মঙ্গলবার ২৬ জানুয়ারি ২০২১
Online Edition

প্রত্যক্ষ ভোটে প্রথম আইনসভা নির্বাচন ১৯৩৭

সাইফুল শুভ : ১৮৬১ সালে ব্রিটিশ আইনসভা কর্তৃক প্রণীত ভারতীয় কাউন্সিল আইনানুযায়ী ১৮৬২ সালে সর্বপ্রথম ভারতীয়রা আইনসভায় প্রবেশাধিকারের মাধ্যমে শাসনব্যবস্থার সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ লাভ করেন। শুধু গভর্নর জেনারেলের মনোনীত ব্যক্তিরাই আইনপ্রনেতা হওয়ায় অভিজাত শ্রেণী সন্তুষ্ট হলেও ভারতবাসীদের আশা-আকাঙ্খা পূরণের লক্ষ্যে প্রতিনিধিত্বশীল শাসনব্যবস্থা ও নির্বাচনী নীতি স্বীকৃতিসহ ১৮৯২ সালে নতুন করে প্রণীত হয় ভারতীয় কাউন্সিল আইন, ১৮৯২। ১৮৮৫ সালে প্রথম রাজনৈতিক দল হিসেবে সর্বভারতীয় কংঘেস যাত্রা শুরু করলেও “হিন্দুগ্রীতি” নীতির কারনে দলটি সর্বজন্থহণযোগ্যতা হারায়। ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন প্রশাসনিক ও অন্যান্য সুবিধার্থে বিশেষ করে “পূর্ববঙ্গ ও আসাম” প্রদেশের ঘোর বিরোধীতা করে কংগ্রেস রাজপথে নামায় মুসলমান সম্প্রদায়ের মাঝে স্বজাতির স্বার্থ রক্ষার্থে ও নতুন প্রদেশটিকে টিকিয়ে রাখতে একটি রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন অনুভূত হলে সর্বভারতীয় মুসলিম নেতৃবৃন্দ নবাব সলিমুল্লাহ'র আহ্বানে ঢাকার শাহবাগে মিলিত হয়ে গঠন করে মুসলিম বিশ্বের সর্বপ্রথম রাজনৈতিক দল “নিখিল ভারত মুসলিম লীগ”। কিন্তু ১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশটিকে ভেঙে দিলে মুসলমান সম্প্রদায় চরম হতাশান্ত হয়ে পড়লে নিজেদের স্বার্থরক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে “একলা চলো” নীতি গ্রহণ করে । ১৯০৯ সালে “মর্লি-মিন্টো সংস্কার আইন” এ শুধু মুসলমানদের জন্য এবং ১৯১৯ সালের ভারত শাসন আইনানুযায়ী ভারতের সকল সম্প্রদায়ের জন্য পৃথক নির্বাচন পদ্ধতি স্বীকৃত হওয়ায় সকল প্রদেশের আইনসভাতেই সংরক্ষিত আসনের সৃষ্টি হয়।
১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের বিধান করা হলে ১৯৩৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভারতের ১১টি প্রদেশের মধ্যে সর্ববৃহৎ প্রদেশ বাংলার জনগণও প্রথমবারের মতো তাদের প্রতিনিধিদের প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত করে আইনসভায় পাঠানোর সুযোগ লাভ করায় বাংলার সর্বত্র সকল রাজনৈতিক দল জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নির্বাচনী অভিযানে নেমে পড়ে। বঙ্গীয় আইনসভার ২৫০টি আসনের মধ্যে মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত ১১৯টি আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় মুহাম্মাদ আলী জিন্নাহ’র নেতৃত্বাধীন সর্বভারতীয় মুসলিম সংহতির দাবিদার “নিখিল ভারত মুসলিম লীগ” ও এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বাধীন “বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারী প্রথা উচ্ছেদ” এ বদ্ধপরিকর আঞ্চলিক দল “কৃষক-প্রজা পার্টি” এর মধ্যে। কৃষক-প্রজা পার্টির সভাপতি শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এবং মুসলিম লীগের অন্যতম শীর্ষনেতা ঢাকার নবাব খাজা নাজিমুদ্দীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় শুধু বাংলা নয় সারা ভারতের দৃষ্টি নিবন্ধ হয় পটুয়াখালীর নির্বাচনী আসনের দিকে। নিজ জমিদারী এলাকা ও এই আসনের প্রাক্তন এমপি হওয়া সত্তেও খাজা নাজিমুদ্দীন প্রায় ৮ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন এ কে ফজলুল হকের কৌশলী নির্বাচনী প্রচার ও আকাশচুম্বী ব্যক্তিত্বের কাছে। উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ১১৯টি সংরক্ষিত আসনে মুসলিম লীগ লাভ করে ৪০টি আসন এবং কৃষক-প্রজা পার্টি লাভ করেন ৩৫টি আসন। অপরদিকে সাধারণ আসনে কংথেস ৫৪টি আসন লাভ করলেও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় তারা কোয়ালিশন সরকারের ব্যাপারে অনীহা প্রকাশ করে। এমন পরিস্থিতিতে মুসলিম লীগ প্রধানমন্ত্রীত্বের দাবি পরিত্যাগ করে এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্ব মেনে নিয়ে কোয়ালিশন সরকারে যোগ দেয়ায় কৃষক-প্রজা পার্টির এ কে ফজলুল হক অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী, মুসলিম লীগের খাজা নাজিমুদ্দীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বাণিজ্য ও শ্রমমন্ত্রীসহ ৩ জন বর্ণহিন্দু ও ২ জন তফশিলী হিন্দু মন্ত্রীর সমন্বয়ে মোট ১১ জন সদস্য বিশিষ্ট মন্ত্রিসভা গঠন করার মাধ্যমে ১৭৬৪ সালে বক্সারের যুদ্ধে নবাব মীর কাসিমের পতন ও বাংলার সর্বশেষ নবাব নাজিম-উদ-দৌলার পরে এই প্রথম বাংলার ক্ষমতার মসনদের শীর্ষপদে মুসলমানরা আরোহন করেন। “বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ” করতে না পারলেও এ.কে ফজলুল হকের প্রথম মন্ত্রিসভা সে লক্ষ্যে অনেকদূর এগিয়ে যায় (ক) বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৩৮ (খ) কৃষি খাতক আইন, ১৯৩৮ (গ) মহাজনী আইন, ১৯৪০ (ঘ) বঙ্গীয় চাকরি বিধি বণ্টন আইন, ১৯৩৯ (ঙ) দোকান কর্মচারী আইনসহ বাংলার কৃষক ও বাঙালি মুসলমানদের স্বার্থে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করে যারই ধারাবাহিকতায় ১৯৪০ সালে পূর্ববঙ্গের আইনসভায় “রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন” পাস হয়। ফলে ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্ণওয়ালিস কর্তৃক প্রবর্তিত “চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত” বিলুপ্ত হয়ে বাংলার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক-প্রজাদের দীর্ঘদিনের দাবি “লাঙ্গল যার জমি তার, ঘাম যার দাম তার” স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন নামে কলঙ্ক স্থাপনকারী “হলওয়েল মনুমেন্ট’ অপসারন করা ও চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত সম্পর্কে তদন্তের জন্য “ফ্লাউড কমিশন” গঠন করা। ১৯৪১ সালে জাতীয় প্রতিরক্ষা কাউন্সিলে যোগদান সংক্রান্ত বিষয়ে মতপার্থক্যের কারণে এ কে ফজলুল হককে মুসলিম লীগ থেকে বহিষ্কার করা হলে বাংলার কোয়ালিশন সরকার ভেঙ্গে যায়। তখন এ কে ফজলুল হক ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর হিন্দু মহাসভা ও ফরোওয়ার্ড বুকের সাথে ১৯৪১ সালের ১১ই ডিসেম্বর পুনরায় কোয়ালিশন সরকার গঠন করেন যা ইতিহাসে “হক-শ্যামা মন্ত্রিসভা” নামে খ্যাত। মাত্র ৪৭৫ দিন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকার পরে ১৯৪৩ সালের ২৮ মার্চ গভর্নরের আদেশে পদত্যাগ করলে অবিভক্ত বাংলার রাজনীতিতে শেরে বাংলা ও তার দল কৃষক-প্রজা পার্টি গুরুত্ব হারায়। এ কে ফজলুল হকের পদত্যাগের পরে মুসলিম লীগ ১৯৪৩ সালের ২ এপ্রিল খাজা নাজিমুদ্দীন প্রধানমন্ত্রী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বেসামরিক সরবরাহমন্ত্রীসহ ১৩ সদস্যের নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করেন। নাজিমুদ্দীন মন্ত্রীসভার দুর্ভাগ্য এই যে, প্রদেশের প্রশাসনিক বিষয়ে চিন্তা ভাবনা করার পূর্বেই বাংলায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ “পঞ্চাশের মন্বন্তর” শুরু হয় যাতে বাংলার প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষ না খেতে পেরে জীবন হারায়। এমন পরিস্থিতিতে ১৯৪৫ সালের ২৮ মার্চ নাজিমুদ্দীন মন্ত্রিসভার পতন ঘটে । ১৯৪৫ সালের কেন্দ্রীয় আইনসভা নির্বাচন ও ১৯৪৬ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনকে মুসলিম লীগ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার উপর “গণভোট” হিসেবে আখ্যায়িত করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে সারা ভারতব্যাপী সংরক্ষিত মুসলিম আসনে ভূমিধস বিজয়লাভ করে ভারতবর্ষের মুসলমানদের একক রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বাংলায় কেন্দ্রীয় আইনসভার সবকটি আসনে ও প্রাদেশিক পরিষদের ১১৯টি আসনের মধ্যে ১১৩টি বিজয়লাভের ফলে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ সরকার গঠন করে। অন্য দিকে ব্যক্তিগতভাবে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক বরিশালের ২টি আসন থেকে নির্বাচিত হলেও ৪৬’র নির্বাচনে তার দল কৃষক প্রজা পার্টি মাত্র ৬টি আসন লাভ লাভ করে। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ৭৭,৪৪২ বর্গমাইলব্যাপী অখণ্ড ও অবিভক্ত বাংলার শেষ প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বঙ্গীয় সিপাহসালার হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ