বুধবার ০২ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

ড্রাইভার মালেকের ‘দুর্নীতির’ দায় নিতে চায় না স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতর

তোফাজ্জল হোসাইন কামাল : স্বাস্থ্য অধিদফতরের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী ড্রাইভার আবদুল মালেকের দুটি মামলা তদন্তের অনুমতি চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে র‌্যাব। গতকাল বুধবার র‌্যাবের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদনটি করা হয়। এদিকে র‌্যাবের প্রাথমিক তদন্তে আবদুল মালেক বিদেশে টাকা পাচারের তথ্য পেয়েছে এলিট ফোর্সটি। র‌্যাবের মুখপাত্র লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ গতকাল বুধবার এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে, মালেকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের দায় নিতান্তই তার ব্যক্তিগত বলে দাবি করেছে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতর। এক সময় স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরের গাড়িচালক মালেকের বিষয়ে অবস্থান ব্যাখ্যা করে গতকাল বুধবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়েছে অধিদফতর। তাতে বলা হয়, মালেকের দুর্নীতির দায় অধিদফতরের নয়।
গত ১৯ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী গাড়িচালক আবদুল মালেক ওরফে মালেক ড্রাইভারকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। অস্ত্র ও জাল টাকাসহ গ্রেপ্তারের পর তার শত কোটি টাকার সম্পদের খোঁজ পাওয়ার কথা জানায় র‌্যাব। র‌্যাব কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তুরাগের দক্ষিণ কামারপাড়ায় ২টি সাততলা ভবন, একই এলাকায় একটি বিশাল ডেইরি ফার্ম, ধানমন্ডির হাতিরপুলে সাড়ে ৪ কাঠা জমিতে একটি নির্মাণাধীন ১০তলা ভবন ছাড়াও কলাবাগানসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অন্তত ১৫টি ফ্ল্যাট রয়েছে মালেকের। এছাড়া বিভিন্ন ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ অর্থও জমা আছে তার। গ্রেপ্তারের সময় মালেকের কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন, পাঁচ রাউন্ড গুলি, দেড় লাখ বাংলাদেশি জাল নোট, একটি ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোন উদ্ধার করার কথা বলা হয়েছে। এ ঘটনায় র‌্যাব-১ এর পুলিশ পরিদর্শক (শহর ও যান) আলমগীর হোসেন বাদী হয়ে দুটি পৃথক মামলা  দায়ের করেন। এরপরদিন সোমবার অস্ত্র ও বিশেষ ক্ষমতা আইনের দুই মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আবদুল মালেক ওরফে বাদলের ১৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত।
র‌্যাব‘র মুখপাত্র বলেন, আমাদের নিজস্ব গোয়েন্দারা জানতে পেরেছে তিনি (মালেক ড্রাইভার) অবৈধভাবে শতকোটি টাকার মালিক হয়েছেন। তার এই সম্পদের একটি অংশ বিদেশে পাচার করতে পারে বলে তথ্য এসেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে র‌্যাব আনুষ্ঠানিকভাবে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডিকে মালেকের মানিলন্ডারিং বিষয়ে তথ্য দিয়েছে। পাশাপাশি তুরাগ থানায় হওয়া দুটি মামলা তদন্তের অনুমতি চেয়ে পুলিশ সদরদপ্তরের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে র‌্যাব। অনুমোদন পেলে র‌্যাব আবদুল মালেক ড্রাইভারকে তাদের হেফাজতে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করবে বলে জানান মুখপাত্র।
তাকে গ্রেপ্তারের পর র‌্যাবের কাছে যে তথ্য এসেছে তাতে তার আয়ের সঙ্গে পেশার অসামঞ্জস্যতা নিয়ে অবাক হয়েছে বাহিনীটি। এই আয়ের পেছনে তাকে সহযোগিতাকারীদের বিষয়ে খোঁজখবর নিতে শুরু করেছে দুদক।
জানতে চাইলে আশিক বিল্লাহ বলেন, ‘তিনি (মালেক) যে পরিমাণ আয় করেছেন তার কতটা অংশ অবৈধ বা বৈধভাবে পাচার করেছেন সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তদন্তের পরে বলা যাবে।’
এছাড়া তার বিরুদ্ধে অন্য অভিযোগ বা আর্থিক অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে দুদক কাজ শুরু করেছে জানান র‌্যাবের এই কর্মকর্তা।

‘দুর্নীতির’ দায় নিতে চায় না স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতর
অবৈধ সম্পদ অর্জনের দায়ে র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার গাড়িচালক আবদুল মালেকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের দায় নিতান্তই তার ব্যক্তিগত বলে দাবি করেছে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর। এক সময় স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের গাড়িচালক মালেকের বিষয়ে অবস্থান ব্যাখ্যা করে গতকাল বুধবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়েছে অধিদপ্তর।
এতে বলা হয়, ২০১৯ সালের ২৪ নভেম্বর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে এ অধিদপ্তর গঠিত হওয়ার পর ১২ ডিসেম্বর প্রথম মহাপরিচালক হিসেবে যোগ দেন অধ্যাপক ডা. এনায়েত হোসেন। চলতি বছর ১ জানুয়ারি মালেককে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরে প্রেষণে নিয়োগ দেওয়া হয়।
প্রতিষ্ঠার পর এখন পর্যন্ত এই অধিদপ্তরের অধীনে কোনো কেনাকাটা, নিয়োগ, পদায়ন বা পদোন্নতি হয়নি বলে বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়েছে। “কাজেই গাড়ি চালক মো. আব্দুল মালেকের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সঙ্গে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর বা স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।” স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের কোনো পরিবহন পুল নেই বলেও জানানো হয়েছে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে।

মহাখালীতে হোটেল ব্যবসাও আছে!
গাড়িচালক মো. আবদুল মালেক ওরফে বাদলের অঢেল সম্পদের তথ্য এরই মধ্যে বেরিয়ে এসেছে। ফ্ল্যাট, বাড়ি, ডেইরি ফার্মের পর এবার জানা গেল, মহাখালীতে হোটেল ব্যবসাতেও যুক্ত ছিলেন তিনি। সম্প্রতি অবশ্য হোটেলটি বিক্রি করে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি। র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হয়ে যাওয়ায় সেই প্রক্রিয়া আর শেষ করতে পারেননি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীর মহাখালী আমতলীতে ‘কাপাসিয়া হোটেল’ নামে পরিচিত হোটেলটি দীর্ঘদিন থেকে পরিচালনা করে আসছিলেন আবদুল মালেক। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই ভবনের মালিক সেলিম রেজাও একজন গাড়িচালক। তবে সেলিম রেজার পরিবারের সদস্যরা এই অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, এটা তার শ্বশুরবাড়ি থেকে পাওয়া বাড়ি। তাদের দাবি, ২০০৮ সালে ১৪ লাখ টাকা দিয়ে মালেক এই হোটেলের জায়গা কিনে নেন সেলিম রেজার কাছ থেকে।
জানা যায়, কাপাসিয়া হোটেলের দেখাশোনা করতেন আবদুল মালেকের বড় মেয়ের স্বামী রতন। স্বাস্থ্য অধিদফতরের ক্যান্টিনও চালাতেন এই রতনই। ১৩ সেপ্টেম্বর এই হোটেল বিক্রি করার উদ্যোগ নেন আবদুল মালেক। ৩০ লাখ টাকা দিয়ে এই হোটেল বিক্রির বিষয়ে কথা হয় সেলিম রেজার সঙ্গেও। তবে আবদুল মালেক গ্রেফতার হয়ে যাওয়ায় হোটেলটি আর বিক্রি করতে পারেননি।
 হোটেলের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা বুলবুল বলেন, ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে হোটেলটি চলছে। আমি আবদুল মালেকের কাছ থেকে ভাড়া নিয়েছিলাম। তার বড় মেয়ের জামাই রতন দেখাশোনা করেন। আগে দৈনিক এক হাজার ৫০০ টাকা দিতাম। তবে করোনাভাইরাসের কারণে এক হাজার ২০০ টাকা দিতাম। অর্থাৎ মাসে ৩৬ হাজার দিতাম।
বুলবুলও জানান, হোটেলটি বিক্রি করে দেওয়ার কথাবার্তা চলছিল। তিনি বলেন, আমরা শুনেছি, ৮ থেকে ১০ দিন আগে এটি বিক্রির কথা হয়েছিল, দরদামও ঠিক হয়ে গেছিল। ৩০ লাখ টাকা দিয়ে হোটেলটি এই বিল্ডিংয়ের মালিক সেলিম রেজার কিনে নেওয়ার কথা শুনেছিলাম। সেটা তো আর হয়নি।
বিল্ডিংয়ে মালিক সেলিম রেজার সঙ্গে আবদুল মালেকের ভালো সম্পর্ক ছিল। সেলিম রেজাকে এলাকায় অনেকে গাড়িচালক হিসেবে চেনেন। অনেকে বলেন, তিনি গাড়ির ব্যবসা করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ