মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

পেঁয়াজের ঝাঁজে চোখে পানি ॥ বাড়ছে আতঙ্ক

মিয়া হোসেন : কোনও প্রকার আগাম নোটিশ ছাড়াই বাংলাদেশে পেঁয়াজ রফতানি নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার। এমন সংবাদের পর থেকেই অস্থির হয়ে উঠেছে দেশের পেঁয়াজের বাজার। মানুষের মধ্যে বিরাজ করছে আতঙ্ক উৎকন্ঠা। এক লাফে পেয়াঁজের কেজি একশ টাকা ছাড়িয়েছে। গত বছরের পেয়াঁজের আকাশচুম্বি মূল্য বৃদ্ধির ঘটনা মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। পেয়াঁজের মূল্যবৃদ্ধির ঝাঁজে মানুষের চোখে পানি চলে আসছে। এক কেজি পেয়াঁজের জন্য টিসিবির লাইনে ঘন্টার পর ঘন্টা দাড়িঁয়ে থাকতে দেখা গেছে অনেককে। প্রতি ঘণ্টায় বাড়ছে এই পণ্যটির দাম। ক্রমশই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে পেঁয়াজের বাজার। পেয়াঁজের মূল্য নিয়ন্ত্রণের রাখতে সরকার নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও কোন কাজে আসছে না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, পেঁয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাজারে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যেই বাজার নিয়ন্ত্রণে আসবে। বাজার বিশ্লেষকরাও মনে করেন, পেঁয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাজারে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা জরুরি। সেইসঙ্গে পেঁয়াজ আমদানির বিকল্প নেই।
রাজধানীর বাজারগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কোথাও ১০০ টাকা, আবার কোথাও ১১০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে পেঁয়াজ। ক্রেতারাও হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন পেঁয়াজের বাজারে। কেউ পাঁচ কেজি, কেউবা ১০ কেজি করে যে যেভাবে পারছেন মজুত করছেন। বিশ্লেষকরা মনে করেন, ক্রেতাদের এমন আচরণও বাজারকে অস্থির করার পেছনে বড় কারণ। জানা গেছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালকের পরিকল্পনায়  রাজধানীর বিভিন্ন পাইকারি বাজারে অভিযান চলছে। অধিদফতরের চারটি টিমসহ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তিনটি মনিটরিং টিম এই অভিযান পরিচালনায় অংশ নিয়েছে। পেঁয়াজের বড় পাইকারি আড়ত শ্যামবাজারেও অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
এদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, দেশে বছরে পেঁয়াজের চাহিদা ২৫ লাখ মেট্রিক টন। এ বছর দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজের পরিমাণ ২৫ লাখ ৫৭ হাজার মেট্রিক টন। যেহেতু পেঁয়াজ পচনশীল পণ্য, তাই প্রতিবছরই উৎপাদিত পেঁয়াজের ৩০ শতাংশ পচে গিয়ে ভালো থাকে ১৯ লাখ ১১ হাজার মেট্রিক টন। এবারও তাই হয়েছে। এখানেই মূলত ঘাটতি তৈরি হয়। আর এই ঘাটতির পরিমাণ ৫ থেকে ৭ লাখ টন। চাহিদার বিপরীতে এই ৭ লাখ টন পেঁয়াজের ঘাটতি মেটাতে আমদানির ওপরে নির্ভর করতে হয়। প্রতিবছর আমদানিও হয় ৮ থেকে ১০ লাখ টন, যা চাহিদা বা প্রয়োজের অতিরিক্ত। আমদানিনির্ভর এই ৭ লাখ টন পেঁয়াজ দেশে উৎপাদিত ১৯ লাখ টন পেঁয়াজকে প্রভাবিত করে। আমদানিতে সামান্য কোনও ত্রুটি দেখা দিলেই ব্যসায়ীরা সুযোগ নিয়ে থাকে। আর তখনই অস্থির হয়ে ওঠে দেশের পেঁয়াজের বাজার।  
পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছর ধরে ৩০ শতাংশ বাদ দিয়ে দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন ১৭ থেকে ১৮লাখ মেট্রিক টনে স্থিতিশীল রয়েছে। কিন্তু এই সময়ে আমদানির পরিমাণ বেড়েছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন হয় ৭ লাখ ৩৫ হাজার মেট্রিক টন। ১০ বছরের ব্যবধানে উৎপাদন বেড়ে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তা দাঁড়ায় ১৭ লাখ ৩৮ হাজার টন। এ হিসাবে ১০ বছরের ব্যবধানে উৎপাদনের পরিমাণ বেড়েছে ১৩৬ শতাংশ বা ২ দশমিক ৩৬ গুণ। এ সময়ে হেক্টর প্রতি  ফলন ৬ দশমিক ৮১ টন থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৭৬ টন হয়েছে। তবে তা চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়। ফলে চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে পেঁয়াজের আমদানি। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ১ লাখ ৩৪ হাজার  টন পেঁয়াজ আমদানি করা হলেও, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ লাখ ৬৪ হাজার টন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে ৪ লাখ ৫৯ মেট্রিক টন। ১০ বছরেউৎপাদন বেড়েছে ২ দশমিক ৩৬ গুণ, আর আমদানি বেড়েছে ৭ দশমিক৯ গুণ। আর এই আমদানিতে কোনও কারণে ঘাটতি হলে এর সঙ্গে যুক্ত হয় একশ্রেণির অসৎ ব্যবসায়ীর কারসাজি, যা বাজারকে অস্থির করে তোলে।
এক কেজি পেঁয়াজের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা
ন্যায্যমূল্যে পেঁয়াজ কিনতে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ট্রাকের সামনে দীর্ঘ লাইন স্বল্প আয়ের মানুষের। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে ৩০ টাকায় মিলছে এক কেজি পেঁয়াজ।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পেঁয়াজ কিনতে টিসিবির পণ্যবাহী ট্রাকের সামনে ক্রেতাদের দীর্ঘ লাইন।
মধ্য বাড্ডায় টিসিবির ট্রাক থেকে পেঁয়াজ কিনেছেন সায়মা আক্তার। তিনি বলেন, ‘গতকাল বিকেলে পেঁয়াজ কিনতে গেছি দাম চাইছে ৮০ টাকা। না কিনে আজকে বাজারে গিয়ে দেখি পেঁয়াজ ১০০ টাকা হয়েছে। আমাদের আয় সীমিত এতো দামে কীভাবে পেঁয়াজ কিনব। ৩০ টাকার পেঁয়াজ কিনতে বাধ্য হয়ে লাইনে দাঁড়িয়েছি। প্রায় এক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে মাত্র এক কেজি পেঁয়াজ পেয়েছি।’
বাড্ডায় টিসিবির পণ্যবাহী বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান দেওয়ান ট্রেডার্সের মকবুল হোসেন বলেন, ‘হঠাৎ করে দাম বেড়ে যাওয়ায় পেঁয়াজের অনেক চাহিদা। মানুষের দীর্ঘ লাইন। সবাই পেঁয়াজের জন্য দাঁড়িয়েছে। ক্রেতা বেশি হওয়ায় একজনকে এক কেজির বেশি পেঁয়াজ দেয়া হচ্ছে না।’
তিনি জানান, ‘টিসিবি থেকে মাত্র ৩০০ কোজি পেঁয়াজ এনেছি। কিন্তু লাইনে যে সংখ্যক মানুষ আর তাদের যে চাহিদা তা ১ হাজার কোজিতেও পূরণ হবে না।’
পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে সরকারের ৯ উদ্যোগ
সরকার পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে নয়টি উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে ইতোমধ্যে যেসব উদ্যোগ নিয়েছে সেগুলো হচ্ছে:
১. মন্ত্রিপরিষদ সচিব, দেশের আট বিভাগীয় কমিশনার, দেশের ৬৪ জেলা প্রশাসকের নিকট বাজার মনিটরিং জোরদারকরণের জন্য চিঠি পাঠানো হয়েছে।
২. ফরিদপুর, পাবনা, রাজবাড়ী ও নাটোর এই তিন জেলার জেলা প্রশাসকদের পেঁয়াজের উৎপাদন, মজুত, সরবরাহ এবং মূল্য পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালনের জন্য বাণিজ্য সচিব ডিও লেটার দিয়েছেন।
৩. পেঁয়াজের বিষয়ে দ্রুত সংগনিরোধ সনদ ইস্যু করার জন্য কষি মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
৪. পেঁয়াজের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আমদানিকারকদের এলসি খোলাসহ সার্বিক সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বরাবর চিঠি পাঠানো হয়েছে।
৫. পেঁয়াজের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আমদানি করা পেঁয়াজ স্থলবন্দর থেকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ছাড় করতে এবং আমদানিকারকদের সহযোগিতা করার জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবি আর) চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
৬. পেঁয়াজের ওপর ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক আপাতত প্রত্যাহারের জন্য এনবি আর চেয়ারম্যানেরে কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
৭. পেয়াজের বাজার সরবরাহ স্বাভাবিক ও মূল্য স্থিতিশীল রাখতে আমদানি করা পেঁয়াজ বেনাপোল, ভোমরা, সোনা মসজিদ ও হিলি স্থলবন্দর থেকে দ্রুততম সময়ে ছাড় করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্থলবন্দর চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
৮. পেঁয়াজের উৎপাদন, মজুত ও মূল্য পরিস্থিতি সংক্রান্ত তথ্য জোগাড় করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তিন জন যুগ্ম-সচিবকে পাবনা, নাটোর, রাজবাড়ী ও ফরিদপুরে পাঠানো হয়েছে।
৯. স্থল ও নদীবন্দরে পেঁয়াজের আমদানি পরিস্থিতি, কন্টেইনার জট ও কৃত্রিম সংকট আছে কিনা তা দেখে রিপোর্ট দেওয়ার জন্য স্ব-স্ব কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ