বুধবার ০২ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

সৌদিতে নতুন করে বিমানের ল্যান্ডিং অনুমতি না মেলায় জটিলতা বাড়ছে

টানা অষ্টম দিনের মতো আজও কাওরান বাজারে সোনারগাঁও হোটেলের সামনে সৌদী এয়ারলাইন্সের টিকিটের আশায় অপেক্ষমান প্রবাসীরা বিক্ষোভ করে গতকাল শনিবার তোলা ছবি -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : আর কত দিন টিকিটের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। কাজে ফেরার উৎকণ্ঠা নিয়ে টানা অষ্টম দিনের মতো আবারও কাওরান বাজারে সোনারগাঁও হোটেলের সামনে টিকেট প্রত্যাশিদের বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। সৌদি আরবে নতুন করে বাংলাদেশ বিমানের ল্যান্ডিংয়ের অনুমতি না মেলায় জটিলতা কাটছে না প্রবাসীদের। বাংলাদেশ বিমান জানিয়েছে নতুন করে নয় টিকেট রি-ইস্যু করা হচ্ছে।
গতকাল শনিবার সকাল থেকেই ভিড় করতে থাকেন প্রবাসীরা। এতে রাস্তায় জটলা সৃষ্টি হয়। তবে বৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে জটলা কমে যায়। সৌদি আরবে নতুন করে বাংলাদেশ বিমানের ল্যান্ডিংয়ের অনুমতি না মেলায় জটিলতা কাটছে না প্রবাসীদের। এখনও বিশেষ অনুমতিতেই আটকে আছে বাংলাদেশ বিমানের সৌদি ফ্লাইট। দেড়শ' টিকিটের বিপরীতে গতকাল শনিবার সকালে মতিঝিলে বিমানের কার্যালয়ের সামনে ভিড় করেন কয়েক হাজার মানুষ। একই অবস্থা সাউদিয়া এয়ারলাইন্সেরও। টোকেন দিতেও তিন দফা তারিখ পরিবর্তন করেছে বিমান সংস্থাটি।
জটিলতা যেন পিছু ছাড়ছে না সৌদি প্রবাসীদের। দিন গড়াচ্ছে তবু মিলছে না সমাধানের পথ। সরকারের আশ্বাস আর দুতিয়ালিতেও ফল মিলছে না। প্রথম দিনের বিক্ষোভের পর প্রাথমিক সমাধানের চারটি ফ্লাইট ল্যান্ডিংয়ের অনুমতির কথা জানালেও এর পর তার অগ্রগতি থমকে আছে।
তাই দিনে দিনে বাড়ছে ক্ষোভ। দেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে প্রবাসীরা জড়ো হচ্ছেন কারওয়ান বাজার আর মতিঝিলে।
পূর্ব নির্ধারিত ঘোষণা অনুসারে শনিবার ৩৫০টি টিকেট দেওয়ার কথা থাকলেও ৫৫০টি টিকেট দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সৌদি এয়ারলাইন্স। তবে বাইরে তখন হাজার হাজার টিকেট প্রত্যাশী।
টিকেট না হয় থাক, তাদের দাবি টোকেন। কিন্তু তারিখ বদলে এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষের ঘোষণা ৪ অক্টোবর আগে মিলবে না টোকেন। আর এতেই তৈরি হয় নতুন করে সংকট। কেউ আবার অভিযোগ করছেন টিকিট কালোবাজারির।
বিক্ষুব্ধ প্রবাসীরা এক পর্যায়ে প্রধান সড়ক আটকে দেওয়ায় বন্ধ হয়ে যায় যান চলাচল। বিপাকে পড়েন অফিসগামী যাত্রীরা। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে অবরোধ তুলে নিলেও সোনারগাঁ মোড়ে অবস্থান নেয় তারা।
একই অবস্থা মতিঝিল বিমানের অফিসে। এ পর্যায়ে টিকেট বিক্রির শেষ দিনে অবশিষ্ট দেড়'শ টিকেটের বিপরীতে সেখানে অবস্থান করছে কয়েক হাজার মানুষ। এসময় পুলিশের সঙ্গে দফায় দাফায় হাতাহাতিতে জড়ান টিকিট প্রত্যাশীরা ।
তবে বিমান কর্তৃপক্ষের সাফ জবাব, নতুন করে ল্যান্ডিং পারমিশন না পাওয়ায় নতুন কোনো ফ্লাইট বুকিং দেয়া সম্ভব নয়। প্রবাসীদের বহনকারী বাংলাদেশ বিমানে দ্বিতীয় বিশেষ ফ্লাইটটি শনিবার বিকেল সাড়ে চারটায় ঢাকা ছাড়ার কথা রয়েছে।
টিকিটের আশায় অপেক্ষমান প্রবাসীরা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তাদের অনেকেই নোয়াখালী, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইলসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে টিকিটের জন্য এসেছেন। কেউ কেউ গত শনিবার থেকে অপেক্ষা করছেন। কিন্তু কাজে ফেরার কোনও নিশ্চয়তা কেউ পাচ্ছেন না। টিকিটের জন্য টোকেন হাতে পেলেও কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যাবে বলে জানান তারা।
নরসিংদী থেকে আসা একজন প্রবাসী জানান, পাঁচ বছর ধরে কাজ করেন সৌদি আরবের জেদ্দায়। পাঁচ দিন ধরে ঘুরছেন টিকিটের জন্য, কিন্তু মিলছে হতাশা। তিনি বলেন, ভিসার ডেট পার হয়ে গেছে। কবে বাড়বে জানি না। টিকিটের জন্য অপেক্ষা করছি পাঁচ দিন ধরে। এয়ারলাইনসের কাছ থেকেও কিছু জানতে পারছি না। আমরা একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি। কাজে ফিরতে পারবো কিনা জানি না।
আরেক প্রবাসী জানান, ১৬ বছর ধরে কাজ করছেন সৌদি আরবে। তিনি বলেন, কাজে ফিরতে না পারলে কাজ থাকবে না। এমনিতে পাঁচ মাস কাজ নাই। তাই বেতন নাই। ছুটিতে আইসা আটকা পড়লাম।
আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু করার পর বাংলাদেশিদের সৌদি আরবে কর্মস্থলে ফেরার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তবে ভিসার মেয়াদ, ফ্লাইট সংকট থাকায় কিছুটা জটিলতায় পড়তে হচ্ছে প্রবাসীদের। সৌদি অ্যারাবিয়ান এয়ারলাইন্স বিশেষ ফ্লাইটের পাশাপাশি নিয়মিত ফ্লাইটে যাত্রী নেওয়া শুরু করেছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সও প্রবাসীদের সৌদিতে ফেরাতে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করবে। তবে করোনা মহামারির মধ্যে সৌদিতে ফিরতে প্রবাসীদের মানতে হবে স্বাস্থ্যবিধিসহ বেশ কিছু শর্ত।  
সৌদি আরব থেকে রিটার্ন টিকিট কেটে যারা ছুটিতে দেশে এসেছেন তাদের টিকিট দেবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। নতুন করে কোনও টিকিট বিক্রি করছে না এয়ারলাইন্সটি। টিকিট বিতরণের ক্ষেত্রে ফ্লাইট বাতিলের তারিখ ধরে পর্যায়ক্রমে টিকিট রি-ইস্যু করা হবে।
বিমান জানিয়েছে, তারিখ অনুসারে যাত্রীদের টিকিট রি-ইস্যু করছে তারা। করোনাভাইরাসের কারণে ১৬ মার্চ থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে সৌদি আরবের আকাশপথের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এ কারণে ১৬ মার্চ থেকে পরবর্তী সব শিডিউল ফ্লাইট বাতিল হয়ে যায়। টিকিট বিতরণের ক্ষেত্রে বিমান ফ্লাইট বাতিলের তারিখ ধরে পর্যায়ক্রমে বাতিল হওয়া ফ্লাইটগুলোর টিকিট রি-ইস্যু করছে।
বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোকাব্বির হোসেন বলেন, যাত্রীদের সুশৃঙ্খলভাবে টিকিট দিতে আমরা ফ্লাইট বাতিলের তারিখ ধরে টিকিট রি-ইস্যু করবো। প্রথমে ১৬ মার্চে বাতিল হওয়া ফ্লাইটের টিকিট রি-ইস্যু করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে ১৭, ১৮, ১৯, ২০ মার্চ এভাবে তারিখ ধরে ধরে সিরিয়ালি টিকিট রি-ইস্যু করা হবে।
বর্তমানে রিয়াদ ও জেদ্দায় ফ্লাইটের অনুমতি পেয়েছে বিমান। অনুমতি না পাওয়ায় দাম্মাম ও মদিনার রুটের যাত্রীদের এখনই টিকিট রি-ইস্যু করেছে না এয়ারলাইন্সটি।
বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোকাব্বির হোসেন বলেন, আমরা রিয়াদ ও জেদ্দায় ফ্লাইটের অনুমতি পেয়েছি। তাই এ রুটের যাত্রীদের টিকিট রি-ইস্যু করা হচ্ছে। দাম্মাম ও মদিনার অনুমোদন পেলে সেই রুটগুলোতেও ফ্লাইট চলবে। নতুন  ফ্লাইট অনুমোদন সাপেক্ষে পর্যায়ক্রমে অন্য যাত্রীদেরও বুকিংয়ের কাজ শুরু হবে। সৌদি আরবে  ১ অক্টোবর থেকে বিমানের বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতির জন্য আবেদন করেছে বিমান। তবে এখনও অনুমতি পায়নি।
মোকাব্বির হোসেন বলেন, আসন বরাদ্দ শুরু করার আগে ল্যান্ডিং পারমিশন আবশ্যক। কিন্তু ল্যান্ডিং পারমিশন পাওয়া যায়নি। ল্যান্ডিং পারমিশন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ফ্লাইট ঘোষণা করা হবে।
বাণিজ্যিক ফ্লাইটের অনুমতি না পেলেও বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটের অনুমতি পেয়েছে বিমান। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাণিজ্যিক ফ্লাইটের পুরাতন টিকিটের যাত্রীদের চার্টার্ড ফ্লাইটে যাওয়ার ব্যবস্থা করছে তারা। গতকাল ২৬ সেপ্টেম্বর  ঢাকা-জেদ্দা ও ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা-রিয়াদে ফ্লাইট পরিচালনা করবে বিমান। এই দুই ফ্লাইটে ১৬ ও ১৭ মার্চের জেদ্দা ও রিয়াদের বাতিল হওয়া ফ্লাইটের যাত্রীদের টিকিট রি-ইস্যু করা হচ্ছে।  তাদের জন্য ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে টিকিট  ইস্যুর কার্যক্রম শুরু করে বিমান।
২৯ সেপ্টেম্বর বিমান ঢাকা-রিয়াদ ও ৩০ সেপ্টেম্বর  ঢাকা-জেদ্দা যাত্রীবাহী ফ্লাইট পরিচালনা করবে। এ ফ্লাইটগুলোতে যেতে পারবেন যাদের ১৮ থেকে ২০ মার্চের জেদ্দা এবং  ১৮ ও ১৯ মার্চের  রিয়াদের বিমানের ফ্লাইট ছিল।  রিটার্ন টিকেটধারীরা ২৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে টিকিট পাবেন। বুকিং করা হচ্ছে আগে আসলে আগে পাবেন ভিত্তিতে।
সৌদিগামী যাত্রীদের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে করোনা নেগেটিভ রিপোর্টসহ বিমানবন্দরে আসতে হবে। যাত্রীদের কোভিড-১৯ নেগেটিভ টেস্ট ফলাফলের  ছয়টি কপি সঙ্গে রাখতে হবে। ৪৮ ঘণ্টার সময় গণনা শুরু হবে নমুনা সংগ্রহের সময় থেকে। যাত্রীদের সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারি করা কোভিড-১৯ স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ন্ত্রণ এবং পদক্ষেপগুলো মেনে সৌদি আরবে প্রবেশ করতে হবে। বিমানে বোর্ডিং এর আগে যাত্রীদের অবশ্যই সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ফর্ম পূরণ করে স্বাক্ষর করতে হবে। সৌদি বিমানবন্দরে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে বিমানবন্দর স্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে পূরণ ও স্বাক্ষর করা ফর্মটি জমা দিতে হবে। নির্দেশাবলি অমান্য করার ফলে সিভিল এভিয়েশন আইনের ১৬৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বড় অঙ্কের জরিমানা আরোপিত হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ