বুধবার ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

যেনো লেখা হয়, আমার এ লেখায় তাদের সর্বনাশ

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী : মদিনা থেকে জিনের পাহাড়ের দূরত্ব ৬০ কিলোমিটার। চমৎকার রাস্তা। মদিনায় মাঝে মাঝে সবুজের সমারোহ আছে। সেগুলো খেজুরের বাগান। পানি সরবাহের উৎস বিষয়ে কোনো ধারণা নেই। তবে এই পথে যেতে একটি লেক দেখলাম। আমাদের দেশের বাঁওড়ের মতো। কিন্তু লেকটির পরিচর্যা ব্যবস্থা ভাল নয়। মনে হলো, এই লেকের পাশে সন্ধ্যায় মদিনাবাসীদের বসবার ব্যবস্থা করা গেলে ভাল হতো। আমরা জিনের পাহাড়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। সবার কাছেই সে পাহাড় রহস্যময়। জনশ্রুতি এই যে, এখানে সবকিছু ঢালু থেকে ওপরের দিকে গড়িয়ে যায়। কিন্তু অনেক দূর থেকে দেখলে বোঝা যায় প্রকৃতপক্ষে বিষয়টা সেরকম নয়। ওপর থেকে ঢালুর দিকেই গড়ায়। সড়কের গড়ন, শিলা পাহাড়ের প্রতিফলন এইসব মিলে জিনের পাহাড় বেশ মজাদার রহস্য বটে। 

আমরা যখন গিয়েছিলাম, তখন প্রচ- গরম। বিকেল হয়নি। এর পাশে দূরে দূরে ছাউনির মতো দেয়া আছে। সিমেন্টের টেবিল বেঞ্চ। সেখানে নাকি ছুটির দিনে আরবীয়রা পরিবার পরিজন নিয়ে বেড়াতে আসে। গ্রীল খায়। তারপর যে যার গন্তব্যে চলে যায়। আমরা যখন সেখানে পৌঁছলাম, তখন দুপুর তিনটা সাড়ে তিনটা। মাথার উপর তীব্র সূর্য। গরমে গা পুড়ে যায়। কিন্তু মরুভূমির বৈশিষ্ট্য এই যে, সেখানে ঘাম ঝরে না। আর এই কারণেই আরবীয়রা ও রকম ঢিলেঢালা পোশাক পরে। বাইরের গরমের চেয়ে পোশাকের ভেতরের গরম কম। 

আমরা গিয়ে দেখলাম, বেশ কিছু পর্যটক ঘুরছেন, বেড়াচ্ছেন। পানির বোতল, গাড়ি এইসব ঢালুর দিকে ছেড়ে দিচ্ছেন। ঘোর লাগা চোখে মনে হচ্ছে সেগুলো ওপরের দিকে উঠে আসছে। জনাদুই আইসক্রিমের ভেন্ডর। তারা সৌদি নয়, বিদেশি। ময়লা ফেলা নিয়ে বিদেশিরা যতটুকু সচেতন, সৌদিদের ততটা সচেতন মনে হয়নি। তারা কফির কাপ, সিগারেটের ফিলটার, আইসক্রিমের কাগজ এগুলো যেখানে সেখানে ছুঁড়ে ফেলে দেন। কে তুলবে এসব? 

পাহাড়ের গা ঘেঁষে দেখলাম, ছোট্ট একটু স্থাপনা। ১৫ ফিট বাই ১০ ফিট হবে। সেখানে পানি আছে। অযু, নামাযের জায়গা আছে। চাই কি নিজেদের বিছানোর চাদর থাকলে খানিকটা বিশ্রাম নেবারও ব্যবস্থা আছে। এই ঘরটুকু দালান। পাশে কাঁটা-জাতীয় গাছ। বেশ উঁচু। ১০/১২ ফুট তো হবেই। কিন্তু পাতা না থাকলে গাছ কি ছায়া দিতে পারে? সেখানে ডাস্টবিনও ছিল। আমরা নিজেদের খাওয়ার কাপ-কাগজ ডাস্টবিনে ফেললাম। দেশি-বিদেশি অনেকে কেয়ারই করছিল না। তাহলে উপায়? আগামীকাল যারা আসবেন, তারা কি এই ময়লার ভেতরে এসে দাঁড়াবেন?

কিন্তু না। কিছুক্ষণ পর ঐ ঘরটার পাশ থেকে বেরিয়ে এলেন একজন মাঝবয়সী মানুষ। সবুজ জামা-প্যান্ট পরা। পায়ে একেবারেই কম দামী স্পঞ্জের স্যান্ডেল। মাথায় কাঁচা-পাকা চুল। স্বাস্থ্যহীন নন। কিন্তু দৃষ্টিতে ঔদাস্য। সেখানে আশার আলো নেই। নিভু নিভু ঘোলাটে চোখ। দেখে মনে হলো, তিনি হয়তো বাংলাদেশী, কিংবা শ্রীলঙ্কান। তার নিস্পৃহ ভাবে কেমন যেন বিচলিত হলাম। এগিয়ে গিয়ে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, চাচা আপনি কি বাংলাদেশ থেকে এসেছেন? অর আর ইউ ফ্রম শ্রীলংকা? তিনি একেবারে খাস কুমিল্লার উচ্চারণে বললেন, আমার বাড়ি চাঁদপুর। ওমরাহ করতে এসেছেন? ওমরাহ করতে এলে সবাই জিনের পাহাড় দেখতে আসে। গরমে নাক জ্বলছিল। ভাবলাম, আরও একটু আলাপ করি। জানতে চাইলাম, ‘আপনার নাম কী?’ জানালেন, আবু তালেব। বললাম, এই জিনের পাহাড়ে আপনি কি কখনও জিন দেখেছেন? তিনি বললেন, জিন কি আর দেখা যায়? দেখি নাই। দেখার সময়ই বা কোথায়?

তিনি ক্লিনারের চাকরি নিয়ে কবে যে সৌদি আরব এসেছিলেন, ঠিক মতো মনে করতে পারছেন না। বললেন, বহুদিন হয়ে গেছে। আমি বললাম, ২০ বছর। বলল, তা তো বটেই। কথা বলায় তার খুব একটা আগ্রহ ছিল না। বরং তিনি ঝাড়ু, বেল্চা ও ছোটখাট একটা ডাস্টবিন হাতে নিয়ে আবর্জনা পরিষ্কার করছিলেন। একটা একটা করে সিগারেটের ফিল্টার তুলে ফেলছিলেন। জানতে চাইলাম, ডিউটি কতক্ষণ? বলল, ১০ ঘণ্টা। সকাল ৬টা থেকে বিকাল ৪টা। কেউ তো আর এখানে আসতে চায় না। আমি আরও দুই ঘণ্টা ওভার টাইম করি। তাতে অতিরিক্ত কিছু মেলে। বেতন কত? বললেন, বাংলাদেশি টাকায় ৮০০০-এর মতো। ওভারটাইম দিয়ে ১০/১২ হাজার পড়ে। তবে একটা সুবিধা আছে। প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরের এক খেজুরের বাগানের দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখালেন, ঐ বাগানের মালিকের কাজ করি। সেটা অতিরিক্ত। তিনিও কিছু পয়সা দেন। তার ওখানে থাকি বলে, পানিটা সহজে পাই। নিজে রেঁধে খাই। মাঝেমধ্যে শাকসবজি, এটা ওটা বুনি। এভাবেই দিন চলে যাচ্ছে।

কিন্তু কথা বলায় তার বেশি আগ্রহ ছিল না। আমরাও জিনের পাহাড় ছুঁয়ে দেখতে কিংবা পাহাড় বেয়ে খানিকটা ওপরে ওঠার চেষ্টা করছিলাম। যখন ফিরলাম, তখন আর কাছে-বিছে তাকে দেখিনি। এরা বিদেশে বাংলাদেশী শ্রমিক। সরকার ঘোষণা দিয়েছে এই করোনাকালে প্রবাসী বাংলাদেশীরা দেশে বিপুল অঙ্কের টাকা পাঠিয়েছে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাঙ্কে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন সর্বকালের সবচেয়ে বেশি। কী মজার খবর, না?

কিন্তু এই শ্রমিকদের সঙ্গে বাংলাদেশী দূতাবাস কর্মকর্তাদের আচরণ কী ভয়ঙ্কর ও নিষ্ঠুর, তার সাম্প্রতিক বিবরণ পাওয়া গেল ভিয়েতনামে গিয়ে আটকে পড়া শ্রমিকদের নিয়ে। বাংলাদেশী অসাধু কোনো আদমব্যাপারি কিছুকাল আগে ৮১ জন শ্রমিককে চাকরি দেয়ার কথা বলে ভিয়েতনাম পাঠিয়েছিল। ভিয়েতনামীরা নিজেরাই নিজেদের কাজ করার জন্য যথেষ্ট। তাদের বিদেশি শ্রমিকের প্রয়োজন হয় না। তারপরও কিছু অসাধু জনশক্তি ব্যবসায়ী ভিয়েতনামে আকর্ষণীয় চাকরি দেবার নাম করে ৫/৭ লাখ টাকার বিনিময়ে বাংলাদেশ থেকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিল।

তারপর শুরু হয়েছিল তাদের জীবনের ট্র্যাজেডির কাহিনী। তাদের কাউকে কাউকে কোনো কারখানায় নিয়ে গিয়ে কাজ দেখাচ্ছিল। কিংবা তাদের নিয়োগ করছিল নামমাত্র বেতনে। এ এক চক্র। এই চক্রের সঙ্গে জড়িত বাংলাদেশীরাও। তারা মানব পাচারকারীদের এজেন্ট। এদেরকে রাখা হচ্ছিল অমানবিক পরিবেশে। যে চাকরি দেয়ার কথা বলে আনা হয়েছিল, সে রকম চাকরি ছিলই না। যারা এর প্রতিবাদ করেছে তারা নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এই নির্যাতনকারীদের মধ্যে ভিয়েতনামীদের সঙ্গে বাংলাদেশীরাও ছিল। এক পর্যায়ে অতিষ্ট হয়ে শ্রমিকরা ভিয়েতনামের বাংলাদেশী দূতাবাসে গিয়ে অভিযোগ জানায়। তারা জানায় যে, তাদের যেসব চাকরি দেবার নাম করে আনা হয়েছে, সেরকম চাকরি দেয়া হচ্ছে না। মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য করা হচ্ছে। চাকরি নাই। টাকা পয়সা যা ছিল নিয়ে গেছে আদম পাচারকারীর এজেন্টরা। পাসপোর্ট তো নিয়েছে আগে। ফলে এরা খুব অসহায়। তারা দূতাবাসে সাহায্য চাইতে গিয়েছিল। সাহায্যটা হলো এই যে, দূতাবাস যেন তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করে।

কিন্তু যখন এই প্রতারিত শ্রমিকরা একযোগে ভিয়েতনামে বাংলাদেশের দূতাবাসে গিয়ে হাজির হলো, তখন আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে যে বিবৃতি দেয়া হলো, সে বিবৃতি পড়ে আতঙ্কিত হলাম। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হলো যে, একদল বাংলাদেশী বিপুল অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ভিয়েতনামে বাংলাদেশ দূতাবাস দখল করে নিয়েছে। এই খবর পড়ে দারুণ আতঙ্কিত হলাম। ভিয়েতনাম কোনো আইএসআই-এর দেশ নয়। এসব হাবিজাবি রাজনীতি ভিয়েতনাম করেও না। সেখানে কিছু সংখ্যক বাংলাদেশী বিপুল অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে দূতাবাস দখল করে নিয়েছে, ভাবতেও কেমন আতঙ্কিত বোধ করলাম। অর্থাৎ বাংলাদেশীরা ভিয়েতনামে গিয়ে জোগাড় করেছেন, বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র গোলাবারুদ, মর্টার, গ্রেনেড। নানা ধরনের ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি।

কী সাংঘাতিক ঘটনা! তারপর একাধিক টেলিভিশন এবং ফেসবুক লাইভে দেখলাম, এইসব মানুষের আর্তনাদ। একটি খুপড়ি ঘরের ভেতরে ডজন ডজন লোক ক্ষুধার্ত। তারা শুধু একটিই কথা বলছে। দূতাবাস আমাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠাক, শুধু এইটুকু দাবী। আমরা বড় অসহায় অবস্থায় আছি। তাদের অশ্রুপাত যে কোনো হৃদয়বান মানুষের কান্নার উদ্রেক করবে। টেলিভিশনের সামনে চুপ করে বসে ছিলাম। এরা অস্ত্রশস্ত্র গোলাবারুদসহ ভিয়েতনামে বাংলাদেশ দূতাবাস আক্রমণ করেছে? কোনো রাষ্ট্রের দূতাবাস এইরকম নিম্নমানের মিথ্যাচার করতে পারে, এই ছিল আমার মতো অনেকেরেই কল্পনার বাইরে। তাদের কাছে প্রশ্ন রাখা হয়েছিল। ভুক্তভোগীরা জানালেন, প্রকৃতপক্ষে তারা দূতাবাসের সাহায্য চাইতে গেলে দূতাবাসের কর্মকর্তা কর্মচারীরা তাদের উপর হামলা চালায়। তখন তারা দেয়াল টপকে এদিক সেদিক ছুটে পালান। এরপর রাস্তায় তারা ধরনা দিয়েছেন। কেউ ফিরেও তাকায়নি।

অথচ একেই সন্ত্রাসী কর্মকা- বলে অভিহিত করতে দ্বিধা করেনি আমাদের দূতাবাসের কর্মকর্তারা। আমি তাদের ধিক্কার জানাই। আর আশ্চর্য ঘটনা এই যে, জনশক্তি রপ্তানিকারকদের প্রতিষ্ঠান বায়রার নেতারা এক আজব কথা বললেন। বললেন যে, এদেরকে বায়রা সদস্যরা ভিয়েতনামে চাকরি দেয়ার কথা বলে নিয়ে গিয়েছিল, সত্য। হ্যাঁ, যে চাকরি দেয়ার কথা ছিল, সে চাকরি দিতে পারেনি। অন্য চাকরি দিবে। এ নিয়ে এত হৈচৈ এর কী আছে? আমার মতো, ব্যবসায়ী বুদ্ধিহীন বহুমানুষের মনে নিশ্চয় প্রশ্ন উঠেছিল যে, ভিয়েতনামে কোথায় চাকরি? কী চাকরি দিতে তাদের নিয়ে যাওয়া হলো? কী চাকরির বদলে তাদের কী চাকরি দেয়া হবে? কিছু ফয়সালা হলো না। 

ভিয়েতনামে গিয়ে যারা অসহায় হয়ে পড়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত সরকার তাদের দেশে ফিরিয়ে এনেছে। সরকারকে সাবাসই দেই। তারপরের ঘটনা কী? এদের মধ্যে ৮১ জনকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে প্রথমে ১৪ দিনের কোরেন্টাইনে পাঠানো হলো। সেটা ভাল খবর। কিন্তু কোরেন্টাইন পরপরই ঘটল ভয়ঙ্কর ঘটনা। ভিয়েতনাম ফেরত ৮১ জনকে সরাসরি জেলে পাঠিয়ে দেয়া হলো। কারণ, সরকারি ভাষ্যে বলা হলো, ‘তারা দেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করেছে। অথচ যেভাবেই হোক, যারা বিদেশে যায়, টাকা উপার্জন করে। তাদের টাকার জন্য সরকারের জিভ লিকলিক করতে থাকে। 

ভিয়েতনাম ফেরতদের সম্পর্কে বলা হলো, এই সমস্ত শ্রমিককে জেলে না পাঠিয়ে যদি ছেড়ে দেয়া হয়, তাহলে তারা বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কার্যক্রম, যথা : ডাকাতি, পারিবারিক সহিংসতা, খুন, জঙ্গিবাদ প্রভৃতি কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়তে পারে। পুলিশের এসআই এমন পর্যন্ত বললেন যে, তাদেরকে ভিয়েতনামে জঙ্গিবাদের ট্রেনিং দেয়া হয়েছে। এই এসআই লোকটা এতটাই অশিক্ষিত যে, তার ভিয়েতনামের শ্রমবাজার এবং সেখানে আদম পাচারকারীদের সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই। এখন ঐ ৮১ জন ভিয়েতনাম ফেরত শ্রমিক জেলে। যেভাবে তাদের বিরুদ্ধে মামলা সাজানো হয়েছে, তাতে তাদের কতকাল জেলে থাকতে হবে সেটা একমাত্র ¯্রষ্টাই বলতে পারেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ