বুধবার ২১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

কিশোরগঞ্জ হাওড়ে মাত্রাতিরিক্ত ভাড়া এবং খাবার মূল্য আদায়ের অভিযোগ

কিশোরগঞ্জ হাওড়ে ভাড়ায় চালিত ট্রলার ও স্পীড বোট

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল, কিশোরগঞ্জ হাওড় থেকে ফিরে : দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত কিশোরগঞ্জের হাওড় ভ্রমণপিপাসু পর্যটকদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করছে। বৈশ্বিক মহামারি করোনাকালেও এখানকার নিকলী বেড়িবাঁধ হাওড় এবং ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম উপজেলা পর্যন্ত বিস্তৃত পানির বুক চিড়ে বয়ে চলা ‘অলওয়েদার সড়কপথ’ এলাকায় হাজারো পর্যটকের ঢল নামছে। আসছেন অনেক বিদেশী পর্যটকও। কিন্তু কোনো রকম নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকায় খেয়াল খুশিমতো মাত্রাতিরিক্ত নৌকা, স্পিডবোট, অটোরিকশা ও মোটরবাইক ভাড়া এবং হোটেলে খাবার মূল্য আদায় করা হচ্ছে। যার কারণে পর্যটকদের মধ্যে চরম বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একটি সিন্ডিকেট পর্যটকদের ভ্রমণে প্রয়োজনীয় সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করছে। একইসাথে গাড়ি পার্কিং, মোটেল এবং প্রয়োজনীয় শৌচাগার না থাকায় পরিবার নিয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে পর্যটকদের। পর্যটকরা বলছেন, পানি ও সড়কযানের এমন পকেটকাটা ভাড়া এবং খাদ্যসামগ্রীর মূল্য আদায় এই সম্ভাবনাময় পর্যটন এলাকাটিকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন অনেকেই। একইসাথে বর্তমান রাষ্ট্রপতির সুনামও ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে মনে করেন পর্যটকরা।
কিশোরগঞ্জের হাওড় উপজেলা নিকলী উপজেলা সদরকে রক্ষায় ২০০০ সালে সরকার পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং পার্শ্ববর্তী ছাতির চর গ্রাম ভাঙনের কবল থেকে রক্ষায় অসংখ্য পানি সহিষ্ণু করচ গাছ বন তৈরি করে। বর্ষায় এই এলাকা কানায় কানায় ডুবে গিয়ে সাগরের ন্যায় দিগন্ত বিস্তৃত এক ভিন্ন রকম নৈসর্গিক সৌন্দর্যে রূপ নেয়। বেড়িবাঁধে আছড়ে পড়া উত্তাল ঢেউয়ের দৃশ্য, নৌকা ও স্পীড বোটে ঘুরে বেড়ানো, আর করচবনের শীতল ছায়ায় জলকেলি পর্যটকদের হৃদয় মন আন্দোলিত করে। একই সঙ্গে পার্শ্ববর্তী হাওড় উপজেলা ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম পর্যন্ত হাওরের বুক চিড়ে বিস্তৃত ৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ দৃষ্টিনন্দন অল-ওয়েদার সড়কপথ বর্ষায় পর্যটকদের কাছে ভিন্ন রূপে ধরা দেয়। চারদিকে সাগরের ন্যায় থৈ-থৈ পানি আর মাঝপথে সরীসৃপের ন্যায় এঁকেবেঁকে চলা এ সড়কপথ মুখরিত হয়ে ওঠে পর্যটকদের কোলাহলে। কিন্তু এলাকাটি ব্যাপকভাবে পরিচিতি পাবার আগেই একটি সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তাদের আচরণে অনেকেই এখন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন হাওড় পরিদর্শন থেকে।
এ হাওড় দেখতে নিয়মিত আসা ভুক্তভোগী দ্য ব্যাকপ্যাকার্স নামে একটি ভ্রমণপিপাসু গ্রুপের হোস্ট ফয়সাল আহমেদের সঙ্গে কথা হলে তিনি অভিযোগ করে বলেন, হাওরের জিনিসপত্রের এমন দাম সারা দেশের অন্য অঞ্চলকে ছাড়িয়ে গেছে। আর ওখানকার মানুষ তো পর্যটকদের এক একজনকে টাকার মেশিন মনে করছেন। নিকলী থেকে মিঠামইন নৌকা ভাড়া প্রকার ভেদে ৭ হাজার থেকে ২২ হাজার পর্যন্ত। তাও আবার সন্ধ্যার আগে ফিরে আসতে হবে। সন্ধ্যার পরে ফিরলে আলাদা একস্ট্রা টাকা! এর সাথে রয়েছে খাবার খরচসহ বখশিশ। একদিনের জন্য এতো বেশি নৌকা ভাড়া দেশের আর কোথাও আছে কিনা আমার জানা নেই। আমার তো মনে হচ্ছে, আমাদের দেশের পর্যটন শিল্পকে ধ্বংস করার জন্য আমরা নিজেরাই দায়ী।
অপরদিকে, ঢাকা থেকে ২৫ জনের গ্রুপ নিয়ে এ হাওড় এলাকায় ঘুরতে আসা গণমাধ্যম কর্মী দলের ভ্রমণপিপাসু পর্যটক সাঈদ আল হাসান শিমুলও ক্ষোভ ঝাড়লেন মাত্রাতিরিক্ত নৌকা ভাড়া আদায় নিয়ে। এ ভুক্তভোগী জানালেন, তারা ২৫ জন নিকলী বেড়িবাঁধ পর্যটন এলাকা ঘুরে এখান থেকে দুপুর দেড়টার দিকে ১১ হাজার টাকা ভাড়ায় একটি ইঞ্জিনচালিত ট্রলার নিয়ে মিটামইনের দৃষ্টিনন্দন অলওয়েদার সড়কপথে যান। সেখানে সেই সড়কপথ পর্যটনেও অটোরিকশা অতিরিক্ত ভাড়া নেয় এবং সেখান থেকে একই ট্রলারে রাত ৯ টার দিকে নিকলী ফিরে আসার পর অতিরিক্ত ৬ হাজার টাকা ভাড়া গুণতে হয়। বলা হয়, ফিরতে দেরী হওয়ায় অতিরিক্ত এই ভাড়া দিতে হবে। এছাড়া অটোরিক্সা ভাড়া যেখানে আসা-যাওয়া ২০ থেকে ৩০ টাকা হওয়ার কথা সেখানে ১৪০ থেকে ১৮০ টাকা পর্যন্ত নেয়া হচ্ছে। এমনকি মাঝপথে ভাড়া বাড়িয়ে না দিলেও পর্যটকদের নামিয়ে দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে তিনি জানান। এ পর্যটক জানান, হাওরে নৌকা ভাড়া বড়জোর তিন হাজার থেকে সর্Ÿোচ্চ সাড়ে চার হাজার টাকা হতে পারত।  তিনি বলেন, এমন সম্ভবনাময় পর্যটন এলাকায় ভালো কোনো পরিবেশযোগ্য খাবারের হোটেল, বসবাসযোগ্য আবাসিক হোটেল নেই, নেই পর্যটন এলাকায় উপযুক্ত শৌচাগারের ব্যবস্থা। এসবই এই পর্যটন এলাকায় আসতে পর্যটকদের নিরুৎসাহিত করার জন্য যথেষ্ট মনে করেন তিনি।
গেল ১১ সেপ্টম্বর হাওড় পরিদর্শনে যায় বাংলাদেশ ইয়ুথ জার্নালিস্ট ইউনিটির (বিজু) সদস্যরা। তাদের সাথে সঙ্গি হয়েছিল এ প্রতিবেদকও। হাওড়ের মনোরম পরিবেশ নিয়ে বেশ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেও হাওড় পরিদর্শনে এসে ট্রলার, নৌকা, ইজিবাইক ভাড়া এবং খাবারের দাম ও মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সংগঠনটির সভাপতি মো: শরিফুল ইসলাম। তিনি বলেন, হাওরের মনোমুদ্ধকর পরিবেশের কথা শুনে আমরা ঘুরতে এসেছিলাম। ঘুরে ভালও লেগেছে। কিন্তু এখানকার জনগণের মাঝে পর্যটকদের ঘিরে যেভাবে টাকা হাতিয়ে নেয়ার প্রতিযোগিতা চলে, তাতে ভবিষ্যতে আবারো আসব কিনা সেটি ভাবতে হচ্ছে। এখানে প্রতিদিনই একটি সিন্ডিকেট ভাড়া নিয়ন্ত্রণ করে। যে ট্রলারের ভাড়া আগেরদিন চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা থাকে সেটি পরের দিন ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা হয়ে যায়। এভাবে চলতে থাকলে সম্ভাবনাময় এই পর্যটন স্পটটি ধ্বংসের দিকে চলে যাবে।
এ ব্যাপারে কথা হলে নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুদ্দিন মুন্না ট্রলার, নৌকা, ইজিবাইক, মোটরযানে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়সহ হোটেলে খাদ্য মূল্য অধিক রাখার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, যেভাবে ইচ্ছেমত ভাড়া আদায় চলছে সেটির  সঙ্গে আমি মোটেও একমত নন। ভাড়া আরও বাস্তবসম্মত করা জরুরি। তিনি বলেন, পর্যটকদের টার্গেট করে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। তাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে উপজেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কমিটির মাধ্যমে নৌযানগুলোর ভাড়া এবং খাদ্য সামগ্রী মূল্য নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্টদের ডেকেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তিনি নিজেও সরকারের উচ্চ মহলের হস্তক্ষেপের কথা জানান।  তিনি নিকলী পর্যটন এলাকায় কয়েকটি শৌচাগার নির্মাণ এবং গাড়ি পার্কিংয়ের উপযুক্ত স্থান নির্ধারণের পদক্ষেপের কথা জানালেন।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার মুর্শেদ চৌধুরী জানান, গোটা কিশোরগঞ্জ জেলাকে পর্যটন বলয়ের মধ্যে আনতে কাজ করছে সরকার। ইতিমধ্যে হাওড় এলাকায় বেশ পর্যটক আসছে। মিডিয়ার মাধ্যমে যেসব অব্যবস্থাপনার কথা শোনা যাচ্ছে সেগুলো নিয়ে আমরা কাজ করছি। তিনি বলেন, বর্তমান ব্যবস্থায় নৌযানগুলোতে যাত্রীদের জীবন রক্ষামূলক ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ইতিমধ্যেই কয়েকটি দুর্ঘটনায় বেশ কয়েকজন পর্যটকের জীবনহানির ঘটনাও ঘটেছে। তাই এমন পরিস্থিতিতে লাইফ জ্যাকেটসহ প্রয়োজনীয় জীবন রক্ষামূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, ভাড়ার বিষয়টি নির্ধারণ করার জন্য নৌযান মালিক ও ব্যবসায়ীদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
গত ১১ সেপ্টম্বর এ প্রতিবেদক সরেজমিনে ঘুরে আসেন কিশোরগঞ্জের বির্স্তুৃর্ণ এই হাওড় এলাকায়। আলাপকালে হাওরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসা পর্যটকদের অনেকেই বেশকিছু অভিযোগ করছেন। খাবারের হোটেলগুলোতে অত্যধিক হারে মূল্য গুনতে হয়। হোটেল মালিকরা ইচ্ছামতো মূল্য নির্ধারণ করে পকেট কাটেন। হোটেল মালিকদের সাখে পর্যটকদের এ নিয়ে বাদানুবাদও হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগও করা হচ্ছে। যদিও মিঠামইন সদর ইউপি চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শরীফ কামাল পর্যটকদের ঘোরাফেরার জন্য অটোরিকশা ও সিএনজির ভাড়া নির্ধারণ করে দিয়েছেন। কিন্তু সেটি কেউই মানছেন না। অনেকেই বলেছেন, পর্যটকদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে সেটি বলা হলেও বাস্তবে সেটি নেই। যে যার মতো করে ভাড়া নিচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাওরে ভাঢ়ায় চালিত ট্রলার বা নৌকা গুলো সাধারণত এক ঘণ্টার জন্য ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা নেয়। আবার কয়েক ঘণ্টার জন্য বা পুরো দিনের জন্য ভাড়া নিলে প্রতি ঘণ্টায় ৫০০ টাকার মতো ভাড়া দিতে হয়। ভাড়া দামাদামি করলে সেটি আরও কমে যায়। নৌকাগুলো বেশ বড়সড়ও হয়। ১৫-২০ জন পর্যন্ত অনায়াসে ঘুরে আসতে পারে পুরো হাওড়। কিন্তু বর্ষা মওসুমে এভাড়া কয়েকগুণ বেড়ে যায়। একেক দিনের ভাড়া একেক রকম। একটি সিন্ডিকেট পুরো ট্রলার ও নৌকার ভাড়া নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে হাওরে ঘুরতে এসে ট্রলার বা নৌকাই যখন একমাত্র অবলম্বন, তখন বেশী ভাড়া দিয়ে হলেও ট্রলার ভাড়া নেয় পর্যটকরা। এছাড়া অল-ওয়েদার সড়কেও ইচ্ছেমত ভাড়া নেয় ইজিবাইক চালকরা। তাদের সাথে ভাড়া নিয়ে কিছু বললে উল্টো হুমকির মুখে পড়তে হয় বলে পর্যটকরা অভিযোগ করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ