শুক্রবার ২৭ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

স্বামীর সামনে স্ত্রীকে গণধর্ষণ

প্রথম সারিতে বাঁ থেকে সাইফুর রহমান, তারেকুল ইসলাম ও শাহ মাহবুবুর রহমান দ্বিতীয় সারিতে বাঁ থেকে অর্জুন লঙ্কর, রবিউল ইসলাম ও মাহফুজুর রহমান -সংগৃহীত

* ৯ জনকে আসামী করে মামলা
* ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি ॥
* ২ কর্মচারী বরখাস্ত ॥ অস্ত্র উদ্ধার
কবির আহমদ সিলেট : সিলেট বিভাগের অন্যতম বিদ্যাপীঠ এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে এক মহিলাকে  জোরপূর্বক ধরে নিয়ে তার স্বামীর সামনে গণধর্ষণ করেছে ৬ ছাত্রলীগ ক্যাডার। এমন অভিযোগে গতকাল শনিবার এসএমপির শাহপরাণ থানায় ধর্ষিতার স্বামী ৬ জনের  নামে মামলা করেছেন। একই মামলায় আরও তিন জনকে  অজ্ঞাত আসামী করা হয়েছে। মহিলাকে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে মারধর করার পাশাপাশি তার  স্বর্ণালংকারও ছিনিয়ে নিয়েছে ছাত্রলীগের নেতা কর্মীরা। গত শুক্রবার সন্ধ্যা রাতে স্বামীকে নিয়ে এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে বেড়াতে আসা এই দম্পতিকে মারধর করে হোস্টেলে নিয়ে যায় ছাত্রলীগ নেতারা। পরে বন্ধ হোস্টেলে নিয়ে গণধর্ষণ করে। এই ন্যক্কারজনক ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে আওয়ামী লীগ সিলেট মহানগরের কিছু সংখ্যক নেতা দৌড়ঝাঁপ করেন।এস এমপি পুলিশও প্রথমে মিডিয়াকে এ ঘটনার খবর জানাতে অনিহা দেখালেও অবশেষে ধর্ষণের খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে সয়লাব হয়ে গেলে প্রশাসনও সরব হয়ে উঠে। যদিও করোনার কারণে বন্ধ থাকা এমপি কলেজ হোস্টেলে রঞ্জিত গ্রুপের ছাত্রলীগ ক্যাডাররা জুয়া ও তাস খেলায় মত্ত থাকতো তাদের বিরুদ্ধে কোন দিনও আইনগত ব্যবস্থা নিতোনা পুলিশ প্রশাসন। এমন অভিযোগ টিলাগড়, গোপালটিলা ও বালুচর এলাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের। গণধর্ষণের পর শাহপরাণ থানা পুলিশ গতকাল শনিবার ভোর রাতে ছাত্রলীগ নেতাদের নামে হোস্টেলের বরাদ্দকৃত কক্ষে অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু অস্ত্র উদ্ধার করে। এঘটনায় পুলিশ পৃথক আরেকটি মামলা দায়ের করেছে। গতকাল শনিবার এমসি কলেজ অধ্যক্ষ প্রফেসর সালেহ আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় এ ঘটনায় ৩ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এছাড়া গেইটের দায়িত্ব প্রাপ্ত দুজন কর্মচারীকে বরখাস্ত করা হয়। এমসি কলেজ অধ্যক্ষ প্রফেসর সালেহ আহমদ দৈনিক সংগ্রামকে জানান এঘটনায় কলেজের গণিত বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর আনোয়ার হোসেন চৌধুরীকে প্রধান করে ৩ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন সহযোগী অধ্যাপক জীবন কৃষ্ণ ও জামাল আহমদ। এ কমিটিকে আগামী ৭ কার্যদিবসের মধ্যে রিপোর্ট প্রদানের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এছাড়া এ ঘটনায় দায়িত্ব অবহেলার দায়ে দুই কর্মচারীকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
শাহপরাণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল কাইয়ুম মামলার সত্যতা নিশ্চিত করে দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, মামলায় ৬ জনকে সরাসরি জড়িত বলে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অন্য ৩ জনের বিরুদ্ধে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে পুলিশ এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। তিনি বলেন পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
মামলার আসামীরা হলেন, এমসি কলেজ ছাত্রলীগের নেতা ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী শাহ মো. মাহবুবুর রহমান রনি (২৫), কলেজ ছাত্রলীগ নেতা এম সাইফুর রহমান (২৮), ছাত্রলীগ নেতা তারেক (২৮),  অর্জুন লস্কর (২৫), রবিউল ইসলাম (২৫) ও মাহফুজুর রহমান মাছুম (২৫)।
তাদের মধ্যে সাইফুর রহমানের গ্রামের বাড়ি বালাগঞ্জে, রবিউলের বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলায়, মাহফুজুর রহমান মাছুমের বাড়ি সিলেট সদর উপজেলায়, অর্জুনের বাড়ি সিলেটের জকিগঞ্জে, রনির বাড়ি হবিগঞ্জে এবং তারেক সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার বাসিন্দা।
স্থানীয়রা জানান, গত শুক্রবার সন্ধা রাতে ধর্ষিতা মহিলা  তার স্বামীকে নিয়ে সিলেটের এমসি কলেজে ঘুরতে আসেন। এসময় ছাত্রলীগের ৫/৬ জন নেতাকর্মী তাদের জিম্মি করে ছাত্রাবাসে নিয়ে আসে। সেখানে দুজনকে মারধরের পর তরুণীকে ধর্ষণ করে।
খবর পেয়ে শাহপরাণ থানার একদল পুলিশ এসে ওই দম্পতিকে উদ্ধার করে। পরে মহিলাকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান-ষ্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) ভর্তি করা হয়।
এদিকে সিলেট এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে এক মহিলাকে গণধর্ষণের ঘটনায় গত শুক্রবার মধ্যরাতে ছাত্রাবাসটিতে অভিযান চালায় শাহপরাণ থানা পুলিশ। এ সময় ছাত্রলীগ নেতাদের কক্ষ থেকে পিস্তলসহ বেশকিছু অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এই অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছে।
গতকাল শনিবার সকালে ধর্ষণ মামলার আসামী এমসি কলেজ ছাত্রলীগ নেতা এম সাইফুর রহমান (২৮) কে আসামি করে ও পুলিশ বাদী হয়ে অস্ত্র আইনে এই মামলা দায়ের করা হয়।
এর আগে শুক্রবার মধ্যরাতে এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে পুলিশি অভিযানকালে একটি বিদেশি পিস্তল, চারটি রামদা, দুটি লোহার পাইপ উদ্ধার করা হয়। ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতা সাইফুর রহমানের কক্ষ থেকে এসব অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।

গণধর্ষণ ধাপাচাপা দেয়ার চেষ্টা আ.লীগ নেতাদের
অপরদিকে সিলেট মুরারীচাঁদ (এমসি) কলেজ ছাত্রাবাসে গত শুক্রবার সন্ধা রাতে গণধর্ষণের শিকার  এই মহিলা ও তার স্বামীর সাথে আপোষ মীমাংসা করার চেষ্টা করেন সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের কিছু সংখ্যক নেতৃবৃন্দ।
জানা যায়, প্রথমদিকে ধর্ষণের ঘটনা স্থানীয় কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা বিষয়টি ধাপাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেন। আপোষে মীমাংসারও চেষ্টা চালান তারা। প্রথমদিকে পুলিশও বিষয়টি গণমাধ্যমের কাছে এড়িয়ে যায়। পরে গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বিষয়টি জানাজানি হয়ে যাওয়ায় ধাপাচাপা দেয়ার চেষ্টা বিফলে যায়। তবে দীর্ঘ সময়ক্ষেপণের কারণে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয় অভিযুক্তরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার সন্ধ্যা রাতে স্ত্রীকে নিয়ে প্রাইভেটকারে করে এমসি কলেজে বেড়াতে যান সিলেটের দক্ষিণ সুরমা এলাকার এক যুবক। বিকেলে এমসি কলেজের ছাত্রলীগের ছয়জন নেতা তাদের ধরে ছাত্রাবাসে নিয়ে আসেন। এই ছাত্রনেতাদের প্রত্যেকেই ছাত্রাবাসে থাকেন।
এরপর ছাত্রাবাসে এনে এই দম্পত্তিকে প্রথমে মারধর করেন তারা। এ সময় তার সাথে থাকা স্বর্ণালংকারও ছিনিয়ে নেয় ছাত্রলীগ নেতা কর্মী। পরে মহিলাকে গণধর্ষণ করেন। সন্ধ্যার পর এই খবর পেয়ে টিলাগড় এলাকার একাধিক  আওয়ামী লীগ নেতা ও কয়েকজন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। প্রথমে তারা বিষয়টি ধাপাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর তারা বিষয়টি আপোষে শেষ করার চেষ্টা চালান। এসময় ধর্ষণের শিকার নারী ও তার স্বামীকে আপোষে মীমাংসার জন্য চাপ দেয়া হয় বলেও জানা গেছে। তবে ধর্ষণ ঘটনার খবর পেয়ে গণমাধ্যম কর্মীরা ঘটনাস্থলে হাজির হওয়ায় ধামাপাচা দেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। এসময় আওয়ামী লীগ নেতারাও ঘটনাস্থল থেকে সরে পড়েন। তবে আপোষের চেষ্টায় অনেকক্ষণ সময় ক্ষেপনের সুযোগে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয় অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতারা।
তবে আপোষের মীমাংসার চেষ্টার অভিযোগ অস্বীকার করে সিলেট মহানগরের শাহপরান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাইয়ুম চৌধুরী জানান, এক দম্পতিকে আটকে রাখা হয়েছে খবর পেয়েই আমরা এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে যাই। এরপর সেখান থেকে তাদের উদ্ধার করি। পরে ধর্ষণের শিকার হওয়া নারীকে সিলেট ওসমানী হাসপাতালের ওসিসি সেন্টারে ভর্তি করা হয়। এঘটনায় জড়িতদের  গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ