মঙ্গলবার ১৯ জানুয়ারি ২০২১
Online Edition

রিমান্ডে স্বীকারোক্তি আদায় নিয়ে সন্দেহ বাড়ছে

* বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ হাইকোর্টের
* দুই ঘটনায় তিন পুলিশ বরখাস্ত, তদন্ত কমিটি গঠন

নাছির উদ্দিন শোয়েব : নারায়ণগঞ্জে এক কিশোরীকে ধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে বলে স্বীকার করেছেন তিন আসামী। তারা আদালতেও ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। ৫১ দিন পর সেই কিশোরী জীবিত ফিরে আসা নিয়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। তাহলে কেন পুলিশের হাতে গ্রেফতার তিন ব্যক্তি ধর্ষণ ও হত্যাকান্ডের মতো জঘন্য অপরাধ না করেও নিজেদের ঘাড়ে দায়ভার নিলেন?  এদিকে বরিশালেও একই ধরণের আরও একটি ঘটনা ঘটেছে। স্বামীকে হত্যার দায়ে স্ত্রীকে গ্রেফতার করলে জিজ্ঞাসাবাদে তিনিও দায় স্বীকার করেছেন বলে দাবি পুলিশের। এ ঘটনায়ও তিন ব্যক্তি অন্য একটি চুরির মামলায় পুলিশের হাতে আটকের পর স্বামীকে হত্যার কথা স্বীকার করে।
এ দু‘টি ঘটনা ছাড়াও স্বীকারোক্তি আদায়ের আরও অভিযোগ আছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে। টেকনাফ থানার বরখাস্ত হওয়া ওসির বিরুদ্ধে ক্রসফায়ারের হুমকি দিয়ে স্বীকারোক্তি আদায় এবং গুলি চালিয়ে নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করার বহু অভিযোগ আসছে। এসব ঘটনায় প্রদীপের বিরুদ্ধে ভুক্তভুগীরা বিচার চেয়ে মামলা করেছেন। বিষয়টি উচ্চ আদালত গড়িয়েছে। সম্প্রতি নারায়নগঞ্জে মৃত কিশোরীর জীবিত ফিরে আসা এবং তিন ব্যক্তির স্বীকারোক্তির বিষেেয় বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ  দিয়েছেন হাইকোর্ট।  
স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে- তাহলে কেন ঘটছে এ ধরণের ঘটনা? অনুসন্ধানে এবং ঘটনা বিশ্লেষণে বেরিয়ে এসেছে ভয়ঙ্কর তথ্য। ভুক্তভুগীদের অভিযোগে জানা গেছে, মামলার সঠিক তদন্ত না করে পুলিশ সন্দেহজনক ব্যক্তিদের গ্রেফতারের পর নির্যাতন চালিয়ে ঘটনার স্বীকারোক্তি আদায় করাচ্ছে। স্বীকারোক্তি দিতে না চাইলে ক্রসফায়ারে হত্যার হমকি দেয়া হয়। ফলে জীবন বাঁচাতে অনেকেই পুলিশের দেয়া বক্তব্য স্বীকার করে নেয়। এমনকি আদালতে ১৬৪ ধারায়ও তারা জবানবন্দি দিতে বাধ্য হন। আদালতে স্বীারোকক্তি না দিলে পূনরায় রিমান্ডে এনে নির্যাতনেরও ভয় দেখানো হয় বলে অভিযোগ আছে। এমনকি অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য উদ্ধারের নামে আসামিকে ক্রসফায়ার দেয়া হবে এমন ভয় থাকায় আদালতে তারা স্বীকারোক্তী দেন। ফলে মামলার তদন্ত সঠিক পথে এগোয় না। প্রকৃত ঘটনা চাপা পড়ে যায়। সঠিক ঘটনা কোনো ভাবে প্রকাশ না পেলে অপরাধ না করেও মিথ্যা মামলায় সাজা খাটতে হয়।
যা ঘটেছে নারায়ণগঞ্জে : নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগ পাক্কা রোড এলাকার ১৫ বছরের এক স্কুলছাত্রী গত ৪ জুলাই নিখোঁজ হয়। বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজির পর ১৭ জুলাই সদর মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন স্কুলছাত্রীর বাবা। এক মাস পর ৬ আগস্ট একই থানায় স্কুলছাত্রীর বাবা অপহরণ মামলা করেন। মামলায় প্রধান আসামি করা হয় বন্দর উপজেলার বুরুন্ডি খলিলনগর এলাকার আমজাদ হোসেনের ছেলে আব্দুল্লাহ (২২) ও তার বন্ধু বুরুন্ডি পশ্চিমপাড়া এলাকার সামসুদ্দিনের ছেলে রকিবকে (১৯)। তাদের ওইদিনই গ্রেফতার করা হয়। দুদিন পর গ্রেফতার করা হয় বন্দরের একরামপুর ইস্পাহানি এলাকার বাসিন্দা নৌকার মাঝি খলিলকে (৩৬)। গত ৯ আগস্ট পুলিশ জানায়, স্কুলছাত্রীকে গণধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেন আসামিরা। তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় এ ঘটনা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। অথচ ঘটনার ৫১ দিন পর ২৩ আগস্ট দুপুরে বন্দরের নবীগঞ্জ রেললাইন এলাকায় সুস্থ অবস্থায় পাওয়া যায় নিখোঁজ স্কুলছাত্রীকে। সে নিজে তার মাকে ফোন কওে কথা বলে! বাবা-মা এতে অবাক হয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে বিষয়টি জানান। পরে স্কুলছাত্রীকে নিয়ে তারা থানায় হাজির হন। তাদের সঙ্গে ছিল কিশোরীর স্বামী ইব্রাহিম। তাকে জীবিত অবস্থায় পাওয়ায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়। পুলিশের তদন্ত ও আদালতে দেয়া জবানবন্দিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। মেয়েটি ফিরে আসার পর অভিযোগ ওঠে, জিজ্ঞাসাবাদে মারধর না করার কথা বলে গ্রেফতারকৃত তিনজনের কাছ থেকে ঘুষ নিয়েছিলেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই শামীম আল মামুন।
এদিকে কিশোরীকে অপহরণ ও ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে তিন আসামির কাছ থেকে জোরপূর্বক জবানবন্দি আদায় এবং ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তদন্ত কর্মকর্তা এসআই শামীমকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। ২৪ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেনে হাইকোর্ট। আগামী ৪ নভেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ৫ তারিখ শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম এবং বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
বরিশালের ঘটনা : ২০১৮ সালের ১৮ এপ্রিল রাতে বরিশাল সদর উপজেলার বুখাইনগর গ্রামে নিজ বাড়িতে ঘুমন্ত অবস্থায় দলিল লেখক রিয়াজকে কুপিয়ে হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন উপ-পরিদর্শক (এসআই) বশির আহমেদ। ২০ এপ্রিল নিহতের স্ত্রী লিজা পরকিয়া প্রেমিক মাসুমকে নিয়ে স্বামী হত্যার কথা স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তি দেয়। এদিকে নগর গোয়েন্দা পুলিশের অধিকতর তদন্তে গ্রেফতার হওয়া তিন যুবক গত ২৮ আগস্ট স্বীকারোক্তিতে বলেছে, ঘরে চুরি করতে ঢুকলে রিয়াজ জেগে ওঠায় তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। লিজার অভিযোগ, এসআই বশির আহমেদ তাকে অমানুষিক নির্যাতন করে আদালতে জবানবন্দী দিতে বাধ্য করেছিল। এ নিয়ে গত ৩ সেপ্টেম্বর ‘নির্যাতন করে স্বামী হত্যার স্বীকারোক্তি আদায়’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এ ঘটনায় এসআই বশির আহমেদকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। নির্যাতন করে স্বামী খুনের স্বীকারোক্তী আদায় করায় অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিচার দাবী করেছেন ঘটনার শিকার গৃহবধু আমিনা আক্তার লিজা (৩০)। সাংবাদিক সম্মেলন করে লিজা বলেন, কেতোয়ালী মডেল থানার উপ পরিদর্শক (এসআই) বশির আহমেদ (বর্তমানে সাময়িক বরখাস্ত) ও এসআই ফিরোজ আল মামুনসহ কয়েকজন তাকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করেছে। থানার কয়েকজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা তখন থানায় উপস্থিত থাকায় তারাও বিষয়টি অবগত ছিলেন। এ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল কর্মকর্তার বিচার দাবী করেছেন তিনি। এই দুই এসআইকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
ক্রসফায়ারের হুমকি দিয়ে স্বীকারোক্তি প্রদীপের বিরুদ্ধে : কক্সবাজারে মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া বহুল আলোচিত টেকনাফের সাবেক ওসি প্রদীপের বিরুদ্ধে একটার পর একটা মামলা হচ্ছে।  সিনহা হত্যার পর এপর্যন্ত আরো ১৪  মামলার খবর পাওয়া গেছে। মামলাগুলোর অভিযোগ প্রায় একই রকম ‘টাকা না পেয়ে ক্রসফায়ারে হত্যা। ক্রসফায়ারের ভয়ে মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায়’। আইনজীবী, সাংবাদিক, রাজনীতিক, ব্যবসায়ীসহ কেউ তার কাছে রক্ষা পাননি। মিথ্যা অভিযোগ এনে প্রদীপের বাহিনীর হাতে আটকের পর থানায় নিয়ে টর্সার সেলে অমানুসিক নির্যাতন চালানো হতো। স্বীকারোক্তি আদায় করে পরিবারের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়া হতো লাখ লাখ টাকা। এরপরও প্রানে রক্ষা পাননি অনেকে। সিনহা হত্যাকান্ডের পর প্রদীপের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ ও বুক্তভোগীরা মুখ খোলতে শুরু করেছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ