মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

হঠাৎ পেঁয়াজের দাম বাড়ায় বিপাকে সাধারণ মানুষ

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : পেঁয়াজ নিয়ে গতবছরের ক্ষত এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি বাংলাদেশের জনগণ।  কোনো রকম আলোচনা বা ইঙ্গিত ছাড়াই গতবছর ভারতের হঠাৎ রফতানি বন্ধ করে দেওয়ায় বাংলাদেশে পেঁয়াজের দাম পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটতে থাকে। দাম কমাতে সরকারের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। জনগণের রোষানলে পড়ে সরকার। লাগাম টেনে ধরার আগ পর্যন্ত ৩০ টাকার পেঁয়াজ গিয়ে ঠেকে ৩০০ টাকায়। নিত্যপ্রয়োজনীয় এ পণ্যটি কিনতে বাংলাদেশের মানুষের নাভিশ্বাস চরমে ওঠে। আবারও একই অবস্থার পুনরাবৃত্তি ঘটলো। কোনো কিছু না জানিয়েই ভারত হঠাৎ করে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে। দেশের বাজারে ৪০ টাকার পেঁয়াজ হু হু করে বেড়ে এক সপ্তাহের ব্যবধানে সেঞ্চুরি করেছে। রাজধানীর কোথাও কোথাও খুচরা বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকা কেজি দরে। হঠাৎ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যটির দাম বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ও স্বল্প আয়ের মানুষ। পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের আগাম কোনো তথ্য নেই সরকারের হাতে। এতে কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। তারা বলছেন, ভারত কূটনৈতিক নিয়ম-নীতির কোনো তোয়াক্কা না করে বাংলাদেশের মানুষকে পনবন্দী করছে। বন্ধু দেশের এমন আচরণে হতবাক বাংলাদেশের মানুষ।          
জানা গেছে, ভারতের রফতানি বন্ধ-এমন খবরে হঠাৎ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে পেঁয়াজের দাম। এক সপ্তাহ আগে ছিলো ৪০ টাকা। দুই দিন আগেও নিত্যপণ্যটির দাম ছিল ৫০ থেকে ৬০ টাকা। কিন্তু এখন খুচরা বাজারে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১২০ টাকা।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কিছু অসৎ ব্যবসায়ী সবসময় সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন। পেঁয়াজ নিয়ে এখন কারসাজি চলছে। ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করেছে এমন খবর ছড়িয়ে পড়ায় দেশের মজুতদার ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা হঠাৎ দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। এমন অবস্থায় সাধারণ ভোক্তারা আতঙ্কিত হয়ে চাহিদার চেয়ে বেশি পেঁয়াজ কেনা শুরু করে দিয়েছেন। সবমিলিয়ে খুচরা বাজারে ৬০ টাকার পেঁয়াজ এক লাফে ১২০ টাকায় উঠেছে। তবে চাষি ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানির জন্য ব্যবসায়ীরা এলসি খুলছেন। পেঁয়াজ নিয়ে এবার আগের মতো অস্থির হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলছেন খাত সংশ্লিষ্টরা ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকরা।
রাজধানীর শ্যামবাজারের পেঁয়াজ ব্যবসায়ীদের নেতা মেসার্স আলী ট্রেডার্সের পরিচালক মো. শামসুর রহমান জানান, ভারতের রফতানি বন্ধ-এমন খবর আসার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন জেলার মোকামের ব্যবসায়ী ও চাষিরা পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। আবার ক্রেতারাও চাহিদার তুলনায় পেঁয়াজ বেশি কেনা শুরু করেছেন। হঠাৎ আমদানি বন্ধ ও চাহিদা বাড়ায় বাজারে অস্থির অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। গত তিন দিনে পাইকারি বাজারে পেঁয়াজ ৩০ থেকে ৪০ টাকা বেড়ে গেছে।
গতকাল বুধবার রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, দেশী পেঁয়াজের কেজি বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১২০ টাকা। আমদানি করা ভারতের পেঁয়াজের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ টাকা। গত সোমবারও দেশি পেঁয়াজের কেজি ছিল ৬০ টাকা এবং আমদানি করা পেঁয়াজের কেজি ছিল ৫০ থেকে ৫৫ টাকা।
মুগদার খুচরা ব্যবসায়ী আল আমিন জানান, গত সোমবার পেঁয়াজের দাম বেশি। পাইকারি বাজারের ৪৫ টাকার পেঁয়াজ মঙ্গলবার ৮২ টাকায় কিনতে হয়েছে। ক্রেতারাও ইচ্ছামতো পেঁয়াজ কিনেছেন। তিনি বলেন, আগে যারা এক-দুই কেজি পেঁয়াজ কিনতেন, তারা এখন ৫ থেকে ১০ কেজি পেঁয়াজ কিনছেন। এ কারণে দাম বেড়ে গেছে। আর পাইকারি বাজারে দাম বাড়লে খুচরা বাজারেও দাম বেড়ে যায়।
এদিকে হঠাৎ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যটির দাম বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ও স্বল্প আয়ের মানুষ। নির্মাণ শ্রমিক দুলাল বলেন, আমাদের দিন কামাই দিন খাই। কাজ না থাকলে পেট চলে না। এর মধ্যে কোনো কিছুর দাম বাড়লে খরচও বেড়ে যায়। মজুরি তো বাড়ে না। রোববার পেঁয়াজ কিনেছি ৬০ টাকা করে, আজকে চাচ্ছে ১২০ টাকা। বাজারে সব পণ্যের দামই বেশি। এখন যে টাকা ইনকাম করি পেট চালানোই কঠিন হয়ে যায়।
পেঁয়াজের হঠাৎ দাম বাড়ার বিষয়ে মাঠ পর্যায়ে অভিযান করা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক আব্দুল জব্বার মণ্ডল বলেন, কিছু ব্যবসায়ী আছেন যারা সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন। বাজারে পেঁয়াজের কোনো অভাব নেই। আড়তগুলোতে পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তারপরও সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে তারা দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, একদিনে দ্বিগুণ দাম বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই। মজুতদার ও পাইকাররা বেশি মুনাফার লোভে এ কাজ করেছে।
পেঁয়াজের মূল্য নিয়ন্ত্রণে অধিদফতরের মহাপরিচালকের নির্দেশনায় সারাদেশে পাইকারি ও খুচরা বাজারে অভিযান করা হচ্ছে। যারা অনিয়ম করে দাম বাড়াচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলেও জানান অধিদফতরের এ কর্মকর্তা। পাশাপাশি এক সঙ্গে চাহিদার বেশি পণ্য কিনলে সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যা সৃষ্টি হয়। তাই বাজারে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে চাহিদার বেশি পণ্য না কেনার পরামর্শ দেন তিনি।
পেঁয়াজ আমদানিকারক মো. হাফিজুর রহমান বলেন, ভারত রফতানি বন্ধ করেছে -এ খবরের কারণেই বাজারে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। তবে এবার দেশের চাষি ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে পর্যাপ্ত পেঁয়াজ মজুত রয়েছে। বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানির জন্য ব্যবসায়ীরা এলসি খুলছেন। পেঁয়াজ নিয়ে এবার আগের মতো অস্থির হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
জানা গেছে, কোনো ধরনের পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই গত সোমবার হুট করে বাংলাদেশে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেয় প্রতিবেশী দেশ ভারত। এরপর ২৪ ঘণ্টা পার না হতেই দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম সেঞ্চুরি ছুঁয়ে দাম ওঠে ১২০ টাকায়।
ভারত এমন দিনে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে যে দিন শারদীয়া দুর্গাপূজার শুভেচ্ছা হিসাবে বাংলাদেশের ইলিশের ট্রাক যখন বেনাপোল বন্দর দিয়ে (শুল্কমুক্ত) ভারতের পেট্রাপোল বন্দরে পৌঁছে গেছে; তখন ভারত সরকার সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর, হিলি স্থলবন্দরসহ সব সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে। গত বছরও ২০১৯ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ভারত হঠাৎ করে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেয়ায় বাংলাদেশের মানুষকে চরম বিপাকে পড়তে হয়েছিল। পরে দেশের ইতিহাসে পেঁয়াজের কেজি সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা পর্যন্ত ওঠে। তখন মোদি সরকারের স্বার্থপরতার কারণে মিশর, তুরস্ক, পাকিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বিমানে  পেঁয়াজ আনতে হয়েছিল। এবারও সেই সেপ্টেম্বরেই ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দিল। এতে পেঁয়াজের দাম আবারও অস্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে-এমন আশঙ্কায় কেউ কেউ বাড়তি পেঁয়াজ কেনা শুরু করেছেন।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পেঁয়াজ আমদানিকারক খুলনার হামিদ এন্টারপ্রাইজের প্রতিনিধি জনি ইসলাম জানান, পূজার সময় আমরা ভারতকে ইলিশ দিচ্ছি অথচ তারা হঠাৎ করে এভাবে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ না করে সময় দিতে পারতো। এখন এমন অবস্থা আটকে পড়া পেঁয়াজে মারাত্মক লোকসানের মুখে পড়বেন তারা।
জানা যায়, দেশে ইলিশ উৎপাদন কমে যাওয়ায় ২০১২ সালের পহেলা অক্টোবর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দেশের বাইরে ইলিশ রফতানি স্থগিত করে। তবে এরপর থেকে বাইরের কোন দেশে ইলিশ রফতানি না হলেও বন্ধুত্ব সম্পর্কের কারণে পূজা উপলক্ষে গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর ভারতকে ৫০০ মেট্রিক টন এবং এবছর ১৪৫০ মেট্রিক টন ইলিশ আমদানির সুযোগ দেয়। গত সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বিকালে প্রথম চালানে দুই ট্রাক ইলিশ ভারতে ঢুকেছে। আগামী ১০ অক্টোবরের মধ্যে বাকি ইলিশ ঢুকবে। তবে দুই বারই দেখা গেছে যেদিন ইলিশ পাঠানো হয়েছে ঠিক সেদিনই বাংলাদেশী মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য পেঁয়াজ রফতানি তারা বন্ধ করেছে।
বন্ধু দেশের এমন আচরণে হতবাক বাংলাদেশের মানুষ। ভারত হঠাৎ কেন পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করলো অথচ ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু যখন বাণিজ্য ক্ষেত্রে আসে তখন আমরা দেখতে পাই নানা সমস্যা, এতে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া মেনটেইনের কোনো বিষয় আছে কিনা এসব প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, প্রথম হচ্ছে রাজনৈতিক কথা। গতবারও তারা পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করেছিল এবারও বন্ধ করেছে। কিন্তু গতবার বন্ধ করার আগে তারা মিনিমাম একটা দাম নির্ধারণ করে দিয়েছিল। তারপর ২৯ সেপ্টেম্বর বন্ধ করেছিল। তখন ওদের দেশেও ১৫০ রুপিতে পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে। সে সময় পশ্চিমবঙ্গে রেশনের দোকানে পেঁয়াজ বিক্রি করা হয়েছিল।
বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, দেশে বর্তমানে প্রায় ৬ লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজ মজুত রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি হচ্ছে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ আমদানি করা হচ্ছে। পেঁয়াজ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হোন, প্রয়োজনের অতিরিক্ত পেঁয়াজ কিনবেন না। তিনি বলেন, পেঁয়াজ টিসিবির পাশাপাশি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে কম দামে বিক্রি করা হবে। দেশে পণ্যের দাম হুট করে বেড়ে যায় এক্ষেত্রে আমাদের বাজার মনিটরিং কি করছে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, প্রথম কথা এটা আন্দাজ করা যায় না যে ভারত বন্ধ করে দেবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ