শনিবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

হাটহাজারী মাদ্রাসা বন্ধ ঘোষণা 

হাটহাজারী (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা- পাঁচ দফা দাবীতে চট্টগ্রামের হাটহাজারী দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসায় গত দুই দিন ধরে ছাত্র বিক্ষোভ চলছে। গত বুধবার দুপুর ২টা থেকে শুরু হওয়া এই ছাত্র বিক্ষোভের কারণে হাটহাজারী মাদ্রাসায় অচল অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় এক আদেশে করোনা ভাইরাস এর কারণে আরোপিত শর্ত প্রতিপালন না করায় হাটহাজারী দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসা বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

বুধবার রাতে ৩ দফা দাবী মানার ঘোষণায় ছাত্ররা আন্দোলন স্থগিত করলেও বৃহস্পতিবার মাদ্রাসা বন্ধের গুজবে সকাল থেকে ছাত্ররা আবার আন্দোলনে নেমেছে। এদিকে যে কোন ধরনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাদ্রাসার সামনে অবস্থান নিয়েছেন বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যসহ আইন শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা।

এদিকে আন্দোলনরত ছাত্রদের দাবীগুলো হচ্ছে- মাদ্রাসার মহাপরিচালক আল্লামা শফির পুত্র মাওলানা আনাছ মাদানীকে বহিষ্কার করা, মাদ্রাসার ছাত্রদের প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা বাস্তবায়ন করাসহ সকল প্রকার হয়রানি বন্ধ করা, আল্লামা আহমদ শফি শারীরিকভাবে অক্ষম হওয়ায় পরিচালকের পদ থেকে সম্মানজনক অব্যাহতি দিয়ে  উপদেষ্টা বানানো, মাদ্রাসার উস্তাদ (শিক্ষক)দের পূর্ণ অধিকার ও বিয়োগ নিয়োগকে শুরার নিকট ন্যস্ত করা  এবং  বিগত শুরার হক্কানী আলেমদেরকে পুনর্বহাল ও বিতর্কিত সদস্যদেরকে পদচ্যুত করা।

 এদিকে  হাটহাজারী মাদ্রাসা, হেফাজতে ইসলাম ও কওমি মাদ্রাসা বোর্ডের (বেফাক) ওপর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে হেফাজত আমির আল্লামা আহমদ শফীর ছেলে আনাস মাদানীর বিরুদ্ধে।হাটহাজারী মাদ্রাসার কয়েকজন শিক্ষক ও ছাত্রের অভিযোগ, আল্লামা আহমদ শফী দীর্ঘদিন ধরেই বার্ধক্যজনিত কারণে মাদ্রাসার প্রশাসনিক তদারকিতে অক্ষম হয়ে পড়ছেন। একাধিকবার তাকে দেশে বিদেশে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। নিজের বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় আহমদ শফী দফতারিক কাজে ছোট ছেলে মাওলানা আনাস মাদানীর ওপর নির্ভর হয়ে পড়েন। এই সুযোগে মাওলানা আনাস মাদানী হাটহাজারী মাদ্রাসা, হেফাজতে ইসলাম ও বেফাকে নিজের বলয় বাড়াতে তৎপরতা চালাচ্ছেন।আল্লামা আহমদ শফী নিজের একক সিদ্ধান্তে ছেলে মাওলানা আনাস মাদানীকে হাটহাজারী মাদ্রাসার শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। মাদ্রাসার মহাপরিচালকের ছেলে হিসেবে তিনি প্রভাব বিস্তার শুরু করেন। তার সুপারিশের ভিত্তিতে মাদ্রাসায় শিক্ষক নিয়োগ, বরখাস্ত করা হয় প্রতিষ্ঠানের গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন করে।

স্থানীয় সূত্রের খবর,পাঁচদফা দাবী নিয়ে বুধবার দুপুরে আন্দোলন শুরু হওয়ার সাথে সাথে মাদ্রাসার সকল গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। ভিতরের কেউ বাইরে, আবার বাইরের কেউ ভিতরে আসা যাওয়া বন্ধ রয়েছে। আইন শৃংখলা বাহিনীর পুলিশ র‌্যাব সদস্যরা মাদ্রাসার বাইরে সামনে অবস্থান করছে। মাদ্রাসার ভিতরে অবস্থানরত প্রায় ছয় সহস্রাধিক ছাত্র এ আন্দোলনে যোগ দিয়েছে। মাদ্রাসার মাইকে ছাত্র নেতৃবৃন্দ তাদের দাবীগুলো উচ্চারণ করে বক্তব্য রাখতে শুনা যায় এবং এ সময় মাদরাসার বাইরে অবস্থানরত ছাত্ররা তাদের দাবীর সাথে একাত্মতায় সুর মিলিয়ে একই প্রতিধ্বনি  উচ্চারণ করতে দেখা গেছে। এদিকে বুধবার দাবী আদায়ে অনড় আন্দোলনরত ছাত্ররা বক্তব্যে ও তাদের লিখিত লিফলেটে উল্লেখ করেন-আমাদের দাবী আদায় না হলে মাদরাসার সমস্ত একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। তারা আরো বলেছেন, আমাদের আদর্শিক এ আন্দোলনে বাধা সৃষ্টি হলে সমস্ত কওমী মাদরাসায় আন্দোলন  উঠবে এবং প্রয়োজনে জেল-জুলুমসহ যে কোন ত্যাগের জন্য প্রস্তুত থাকবো।

 স্থানীয় সূত্রের আরও খবর,ছাত্রদের বিক্ষোভের মুখে গত বুধবার রাতে হাটহাজারী মাদ্রাসার শুরার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আল্লামা শাহ আহমদ শফির সভাপতিত্বে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন হাটহাজারী মেখল মাদরাসার মাওলানা নোমান ফয়জী, ফটিকছড়ি নানুপুর মাদরাসার মাওলানা সালা উদ্দিন নানুপুরী, চট্টগ্রাম মুজাহিরুল উলুম মাদরাসার মাওলানা ওমর ফারুক, হাটহাজারী মাদরাসার মুফতি জসিম উদ্দিন।বৈঠক শেষে ছাত্র সমাবেশে এসে তিনটি সিদ্ধান্ত ঘেষণা করা হয়। এর মধ্যে প্রথম সিদ্ধান্ত দারুল উলুম হাটহাজারী থেকে আল্লামা শফিপুত্র মাওলানা আনাস মাদানিকে স্থায়ী ভাবে বহিস্কার করা হয়েছে।দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত আন্দোলনকারী ছাত্রদেরকে কোন ধরনের হয়রানি করা হবে না এবং ভর্তি নিয়ে যাদের হয়রানি করা হয়েছে তারা ভর্তির সুযোগ পাবে।তৃতীয়ত: ছাত্রদের বাকী দাবী পুরণ করার জন্য আগামী ২১ সেপ্টেম্বর শনিবার মাদরাসার পুর্নাঙ্গ শুরা অধিবেশন ডাকা হবে।তিনটি সিদ্ধান্ত ঘোষণা দেওয়ার পর  হাটহাজারী মাদ্রাসায় ছাত্রদের আন্দোলন শনিবার পর্যন্ত আংশিক স্থগিত করা হয়। আন্দেলনরত ছাত্ররা জানিয়েছেন আপাতত তাদের অবস্থান সমাবেশ স্থগিত থাকবে তবে  ক্লাস বর্জন চলবে ।

এদিকে জানা গেছে, হাটহাজারী মাদ্রাসায় ছাত্র আন্দোলনের মুখে আনাস মাদানীকে বহিষ্কারের পর ছাত্র আন্দোলন শনিবার পর্যন্ত আংশিক স্থগিত করা হলেও হাটহাজারী মাদ্রাসা বন্ধের গুজব ছড়িয়ে পড়লে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল দশটা থেকে বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা আবার আন্দোলনে নামে।মাদ্রাসার সকল গেইট বন্ধ করে ভিতরে  মাইক নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সহস্রাধিক ছাত্র মাঠে অবস্থান করে  মাইকে বক্তব্য রাখতে শুরু করে। দুপুর সাড়ে ১১টার দিকে মাইকে ছাত্রনেতৃবৃন্দের ঘোষণায় শোনা গেছে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ গোপনে বৈঠক করে মাদ্রাসা বন্ধের ষড়যন্ত্র করছে, ছাত্রদের প্রশাসন দিয়ে হয়রানী করার চেষ্টা চালাচ্ছে। তাই তারা আবার মাদ্রাসার মাঠে নেমে এসেছে। যতক্ষণ কর্তৃপক্ষ ষড়যন্ত্র থেকে ফিরে আসবেনা এবং দাবী মেনে নিয়ে তা বাস্তবায়ন করবেনা ততক্ষণ আমাদের আন্দোলন চলবে।

এদিকে বৃহস্পতিবার বিকালে জানা গেছে,সন্ধ্যায় মাদ্রাসার শুরার বৈঠক হবে। হাটহাজারী মাদরাসার চট্টগ্রাম অঞ্চলের শুরা সদস্য যাদেরকে বৈঠকে ডাকা হয়েছে তাঁরা হলেন- হাটহাজারী মেখল মাদরাসার মাওলানা নোমান ফয়জী, ফটিকছড়ি নানুপুর মাদরাসার মাওলানা সালা উদ্দিন নানুপুরী, চট্টগ্রাম মুজাহিরুল উলুম মাদরাসার মাওলানা ওমর ফারুক, কক্সবাজার চকোরিয়া মাদরাসার মাওলানা সোয়াইব নোমানী, হাটহাজারী ফতেপুর মাদরাসার মাওলানা মাহমুদুল ইসলাম ও হাটহাজারী মাদরাসার মুফতি জসিম উদ্দিন। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ