ঢাকা, শুক্রবার 30 October 2020, ১৪ কার্তিক ১৪২৭, ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪২ হিজরী
Online Edition

আবার কলঙ্কিত হল সিলেটে এমসি কলেজ: স্বামীর সামনে স্ত্রী ধর্ষণের শিকার

সংগ্রাম অনলাইন ডেস্ক: সিলেটের এমসি কলেজে স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এক গৃহবধূ।এ ঘটনায় ৯ জনকে আসামি করে মামলা করেছে ভুক্তভোগীর পরিবার। অভিযুক্তদের সবাই ছাত্রলীগ কর্মী।তারা সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুব ও ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক রণজিৎ সরকারের অনুসারী বলে জানা গেছে।

আজ শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সকালে, সিলেটের শাহপরান থানায় ৯ জনকে আসামি করে মামলা করে ওই গৃহবধূর পরিবার। এর মধ্যে ছয়জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এরা হলেন সাইফুর রহমান (২৮), তারেকুল ইসলাম (২৮), শাহ মাহবুবুর রহমান ওরফে রনি (২৫), অর্জুন লঙ্কর (২৫), রবিউল ইসলাম (২৫) ও মাহফুজুর রহমান ওরফে মাসুম (২৫)।

তাদের মধ্যে তারেক ও রবিউল বহিরাগত। বাকিরা এমসি কলেজের সাবেক ছাত্র। নাম উল্লেখ করা ছয়জনের সঙ্গে তিনজন সহযোগী ছিলেন উল্লেখ করে তাদের অজ্ঞাত বলা হয়েছে।

এদিকে, এই ঘটনা স্থানীয় কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠেছে।

একটি সূত্র জানায়, এই ধর্ষণের ঘটনা ধাপাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেন স্থানীয় কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা । তারা আপস মীমাংসারও চেষ্টা চালান। প্রথমদিকে পুলিশও বিষয়টি গণমাধ্যমের কাছে এড়িয়ে যায়। পরে গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বিষয়টি জানাজানি হয়ে যাওয়ায় ধাপাচাপা দেয়ার চেষ্টা বিফলে যায়। তবে, দীর্ঘ সময়ক্ষেপণের কারণে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয় অভিযুক্তরা।

তবে, আপস মীমাংসার চেষ্টার অভিযোগ অস্বীকার করে সিলেট মহানগরের শাহপরাণ থানার ওসি কাইয়ুম চৌধুরী জানান, এক দম্পতিকে আটকে রাখা হয়েছে খবর পেয়েই আমরা এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে যাই। এরপর সেখান থেকে তাদের উদ্ধার করি। পরে ধর্ষণের শিকার হওয়া নারীকে ওসমানী হাসপাতালের ওসিসি সেন্টারে ভর্তি করা হয়। এঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতারে চেষ্টা চলছে।

শুক্রবার দিবাগত রাত ২টার দিকে পুলিশ অভিযুক্ত এক ধর্ষকের রুম থেকে দেশি-বিদেশি অস্ত্র উদ্ধার করেছে। তবে এখন পর্যন্ত অভিযুক্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

ছাত্রলীগ নামধারী সন্ত্রাসীদের কক্ষ থেকে উদ্ধারকৃত অস্ত্র

(ওসি) আব্দুল কাইয়ুম বলেন, আমরা রাতে এমসি কলেজের হোস্টেলে অভিযান চালিয়ে সাইফুর রহমানের রুম থেকে একটি পাইপগান, চারটি রামদা ও একটি চাকুসহ বিভিন্ন জিনিস উদ্ধার করি। 

এ বিষয়ে এমসি কলেজের হোস্টেল সুপার জামাল উদ্দিন বলেন, শুনেছি কারা স্বামী-স্ত্রীকে আটক রাখে হোস্টেলে। পরে পুলিশ গিয়ে তাদের উদ্ধার করে। এর বাইরে তিনি আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এমসি কলেজের অধ্যক্ষ সালেহ আহমদ বলেন, ঘটনাস্থলে পুলিশ রয়েছে। তারা বিষয়টি দেখছে। তবে যতটুকু জেনেছি স্বামী-স্ত্রীকে কারা হোস্টেলে আটক করে রেখেছিল।

জানা যায়, শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় একটি প্রাইভেট কারযোগে স্বামীকে সাথে নিয়ে টিলাগড় এলাকার সিলেট মুরারিচাঁদ (এমসি) কলেজে বেড়াতে আসেন দক্ষিণ সুরমার শিববাড়ির এক যুবক।বিকেলে এমসি কলেজের ছাত্রলীগের ছয়জন নেতা তাদের ধরে ছাত্রাবাসে নিয়ে আসেন। এই ছাত্রনেতাদের প্রত্যেকেই ছাত্রাবাসে থাকেন। ছাত্রাবাসে এনে ওই দম্পত্তিকে প্রথমে মারধর করেন তারা। পরে ওই তরুণীকে গণধর্ষণ করেন।

সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার জ্যোতির্ময় সরকার বলেন, “ওই নববধূ তার স্বামীর সঙ্গে এমসি কলেজে ঘুরতে আসেন। এক পর্যায়ে তার স্বামী সিগারেট খাওয়ার জন্য কলেজের গেইটের বাইরে বের হন।

“এসময় ৬/৭ জন যুবক তরুণীকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে নিয়ে এমসি কলেজ ছাত্রাবাস এলাকায় নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে।”

এসময় তার স্বামী প্রতিবাদ করলে তাকে মারধর করা হয় বলে জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।

খবর পেয়ে পুলিশ রাত সাড়ে ১০টার দিকে ওই তরুণীকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ভর্তি করছে।

পুলিশ দুর্বৃত্তদের ধরতে অভিযান শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তা জ্যোতির্ময় সরকার।

এদিকে এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে ধর্ষণের এই ঘটনায় ৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তারা ছাত্রলীগের কর্মী। এর মধ্যে সাইফুর রহমান নামে একজনের কক্ষ থেকে অস্ত্র উদ্ধার করেছে পুলিশ।

অভিযুক্ত ছাত্রলীগ কর্মীদের কয়েকজন

শনিবার ভোর রাতে ওই ছাত্রাবাসে সাইফুরের কক্ষ থেকে একটি পাইপগান, চারটি রামদা, একটি ছুরি ও দুটি লোহার পাইপ উদ্ধার করে বলে শাহপরাণ থানার ওসি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, “রাতে এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত সাইফুর রহমানের কক্ষ থেকে এসব অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় অস্ত্র মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।”

এছাড়া কলেজের ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র শাহ মাহবুবুর রহমান রনি, মাহফুজুর রহমান মাছুম, অর্জুন, রাজন আহমদ এবং বহিরাগত ছাত্রলীগ কর্মী রবিউল এবং তারেক আহমদ এই ঘটনায় জড়িত বলে নাম এসেছে পুলিশের কাছে।

তাদের মধ্যে সাইফুর রহমানের গ্রামের বাড়ি বালাগঞ্জে, রবিউলের বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলায়, মাহফুজুর রহমান মাছুমের বাড়ি সিলেট সদর উপজেলায়, অর্জুনের বাড়ি সিলেটের জকিগঞ্জে, রনির বাড়ি হবিগঞ্জে এবং তারেক সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার বাসিন্দা।

এর আগে ২০১২ সালের ৮ জুলাই সন্ধ্যায় শিবির উৎখাতের নামে সিলেটের এমসি কলেজের ঐতিহ্যবাহী ছাত্রাবাসে হামলা করে অগ্নিসংযোগ করেছিল ছাত্রলীগ। এতে ৪২টি কক্ষ ভস্মীভূত হয়।ঘটনার পাঁচ বছর পর সিলেটের মহানগর বিচারিক হাকিম আদালতে বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়।তদন্ত প্রতিবেদনে  ২৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়। অপরাধীদের অধিকাংশই ছিল ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী। বাকিরাও ছিল সরকারি দলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।তাঁদের সবার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন আদালত।

ডিএস/এএইচ

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ