মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

ঢাকা ও আশপাশে বৈধ গ্রাহকরা পাচ্ছে না নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস 

স্টাফ রিপোর্টার : রাজধানী ঢাকা ও তার আশপাশে গ্যাসের অবৈধ লাইন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নৈরাজ্য চলে আসছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তরা অবৈধ গ্যাস সংযোগের গ্রাহক। ঢাকার বাইরের এলাকাগুলোতে অত্যন্ত বিপজ্জনকভাবে পাতলা প্লাস্টিকের পাইপ গাছের উপর দিয়ে টেনে গ্যাসের অবৈধ সংযোগ নেয়া হয়েছে। তবে এই সংযোগ শুধু আবাসিকেই নয়, বড় বড় শিল্প কারখানাতেও দেয়া হচ্ছে। আর অবৈধভাবে বসানো এসব লাইনের কারণে শুধু যে গ্যাস চুরি হচ্ছে তা নয়, গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থাও সংকটে পড়েছে। ফলে ভয়ানক বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে জনজীবন। সুবিধাভোগীরা বলছেন, গ্যাসের অবৈধ ব্যবহারের কারণে বৈধ গ্রাহকরাই নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস পাচ্ছেন না। শিল্পসহ বাসাবাড়িতেও গ্যাসের জন্য দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এরপরও ক্রমাগত বেড়েই চলেছে অবৈধ গ্যাসের ব্যবহার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবৈধ গ্যাসের ব্যবহার শক্ত হাতেই বন্ধ করতে হবে।  

রাজধানী ঢাকার আশেপাশে শত শত কিলোমিটার দীর্ঘ অবৈধ গ্যাস বিতরণ লাইন শনাক্ত করা হয়েছে। এসব লাইন থেকে হাজার হাজার অবৈধ গ্যাস সংযোগ নিয়েছেন বিপুল সংখ্যক গ্রাহক। এসব লাইনে ব্যবহার করা হয়েছে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার এবং নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয় বিবেচনা না করেই; যা ভয়াবহ দুর্ঘটনায় মৃত্যুর বিরাট ফাঁদ তৈরি করেছে। এখন এমন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চলছে ঠিকই, কিন্তু যখন প্রকাশ্যে এমন সরবরাহ লাইন নির্মাণ করা হয় তখন কেন কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। 

মূলত গ্যাস সংকটের কারণে ২০০৯ সালের জুলাই থেকে শিল্প কারখানায় এবং এর এক বছর পর অর্থাৎ ২০১০ সালে জুলাইয়ে বাসাবাড়িতে গ্যাসের সংযোগ দেয়া বন্ধ রাখে সরকার। এরপর চাহিদা বেড়েছে অনেকগুণ। বলা হচ্ছে ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে তিতাসের কাজ করতো এমন কন্ট্রাকটররা অবৈধ সংযোগ দিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। সংযোগ দিতে গিয়ে কোন নিয়মকানুনের বালাই ছিলনা, মানা হয়নি কোন নিরাপত্তা ঝুঁকির দিকও। কোথাও বা গাছের ওপর দিয়েও গ্যাসের পাইপ টানা হয়েছে। 

সংশ্লিষ্টারা বলছেন, বর্তমানে সংকটের কারণে বৈধ গ্রাহকরাই নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস পাচ্ছেন না। শিল্পসহ বাসাবাড়িতেও গ্যাসের জন্য দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। কিন্তু ক্রমাগত বেড়েই চলেছে অবৈধ গ্যাসের ব্যবহার।  অভিযোগ রয়েছে, তিতাস গ্যাস অফিসের কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ দেয়া হয়েছে। আর ওসব অবৈধ গ্যাস সংযোগের মাধ্যমে বাড়ির মালিকদের কাছ থেকে তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদাররা মোটা অঙ্কের টাকা নিয়েছে। মাইলের পর মাইল পাইপ বসিয়ে অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ দেয়ার নাম করে ইতঃমধ্যে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। আর গ্রাহকরাও দ্রুত লাইন পেতে অসাধু ওই চক্রের ফাঁদে পা দিচ্ছে। কারণ সাধারণ গ্রাহকদের বৈধভাবে গ্যাস সংযোগ পেতে ঠিকাদার ও তিতাসের পেছনে বছরের পর বছর ঘুরতে হয়। কিন্তু চাহিদামতো টাকা দিলেই অবৈধ সংযোগ পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু অবৈধ ওসব সংযোগ থেকে বিভিন্ন স্থানেই মাঝেমধ্যে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে।

তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী মো. আল মামুন বলেন, ‘যেগুলো নলেজে আছে সেগুলো আমরা দ্রুত উচ্ছেদের চেষ্টা করছি।' নগর পরিকল্পনাবিদদের আশঙ্কা, জালের মতো ছড়ানো অবৈধ গ্যাস সংযোগে পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ। এ অবস্থার মধ্যে যদি বড় ধরনের ভূমিকম্প হয় তবে পরিস্থিতি কি হবে তা অকল্পনীয়। 

নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব বলেন, ‘পুরো নগরী জুড়ে টাইমবোমার মতো ছড়িয়ে আছে গ্যাস লাইনগুলো। গ্যাস কর্তৃপক্ষের চরিত্র হচ্ছে একবার যদি লাইন দেয় তারপরে সব চলে যায় লাইনম্যানের কর্তৃত্বে। তিতাসেরই হিসাব বলছে, ঢাকাসহ আশেপাশের ৪ জেলায় অবৈধ সরবরাহ লাইন রয়েছে প্রায় আড়াইশ কিলোমিটার। অবৈধ সংযোগ উচ্ছেদে লোক দেখানো অভিযান চলে কিন্তু আড়ালে থেকে যায় অসাধু কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রভাবশালীরা। যে কারণে কদিন পর একই এলাকায় আবারও চালু হয় অবৈধ সংযোগ। সরকার হারায় কোটি কোটি টাকার রাজস্ব।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, গ্যাসের অবৈধ সংযোগের লাইন নিয়ন্ত্রণে- হয় বিচ্ছিন্নকরণ প্রক্রিয়ায় যেতে হবে অথবা অবৈধ বা বৈধ লাইনগুলোকে মাসিক বিলিং সিস্টেমের আওতায় আনতে হবে। এ ছাড়া অবৈধ গ্যাস সংযোগের ফলে সৃষ্ট দুর্ঘটনা রোধে সরকার ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাকে শিগগিরই একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করতে হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিভিন্ন স্থানে ২০ হাজার থেকে এক লাখ টাকার বিনিময়ে অবৈধ গ্যাস-সংযোগ দেওয়া হচ্ছে। আর এই প্রক্রিয়ায় প্রায় কয়েকশ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, তিতাস গ্যাসের এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদাররা। এসব অবৈধ সংযোগ থেকে এককালীন টাকা পাচ্ছে তিতাস গ্যাসের এক শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী। আবার কোথাও কোথাও এককালীন টাকা নেওয়ার পরও মাসিক বিল নিচ্ছে একটি চক্র। আর এর ভাগ তিতাস গ্যাসের কর্মীরাও পাচ্ছেন। সমস্যা হচ্ছে উচ্চ পর্যায়ের চাপে কোথাও লাইন কাটা হলেও স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে কিছুদিন পরই আবার অবৈধ সংযোগ নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী এবং সমর্থকদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ তত্ত্বাবধানে চলছে এই গ্যাস চুরির মহাযজ্ঞ। যার জন্য রাষ্ট্র কোটি কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আবার অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গেলে সংশ্লিষ্টদের বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম তামিম মনে করেন, আজকে একটা দুর্ঘটনা ঘটলে সেখানে অভিযান, গিয়ে ঠিক করলাম, আবার কালকে ঘটলে সেখানে, এটা কোনো সমাধান না। এই যে দুর্ঘটনাগুলো ঘটে, যেকোনো সংকটই কিন্তু সমস্যা সমাধানের একটা সুযোগ তৈরি করে। এই যে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হচ্ছে, এই সময়েই কিন্তু আমরা নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে পরিবর্তনটা আনতে পারি। তাহলে মানুষকে বোঝানো সুবিধা হবে। স্বচ্ছতা এখানে একটা বিরাট বিষয়। তবে, পাইপলাইনগুলোর যে রক্ষণাবেক্ষণ করেনি, সেটা একেবারে গাফিলতি। তারা হয়তো বলবে একেবারেই করিনি, সেটা ঠিক নয়। কিন্তু, এর ব্যাপকতা যা হওয়ার কথা ছিল, সেই হারে করেনি। সেই কারণেই আমরা এখন বলছি প্রায় ৭০ শতাংশ লাইনে লিকেজ করছে। তারপর হলো ম্যাপিং। কোনখান দিয়ে কোন লাইন গেছে, এই সম্পর্কে তিতাসের স্পষ্ট ধারণা আছে কি না, আমি জানি না। একটা ট্যাগলাইন দিয়ে রাখা। আমি তো দেখি হয়তো দুই-এক জায়গায় এটা আছে। বেশিরভাগ সময়ই আমি এটা দেখি না। অনেকটা ওয়াসার মতো। তাদের সুয়ারেজ লাইন কোথায় কোথায় গেছে, সেটা তারাও জানে না।’ 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ