মঙ্গলবার ২৬ জানুয়ারি ২০২১
Online Edition

করোনা যাচ্ছে না সহজে

আশিকুল হামিদ : আজকের নিবন্ধে বিশেষ করে দরিদ্র ও সাধারণ মানুষের ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার বিষয়ে আলোচনার ইচ্ছা রয়েছে। এর কারণ, অসুস্থতা ও মৃত্যুর জন্য শুধু নয়, অর্থনৈতিক চাপেও এরই মধ্যে করোনাকেন্দ্রিক পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। ফলে জাতীয় অর্থনীতি তো বটেই, মানবিকতা এবং মানুষের ওপর জুলুম-নির্যাতনের মতো অন্য কিছু বিষয়ও প্রাধান্যে আসতে শুরু করেছে। সত্যি বলতে কী, এসব দেখার জন্য সচেতন ও দেশপ্রেমিক বাংলাদেশিরা মোটেও প্রস্তুত ছিল না। অন্যদিকে বর্তমান বাংলাদেশে এমন অনেক ঘটনাই ঘটে চলেছে, যেগুলোকে  নিষ্ঠুর এবং অমানবিক ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। করোনায় আক্রান্ত বলে কথিত বৃদ্ধ বাবা-মাসহ স্বজনদের রাস্তায় বা জঙ্গলে ফেলে যাওয়ার মতো কর্মকান্ডের খবর অনেক আগেই পুরনো হয়ে গেছে। আজকাল অবস্থা এমন হয়ে পড়েছে যে, কোনো অসুস্থ মানুষ কোনো হাসপাতালের সামনের রাস্তায় জ্ঞান হারিয়ে পড়ে থাকলেও অন্য সুস্থ মানুষেরা তার সাহায্যে এগিয়ে যাচ্ছে না। মাত্র ক’দিন আগে মুগদা জেনারেল হাসপাতালের সামনে থেকে এরকম একজন অসুস্থ যুবককে উদ্ধার করেছেন এক ফটো সাংবাদিক।
এভাবেই একের পর এক শুধু নয়, অসংখ্য ঘটনার দৃষ্টান্ত স্থাপিত হচ্ছে বাংলাদেশে। বৃদ্ধ পিতামাতাসহ ঘনিষ্ঠ স্বজনদের পর্যন্ত দেশের ভোগবাদী লোকজন রাস্তায় এবং যেখানে-সেখানে ফেলে রেখে পালিয়ে যাচ্ছে। বাস্তবে ‘কেটে’ পড়ছে। ভক্তি-শ্রদ্ধা দূরে থাকুক, কোনো রকম মায়া-মমতাও দেখা যাচ্ছে না তাদের মধ্যে। অথচ আমাদের বাংলাদেশ আগে কখনো এরকম ছিল না।
অন্য রকমের অমানবিকতাও যথেষ্টই দেখা যাচ্ছে। যেমন করোনাকেন্দ্রিক ঘটনাপ্রবাহে কারো মৃত্যু হলে লকডাউনের নামে তার বাসায় যাতায়াত নিষিদ্ধ করা হচ্ছে। মৃতের স্ত্রী-স্বামী ও সন্তানদের তো বটেই, যাতায়াত করতে দেয়া হচ্ছে না এমনকি আত্মীয়-স্বজনদেরকেও। পুলিশ ও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা সোজা নির্দেশ জারি করেই চলে যাচ্ছেন। ওই পরিবারের লোকজন কি খাবেন, তাদের বাজার-সদাই কারা কিভাবে করবেন- এসব বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। অথচ আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়ম হলো, যে পরিবারকে লকডাউন করা হবে সে পরিবারের জন্য খাবার এবং ওষুধসহ প্রতিটি পণ্য পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব সরকারকে পালন করতে হবে। অন্যদিকে বর্তমান বাংলাদেশে লকডাউনের হুকুম জারি করেই ‘কর্তব্যে’ সমাপ্তি টানা হচ্ছে! পরিবারের সদস্যরা খাবার এবং ওষুধপত্র পচ্ছেন কি না, তারা টাকা কীভাবে পাবেন বা আয় করবেন- সে সব বিষয়ে সামান্য মাথাব্যথাও দেখা যাচ্ছে না কর্তাব্যক্তিদের মধ্যে।
করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে মৃত্যুবরণকারীদের দাফন করার প্রশ্নেও সুচিন্তিতভাবে বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়েছে। লাশ থেকে অন্যরা সংক্রমিত হতে পারে-এমন একটি প্রচারণার কারণে গোসল করানো এবং জানাজার নামায পড়ানো দূরে থাকুক, পিতা ও ভাই-সন্তানসহ স্বজনরাও লাশের কাছাকাছি যাচ্ছে না। কিছু লাশ নিয়ে দাফন করছে মারকাজুল ইসলামের মতো কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। পুলিশও এ ব্যাপারে অবদান রাখছে। পুলিশ জানাজার নামাযও পড়াচ্ছে।
লাশ দাফনের বিষয়ে এই অমানবিক অবহেলা ও অপপ্রচারের সুযোগ নিয়ে ইসলাম ও মুসলিম বিরোধী কোনো কোনো টেলিভিশন চ্যানেল এমনকি হিন্দুদের মতো লাশ পুড়িয়ে ফেলার পরামর্শ দিতে শুরু করেছে। তারা বলছে, লাশ থেকে নাকি ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটে আর সে কারণেই দাফন করার পরিবর্তে লাশ পুড়িয়ে ফেলাই নাকি বিজ্ঞানসম্মত পন্থা! অভিযোগ উঠেছে, পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে এসব টিভি চ্যানেল পরামর্শের আড়ালে আসলে হিন্দু ধর্মের পক্ষে এবং ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। এদের মতো অন্য মুসলিমবিদ্বেষীরা কিন্তু লক্ষ্য করেননি যে, পোড়াতে হলেও লাশটিকে কয়েকজন মিলে ধরে ও টেনে নিয়ে যেতে হবে। আর ততক্ষণে সত্যি ঘটলে করোনার সংক্রমণ ঘটে যেতে পারে। কিন্তু সব জেনে-বুঝেও বিশেষ টিভি চ্যানেলগুলো বিজ্ঞানভিত্তিক সত্যকে এড়িয়ে অসত্য প্রচার করছে। বলা বাহুল্য, তাদের উদ্দেশ্য ইসলাম ও মুসলিম বিরোধী প্রচারণা চালানো।
এ ধরনের প্রচারণার ফলে একদিকে করোনায় মৃত বলে বর্ণিত মুসলিমদের লাশ অযত্নে ফেলে রাখা হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের কবরস্থানগুলোতে কোনো লাশ সহজে দাফন করতে দেয়া হচ্ছে না। এ নিয়ে বহু স্থানে পরস্পর বিরোধী পক্ষগুলোর মধ্যে সংঘাত-সংঘর্ষ পর্যন্ত হয়েছে। এখনও হচ্ছে। এদিকে কবরস্থানে দাফন প্রসঙ্গে দেশের বিশিষ্ট চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা একাধিক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, মৃত ব্যক্তির শরীরে করোনা ভাইরাস বাঁচতে পারে না। সুতরাং অন্য কোনো মানুষের শরীরেও ভাইরাস সংক্রমিত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। এজন্যই সাবান দিয়ে ভালোভাবে গোসল করিয়ে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী লাশ দাফন করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বস্তুত বিশেষজ্ঞরা যথার্থই বলেছেন। কারণ, বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত সত্য হলো, কোনো লাশকে কবর দেয়া হলেই জীবাণু সংক্রমণের সম্ভাবনা নস্যাৎ হয়ে যায়। কিন্তু পোড়ানো হলে ধোঁয়ার মাধ্যমে শুধু নয়, ছাইয়ের মাধ্যমেও জীবাণু তথা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে। অন্যদিকে ইসলাম বিরোধী মিশনে নেমেছে বলেই বিশেষ টিভি চ্যানেলগুলোর পাশাপাশি চিহ্নিত কিছু বুদ্ধিজীবীও হিন্দুদের মতো লাশ পোড়ানোর পরামর্শ দিতে লাফিয়ে দৃশ্যপটে এসেছেন। এর মধ্য দিয়ে মুসলিম প্রধান বাংলাদেশে কবর দেয়ার বিরোধিতার পাশাপাশি একই সঙ্গে অমানবিকতার পক্ষেও ওকালতি করেছেন তারা।  
অথচ লাশ দাফনের ব্যাপারে কোনো মহলের পক্ষ থেকেই নেতিবাচক মনোভাবের প্রকাশ ঘটানো উচিত নয় বরং বিশেষজ্ঞদের অভিমত ও পরামর্শ অনুসারে ব্যবস্থা নেয়া  দরকার। মুসলিমদের লাশ ইসলামী রীতি অনুসারেই দাফন করতে হবে। লকডাউনের বিষয়টিকেও বিশেষভাবে বিবেচনায় নেয়া দরকার। মৃত ব্যক্তির পরিবারকে শুধু বন্দি করলে চলবে না, তাদের জন্য সরকারি উদ্যোগে খাবার ও ওষুধসহ প্রয়োজনীয় সকল পণ্য পৌঁছে দেয়ারও ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের আয় কীভাবে হবে, কীভাবে তারা টাকা পাবেন-এসব দেখাও সরকারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আমরা মনেই করি না যে, লকডাউনের নামে স্বজন হারানো শোকার্ত মানুষের কষ্ট ও ভোগান্তি বাড়ানোর কর্র্মকান্ড সমর্থনযোগ্য হতে পারে।
এবার দ্বিতীয় একটি প্রসঙ্গ। পাঠকরা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন, হাজার হাজার পরিবার রাজধানী ছেড়ে চলে যেতে শুরু করেছে। এর প্রধান কারণ অভাব এবং অর্থনৈতিক সংকট। গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত খবরে জানা যাচ্ছে, বাসাবাড়ির বকেয়া ভাড়া আদায়ের জন্য মালিকদের জোরজবরদস্তি ও জুলুম চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত চার মাসের বকেয়া ভাড়া এক সঙ্গে পরিশোধ করার জন্য মালিকরা ভাড়াটেদের পেছনে উঠে-পড়ে লেগেছেন। বিভিন্ন বয়সের ভুক্তভোগী ও জুলুমের অসহায় শিকার বেশ কয়েকজন নারী-পুরুষের সাক্ষাৎকার ভিত্তিক বিভিন্ন রিপোর্টে জানানো হয়েছে, করোনার ব্যাপক সংক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে মার্চ মাসের তৃতীয় সপ্তাহে সরকার যখন লকডাউন এবং সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছিল তখন জানানো হয়েছিল, বাড়ি ভাড়া এবং গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিলসহ সকল বিষয়েই তিনমাস পর্যন্ত যথেষ্ট নমনীয়তা দেখানো হবে। সরকার তো বটেই, এই নমনীয়তা বাসাবাড়ির এবং মার্কেট ও শপিং মলের মালিকরাও দেখাবেন।
অন্যদিকে তিন মাস পার হওয়ার আগেই ভাড়া ও বিলের জন্য রীতিমতো জুলুম শুরু করেছেন মালিকরা। কোনো ভাড়াটে অক্ষমতার কথা জানিয়ে সময় বাড়িয়ে দেয়ার অনুরোধ জানালে তাকে বাড়ি ছেড়ে দেয়ার হুকুম শোনানো হচ্ছে। শুধু বাড়ি ছাড়লেই চলবে না, চার মাসের বকেয়া তো পরিশোধ করতেই হবে, আইন অনুযায়ী দু’মাসের নোটিশ পিরিয়ডের ভাড়াও পরিশোধ করে যেতে হবে! অর্থাৎ সব মিলিয়ে ভাড়া দিতে হবে ছয় মাসের! বিদ্যুৎ এবং গ্যাসের বিলের ক্ষেত্রেও একই হুকুম তামিল করতে হবে।
বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে রাজধানীর প্রায় সকল এলাকায় সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মালিকদের সাফ কথা, বকেয়া পরিশোধ না করলে আসবাবপত্র যেমন নিতে দেয়া হবে না, তেমনি ভাড়াটেদের স্ত্রী-সন্তানরাও যেতে পারবে না। অর্থাৎ তাদের জিম্মি করা হবে! অথচ বাস্তব অবস্থার কারণেই এমন পরিস্থিতি কাম্য হতে পারে না। এই সত্য স্বীকার করতে হবে যে, সারাদেশই বর্তমানে করোনা ভাইরাসের শিকারে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ আক্রান্ত যেমন হচ্ছে, তেমনি মৃত্যুও ঘটছে বহু মানুষের। এরই মধ্যে চাকরি খুইয়ে অর্থনৈতিক দিক থেকে চরম বিপদে পড়েছে সাধারণ মানুষ। দেশে প্রকৃতপক্ষে অঘোষিত দুর্ভিক্ষ শুরু হয়েছে।
এ সম্পর্কে বিভিন্ন গবেষণা রিপোর্টেও যথেষ্টই জানা যাচ্ছে। যেমন, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি জানিয়েছে, গত ২৬ মার্চ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির আড়ালে ৬৬ দিনের লকডাউনে নতুন করে ৫ কোটি ৯৫ লাখ মানুষ গরীব ও অতি দরিদ্র হয়ে পড়েছে। বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মধ্যবিত্তরা। আগের তিন কোটি ৪০ লাখ উচ্চ মধ্যবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত হয়েছে এক কোটি ১৯ লাখ, তিন কোটি ৪০ লাখ মধ্যম পর্যায়ের মধ্যবিত্ত থেকে নিম্ন পর্যায়ের মধ্যবিত্ত হয়েছে এক কোটি দুই লাখ আর পাঁচ কোটি ১০ লাখ নিম্ন মধ্যবিত্ত থেকে এক কোটি ১৯ লাখ দরিদ্র হয়েছে এবং তিন কোটি ৪০ লাখ দরিদ্র থেকে অতি দরিদ্র হয়েছে দুই কোটি ৫৫ লাখ মানুষ। এভাবে সব মিলিয়ে লকডাউনের ৬৬ দিনে দরিদ্র ও অতি দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে পাঁচ কোটি ৯৫ লাখ।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির পর কিছু ভীতিকর ও আশংকাজনক তথ্য-পরিসংখ্যান জানিয়েছে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থা-বিআইডিএস। ব্যাপক জরিপশেষে প্রকাশিত সংস্থাটির এক গবেষণা রিপোর্টে জানানো হয়েছে, করোনার কারণে দেশের এক কোটি ৬৪ লাখ মানুষ নতুন করে গরীব বা দরিদ্র হয়ে পড়েছে। করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যুর কারণে মানুষের আয় কমে গেছে, বেড়েছে বেকারত্ব। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তারাই, যাদের আয় কম। এমন অনেক মানুষ আছেন, যাদের আয়ের উৎসই বন্ধ হয়ে গেছে।
ওদিকে ব্র্যাকসহ তিনটি প্রতিষ্ঠানের যৌথ জরিপশেষে প্রকাশিত অন্য এক গবেষণা রিপোর্টে জানানো হয়েছে, করোনাকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক সংকটে দেশের ৭৪ শতাংশ মানুষের আয় কমেছে আশংকাজনক হারে। একযোগে মারাত্মকভাবে বেড়েছে মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকিও। ওই রিপোর্টে আরো জানানো হয়েছে, করোনা ভাইরাসের অশুভ প্রভাবে দেশের ১০ কোটি ২২ লাখ মানুষ তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে যেমন পড়েছে তেমনি পড়েছে স্বাস্থ্যগত দর্বলতার ঝুঁকিতেও। উপার্জন কমে গেছে ৭৪ শতাংশ পরিবারের। এরই পাশাপাশি ১৪ লাখের বেশি প্রবাসী শ্রমিক চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরে এসেছে অথবা ফিরে আসার পর্যায়ে রয়েছে।
তিন সংস্থার ওই গবেষণা রিপোর্টে জানা গেছে, দেশের ভেতরে অর্থনৈতিক সংকট এবং স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিতে থাকা জগোষ্ঠীর মধ্যে ৫ কোটি ৩৬ লাখ মানুষই এখন চরম দরিদ্র-যাদের দৈনিক আয় একশ’ টাকারও কম। এদের মধ্যে নতুন দরিদ্র হয়ে পড়া পরিবারগুলোও রয়েছে। উচ্চ অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে থাকা চরম দরিদ্রদের সংখ্যা ৪ কোটি ৭৩ লাখে পৌঁছেছে। পাশাপাশি উচ্চ স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিতে রয়েছে ৩ কোটি ৬৩ লাখ মানুষ। জরিপকালে যেসব পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে সেসব পরিবারের ৩৪ দশমিক ৮ শতাংশের অন্তত একজন সদস্য বিগত দুই-আড়াই মাসের মধ্যে চাকরি হারিয়েছে। আর গত মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে গড় পারিবারিক উপার্জন কমে গেছে ৭৪ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দিনমজুর ও রিকশাচালকসহ যারা দিন এনে দিন খাওয়াদের দলে পড়ে।
এমন এক কঠিন সময়ে দরকার যেখানে চাকরি দেয়াসহ অর্থনৈতিক সহযোগিতা করা সেখানে বাসা-বাড়ির মালিকরা উল্টো নিষ্ঠুর জুলুম শুরু করেছেন। দেশপ্রেমিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, সরকারের উচিত এখন ভাড়াটে তথা সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানো। কারণ, তিন মাস পর্যন্ত নমনীয়তা দেখানোর ঘোষণা এসেছিল সরকারের পক্ষ থেকেই। বর্তমান পর্যায়ে ভাড়ার ব্যাপারে কিস্তির সুবিধা করে দেয়াসহ সরকার এমন আয়োজন করতে পারে-যার ফলে বাসা-বাড়ির মালিকরা যেমন তাদের বকেয়া টাকা পেয়ে যাবেন ভাড়াটেরাও তেমনি টাকা পরিশোধের জন্য যথেষ্ট সময় পাবেন। সরকারের উদ্যোগে তেমন ব্যবস্থাই নেয়া দরকার, যাতে মালিক এবং ভাড়াটেসহ কোনো পক্ষকেই ক্ষতিগ্রস্ত না হতে হয়।
পরিস্থিতির ভয়াবহতার ব্যাপারেও বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখা দরকার। কারণ, গণাধ্যমের খবরে জানানো হচ্ছে, প্রায় ৬০ শতাংশ পরিবার রাজধানী থেকে চলে গেছে অথবা যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। জনসংখ্যার হিসেবে ধরে নেয়া যায়, কমবেশি ৮০ লাখ মানুষ ঢাকা ছাড়ছে অথবা এরই মধ্যে ছেড়ে গেছে। এই বিপুল সংখ্যক মানুষ যদি সত্যিই চলে যায় তাহলে রাজধানী ঢাকার পরিবেশ তো পাল্টে যাবেই, সেই সাথে সারাদেশেও তৈরি হবে চরম অনিশ্চয়তার।
কারণ, উন্নয়নের মহাসড়কের নামে ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল এবং পদ্মাসেতুর মতো স্থাপনা নির্মাণের জন্য লক্ষ-হাজার কোটি টাকা ব্যয় ও আত্মসাত করা হলেও দেশের কোনো অঞ্চলেই মানুষকে চাকরি দেয়ার মতো শিল্প-কারখানা তৈরি করা হয়নি। সে কারণে ঢাকা থেকে বাধ্য হয়ে চলে গেলেও খুব কম সংখ্যকের পক্ষেই চাকরি পাওয়া বা আয় করার মতো কোনো পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে। ফলে করোনার মতো বেকার মানুষেরাও ছড়িয়ে পড়বে সারাদেশে। তেমন অবস্থায় দুর্ভিক্ষ এড়ানো তো সম্ভব হবেই না, একই সঙ্গে ভেঙে পড়বে আইন-শৃংখলাও। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে-সে বিষয়ে এখনই সতর্ক না হলে এবং ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলে সর্বনাশ ঘটবে বাংলাদেশের। বলা দরকার, করোনাও কিন্তু সহজে ও স্বল্প সময়ের মধ্যে বিদায় নেবে না!

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ