মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

কূল নাই কিনার নাই থৈ থৈ পানি...

নিকলী হাওড় কিশোরগঞ্জ

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল, কিশোরগঞ্জ হাওড় থেকে ফিরে : কূল নাই কিনার নাই, নাইরে দরিয়ার পাড়ি....।  তাকালেই চারদিকে জলরাশি। শুধু অনন্ত আকাশ আর সুনীল দিগন্ত। এটি কোনা সাগর-মহাসাগরের কথা বলছি না। বলছি কিশোরগঞ্জের হাওড়ের কথা। কর্মব্যস্ত ঢাকা শহর থেকে মাত্র তিন ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত অপূর্ব এক বিস্তীর্ণ জলাভূমি। চারদিকে পানি আর পানি। বর্ষাকালে এখানে বেড়াতে আসার উপযুক্ত সময়। বছরের অন্যান্য সময় এখানে এসে আপনি শহরের যান্ত্রিক জীবনের সকল ক্লান্তি ও অবসাদ ধুয়ে ফেলতে পারবেন। ভ্রমণ পিয়াসু মানুষের জন্য কিশোরগঞ্জ জেলার নিকলী হাওড় হতে পারে এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা। ঢাকা থেকে সকালে রওনা হলে সারাদিন ঘুরে আবার বিকেলে ঢাকায় ফিরে আসা সম্ভব। তবে রাতে থেকে রাত এবং সকালের সৌন্দর্য উপভোগ করতে না পারলে মন কিছুটা অতৃপ্তই থেকে যাবে হয়ত। বর্ষায় এই হাওড়ে নৌকা ভাসালে মনে হবে অকূল দরিয়া পার হতে হচ্ছে। কূল নাই কিনার নাই, শুধু অনন্ত আকাশ আর সুনীল দিগন্ত।
কিশোরগঞ্জ জেলা হাওড় এলাকা ‘দ্বারপ্রান্ত’ নামে খ্যাত। সীমানা দক্ষিণে অষ্টগ্রাম থানা, উত্তরে মিঠামইন, উত্তর-পূর্ব কোণে ইটনা, উত্তর-পশ্চিমে কটিয়াদি, পশ্চিমে নিকলী এবং পূর্বে হবিগঞ্জ জেলার লাখাই থানা। নিকলী হাওড় ছাড়া কিশোরগঞ্জে আরও অনেক হাওড় রয়েছে। যেমন হুমাইপুর হাওড় (বাজিতপুর), সোমাই হাওড় (অষ্টগ্রাম), বাড়ির হাওড় (মিঠামইন), তল্লার হাওড় (বাজিতপুর-নিকলী-অষ্টগ্রাম), মাহমুদুর হাওড় (নিকলী), সুরমা বাউলার হাওড় ইত্যাদি। ঢাকার সায়দাবাদ থেকে নিকলীর সরাসরি বাস আছে। আবার সায়দাবাদ থেকে কিশোরগঞ্জের বাসে গিয়ে কালিয়াচাপরা সুগার মিল এলাকা থেকে টেম্পো/সিএনজিতে নিকলী হাওড়ের সামনেই নামা যাবে। সময় লাগবে তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা। তাছাড়া ঢাকা থেকে কিশোরগঞ্জ-গামী ট্রেনে সরার-চর কিংবা মানিক-খালি ন্টেশনে নেমে সিএনজি দিয়ে যেতে সময় লাগবে ১ ঘণ্টা। অন্যান্য হাওড়গুলোতেও কাছাকাছি সময়ে যাওয়া যাবে। সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কিশোরগঞ্জ এ সাতটি জেলা মিলে হাওড়াঞ্চল। এখানে ৭ লাখ ৮৪ হাজার হেক্টর জলাভূমিতে রয়েছে ৪২৩টি হাওড়। এর মধ্যে কিশোরগঞ্জ জেলায় রয়েছে বিশাল আকারের ১২২টি হাওড়।
কিশোরগঞ্জ জেলার আকর্ষণীয় দিকই হচ্ছে এই হাওড়গুলো। কেবল ভূপ্রকৃতিগত বৈচিত্র্যের কারণে নয়, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দৃষ্টিকোণ থেকেও এই হাওড় এক বিরাট স্থান জুড়ে আছে। হাওড় মূলত সাগর শব্দের অপভ্রংশ মাত্র। উচ্চারণ বিকৃতিতে সাগর থেকে সায়র এবং সায়র থেকে হাওড় হয়েছে বলে ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে। বর্ষাকালে বিশাল হাওড় এলাকায় অথৈ জলরাশি দেখলে সাগরের কথাই মনে করিয়ে দেয়। হাওড় আর কিছু নয়, এটা অপেক্ষাকৃত বড় জলাভূমি। শীতকালে যে প্রান্তর ফসলে পূর্ণ বা শুকনো মাঠ কিংবা বালুচর, বর্ষাকালে সেখানে এমন পানিরধারা যে চারদিক প্লাবিত করতে পারে, তা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। শুধু পানির প্রবাহ নয়, প্রচণ্ড ঢেউ আর দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশি সাগরের বিশালত্বের কথাই মনে করিয়ে দেয়। দ্বীপের মতো গ্রামগুলো যেন ভেসে আছে পানির বুকে। বর্ষাকালে হাওড়ের এই পাগল করা ঢেউয়ের দোলায় নৌকার পাল উড়িয়ে চলার সময় উল্টিয়ে পড়ছে যেন! সেই হাওড়ে শুষ্ক মওসুমে পানি থাকে না এক ফোঁটা, যতদূর চোখ যায় শুধু ধানের সবুজ শিষ বা সোনা-রঙা ধানের সুবিপুল সমারোহে ভরপুর হয়ে ওঠে। বর্ষায় এমন থৈ থৈ পানি দেখে সেটা বিশ্বাস করা কঠিন। এখানে আরও অবিশ্বাস্য এক রাস্তা আছে, সাবমার্সিবল (ডুবন্ত রাস্তা) রোড, বর্ষায় ডুবে থাকে। আর শুকনোর সময় দিব্যি পথ চলার রাস্তা। পানির জন্য এ রাস্তার কোনও ক্ষতি হয় না।
ঘুরে আসা বেশ কয়েকজন পর্যটক জানান, জোছনা রাতে হাওড়ে নৌকায় ভ্রমণ করলে বিদ্যুৎবিহীন জোছনা-মাখা এই হাওড় মনে জন্ম দেবে এক অসাধারণ ভালো লাগা। রাত পেরিয়ে ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে চারদিকে ঝিলিমিলি নীল আলোর দেখা মিলবে। ঢেউয়ের ছন্দ-দোলায় মনে হবে রক্ত-লাল সূর্য একবার পানির নিচে ডুবছে, আবার ভেসে উঠছে। ভোরের আলোয় ছোট ছোট নৌকা নিয়ে হাওড়ের মাছ ধরছে জেলেরা, সে এক অদ্ভুত দৃশ্য! চারদিকে শুধু পানি আর পানি, মাঝে মাঝে পানির ওপর ভাসমান গ্রাম যা আপনাকে হাতছানি দিয়ে ডাকবে!
প্রাকৃতিক অপরূপ সৌন্দর্যে ভরপুর হাওড়-আর ছোট নদীবেষ্টিত জেলা কিশোরগঞ্জ। এই হাওড় ঘিরে প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে হাজারো মানুষের পদভারে মুখরিত থাকে হাওড়াঞ্চল। হাওড়ে বর্ষা থাকে বছরের প্রায় ছয় মাস। পানি আসতে শুরু করে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ থেকে। শেষ হয় আশ্বিন-কার্তিকে। বাকি কয়েক মাস এখানে শুকনাকাল। কি শুকনা, কি বর্ষাকাল ভ্রমণপিপাসুদের জন্য সৌন্দর্যের বিপুল পসরা সাজিয়ে বসে থাকে কিশোরগঞ্জের হাওড়। বর্ষায় হাওড় হয়ে ওঠে কূলহীন সাগর। হাওড়জুড়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা সারি সারি হিজলগাছ মন কাড়ে যে কারও। পানির নিচ থেকে জেগে ওঠা করচের বন সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দেয়। বর্ষা পরবর্তী শরতে হাওড়ে যখন পানি কমতে শুরু হয়, তখন থেকেই আকাশে সাদা মেঘের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হাজার হাজার ধবল বকেরও ওড়াউড়ি শুরু হয়। দুলতে থাকে হাওড়পারের সাদা কাশবন। আসতে শুরু করে নানা রকমের পাখি। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিলে ফোটে সাদা শাপলা। শুষ্ক মওসুমে পুরো হাওড় হয়ে যায় দিগন্তবিস্তৃত সবুজ প্রান্তর। যেখানেই চোখ যায়, সবুজ আর সবুজ। বালিহাঁসের ওড়াউড়ি। কালিম, জলপিপি, ডাহুক, পানকৌড়ি ও জলময়ূরের অবগাহন দেখলে মোহিত না হয়ে পারা যায় না। শরতে পরিযায়ী পাখির আগমন হাওড়কে আরও আন্দোলিত ও মুখরিত করে তোলে।
কিশোরগঞ্জের হাওড়ে পর্যটকদের দেখার মতো বেশ কিছু জায়গা রয়েছে। মিঠামইন উপজেলার কাটখাল ইউনিয়নের ‘দিল্লির আখড়া’ সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। আখড়া ঘিরে এখানে রয়েছে শত শত হিজলগাছ। হিজলগাছের সারি তিনশ একরের আখড়া এলাকাজুড়েই। সারা বর্ষায় এগুলো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। কিশোরগঞ্জের হাওড় উপজেলা ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও নিকলীতে রয়েছে বেশ কয়েকটি বেড়িবাঁধ। এসব বেড়িবাঁধে দাঁড়িয়ে সামনের দিকে তাকালে ৩০-৩৫ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো গ্রাম চোখে পড়ে না। বাঁধে দাঁড়িয়ে হাওড় দেখা সাগর দেখার মতোই উপভোগ্য। এবারের বর্ষায় হাওড়ে দর্শনার্থীর সংখ্যা ছিল অন্য বছরের তুলনায় বেশি। করোনার কারণে বাসা বাড়িতে আটকে পড়ারা যেন এখানে এসে নিজেকে নতুন করে আবিস্কার করছেন। দেশের দূরদূরান্ত থেকে মানুষ দল বেঁধে এসেছেন কিশোরগঞ্জের হাওড়ের বিভিন্ন মনোরম স্থানে। আগে বন্ধের দিনে জনসমাগম বেশী থাকলেও এখন প্রায় প্রতিদিনই ভ্রমণপিপাসুদের কোলাহলে লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
গত ১১ সেপ্টম্বর কিশোরগঞ্জের হাওড় ঘুরতে গিয়েছে বাংলাদেশ ইয়ুথ জার্নালিস্ট ইউনিটির (বিজু) সদস্যরা। হাওড়ের মনোরম পরিবেশ নিয়ে বেশ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন সংগঠনটির সভাপতি মো: শরিফুল ইসলাম। তাদের সাথে সঙ্গি হয়েছিল এ প্রতিবেদকও। তিনি বলেন, হাওড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দয্য আসলেই চমৎকার। দূর থেকে এতদিন শুধু শুনেছি। এবার নিজ চোখে হাওড়ের সৌন্দয্য দেখে আমি অভিভূত। সরকারিভাবে উদ্যোগ নিলে কিশোরগঞ্জের এ হাওড়কে দেশের বাইরে বিদেশেও ব্যাপকভাবে আকর্ষণীয় করে তোলা যাবে। এক্ষেত্রে এখানকার যানবাহনের ভাড়া সহনীয় পর্যায়ে আনা, হোটেল-মোটেল নির্মাণসহ বেশ কিছু উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
একই রকমের কথা বললেন বিজুর সাধারণ সম্পাদক মাসুদ মিয়াও। তিনি বলেন, ফেসবুকসহ সামাজিক মাধ্যমে হাওড়ের বিভিন্ন ছবি দেখে বেড়ানোর জন্য মন ব্যাকুল ছিল। এখানে এসে মনে হচ্ছে, দেশের বাইরে কোথাও ভ্রমণে বেরিয়েছি বুঝি! হাওড়ের বুক চিরে থাকা এই রাস্তাগুলো মনটাকে আরও বেশি করে হাওড়প্রেমী করে তুলেছে।
ঢাকার কুড়িল এলাকার মহসিন ও মিয়া মেম্বার ১০-১২ জন বন্ধু নিয়ে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের বালিখলা ও নিকলীর বেড়িবাঁধ এলাকায় ঘুরতে এসেছিলেন। কিন্তু হাওড়ে রাত যাপনের কোনো সুব্যবস্থা না থাকায় তারা অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, হাওড়ের অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাদের বিমোহিত করেছে। যদি রাতযাপন ও শৌচাগারের সুব্যবস্থা থাকত, পরিবার-পরিজন নিয়ে অনায়াসে হাওড়ে বেড়ানো যেত।
নিকলীর বেড়িবাঁধে ঘুরতে আসা মিডিয়াকর্মী আক্তারুজ্জমান বলেন, নিকলীর বেড়িবাঁধ ঘিরে পর্যটন শিল্প বিকাশের বিশাল সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। হাওড়ে পর্যটন বিকাশের বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কিশোরগঞ্জে হাওড়ের পর্যটন বিকাশে সরকারের তেমন উদ্যোগ নেই বলে তার অভিযোগ।
কিশোরগঞ্জ জেলা হোটেল-রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এ কে এম মোস্তাফিজুর রহমান জানান, শহর থেকে হাওড়ে যেতে ঘণ্টাখানেক সময় লাগে। সে জন্য দূরদূরান্ত থেকে আসা অনেকেই শহরে রাত যাপন করতে চান। কিন্তু হাওড় এলাকায় তেমন থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই।
স্থানীয় ট্যুরিজম সংগঠন কিশোরগঞ্জ ট্র্যাকার্স ক্লাবের সভাপতি মারুফ আহমেদ বলেন, তারা প্রতিবছর দেশের দূরদূরান্তের বিভিন্ন দুর্গম জায়গায় ভ্রমণে যান। কিন্তু সেসব জায়গায় ট্যুরিজমের পরিবেশ থাকায় তেমন সমস্যা হয় না। কিন্তু কিশোরগঞ্জে হাওড়ে দূরদূরান্ত থেকে অনেক দর্শনার্থী এসে নানা সমস্যায় পড়েন। কারণ, হাওড়ের কোথাও রাতযাপনের সুব্যবস্থা নেই। রাতে হাওড়ের সৌন্দর্য উপভোগের ব্যবস্থা নেই।
যোগাযোগ করলে কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার মুর্শেদ চৌধুরী বলেন, এবার বর্ষায় কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন হাওড় ঘিরে পর্যটকদের আনাগোনায় মনে হয়েছে, সবাই যেন এসব হাওড়কেই ভ্রমণের প্রধান কেন্দ্রস্থল হিসেবে বেছে নিয়েছেন। হাওড়ে ভ্রমণকে আরও পরিবেশবান্ধব করতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ