মঙ্গলবার ২৪ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

ইমেজ রক্ষায় ব্যাপক তৎপরতা পুলিশ বাহিনীতে

কক্সবাজার, নারায়ণগঞ্জ ও বরিশালে বরখাস্ত হওয়া পাঁচ পুলিশ সদস্য- ১. বরখাস্ত হওয়া ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, ২. ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলী, ৩. কনস্টেবল নন্দ দুলাল, ৪. এসআই শামীম আল মামুন, ৫. এসআই বশির আহমেদ

নাছির উদ্দিন শোয়েব : কক্সবাজারে মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যাকান্ডের পর কতিপয় পুলিশ সদস্যের প্রতি সাধারণ মানুষের বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। করোনা মহামারিতে যে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে দেশের মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছিল সেই বাহিনীটি হঠাৎ ইমেজ সংকটে পড়ে। এ বাহিনীর সুনাম যেনো ম্লান না হয়ে যায় সে ব্যাপারে জোর চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ সদর দফতর। দু’একজন সদস্যের জন্য পুরো বাহিনীর অর্জন যাতে বিনষ্ট না হয় সে বিষয়ে সদর দফতর দৃষ্টি রাখছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। আর এ কারণে সম্প্রতি পুলিশে বড় ধরনের রদবদল চলছে। কক্সবাজার জেলা থেকে পুরো বাহিনীকে বদলি করা হয়েছে। জেলার শীর্ষ কর্মকর্তা থেকে কনস্টেবল পর্যন্ত ১ হাজার ৫০৭ জন পুলিশ সদস্যকে একযোগে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। পুলিশ বাহিনীতে একযোগে একক কোনো জেলায় এ ধরনের বিশাল বদলি নজিরবিহীন।
শুধু তাই নয়, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শীর্ষ কর্মকর্তারা। কক্সবাজারের ঘটনায় একজন ওসিসহ ১১ জন পুলিশ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সূত্র জানায়, পুলিশকে যাতে সাধারণ মানুষ বন্ধু হিসাবে মনে করে সেজন্য এসব চেষ্টা চলছে। পুলিশের ইমেজ রক্ষায় সদর দফতর এ সংক্রান্ত বার্তা এরই মধ্যে রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলায় পুলিশ সুপারদের (এসপি) কাছে পাঠিয়েছে। এতে কনস্টেবল থেকে শুরু করে পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর), বিশেষ করে থানার দায়িত্বে থাকা অফিসার ইনচার্জদের (ওসি) নৈমিত্তিক কর্মকান্ড তীক্ষè নজরদারিতে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উচ্চাভিলাষী দুর্নীতিবাজ, বেপরোয়া ও নানা অপকর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের দ্রুত চিহ্নিত করে তাদের সম্পর্কে পুলিশ সদর দফতরকে অবহিত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে প্রকাশিত অনিয়ম-দুর্নীতির প্রতিটি সংবাদ গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখার জোরালো নির্দেশনা রয়েছে। একই সঙ্গে পুলিশ ইন্টারনাল ওভারসাইট (পিআইও) ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। পুলিশের ভাবমর্যাদা রক্ষায় ঊর্ধ্বতনদের কাছে পাঠানো বিশেষ সতর্ক বার্তায় মাঠপর্যায়ের তদারকিতে কোনো ধরনের দুর্বলতা প্রকাশ পেলে তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অযোগ্যতা হিসেবে ধরা হবে এবং এ ব্যাপারে তাদের বিরুদ্ধেও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার প্রস্তুতি রয়েছে বলে হুঁশিয়ার করা হয়েছে। সুপারভাইজিং কর্মকর্তাদের সঠিক নজরদারির অভাবে ওসিসহ মাঠপর্যায়ের মুষ্টিমেয় পুলিশ সদস্য নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে বলে শীর্ষ প্রশাসন মনে করছে।
জানা গেছে, মেজর সিনহা হত্যার পর ইমেজ পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি শৃঙ্খলা ফেরাতে কক্সবাজার জেলায় কর্মরত পুলিশ সুপার থেকে শুরু করে কনস্টেবল পর্যন্ত ১৫০৭ সদস্যকে একযোগে বদলি করা হয়েছে। একক কোনো জেলার সব সদস্যকে এ ধরনের বদলি দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের আচরণে পরিবর্তন আনতে এই আদেশ বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম রেঞ্জে সদ্য যোগ দেয়া ডিআইজি আনোয়ার হোসেন। পুলিশ সদর দফতর থেকে জারি করা বদলি আদেশগুলো গত দু’দিন ধরে একে একে পৌঁছায় চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ের পাশাপাশি কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে। প্রথমে শুধু পুলিশ সুপার (এসপি) এবিএম মাসুদ হোসেনকে বদলি করা হলেও তার পরদিন সাতজন অতিরিক্ত এবং সহকারী পুলিশ সুপারকে বদলি করা হয়। তৃতীয় দফায় পরিবর্তন করা হয় আট থানার ওসিসহ ৬১ পরিদর্শককে (ইন্সপেক্টর)। সবশেষ শুক্রবার ১৩৯ জন এসআই, ৯২ জন এএসআই এবং ১ হাজার ৫৫ কনস্টেবল ও নায়েককে গণহারে বদলির আদেশ দেয়া হয়। ডিআইজি আনোয়ার হোসেন বলেন, কক্সবাজারে ইতিপূর্বে যারা কর্মরত ছিলো আমরা বিশ্বাস করি সকলে ভালো কাজ করেছেন। পরবর্তীতে আরো ভালো কাজ করবে সে জন্য আমরা পরিবর্তন এনেছি।
দেশের ইতিহাসে এর আগে একযোগে একক কোনো জেলার পুলিশের সব সদস্যকে বদলির এমন নজির নেই। মূলত টেকনাফে পুলিশের গুলীতে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান নিহত হওয়ার পর পুরো দেশের পুলিশই ভয়াবহ ইমেজ সংকটের মুখে পড়ে। সংকট কাটাতেই এ বদলি আদেশ বলে মনে করছেন অপরাধ বিজ্ঞানীরা। তবে তারা পুরো পুলিশ প্রশাসনেরই আমূল পরিবর্তনের কথা বলছেন। কক্সবাজার থেকে বদলি হওয়া সব পুলিশ সদস্যদের আগামী ২৮ এবং ২৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে নতুন ইউনিটে যোগ দিতে কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজি আনোয়ার হোসেন। এ ব্যাপারে অপরাধ বিশ্লেষক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এটি একটি ভালো উদ্যোগ। তবে অন্যায় যার সাথেই হোক ব্যবস্থা নেওয়ার সময় অবশ্যই যেনো সমতা থাকে। শুধু এলিট বা ধনীদের সাথে অন্যায় হলে শাস্তি দেওয়া হবে গরীবের বেলাতে হবে না এমন বৈষম্য যেনো না হয়।
উল্লেখ্য, ৩১ জুলাই কক্সবাজারের টেকনাফ বাহারছড়ার শামালপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে মেজর (অব.) সিনহার মৃত্যুর পর টেকনাফ থানার বরখাস্তকৃত ওসি প্রদীপ কুমার দাশ এবং বাহারছড়া ফাঁড়ির ইনচার্জ ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলীসহ ১১ জন পুলিশ সদস্য গ্রেফতার হয়ে এখন কারাগারে। ঘটনার পর কক্সবাজারে যৌথ সংবাদ সম্মেলন করেন সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ ও পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ। সাংবাদিক সম্মেলনে তারা দুই বাহিনীর মধ্যে আস্থার সম্পর্ক অটুট রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। অন্যদিকে পুলিশ এসোসিয়েশনের সাংবাদিক বিজ্ঞপ্তিতে এই দু‘টি বাহিনীর প্রতি কারো কারো ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচারে’ বিভ্রান্ত না হয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, জনবান্ধব ও গণমুখী পুলিশ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার জন্য সব ধরনের সহযোগিতা ও উৎসাহ অব্যাহত রাখতে সবার প্রতি আহ্বান জানানো হয়। বিভিন্ন সময়ে পুলিশের নানা দায়িত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা উল্লেখ করে এসোসিয়েশনের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর মধ্যে সুদীর্ঘকাল পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক বিদ্যমান। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি, কিছু-কিছু স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি/মহল বা সংগঠন জনগণের কাছে পুলিশ বাহিনীকে বিতর্কিত ও অগ্রহণযোগ্য করার জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় ওই ঘটনার বিষয়ে উস্কানিমূলক বক্তব্য প্রদান করছেন। দুটি ঐতিহ্যবাহী ও ভ্রাতৃপ্রতিম বাহিনীকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর অপপ্রয়াসে লিপ্ত হয়েছেন। এই অপপ্রচার চলমান বিচারিক ও প্রশাসনিক অনুসন্ধান প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ