শুক্রবার ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

জোড়াতালির দেয়ার নামে কোটি কোটি টাকা লুটপাট

নুরুল আমিন মিন্টু, চট্টগ্রাম ব্যুরো : বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ১৪৪টি লোকোমেটিভ-ইঞ্জিন রয়েছে। এর মধ্যে ১১৪টি মেয়াদোত্তীর্ণ। বাকি ৩০টির মেয়াদ যায় যায়। জোড়াতালি দিয়ে ১৪৪টি ইঞ্জিন চলছে যুগের পর যুগ। কেন এত ইঞ্জিন মেয়াদোত্তীর্ণ? এতে লাভ কার? অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ইঞ্জিনে জোড়াতালি দেয়ার নামে কোটি কোটি টাকার লুটের তথ্য।
অনুসন্ধানে জানা যায়, যাত্রীবাহি ৭২টি, মালবাহি ১৩টি, সান্টিংয়ে ১৬টি, শাটল ৪টি, বিটি/প্রকল্পে ২টি ও রিলিফ ও অন্যান্য মিলে ১১২টি ট্রেন রয়েছে। ১১২টি ট্রেনের বিপরিতে ইঞ্জিন আছে ১৪৪টি। যার মধ্যে ১১৪টি মেয়াদোত্তীর্ণ। বাকি রয়েছে ৩০টির মেয়াদ। যার ফলে ট্রেন পথিমধ্যে বিকল হয়ে যায়। দুর্ঘটনায় পতিত হয়। যাত্রীরা নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পোঁছাতে বেগ পেতে হয়।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা এসব ইঞ্জিনে জোড়াতালি দেয়ার নামে কোটি কোটি টাকা লুটপাট করছেন। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের যোগসাজসে মালামাল সরবরাহ না করে কোটি কোটি টাকার বিল উত্তোলন করছে তারা।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল সূত্রে জানা যায়, এখানে যাত্রীবাহী ৭২টি, মালবাহী ১৩টি, সান্টিংয়ে ১৬টি, শাটল ৪টি, বিটি/প্রকল্পে ২টি ও রিলিফ ও অন্যান্য মিলে ১১২টি ট্রেন রয়েছে। ১১২টি ট্রেনের বিপরিতে ইঞ্জিন আছে ১৪৪টি। যার মধ্যে ১১৪টি মেয়াদোত্তীর্ণ। বাকি রয়েছে ৩০টির মেয়াদ। এসব ইঞ্জিনের ওপর নির্ভরশীল রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ১১২টি ট্রেন। মেয়াদোত্তীর্ণ ১১৪টি লোকোমেটিভ-ইঞ্জিনের মধ্যে ১৯৫৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের থেকে ২০০০ সিরিজ এমইজি-১১ মডেলের ৯টি লোকোমেটিভ-ইঞ্জিন আনা হয়। সেখান থেকে আনা হয় ১৯৬১ সালে এমইজি-৯ মডেলের ২২০০ লোকে সিরিজের আরও ২৫টি লোকোমেটিভ-ইঞ্জিন। ১৯৬৯ সালে ২৩০০ সিরিজের এমইএম-১৪ মডেলের ১২টি লোকোমেটিভ-ইঞ্জিন আনা হয় কানাডা থেকে। সেখান থেকে ১৯৭০ সালে ২৪০০ সিরিজের একই মডেলের আরও ৪টি লোকোমেটিভ-ইঞ্জিন আনা হয়। ১৯৮০ সালে হাঙ্গেরি থেকে এমএইচজেড-৫ মডেলের ৩২০০ সিরিজের ২টি লোকোমেটিভ-ইঞ্জিন আনা হয়। ১৯৮১ সালে জাপান থেকে আনা হয় এমইএইচ-১৪ মডেলের ২৫০০ সিরিজের ১৫টি লোকোমেটিভ-ইঞ্জিন। ১৯৮৮ সালে কানাডা এমইজি-১৫ মডেলের ২৬০০ সিরিজের ১৫টি লোকোমেটিভ-ইঞ্জিন আনা হয়।১৯৯৫ সালে জার্মানি থেকে আনা হয় এমইএল-১৫ মডেলের ২৭০০ সিরিজের ৯টি লোকোমেটিভ-ইঞ্জিন। ১৯৯৬ সালে একই মডেলের আরও ১২টি লোকোমেটিভ-ইঞ্জিন আনা হয় ওই দেশ থেকে।একই বছর ভারত থেকে আনা হয় এমইডি-১৪ মডেলের ২৮০০ সিরিজের ৫টি লোকোমেটিভ-ইঞ্জিন। ১৯৯৯ সালে কোরিয়া থেকে আনা হয় এমইএল-১৫ মডেলের ২৯০০ সিরিজের ৬টি লোকোমেটিভ-ইঞ্জিন। কোরিয়া থেকে আনা ৩০টি লোকোমেটিভ-ইঞ্জিনের মেয়াদ রয়েছে। এর মধ্যে আছে, ২০০৫ সালে কোরিয়া থেকে আনা এমইএল-১৫ মডেলের ২৯০০ সিরিজের ১১টি লোকোমেটিভ-ইঞ্জিন। ওই দেশ থেকে একই মডেলের ২০১২ সালে ৯টি ও ২০১৩ সালে ১০টি লোকোমেটিভ-ইঞ্জিন আনা হয়।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের জেনারেল মোটরসের তৈরি ২০০০ লোকো সিরিজ এমইজি-১১ মডেলের ৯টি লোকোমেটিভ-ইঞ্জিন চলছে ৬৭ বছর ধরে। রেল কর্তৃপক্ষের মতে, একটি ইঞ্জিনের ইকোনমিক লাইফ বা কার্যক্ষমতা থাকে ২০ বছর। ১৯৭৩ সালে কার্যক্ষমতা চলে গেলেও ৪৭ বছর ধরে চলছে এসব ইঞ্জিন।
জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের জেনারেল মোটরসের তৈরি এ ধরনের ইঞ্জিন বিশ্বের বহু দেশে  জাদুঘরে চলে গেছে অনেক আগে। কিন্তু এখানে এ ইঞ্জিন মালামাল ও যাত্রী পরিবহনে ব্যবহার করা হচ্ছে। পুরোনো হওয়ায় এগুলো প্রায়ই বিকল হয়ে যায়। দুর্ঘটনা শিকার হয়। সহজে পাওয়া যায় না এসব ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশও। যন্ত্রাংশ সংকটের সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিজেদের পকেট ভারি করেন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা। একেকটি ইঞ্জিন মেরামতের নামে রেলের দুর্নীতিবাজ কর্তারা কোটি টাকা আত্মসাৎ করছেন। একেকটি ইঞ্জিনের পেছনে যে টাকা খরচ করা হয়েছে, সেই টাকা টকা দিয়ে কয়েকটি নতুন ইঞ্জিন পাওয়া যেত।
রেলের নিয়ম অনুযায়ী ইঞ্জিনগুলো প্রতি দেড় বছর অন্তর ২২ দিন ভারী শিডিউল (মেরামত কাজ) করার কথা। এ ছাড়া প্রতি সপ্তাহে অন্তত একটি ইঞ্জিন দুই দিন এবং আট ঘণ্টা মেরামত করার কথা। কিন্তু সংকটের কারণে বর্তমানে সচল সব ইঞ্জিন এসব নিয়মে মেরামত করা হচ্ছে না।  বিকল ইঞ্জিনগুলো জোড়াতালি দিয়ে সচল করার পর ফের অচল হওয়ার ঘটনা ঘটছে। ফলে হাজার হাজার যাত্রী দুর্ভোগে পড়ছে। অপচয় হচ্ছে শ্রম ঘন্টা।
জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলী-সিএমই এফ এম মহিউদ্দিন বলেন, ১০টি নতুন লোকোমেটিভ-ইঞ্জিন এসেছে। এ বছরে আরও আনার প্রক্রিয়া চলছে। আসলে প্রক্রিয়াটি একটু লম্বা। টেন্ডার করতে হয়। ফান্ডিং করতে হয়।  এই প্রক্রিয়াগুলো নিতে একটু সময় লাগে। তার পরে আবার বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর সিদ্ধান্তগুলো তরান্বিত হচ্ছে, আগে হয় নাই। যার ফলে প্রক্রিয়াগত কারণে অনেক ক্ষেত্রে বিলম্ব হয়। এখন প্রগ্রেসে আছে, অনেক লোকোমেটিভ-ইঞ্জিন আসছে, আসবে।
 রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক-জিএম সরদার সাহাদাত আলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) বলেন, এ বিষয়ে আমি জানি না। এসব আমি দেখিনা । আমাদের একজন চিফ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার আছেন, তিনি রেলের ইঞ্জিন-কোচ এগুলো দেখাশুনা করেন। রেল মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত ডিজির সরাসরি তত্ত্বাবধানে ওয়ার্কশপে ইঞ্জিন মেরামতের কার্যক্রম চলে। জেডিজি মেকানিক্যাল এটার একটি অংশ দেখেন। আমি আউটপুটের পারফর্মসের বিষয়ে কাজ করি। আউটপুট করতে গেলে ইঞ্জিন মেরামত করা, ইঞ্জিনের জন্য জিনিস কেনা বা ইঞ্জিনের জন্য যে জিনিস লাগবে সেটা না কিনে অন্য জিনিস কেনা, বা টাকা বাড়ানো, এসব বিষয়ে ফাইল অনুমোদন আমি করি না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ