মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

বন্যা পরিস্থিতি : শিশু ও বয়োবৃদ্ধদের নজরে রাখুন

জুবায়ের আহমেদ : কোভিড-১৯ মহামারিতে বিপর্ষস্ত দেশ। এই সময় মানুষজন যখন দিশেহারা হয়ে গেছে চিকিৎসা সমস্যা ও অর্থনৈতিক মন্দার কারনে, তখন হানা দিয়েছে বন্যা। বর্ষা মৌসুম চলছে, বর্ষার পানিতে গ্রামাঞ্চলের খাল, বিল জমিজমা সহ বাড়ির আনাচ কানাচ পরিপূর্ণ হয়ে যায়। গ্রাম অঞ্চলের শিশুদের জন্য বর্ষাকাল খুবই ভয়ানক সময়। এই সময়ে হামাগুড়ি দিতে শেখা শিশুরা পরিবারের সদস্যদের অগোচরে বাড়ির পাশের পুকুর, খাল সহ জমিতে পরে গিয়ে তলিয়ে মৃত্যুবরণ করার অসংখ্য ঘটনা আছে। বর্ষার পানির পাশাপাশি বন্যার কারনে আরো ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বন্যা কালে শুধু শিশুই নয়, অসুস্থ, প্রতিবন্ধী, বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তিদেরও বিপদ ঘটতে পারে যেকোন সময়।
বাংলাদেশ বৃষ্টিবহুল ও নদীমাতৃক দেশ। এদেশে বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ২,৩০০ মিলিমিটার। ৫৭টি আন্তর্জাতিক নদীসহ ৭০০টি নদী বাংলাদেশে জালের মতো বিস্তার করে আছে। এর মধ্যে ৫৪টি নদীর উৎসস্থল ভারতে অবস্থিত। এসব কারণেই বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতি বর্ষা মৌসুমেই বন্যার শিকার হতে হয়। বাংলাদেশে প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম তথা দুটি কারণে বন্যা হয়ে থাকে। প্রাকৃতিক কারনের মধ্যে ভৌগোলিক অবস্থান, মৌসুমি জলবায়ুর প্রভাব, মূল নদীর গভীরতা কম,শাখানদীগুলো পলি দ্বারা আবৃত, হিমালয়ের বরফগলা পানি প্রবাহ, বঙ্গোপসাগরের তীব্র জোয়ার-ভাটা  এবং ভূমিকম্প। কৃত্রিম কারণের মধ্যে নদী অববাহিকায় ব্যাপক বৃক্ষ কর্তন, গঙ্গা নদীর উপর নির্মিত ফারাক্কা বাঁধ, অন্যান্য নদীতে নির্মিত বাঁধের প্রভাব এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ। এছাড়াও উজান থেকে নেমে আসা নদীর পানির প্রচুরতার কারণে বন্যা হয় যেমন- ২০১২ এপ্রিল নেত্রকোনায় বন্যা হয়। ভারত থেকে আসা পানিকে বাঁধের সাহায্যে নিয়ন্ত্রণ এবং  সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকার পানির অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে না পারলেও বাংলাদেশে বন্যা হয়।
বন্যায় বাংলাদেশে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। বন্যায় এলাকা প্লাবিত হয়ে বিপুল পরিমাণ ফসলের ক্ষতি হয়। মানুষের প্রাণহানি ঘটে, শিশু ও বৃদ্ধ মানুষেরা সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হন। শিশুদের পিতা মাতা ও পরিবারের বড় সদস্যরা খেয়ালে রাখলেও কোন কারনে বিচ্যুতি ঘটলেই প্রানহাণীর ঘটনা ঘটে। বন্যায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। গৃহপালিত পশুর জীবন বিনষ্ট ও বিপন্ন হয়। ধ্বংস হয় সম্পদ। ২০০০ সালের বন্যায় দেশের ১৬টি জেলার ১.৮৪ লক্ষ হেক্টর জমির ফসল বিনষ্ট হয়। উৎপাদন আকারে এ ক্ষতির পরিমাণ ৫.২৮ লক্ষ মেট্রিক টন। ২০০১ সালে বন্যায় দেশের ১৬টি জেলার ০.৪১ লক্ষ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়।
বাংলাদেশ অঞ্চলে ১৯৭৪, ১৯৭৮, ১৯৮৪, ১৯৮৮, ১৯৯৮, ২০০৪ সালের বন্যা ছিল ভয়াবহ। তার মধ্যে ১৯৯৮ সালের বন্যা ছিল সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী। সে বছর বন্যায় সবচেয়ে বেশি এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশে বর্ষাকালে প্রবল বৃষ্টিপাত হয়। ২০০৪ সালের পর চলতি বছরও বৃহৎ আকারে বন্যার শিকার হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া, ফরিদপুর, সুনামগঞ্জ, রাজশাহী,নওগাঁ, নেত্রকোনা, শেরপুর, মানিকগঞ্জ সহ দেশের ১৮ জেলা বন্যার শিকার হয়েছে। যেখানে সীমাহীন দূর্ভোগে মানবেতর জীবন যাপন করছে সকলে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছেই। কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়ীয়া, কিশোরগঞ্জ, সিলেট সহ আরো বহু জেলায় বন্যা হওয়ার আশংকা আছে।
সরকারি-বেসরকারি ভাবে বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলা ও ক্ষয়ক্ষতি কমানোর জোর চেষ্টা চলছে। তবে প্রাকৃতিকের সাথে কৃত্রিম কারণ মিলিয়ে ভয়াবহ রুপ ধারণ করা বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এই সময় ফসল,ঘর,আসবাবপত্র সহ কিছু ক্ষতি মেনে নিয়ে হলেও মানুষের জীবন বাঁচানোর সকল প্রচেষ্টার বিকল্প নেই। সামর্থবান ব্যক্তিদেরও এগিয়ে আসতে হবে বন্যাকবলিত মানুষদের সহায়তার জন্য।
বন্যা পরিস্থিতিতে পরিবারের সক্ষম ব্যক্তিরা ক্ষয়ক্ষতিরোধের চেষ্টা সহ খাদ্য অধিকার নিশ্চিতের কাজেই ব্যস্ত থাকে, এই সময়ে হামাগুড়ি দিতে পারা শিশু সহ সাতার কাটতে না পারা শিশু, প্রতিবন্ধী, বয়োবৃদ্ধ, অসুস্থ সদস্যদের দিকে বাড়তি নজর রাখার কোন বিকল্প নেই। মনে রাখতে হবে বন্যা পরিস্থিতি এক সময় স্বাভাবিক হবেই, কিন্তু স্বজন হারানোর বেদনা রয়ে যাবে আজীবন, এ ক্ষতি কোন ভাবেই পূরণযোগ্য নয়। কাজেই বন্যায় ক্ষয়ক্ষতিরোধ ও খাদ্য অধিকার নিশ্চিতের দিকে ছুটার পাশাপাশি শিশু ও বয়োবৃদ্ধ সদস্যদের খেয়াল রাখার মাধ্যমে   সকলে মিলেই বন্যা পরিস্থিতিতে সুস্থ থাকা এবং প্রাণহানিরোধ করার লড়াই করতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ