বৃহস্পতিবার ২৬ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

ব্রহ্মপুত্রে ভারত-চীনের বাঁধ প্রকল্পে ক্ষতির শিকার হবে বাংলাদেশ

ব্রহ্মপুত্র নদকে কেন্দ্র করে (বামে) চীনের একটি হাইড্রোইলেকট্রিক প্রকল্প ও (ডানে) ভারতের ব্রহ্মপুত্র নদীকেন্দ্রিক অসংখ্য প্রকল্প চিহ্নিত ম্যাপ ছবি : ওয়েবসাইট থেকে সংগৃহীত

সরদার আবদুর রহমান : আন্তর্জাতিক নদী হিসেবে সুপরিচিত ব্রহ্মপুত্র নদে ভারত ও চীনের বিভিন্ন ধরণের বাঁধ-প্রকল্পের প্রভাবে মারাত্মক ক্ষতির শিকার হতে যাচ্ছে ভাটির দেশ বাংলাদেশ। উজানে দুই দেশের বিভিন্ন প্রকল্পে নদীর প্রবাহ সংকুচিত হয়ে আসছে। এর ফলে যমুনা নদী এবং এর শাখা-প্রশাখাগুলোরও অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সময় বাংলাদেশের সামনে সুযোগ এসেছে ভারত, চীন, নেপাল ও বাংলাদেশকে নিয়ে একটি ‘আঞ্চলিক পানি ফোরাম’ গঠন করে নিজেদের অধিকার আদায়ে তৎপর হওয়ার।
প্রাপ্ত সূত্রগুলো থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, ব্রহ্মপুত্রের উপর চীন ও ভারত নানান প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এর আগে ব্রহ্মপুত্রে ভারতের বিভিন্ন প্রকল্পের কারণে বাংলাদেশের উদ্বেগকে সেভাবে আমল দেয়া হয়নি। এমনকি উৎসমুখ থেকে শুরু করে বাংলাদেশ সীমান্ত পর্যন্ত গঙ্গার বিভিন্ন স্থানে ভারতের অসংখ্য বাঁধ-প্রকল্প তৈরি করা নিয়েও বাংলাদেশের প্রতি ভারতের কোনো সহমর্মী মনোভাব লক্ষ্য করা যায়নি। কিন্তু এখন আরো উজানে এবং উৎসের কাছাকাছি ব্রহ্মপুত্রে চীন প্রকল্প তৈরি করে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে বলে ভারতের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে। তবে ভারতে এনিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করলেও বাংলাদেশে এখনো এর কোনো ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া চোখে পড়েনি। যদিও এতে ভারতের মতো বাংলাদেশেরও স্বার্থযুক্ত।
বাংলাদেশে ব্রহ্মপুত্র : পর্যবেক্ষকরা বলছেন, যেখানে বাংলাদেশের প্রায় সব কটি নদীই মৃতপ্রায় এবং সেগুলো ধুকে ধুকে চলছে, সেখানে বলা যায় একমাত্র ব্রহ্মপুত্রই কিছুটা সচল। দেশের প্রায় অর্ধেক পানিসম্পদের জোগান দেয় এই নদী। এটি বিপন্ন হলে বাংলাদেশকে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়তে হবে, বাধাগ্রস্ত হবে এখানকার কৃষিবৈচিত্র্য। ব্রহ্মপুত্রের দৈর্ঘ্য ২ হাজার ৯০৬ কিলোমিটার। এটি চীনের তিব্বতে উৎপত্তি হয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে। ফলে এটি একটি ত্রিদেশীয় নদী হিসেবে পরিচিত। এই দীর্ঘ প্রবাহপথে এটি তিব্বতে সাংপো, অরুণাচলে দিহং, আসামে ব্রহ্মপুত্র এবং বাংলাদেশের বড় অংশ যমুনা নামে পরিচিত। এই নদীর বিশাল অববাহিকার বিস্তার প্রায় সাড়ে ১৭ লাখ বর্গকিলোমিটার। এই অববাহিকা থকে বছরে প্রায় ৫৩৭ ঘনকিলোমিটার পানি বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়। পানিতে ভেসে আসে প্রায় ১০০ কোটি টন ঘন পলিমাটি। মোহনার কাছে বয়ে আনা মিষ্টি পানি আর সাগরের লবণাক্ত পানিতে গড়ে উঠেছে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য। ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে বাংলাদেশ ৬৭ শতাংশ প্রবাহ পেয়ে থাকে। বাংলাদেশে ব্রহ্মপুত্র-যমুনার উপনদী ও শাখা-প্রশাখার মধ্যে রয়েছে, তিস্তা, ধরলা, করতোয়া, আত্রাই, হুরাসাগর, সুবর্ণসিঁড়ি, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, ধলেশ্বরী, দুধকুমার, ধরিয়া, ঘাঘট, কংস, সুতলা প্রভৃতি। এসব নদীর অববাহিকা হলো বাংলাদেশের সবচেয়ে বিস্তৃত অববাহিকা। ব্রহ্মপুত্রের পানিপ্রবাহ পদ্মার এক মাস আগে শুরু হয়। আরিচাঘাটে যেখানে পদ্মা-যমুনা মিশেছে সেখানে পদ্মার নিম্নমুখী প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে ছোট ছোট শাখানদী বেয়ে পদ্মার পানি সাগরের দিকে চলে যায়। এটিই স্বাভাবিক গতি। ব্রহ্মপুত্রের পানিপ্রবাহের স্বাভাবিক গতি বাধাগ্রস্ত করলে যমুনার পানি কমে যাবে এবং শাখানদীর স্বাভাবিক গতি আর থাকবে না।
চীনের পরিকল্পনার নেপথ্যে
তথ্যে জানা যায়, দ্য গ্রেট ওয়েস্টার্ন রুট ওয়াটার ডাইভারশন প্রজেক্টের নামে চীন ব্রহ্মপুত্র নদী থেকে পানি পীত নদীতে নিয়ে যাবে। শুধু তা-ই নয়, চীন তাদের পরিকল্পনায় সাংপোসহ (তিব্বতে ব্রহ্মপুত্রের নাম) চীনের আরো দুটি নদী থেকে বছরে ২০ হাজার কোটি ঘনমিটার পানি পীত নদীতে নিয়ে যাওয়ার এক মহাপরিকল্পনা নিয়েছে। চীনের সাংপো তথা ব্রহ্মপুত্রে বাঁধ দেয়ার কাজ এখন শুরু করার অপেক্ষায় রয়েছে চীন। এই প্রকল্প সম্পন্ন হলে বাংলাদেশ ও ভারতের অংশে ব্রহ্মপুত্রের বিপন্ন দশা ঘটবে।
তিব্বতকে বলা হয় ‘বিশ্বের পানির চূড়া’। আর্কটিক ও এ্যন্টার্টিকার পর তিব্বতেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় জলাধার আছে। এটি বহু সংখ্যক নদীর উৎস। চীন এই বিপুল পানিসম্পদ ধরে রাখতে মরিয়া। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চীন এখন ইয়ারলং সাংপো (ভারত-বাংলাদেশে যেটি ব্রহ্মপুত্র) নদীর পানি উল্টো দিকে ঘুরিয়ে জিনজিয়াং প্রদেশে নিয়ে যেতে চাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে লাদাখে চীনের সামরিক বিবাদের মধ্যে এই পানির সম্পর্কই প্রধান বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। এছাড়াও চীন ইয়ারলং সাংপো তথা ব্রহ্মপুত্রের পানিসম্পদকে কাজে লাগিয়ে পানিবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষত দাগু, জিয়াচা, জিজু প্রভৃতি প্রকল্প ২০১৩ সালেই অনুমোদন লাভ করে এবং সেগুলোর বাস্তবায়ন চলছে। এনিয়ে ভারতের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হলে চীনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে, এসব বাঁধ ভাটিতে সীমান্তবর্তী নদীগুলোতে কোনো বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প এবং পরিবেশগত বিপর্যয় মোকাবেলা সংক্রান্ত কোনো প্রকল্পে প্রভাব ফেলবে না।
ব্রহ্মপুত্রে ভারতের প্রকল্প
তথ্যে প্রকাশ, ভারত তার পরিকল্পনা মোতাবেক গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র দুটি অববাহিকায় পানির ৩৩টি সঞ্চয়াগার নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে। প্রতিটি সঞ্চয়াগারের ধারণ ক্ষমতা ১ লাখ ৫০ হাজার কিউসেক। অর্থাৎ ৩৩টি সঞ্চয়াগারের সর্বমোট ধারণ ক্ষমতা প্রায় ৫০ লাখ কিউসেক পানি। এই পানি ভারতের পূর্ব, মধ্য ও উত্তরাঞ্চলে সেচ কাজে ব্যবহার করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আওতায় থাকছে ৩ কোটি ৫০ লাখ হেক্টর জমি। পাশাপাশি উৎপাদন লক্ষ্য রয়েছে ৩০ হাজার মেগাওয়াট পানিবিদ্যুৎ। ইতোমধ্যে স্থাপিত বাঁধের মাধ্যমে ভারত ৩৫ লাখ কিউসেক পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ভারত এসব সঞ্চয়াগারের মাধ্যমে ধরে রাখতে সক্ষম ৫০ লাখ কিউসেক পানি। বাড়তি ১৫ লাখ কিউসেক পানির ঘাটতি বাংলাদেশকে এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিবে। গঙ্গার পর ভারত ব্রহ্মপুত্রের পানিও প্রত্যাহার করার এক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলে জানা গেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ভারত ব্রহ্মপুত্রের পানি নিয়ে যাবে দক্ষিণ ভারতের কাবেরী নদীতে। এ জন্য ১ হাজার ৪৬৬ কিলোমিটার খাল খনন করার কথা। ফারাক্কা থেকে কাবেরী নদী পর্যন্ত মূল সংযোগ খাল ছাড়াও অসংখ্য ছোট ছোট খাল কাটা হলে এসব খাল অনেক নদী অতিক্রম করবে। পরিকল্পনায় রয়েছে এই পানি সংরক্ষণ করে বিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরির। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে গঙ্গার পানি ফারাক্কা পয়েন্ট পর্যন্ত আনা যাবে। গঙ্গার পানি কাজে লাগবে উত্তর প্রদেশ ও বিহারের বিভিন্ন সেচ প্রকল্পে। পরিণতিতে বাংলাদেশ অংশের গঙ্গা-পদ্মা নদী একেবারে পানিশূন্য হয়ে পড়বে। অপরদিকে ধুবড়ি থেকে ফারাক্কা পয়েন্ট পর্যন্ত সংযোগ খাল কয়েকটি নদীর পানি টেনে নেবে। নদীগুলো হলো, তিস্তা, তোরসা, রায়ঢাক, জলঢাকা, মহানন্দা প্রভৃতি। এসব নদীই বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে প্রবাহিত নদীগুলোর পানির প্রধান উৎস। অন্যদিকে মেঘনা নদী মূলত সুরমা-কুশিয়ারাসহ বিভিন্ন পাহাড়ি নদী এবং এর স্রোতের সঙ্গে মিলিত অন্যান্য জলধারার প্রভাবে স্ফীত থাকে। এই নদী বিভিন্ন স্থানে পদ্মা ও যমুনার প্রবাহও পেয়ে থাকে। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-বরাক বেসিনে ভারতের বহুসংখ্যক বৃহৎ-ক্ষুদ্র অবকাঠামো নির্মাণের পরিণতির শিকার হয়ে মেঘনারও প্রবাহ স্বাভাবিকভাবেই সংকীর্ণ হয়ে পড়বে।
এ প্রসঙ্গে নদী ও পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন বাংলাদেশ-এর সভাপতি বিশিষ্ট আইনজীবী এডভোকেট এনামুল হকের কাছে জানতে চাওয়া হয়, চীন ব্রহ্মপুত্র নদে বাঁধ-প্রকল্প বাস্তবায়ন করায় নাখোশ ভারত। এতে বাংলাদেশেরও ক্ষতির কথা বলা হচ্ছে। আপনার কি মনে হয়? জবাবে এনামুল হক বলেন, এক্ষেত্রে সামগ্রিক পানিব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের জন্য একটি সুযোগ আসবে। বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে। ভারতকে বলতে হবে: এসো- চীন, নেপাল, ভারত ও বাংলাদেশ- এই চারটি দেশকে নিয়ে আমরা ‘আঞ্চলিক পানি ফোরাম’ গঠন করে আমাদের সকলের অধিকার প্রতিষ্ঠা করি। তিনি বলেন, ভারত আন্তর্জাতিক নদী ব্রহ্মপুত্রের ১২টা বাজিয়ে ছাড়বে আন্তঃসংযোগ নদী প্রকল্পের মাধ্যমে। ফলে ভারতের জন্য বাংলাদেশের হা-হুতাশ করার কোন কারণ নেই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ