মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

প্রদীপরা বেপরোয়া হয়ে উঠে কেন?

মো. তোফাজ্জল বিন আমীন : পুলিশ জনগণের বন্ধু। জনগণের সেবক। এটা করোনার আগে অনুধাবন করা একটু কঠিন ছিল। কিন্তু করোনা ভাইরাসের নিষ্ঠুরতায় পুলিশ বাহিনীর মানবিকতা ও উদারতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিল মনে রাখার মতো। কিন্তু গত ৩১ জুলাই রাত সাড়ে ১০ টার দিকে কক্সবাজার টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলীতে সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যাকান্ডটি পুলিশের ভাবমর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করেছে। এ হত্যাকান্ডের নিন্দা জানানোর ভাষা আমাদের জানা নেই। সাধারণত সন্তান মায়ের লাশ বহন করে। কিন্তু সিনহার লাশ তাঁর মাকেই বহন করতে হল। এর চেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনা একজন মমতাময়ী মায়ের জীবনে আর কী হতে পারে? আরশের মালিকের কাছে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করি তিনি যেন সন্তানহারা এ মাকে ধর্য্যধরার শক্তি দেন। রাষ্ট্রীয় এ বাহিনীর সুনাম যেমন আমাদেরকে আলোড়িত করে, তেমনি এ বাহিনীর কিছু সদস্যের অপকর্মের নিষ্ঠুরতা আমাদের উদ্বেগ উৎকন্ঠাকে আরো বাড়িয়ে দেয়।পুলিশ একটি সেবা প্রদানকারি প্রতিষ্ঠান। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দেয়ার জন্য ট্রেনিং দেয়া হয়। অপরাধ ও অপরাধীর প্রতি কঠোরতা প্রদর্শন এবং নিরপরাধ জনসাধারণের প্রতি কোমল হওয়া এবং তাদের নিরাপত্তা ও মানবাধিকার নিশ্চিত করা পুলিশের বিধি বিধানের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু প্রদীপ দাশদের মতো মানুষের কারণে তা ভাটা পড়ে যায়।
পৃথিবীর অনেক দেশের পুলিশ জনগণের বন্ধু হিসেবে নিজেদেরকে আত্মনিয়োগ করতে পারলেও বাংলাদেশের পুলিশ তা অর্জন করতে পারেনি। রাষ্ট্রের এ বাহিনীর মূল দায়িত্ব হচ্ছে মানুষের জীবনের নিরাপত্তার বিধান নিশ্চিত করা। গণতান্ত্রিক অধিকার ও মানবাধিকার নস্যাৎ করা নয়! সম্প্রতি আমেরিকায় পুলিশের হাতে কৃষ্ণাঙ্গ ফ্লয়েডের মৃত্যু শুধুু আমেরিকাতেই নয়,সারা বিশ্ববিবেককে ঝাঁকুনি দিয়েছে। পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের কোটি কোটি মানবতাবাদী মানুষ ফ্লয়েডের নিষ্ঠুর হত্যাকান্ডকে নিন্দা জানিয়েছে। এক ফ্লয়েডের ঘটনায় আমেরিকার রাষ্ট্রযন্ত্র পুলিশ বাহিনীর নতুন সংস্কারের চিন্তা করছে।  সেখানে আমাদের পুলিশ বাহিনী এখনও ব্রিটিশদের তৈরীকৃত ব্যবস্থায় চলছে। পুলিশ বাহিনীর সংষ্কার না হওয়ার কারণে পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা বেড়েই চলছে। পুলিশ হেফাজতে যেখানে একজন ব্যক্তির নিরাপদ থাকার কথা সেখানে হেফাজতে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। কোথাও কোথাও সাধারণ মানুষের ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতন চালানো হচ্ছে। এই অপসংস্কৃতির অবসান কাম্য।
 মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যার পর বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের ঘটনা টক অব দ্যা কান্টিতে পরিণত হয়েছে। একজন সাবেক মেজর এর জীবন যেখানে অরক্ষিত সেখানে সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ তা সহজে অনুমেয়।আওয়ামী সরকার ২০০৮ সালে নির্বাচনী ইশতেহারে বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের তিন মেয়াদেও হত্যাকান্ড থামেনি। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য এ আলামত মোটেও সুখকর নয়! সংবিধানে প্রতিটি মানুষের ন্যায় বিচারের কথা বলা থাকলেও বাস্তবতা হলো সংবিধানের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হচ্ছে না।বন্দুকযুদ্ধ কিংবা ক্রসফায়ার যে নামেই বলি না কেন এটা পৃথিবীর কোনো সভ্য রাষ্ট্র বা তার নাগরিকরা সমর্থন করতে পারে না। বিগত এক যুগে বাংলাদেশে প্রায় ২০৮৮ জন মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছে। জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কমিটির শুনানিতে এ পরিসংখ্যানটি উত্থাপিত হয়েছে। বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার ব্যক্তির স্বজনরা বিচার চেয়েও কোনো প্রতিকার পাননি। বরং যারা এমন অন্যায় নিষ্ঠুর হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে,তাদের কেউ কেউ পুরস্কৃত হয়েছেন।
পুলিশের গুলিতে সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান নিহতের ঘটনাকে সেনাবাহিনী প্রধান বিচ্ছিন্ন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু টিআইবি বলছে,এটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। কারণ তা বিচারবহির্ভূত হত্যার অপসংস্কৃতিকে স্বাভাবিকতায় রূপান্তরের একটি নজির মাত্র।  টিআইবি গণমাধ্যমের খবরের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছে,২০১৮ সালের ৪ মে থেকে সারা দেশে শুরু হওয়া মাদকবিরোধী অভিযানে গত ৩০ জুলাই পর্যন্ত শুধু কক্সবাজার জেলায় পুলিশ,বিজিবি ও র‌্যাবের সাথে বন্ধুকযুদ্ধের ঘটনায় ২৮৭ জন নিহত হয়েছেন। এসব বন্দুকযুদ্ধের সঙ্গে পুলিশের একশ্রেণির অসাধু সদস্য বা থানার ভারপ্রাপ্তরা জড়িত হলেও বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের ঘটনার দায় পুরো পুলিশ বাহিনীর সুনামকে নষ্ট করছে। এসব হত্যাকান্ড বহু বছর ধরে চলে আসছে। অপারেশন ক্লিনহার্ট থেকে শুরু করে মেজর সিনহা হত্যা পর্যন্ত সকল ঘটনার গল্প প্রায় একই। আইন ও সালিশ কেন্দ্রসহ(আসক) একাধিক মানবাধিকার সংস্থার পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ২০০৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ১৬ বছরে দেশে প্রায় ৩ হাজার ৫৮ জন মানুষ বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন।এসব হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো সোচ্চার হলেও ক্রসফায়ার থামেনি। এসব ঘটনা বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের সুনামকে ক্ষুণ্ন করেছে।
পুলিশ প্রশাসনে প্রদীপ দাশদের উত্থানের জন্য দায়ী কে? কোনো মানুষ জন্মগতভাবে সন্ত্রাসী হয়ে যেমন জন্মায় না ঠিক তেমনি পুলিশে চাকুরী নিয়েই কোনো মানুষ লিয়াকত প্রদীপের মতো ভয়ংকর হয়ে উঠে না। এর পেছনে যে কারণগুলো নিহিত আছে তা রাষ্ট্রের খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। স্বাধীনতার ৪৯ বছর পেরিয়ে গেলেও আইনের শাসন কিংবা কাংখিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। কাগজে-কলমে গণতান্ত্রিক সরকার থাকলেও বাস্তবে গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্যগুলো খুঁজে পাওয়া কঠিন। কারণ গণতন্ত্রের পূর্বশত হচ্ছে জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা। কিন্তু বাংলাদেশে ভোটাধিকার প্রয়োগের অধিকার ভুলন্ঠিত। জাতীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে স্থানীয় নির্বাচন কিংবা স্কুল কলেজ,বিশ^বিদ্যালয় থেকেও ভোটাধিকার উধাও। কাংখিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কিংবা জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনা সম্ভব না হলে প্রদীপ, লিয়াকত,মিজান কিংবা ওসি মোয়াজ্জেমদের উত্থান ঘটতেই থাকবে। সরকার ইচ্ছে করলে ক্রসফায়ারের অপসংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ করতে পারে! ক্রসফায়ার সরকারীভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলে কোনো পুলিশ অফিসারের হিম্মত হবে না বন্দুকযুদ্ধের নাটক মঞ্চায়িত করার। ক্রসফায়ার কোনো সমাধান নয়! এটা লাতিন আমেরিকার কিছু দেশ থেকে শুরু করে ফিলিপাইনেও দেখা গেছে। তারা মাদক ও অপরাধ দমনে ক্রসফায়ার পন্থা অবলম্বন করেও অপরাধ কমাতে পারেনি। উল্টো আইনপ্রয়োগকারী বাহিনী আইনভঙ্গে উৎসাহিত হয়েছে। তবে সিনহা হত্যাকান্ডে সরকার যেভাবে দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে সেভাবে যদি অতীতের সকল ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে নিতো,তাহলে ক্রসফায়ার অপসংস্কৃতির অবসান বহু আগেই হয়ে যেত।
পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। একশ্রেণির পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অপকর্মে জড়ানোর অভিযোগ প্রায়ই পত্রিকার পাতায় মুদ্রিত হয়। কিন্তু প্রতিকার কিংবা অপরাধ বন্ধ হচ্ছে না। কিছু অসাধু পুলিশ সদস্য চাহিদা অনুযায়ী টাকা না পেলে গায়েবী মামলা কিংবা মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দিতেও কুন্ঠাবোধ করছে না। মাদক চোরাচালান রোধে মানুষ হত্যা করা হলেও প্রকৃতপক্ষে মাদকের ব্যবহার ও চোরাচালান বন্ধ হয়নি। ওসি প্রদীপ এলাকার মূর্তিমান ত্রাস হিসেবে পরিচিত ছিল। ক্রসফায়ারকে অর্থ কামানোর ধান্দায় ব্যবহার করতো। মানুষ এতদিন ভয়ে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস করেনি। এখন তার সব অপকর্মের ফিরিস্তি সামাজিক যোড়াযোগমাধ্যমে ভাইরাল। ইত্তেফাকের রিপোর্ট অনুযায়ী ওসি প্রদীপ কুমার এক টেকনাফেই প্রায় ২৫০ জনকে ক্রসফায়ার দিয়েছেন। ইয়াবা ব্যবসায়ীদের নিরাপদ রেখে অসহায় মানুষদের নিকট মোটা অংকের টাকা দাবি করতো। টাকা না পেলে ইয়াবা ব্যবসায়ী তকমা দিয়ে ক্রসফায়ারে দিতো। প্রদীপের পাপ বহু আগেই ভরপুর হয়েছিল। কিন্তু ছিল ধরাছোয়ার বাইরে। অবশেষে সিনহার বুকের তাজা রক্ত প্রদীপের অন্ধকার জীবনের সমাপ্তি টেনেছে।
দেশপ্রেম কারও গায়ে লেখা থাকে না। দেশদ্রোহী হয়েও কেউ জন্মগ্রহণ করে না। প্রতিদিন মানুষের দেশপ্রেমের প্রকাশ ঘটে না। জাতির এই সংকটকালে  নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমিক পুলিশ বাহিনীর বড়ই প্রয়োজন। কারণ ক্ষমতার জৌলুস কিংবা যৌবনের শক্তি চিরদিন কাহারও সমান থাকে না।  জোয়ার ভাটার মতো উত্থান-পতন হয়। ভবিষ্যতে যাতে এরকম মৃত্যু আর কোনো নাগরিকের ক্ষেত্রে না ঘটে তা রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করার উপায় হচ্ছে বিচারবহির্ভূত হত্যা,গুম,অপহরণ নিষিদ্ধ করা। আমরা আশা করবো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে। পাশাপাশি ক্রসফায়ার অপসংস্কৃতির সমাপ্তি টানবে, এমনটিই দেশবাসীর প্রত্যাশা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ