মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

প্রসঙ্গ বাংলাদেশ এবং চীন ও ভারতের সম্পর্ক

আশিকুল হামিদ : ঢাকার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে এখনো ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের ‘আকস্মিক সফর’ নামে বর্ণিত দু’দিনের সফরের ফলাফল ও প্রতিক্রিয়া নিয়ে আলোচনার অবসান হয়নি। মিস্টার হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা গত ১৮ ও ১৯ আগস্ট এই সফর করে গেছেন। গণমাধ্যমের খবরে জানানো হয়েছে, মিস্টার শ্রিংলা নাকি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘বিশেষ বার্তা’ নিয়ে এসেছিলেন এবং বার্তাটি তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পৌঁছেও দিয়েছেন। কিন্তু মিস্টার মোদির কথিত বার্তার বিষয়বস্তু সম্পর্কে কোনো পক্ষই মুখ খোলেননি। কূটনৈতিক অঙ্গনের কানাঘুঁষায় বরং জানা গেছে, তেমন কোনো বার্তা ঢাকায় পৌঁছেনি।
মিস্টার শ্রিংলা আসলে নাকি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্কে সৃষ্ট ‘শীতলতা’ কাটিয়ে ওঠার প্রচেষ্টা চালাতে এসেছিলেন। সে উদ্দেশ্য থেকেই মিস্টার শ্রিংলা বলেছেন, দু’দেশের মধ্যে এখন যে কোনো সময়ের তুলনায় ভালো সম্পর্ক রয়েছে। বিষয়টিকে সম্পর্কের ‘সোনালি অধ্যায়’ হিসেবে উল্লেখ করে মিস্টার শ্রিংলা ঘোষণা করেছেন, তারা এই সম্পর্ককে অব্যাহত রাখতে এবং আরো ঘনিষ্ঠ করতে চান।
অন্যদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিবের কণ্ঠে কিন্তু ভিন্ন সুর ও বক্তব্য শোনা গেছে। জনাব মাসুদ বিন মোমেন বলেছেন, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় সীমান্তে হত্যা অনেক বেড়েছে। তিনি আরো জানিয়েছেন, সীমান্তে হত্যাসহ কিছু সমস্যার বিষয়ে মিস্টার শ্রিংলার কাছে আপত্তি তুলে ধরেছেন তারা। তিস্তার পানিবন্টন চুক্তি এবং রোহিঙ্গা প্রশ্নে ভারতের সমর্থন না পাওয়াসহ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যকার আরো কিছু প্রসঙ্গেও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব সাংবাদিকদের অবহিত করেছেন। এসব কারণে মনে করা হচ্ছে, মিস্টার শ্রিংলার সফরে বাংলাদেশ লাভবান হওয়ার সুযোগ পায়নি। অন্য ভারতীয় মন্ত্রী ও সচিবদের মতো মিস্টার শ্রিংলাও শুধু নিতেই এসেছিলেন।
মিস্টার শ্রিংলার সফরকালে বহুদিন পর বাংলাদেশ সরকার অবশ্য কঠোর মনোভাবের প্রকাশ ঘটিয়েছে। প্রাসঙ্গিক একটি তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য হলো, সফরের দ্বিতীয় দিন, ১৯ অগাস্ট মিস্টার শ্রিংলা যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং প্রায় এক ঘণ্টার বৈঠক করেছেন সে বিষয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সরকারিভাবে কিছুই জানানো হয়নি। তারও আগে মিস্টার শ্রিংলাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য বিমান বন্দরে যাননি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্মকর্তা। সাধারণ বিমানের পরিবর্তে মিস্টার শ্রিংলাও এসেছিলেন ইন্ডিয়ান এয়ারফোর্সের বিশেষ বিমানে চড়েÑ যাকে পরোক্ষ হুমকি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তাছাড়া ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের সফরের সময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হঠাৎ সিলেটে চলে যাওয়ার কারণেও ভারতের প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবর্তিত মনোভাব নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে।
কূটনৈতিক অঙ্গনের পর্যালোচনায় বলা হচ্ছে, মিস্টার শ্রিংলা ‘সোনালি অধ্যায়’ হিসেবে চিহ্নিত করলেও ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যকার সম্পর্কে বর্তমানে ‘শীতলতা’ই বিরাজ করছে। তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষর করা থেকে বারবার পিছিয়ে যাওয়া, নদ-নদীর পানিতে ন্যায্য হিস্যা থেকে বাংলাদেশকে বছরের পর বছর ধরে বঞ্চিত রাখা এবং রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশের পক্ষে ভূমিকা পালন না করার মতো অনেক বিষয়েরই উল্লেখ করা হচ্ছে। তাছাড়া গত বছরের অক্টোবরে দিল্লি সফরকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে যথেষ্ট সম্মানজনক আচরণ করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। সেবার বিমানবন্দরে নিজে না গিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদি তার একজন অখ্যাত প্রতিমন্ত্রীকে পাঠানোয় বাংলাদেশের অসম্মানিত প্রধানমন্ত্রী ক্ষুব্ধও হয়েছিলেন বলে খবরে জানা গেছে। সবচেয়ে গুরুত্বের সঙ্গে প্রাধান্যে এসেছে বাংলাদেশের ওপর গণচীনের দ্রুত বেড়ে চলা প্রভাবের বিষয়টি। বলা হচ্ছে, এটাই আসলে সম্পর্কে ‘শীতলতা’র প্রধান কারণ।
এ প্রসঙ্গেই এশিয়ার দুই পরাশক্তি চীন ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে নতুন পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ, শত্রুতাপূর্ণ সম্পর্কের জন্য পরিচিত দেশ দুটির সামনে বাংলাদেশ ছাড়াও নতুন এক প্রতিবন্ধক তৈরি হয়েছে। সে প্রতিবন্ধক এরই মধ্যে প্রাধান্যে এসে গেছে। গণচীন ও ভারতের মধ্যে তিক্ততার নতুন এই প্রতিবন্ধক নিয়ে শান্তিকামী বিশ্বে উদ্বেগও ছড়িয়ে পড়েছে। প্রায় তিনশ’ কোটি জনসংখ্যার কারণে শুধু নয়, উভয় দেশের হাতেই পারমাণবিক সমরাস্ত্র রয়েছে বলেও দেশ দুটির সম্পর্কে অবনতি ঘটলে আশংকার সৃষ্টি হওয়াটাই স্বাভাবিক।
নতুন প্রতিবন্ধক তথা তিক্ততার সর্বশেষ কারণ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে জানানো হয়েছে, চীন বিশাল এক বাঁধ নির্মাণ করে ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ পাল্টে দিয়েছে। চীন সেই সাথে প্রায় এক হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এবং যথেষ্ট প্রশস্ত টানেল বা খালও খনন করে চলেছে। এই টানেলের মধ্য দিয়ে চীন ব্রহ্মপুত্রের পানি নিয়ে যাবে তার জিন জিয়াং প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায়। এর ফলে ব্রহ্মপুত্রের পানি ভারত আর আগের মতো পাবে না। পানির প্রায় সবটুকুই বরং চলে যাবে চীনের বিভিন্ন অঞ্চলে। বাঁধটি সম্পূর্ণরূপে চালু হলে আসামসহ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর কৃষি ও চাষাবাদ ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ, এসব রাজ্য সেচের জন্য প্রধানত ব্রহ্মপুত্রের পানির ওপর নির্ভরশীল।
ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের বিবৃতিতে বলেছে, চীনের তৈরি বাঁধের কারণে বিশেষ করে কৃষিনির্ভর আসাম সর্বনাশের মুখে পড়বে। আসামের পাশাপাশি ভারতের ভবিষ্যৎও অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যাবে বলেও সাবধান করে দিয়েছে দলগুলো। তারা সেই সাথে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে চীনের সঙ্গে দ্রুত বৈঠক করে সমাধান বের করার জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে দাবি জানিয়েছে। এটাই স্বাভাবিক। কেননা, ব্রহ্মপুত্রের উৎস তিব্বতে এবং চীনে এর নাম সাংপো। ভারত রয়েছে চীনের নিচের দিকে, যেমনটি বাংলাদেশের অবস্থান ভারতের ‘ভাটিতে’। প্রকৃতির নিয়মানুযায়ী সাংপো বা ব্রহ্মপুত্রের পানি ভাটির তথা নিচের দিকে প্রবাহিত হয়। এর ফলেই ভারত এতদিন নদটির পানি পেয়ে এসেছে- যেভাবে বাংলাদেশ এক সময় পেতো ভারত থেকে নেমে আসা গঙ্গা এবং অন্য ৫৪টি অভিন্ন নদ-নদীর পানি। সব নদ-নদীর পানিই ভারতের পর বাংলাদেশ হয়ে গিয়ে পড়তো বঙ্গোপসাগরে।
অবস্থায় পরিবর্তন ঘটেছে ফারাক্কা, গজলডোবা ও টিপাইমুখসহ ভারতের নির্মিত অসংখ্য ছোট-বড় বাঁধের কারণে। পানির তীব্র অভাবে ‘নদীমাতৃক’ বাংলাদেশে এখন মরুকরণ প্রক্রিয়া চ’ড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। বাঁধের ভয়ংকর কুফল সম্পর্কে নিজেরা জানেন বলেই চীনের বাঁধ ও এক হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ টানেলের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন ভারতের সকল দলের নেতারা। খবরে জানা গেছে, ‘চীনপন্থি’ হিসেবে পরিচিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি- সিপিআইএমও প্রধানমন্ত্রীর কাছে চীনের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধান করার দাবি জানিয়েছে। এটাই অবশ্য যে কোনো দেশের দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দলের কর্তব্য- যার ব্যতিক্রম শুধু বাংলাদেশে দেখা যায়।
ব্রহ্মপুত্রের পানি নিয়ে চীন ও ভারতের তিক্ততা কোনদিকে কতটা গড়ায় তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হলেও জানিয়ে রাখা দরকার, দেশ দুটির সম্পর্ক কিন্তু ইতিহাসের কোনো পর্যায়েই বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল না। চীন ও ভারত ১৯৬২ সালে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। পরবর্তীকালে কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কৌশল নিয়েও কমিউনিস্ট রাষ্ট্র চীনের সঙ্গে তিক্ততার অবসান ঘটাতে পারেননি। কাশ্মীর প্রশ্নে চীন পাকিস্তানের পক্ষে ভূমিকা পাল করে চলেছে। চীন এখনো ভারতের রাজ্য অরুণাচলকে নিজের ভূখন্ড বলে মনে করে। এর বাইরেও দীর্ঘ সীমান্তের অসংখ্য এলাকায় দেশ দুটির সেনারা মাঝে-মধ্যেই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে। ২০১৮ সালের প্রথম দিকেও ডোকলাম সীমান্তে ছোটখাটো যুদ্ধ করেছে চীন ও ভারত। ওই এলাকায় এখনো পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়নি।
এভাবেই এগিয়ে চলেছে চীন ও ভারতের অবন্ধুসুলভ তথা শত্রুতাপূর্ণ সম্পর্ক। এরই মধ্যে ২০১৭ সালের আগস্টে দু’দেশের বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হয়েছে। এই ‘যুদ্ধ’ ব্যবসা-বাণিজ্যের সীমা ছাড়িয়ে দু’দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপরও অশুভ প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশংকা প্রকাশ করেছেন পর্যবেক্ষকরা। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে জানানো হয়েছে, ভুটান সংলগ্ন ভূখন্ড ডোকলামের মালিকানা নিয়ে তীব্র উত্তেজনাকর ও সংঘাতময় পরিস্থিতির মধ্যে ভারত ওই সময় হঠাৎ ৯৩টি চীনা পণ্যের ওপর শাস্তিমূলক শুল্ক তথা অ্যান্টি ডাম্পিং ডিউটি আরোপ করেছিল। এর ফলে ভারতে চীনের রফতানিই কেবল অনেক কমে যায়নি, বৈদেশিক মুদ্রার আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি চীনের অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশংকা সৃষ্টি হয়েছিল।
নিজেদের সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ভারত সরকার অভিযোগ করেছিল, দেশটির বাজারে বিক্রি বাড়ানোর উদ্দেশ্যে চীন নাকি তার উৎপাদন খরচের চাইতেও কম মূল্যে বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করে। এর ফলে একদিকে ভারতে চীনা পণ্যের বিক্রি বাড়ছে অন্যদিকে ক্রমাগত কমছে ভারতীয় পণ্যের বিক্রি। এভাবে ভারতের দেশীয় পণ্য মার খাচ্ছে এবং ক্ষতি স্বীকার করতে গিয়ে অনেক শিল্প-কারখানা এমনকি বন্ধও হয়ে যাচ্ছে। এসবের মধ্যে মোবাইল ফোনের মতো বেশি প্রচলিত পণ্যের পাশাপাশি ইস্পাতের তৈরি ভারি অনেক পণ্যও রয়েছে। মূলত দেশীয় পণ্যকে নিরাপত্তা দেয়ার অজুহাত দেখিয়ে অতীতেও ভারত চীনা পণ্যের ওপর শাস্তিমূলক অ্যান্টি ডাম্পিং ডিউটি আরোপ করে দেখেছে। কিন্তু পরিস্থিতিতে উন্নতি হয়নি। সে কারণেই ৯৩টি পণ্যের ওপর নতুন করে এই শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ভারত সরকার।
অন্যদিকে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে ভারতকে ‘ভয়াবহ কুফল’ ভোগ করতে হবে বলে সতর্ক করেছিল চীন। দেশটির কমিউনিস্ট সরকারের মুখপাত্র গ্লোবাল টাইমসের রিপোর্টে বলা হয়েছিল, ভারতের এ ধরনের ‘দুর্বল সিদ্ধান্তের জন্য’ চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থ সাময়িকভাবে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে সত্য, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে ভয়াবহ কুফল ভোগ করার জন্য ভারতকেও প্রস্তুত থাকতে হবে। চীনা পণ্যের ব্যাপারে ভারতের নেতিবাচক ও শত্রুতাপূর্ণ সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে দেশটির কমিউনিস্ট সরকার চীনা কোম্পানিগুলোকে ভারতে বিনিয়োগ করার এবং বিনিয়োগ বাড়ানোর আগে ‘দ্বিতীয়বার’ ভেবে দেখার এবং সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করার জন্য প্রস্তুতি নেয়ার আহবান জানিয়েছিল। এর ফলে ধারণা করা হয়েছিল, এককেন্দ্রিক কঠোর কমিউনিস্ট সরকারের অধীনস্ত বলে চীনের কোনো কেম্পানির পক্ষেই সরকারকে পাশ কাটিয়ে ভারতে বিনিয়োগ বাড়ানো কিংবা উৎপাদনসহ ব্যবসা-বাণিজ্য অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে না। তেমন অবস্থায় বন্ধ হয়ে যাবে ভারতে উৎপাদনকাজে নিয়োজিত অসংখ্য চীনা শিল্প-কারখানা এবং চাকরি হারাবে হাজার হাজার ভারতীয় শ্রমিক। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে ভারতের সমাজ ও অর্থনীতির ওপর। শুল্কবিরোধী প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে এ বিষয়টিকেই সামনে নিয়ে এসেছিল চীন।
দেশ দু’টির অর্থনৈতিক সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে তথ্যাভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ডোকলামকেন্দ্রিক সংকটে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ভারত। কারণ, চীনে ভারতের রফতানি কমেছিল ১২ দশমিক তিন শতাংশ তথা এক হাজার ১৭৫ কোটি মার্কিন ডলার। কৌতূহলোদ্দীপক একটি তথ্য হলো, রফতানি কমলেও একই সময়ে চীন থেকে ভারতের আমদানি বেড়েছিল প্রায় দুই শতাংশ- মার্কিন মুদ্রায় যার পরিমাণ পাঁচ হাজার নয়শ’ কোটি ডলার। অর্থাৎ একদিকে ভারতের আয় কমেছে এক হাজার ১৭৫ কোটি মার্কিন ডলার, অন্যদিকে কমার পরিবর্তে উল্টো চীনের আয় বেড়েছে পাঁচ হাজার নয়শ’ কোটি ডলার!
জানা গেছে, এমনিতেই ভারতের তুলনায় চীন চার হাজার সাতশ’ কোটি ডলারের বেশি পণ্য রফতানি করে থাকে। এমন অবস্থায় ভারত শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করলে এবং সিদ্ধান্তটি বজায় রাখলে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে কমিউনিস্ট দেশটিকে। জবাবে পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে চীন যদি ভারতে চীনা কোম্পানিগুলোর শিল্প-কারখানা বন্ধ করে দেয় এবং চীনের শিল্প মালিক ও ব্যবসায়ীরা যদি ভারতে আর বিনিয়োগ না করেন তাহলে ভারতীয় শ্রমিকরা তো চাকরি হারাবেই, অন্য অনেকভাবেও ভারতকে যথেষ্ট পরিমাণে খেসারত দিতে হবে।
এজন্যই ডোকলামের দখল ও মালিকানাকেন্দ্রিক সংকটের ঘটনাপ্রবাহে ভারতের প্রতি সংযম দেখানোর আহবান এসেছিল বিভিন্ন দেশ ও গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে। ভারতে আশ্রিত চীনের ধর্মীয় নেতা দালাইলামা একথা পর্যন্ত বলেছিলেন যে, যুদ্ধ-সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার পরিবর্তে ভারতের উচিত চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা, শান্তি বজায় রাখা এবং বৈদেশিক মুদ্রার আয় বাড়ানো।
বলার অপেক্ষা রাখে না, দুই বিরাট প্রতিবেশি রাষ্ট্র চীন ও ভারতের বাণিজ্য যুদ্ধ এবং ডোকলামের দখল ও মালিকানা নিয়ে সৃষ্ট সংকট সকল বিচারেই অত্যন্ত আশংকাজনক। প্রায় তিনশ’ কোটি জনসংখ্যার কারণে শুধু নয়, উভয় দেশের হাতেই পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে বলেও বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ দেশ দুটির মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক কামনা করে। প্রতিবেশি রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশও চায় চীন ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক যাতে সংঘাতমুখী না হয়। এশিয়ার এ অঞ্চলের জন্য তো বটেই, বিশ্বশান্তির জন্যও চীন ও ভারতের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়া ও বন্ধুত্বপূর্ণ থাকা দরকার।
এ প্রসঙ্গেই ব্রহ্মপুত্রের ওপর চীনের নির্মিত বিশাল বাঁধ এবং জিন জিয়াং প্রদেশ পর্যন্ত প্রায় এক হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ টানেলকেন্দ্রিক সমস্যাকে সামনে আনা দরকার। বিষয়টি নিয়ে চীনের সঙ্গে বৈঠকে বসারও আগে ভারতের উচিত বাংলাদেশকে গঙ্গা ও তিস্তাসহ অভিন্ন ৫৪টি নদ-নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা দেয়া। তেমন অবস্থায়ই ভারত চীনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমর্থন পাওয়ার আশা করতে পারে। ভারত যদি বাংলাদেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করার নীতি-সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমে পরিবর্তন না করে তাহলে চীন এমনকি এ বিষয়টিকেই ব্রহ্মপুত্রে বাঁধ নির্মাণের ব্যাপারে আত্মপক্ষ সমর্থনের যুক্তি হিসেবে হাজির করার সুযোগ নিতে পারে। এখন দেখা দরকার, ভারত ঠিক কোন পথে পা বাড়ায় এবং চীন ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্কে ব্রহ্মপুত্রের বাঁধ সত্যিই স্থায়ী প্রতিবন্ধক হয়ে ওঠে কি না! বলা দরকার, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান চীন ও ভারতের মধ্যে মধ্যস্থতা করতে পারতেন। তেমন সদিচ্ছার প্রকাশও তিনি বিভিন্ন উপলক্ষে ঘটিয়েছেন। কিন্তু ভারতের বিজেপি সরকার প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে অসম্মানিত করেছে। একই কারণে চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য বিরোধ ও সংঘাতে ভারত অন্তত পাকিস্তানের সহযোগিতা পাবে না বলেই মনে করেন আন্তর্জাতিক রাজনীতির পর্যবেক্ষকরা।
বলা দরকার, ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ বাংলাদেশের সঙ্গেও ভারত সুসম্পর্ক বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছেÑ যার প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে দেশটির পররাষ্ট্র সচিবের সাম্প্রতিক সফরকালে। সমগ্র এ প্রেক্ষাপটেই বলা হচ্ছে, ভারতের উচিত সতর্ক হওয়া। কারণ, শ্রীলংকা এবং নেপাল এরই মধ্যে চীনের পক্ষে চলে গেছে। এমন অবস্থায় বাংলাদেশও ‘হাতছাড়া’ হয়ে গেলে ভারতকে সুদূরপ্রসারী কুফলের শিকার হতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ