মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

বর্ষায় ভরভরন্ত আর শুষ্ক মওসুমে চরের বিস্তার ফসলের আবাদ গাড়ির চলাচল

রাজশাহী: পদ্মা নদীর দুই রূপ। উপরে: এই সময়ের পদ্মার দু’কূল উপচে পানির ভরভরন্ত অবস্থা এবং নিচে: শুকনো মওসুমে পদ্মার বুকে চর, ফসল আবাদ আর গরুর গাড়ি চলাচল। -ছবি: সোহরাব হোসেন সৌরভ

সরদার আবদুর রহমান : এই পদ্মা আর সেই পদ্মা। বিস্তর ফারাক। বর্ষায় যে নদীর বুক থাকে ভরভরন্ত। শুষ্ক মওসুমে সেই নদীতে ঘটে চরের বিপুল বিস্তার, চলে ফসলের আবাদ। নদীর বুকজুড়ে চলাচল করে যানবাহন। এটি সব নদীরই স্বাভাবিক ও সাধারণ চিত্র বলে মনে হলেও পদ্মা নদীর গল্পটা একটু আলাদা। আর এই গল্পের পেছনের বিশাল পটভূমি তৈরি করেছে উজানে অসংখ্য প্রকল্প দিয়ে পানি প্রত্যাহারের বিপুল কর্মতৎপরতা।
সাধারণভাবে বর্ষা মওসুমে গঙ্গায় কমপক্ষে ২৫ লক্ষ কিউসেক পানি প্রবাহিত হয়। রাজশাহীর বুলনপুর পয়েন্টের প্রশস্ততম স্থানে এর বিস্তার দাঁড়ায় অন্তত সাড়ে ৫ কিলোমিটার। গড় গভীরতা প্রায় ১৮ মিটারে পৌঁছায়। উল্লেখ্য, রাজশাহীতে পদ্মার পানির বিপদসীমা ১৮ দশমিক ৫০ মিটার নির্ধারিত রয়েছে। এসময় পদ্মার বুক বিপুল জলরাশিতে ভরপুর রয়েছে। কিন্তু এই চিত্র বদলে যেতে দেরি নেই। কেবলই শুকনো মওসুম শুরুর অপেক্ষা। প্রবল খরা মওসুমে রাজশাহীর সারদা পয়েন্টে নদীর প্রশস্ততা দাঁড়ায় ৬০০ মিটার বা ০.৬ কিলোমিটারে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, বিগত ১৭ বছরে রাজশাহীতে পদ্মা নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেছে মাত্র দুই বার। এর মধ্যে ২০০৪ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত টানা ৮ বছর রাজশাহীতে পদ্মার পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেনি। কেবল ২০০৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর রাজশাহীতে পদ্মার সর্বোচ্চ উচ্চতা ছিল ১৮ দশমিক ৮৫ মিটার। এরপর ২০১৩ সালের ৭ সেপ্টেম্বর রাজশাহীতে পদ্মা বিপদসীমা অতিক্রম করেছিল। ওই বছর পদ্মার উচ্চতা দাঁড়িয়েছিল ১৮ দশমিক ৭০ মিটার। এরপর পানি বাড়লেও আর এই রেকর্ড ভাঙেনি। তবে মাঝেমধ্যে ফারাক্কার সবগুলো গেট একসঙ্গে খুলে দিলে বিপদ বাড়ে, বাড়ে জনমনে আতঙ্ক। গতবছর এই অবস্থার সৃষ্টি হলেও শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়।
শুষ্ক মওসুমের অবস্থা
গঙ্গা-পদ্মায় শুষ্ক মওসুমের অবস্থা দাাঁড়ায় অত্যন্ত শোচনীয়। এর প্রধান কারণ উজানে এই নদী থেকে ব্যাপকহারে পানি প্রত্যাহার। ভারত এর প্রায় সবক’টি উৎসকেই বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত করছে বলে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়। এভাবে এসব উৎসের শতকরা ৯০ ভাগ পানি সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। ফলে নদীতে মাত্র ১০ ভাগ পানি স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত হতে পারছে বলে সূত্রে প্রকাশ। যা প্রধানত বৃষ্টির ফলে জমা হচ্ছে।
ভারত তার বহু সংখ্যক সেচ ও পানিবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মূল গঙ্গা এবং এর উপনদীগুলোর ৯০ ভাগ পানি সরিয়ে নিচ্ছে। ফলে নদীতে পানি প্রবাহিত হতে পারছে মাত্র ১০ ভাগ। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক এই নদীতে বাঁধের পর বাঁধ দিয়ে প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করার ফলে মূল গঙ্গা তার উৎসের কাছে হারিয়ে যেতে বসেছে। ৫৬ বছরের মধ্যে গঙ্গা নদীর প্রবাহ ২০ ভাগ হ্রাস পেয়েছে। সব মিলিয়ে ভারতের নানা উচ্চাভিলাষি কর্মপরিকল্পনার শিকার হয়ে ভাটির দেশ বাংলাদেশ এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে চলেছে। শুধু ফারাক্কা নয়, গঙ্গা-পদ্মাকেন্দ্রিক বাঁধ, জলাধার, ক্রসড্যাম, রেগুলেটরসহ অন্তত ৩৩টি মূল অবকাঠামো নির্মাণ করছে ভারত। এরসঙ্গে রয়েছে আনুষঙ্গিক আরো অসংখ্য ছোট-বড় কাঠামো। নতুন করে উত্তরখন্ডের রাজ্য সরকার তাদের ৫৩টি বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করার পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। এগুলো বাস্তবায়িত হলে ভাগিরথী এবং অলোকানন্দা নদীপথে পানি শুকিয়ে যাবে। ভারত অনেক আগে থেকেই গঙ্গায় বৃহদাকার তিনটি খাল প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে, ‘আপারগঙ্গা ক্যানাল প্রজেক্ট’, ‘মধ্যগঙ্গা ক্যানাল প্রজেক্ট’ এবং ‘নিম্নগঙ্গা ক্যানাল প্রজেক্ট।’ এ ধরণের প্রকল্পের হাজার হাজার কিলোমিটার খালের মাধ্যমে গঙ্গার পানি সরিয়ে নিয়ে সেচ দেবার ব্যাপক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে তারা। ‘উপর গঙ্গা খাল প্রকল্পের’ মাধ্যমে উত্তর প্রদেশের ২৫ লাখ একর জমিতে সেচ দেয়ার লক্ষ্যে ৬ হাজার কিলোমিটারের বেশী খাল কেটে পদ্মার পানি সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। ‘মধ্যগঙ্গা ক্যানাল প্রজেক্ট’ নামের প্রকল্পে মূল ও শাখাসহ খননকৃত খালের মোট দৈর্ঘ প্রায় ১৬শ’ কিলোমিটার। ‘নিম্নগঙ্গা সেচ প্রকল্পের’ জন্য ৬ হাজার  কিলোমিটার  খালের মাধ্যমে গঙ্গার পানি সরিয়ে নেয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চুক্তির মাধ্যমে ফারাক্কা সমস্যার সমাধান তো হয়নি, উল্টো বাংলাদেশের জন্য মরণফাঁদের সংখ্যা বাড়িয়েই চলেছে ভারত। পানি সংকটে পড়ে এই শুকনো মওসুমে বিশ্বের বৃহত্তম নদীগুলোর অন্যতম গঙ্গা নদী বাংলাদেশে অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। এক শুভঙ্করের ফাঁকির মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে পানি চুক্তি করলেও ভারত সে চুক্তিও যথাযথভাবে পালন করে না। এখানেই শেষ নয়, আন্তর্জাতিক নদী আইনের কোন তোয়াক্কাই করছে না বৃহৎ প্রতিবেশী। তারা বাংলাদেশমুখি অর্ধশতাধিক নদীর পানি সরাসরি প্রত্যাহার করে চলেছে। ভারত এসব নদী এবং এর উপ-নদীগুলোর ওপর ৩ হাজার ৬ শ’টি বাঁধ বেঁধে ফেলেছে এবং আরো ১ হাজার বাঁধের নির্মাণ কাজ চলছে।
বর্ষা মওসুমের বিপরীতে শুষ্ক মওসুমে স্বাভাবিকভাবেই পানির প্রবাহ হ্রাস পাবে। কিন্তু উজানে বে-হিসেবি পানি প্রত্যাহারের প্রতিক্রিয়ায় পদ্মা অববাহিকা অঞ্চলে সেচ ও বিশুদ্ধ পানির সংকট বেড়ে যায়। এর ফলে বেকার হয়ে যান পেশাদার জেলে ও মাঝিরা। প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, সেসময় পদ্মা নদীর ৬০ ভাগ এলাকা শুকিয়ে বিশাল বিশাল চর জেগে যায়। আর ৪০ ভাগে পানি থাকলেও একাধিক ধারায় প্রবাহিত হওয়ায় এই পানি তেমন কাজে আসে না। নভেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত একটানা সাত মাস পদ্মা নদীর এমন অবস্থা গত দুই দশক ধরে চলতে থাকে বলে স্থানীয় লোকজন জানান। এর বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় ফসলের ভাণ্ডার বরেন্দ্র অঞ্চলে এ সময়ে সেচ ও কৃষিকাজে পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়। বরেন্দ্র অঞ্চলে বসবাসকারী লোকজন জানান, খরায় বিশুদ্ধ পানির জন্য বসানো নলকূপগুলোতে পানি উঠে কম। এমনকি কোন কোন নলকূপে পানিই উঠে না। জমিতে সেচের পানি দেয়া যায় না। ফলে ফসলের উৎপাদন কম হয়।
বিশিষ্ট নদী ও পরিবেশ গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, আমাদের চোখের সামনে প্রতিনিয়ত গঙ্গা-পদ্মার এই দুই চিত্র দেখে আসছি। উজানের পানি প্রবাহ সংকুচিত হওয়ার ফলে গত কয়েক বছরে রাজশাহীতে এই নদী ভরাট হয়ে ১৮ ফুট গভীরতা কমে গেছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে নদীর অস্তিত্বই হারিয়ে যাবার আশংকা রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ