রবিবার ০৯ আগস্ট ২০২০
Online Edition

চামড়া শিল্পনগরীর সিইটিপি নির্মাণে ১৪ বার সময় নিয়েও কাজ শেষ হয়নি

স্টাফ রিপোর্টার: ২০১৭ সালে হাজারীরাগ এলাকা থেকে ট্যানারি শিল্প স্থানান্তর করে সাভারের হেমায়েতপুরের হরিণধরায় ধলেশ্বরী নদীর তীরে নেওয়া হয়। বুড়িগঙ্গা ও আশেপাশের এলাকার পরিবেশ দূষণ রোধে পরিবেশবান্ধব চামড়াশিল্প নগরী গড়ে তুলতে ২০১৪ সালের শুরুতে চামড়া শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। দেড় বছরের মধ্যে সিইপিটি নির্মাণের জন্য লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও গত সাত বছরেও নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি। প্রকল্পটি শেষ করতে ইতোমধ্যে ১৪ বার সময় নেওয়া হয়েছে। সবশেষ সময় পার হয়েছে গত জুন মাসে। তারপরেও বহুল প্রত্যাশিত এই সিইপিটির কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। কবে শেষ হবে তা কেউই বলতে পারছেনা। 

তবে সিইপিটির প্রধান প্রকৌশলী বলছেন, ‘করোনার কারণে গত জানুয়ারি থেকে কাজ বন্ধ রয়েছে। প্রথমে চীনা প্রকৌশলীরা দেশে গিয়ে আটকে পড়ে, গত মার্চ থেকে বাংলাদেশেও করোনা দেখা দিলে কাজ বন্ধ হয়ে যায। আগামী সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবরের মধ্যে প্রকল্পটির শতভাগ কাজ শেষ হয়ে যাবে।

তবে ট্যানারি মালিকরা এখন আর সরকারের কথায় আস্থা রাখতে পারছেন না। তাদের অভিযোগ দেড় বছরের প্রকল্প রহস্যজনকভাবে সাত বছরেও শেষ করা সম্ভব হয়নি।

সূত্র জানায়, চামড়া শিল্পনগরীতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইপিটি) না থাকায় চামড়াশিল্পে বৈশ্বিক সংস্থার মানসনদ অর্জন করতে সক্ষম হয়নি। ফলে বাংলাদেশ এখনো লেদার ওয়ার্কিং গ্রæপ (এলডাব্লিউজি) এবং আন্তর্জাতিক মান সংস্থা (আইএসও) থেকে কোনো সনদ পায়নি। কোনো দেশের এই সনদ না থাকলে সে দেশের চামড়াজাত পণ্যের আন্তর্জাতিক ক্রেতারা আমদানি করতে উৎসাহ দেখায় না। ফলে বিশ্ববাজারে আমাদের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এতে করে চামড়া শিল্পের আধুনিকীকরণ ও রফতানি বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধক হলো চামড়াশিল্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বড় ধরনের ঘাটতি। দেশে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় বিশ্ববাজারে আমাদের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।

এদিকে আন্তর্জাতিক বায়ার ও ব্র্যান্ড মালিকরা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় বিসিক ও ট্যানারি মালিকরা একে অপরকে দায়ী করছেন। ট্যানারি মালিকদের অভিযোগ, সাভারে চামড়া শিল্পনগরীতে সরকার ডাম্পিং ইয়ার্ড, সিইপিটি এবং রাস্তাঘাট ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা অধুনিকায়ন না করায় আন্তর্জাতিক বায়াররা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।

অন্যদিকে বিসিকের অভিযোগ এর জন্য দায়ী ট্যানারি মালিকরা। ট্যানারিগুলো তাদের কারখানার পরিবেশ অধুনিকায়ন করছে না। কারখানার বর্জ্য পরিশোধনের জন্য একাধিক প্যানেল রাখার কথা থাকলেও কারখানাগুলো তা করছে না। তারা বর্জ্যগুলো পরিশোধিত ক্রোমিয়াম আলাদা না করেই পাইপ দিয়ে ছেড়ে দিচ্ছে। ফলে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে।

বাংলাদেশ ট্যানারি অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, ‘পরিবেশ দূষণ থেকে রক্ষা পেতে আমরা হাজারিবাগ থেকে সাভারে গিয়েছিলাম। কিন্তু সিইপিটিসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ শেষ না হওয়ায় একই দূষণ সাভারেও হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘সিইটিপির নির্মাণ কাজ শেষ না হওয়ায় আমরা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড সংক্রান্ত দুটি সার্টিফিকেট নিতে পারছি না। এতে করে ব্যান্ড বায়াররা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।’ তিনি বলেন, ‘সিইটিপি কাজটি দ্রুত সম্পৃন্ন করার জন্য প্রয়োজনে চীনা প্রকৌশলীদের পরিবর্তে সরকার নিজেই কাজটি করতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘ট্যানারি মালিকরা নিজেরা ইপিটি নির্মাণ করা সম্ভব না। কারণ এগুলোর সঙ্গে সিইপিটির সঙ্গে সংযোগ থাকতে হবে। আবার ছোট ছোট ট্যানারি মালিকদের পক্ষে এই ধরনের ব্যয় বহন করাও সম্ভব হবে না।’

সমতা লেদারের মালিক ও বাংলাদেশ ট্যানারি অ্যাসোসিয়েশনের কোষাধ্যক্ষ মিজানুর রহমান বলেন, ‘কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি)‘র অনেকগুলো কম্পোনেন্ট রয়েছে। এর মধ্যে সিপিআরইউ এবং ডাম্পিং ইয়ার্ড এই দুটির কাজ কিছুই হয়নি। ডাম্পিং ইয়ার্ড ও সিপিআরইউ না থাকায় চামড়াশিল্প আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অর্জন করতে পারছে না। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অর্জন করতে এলডাব্লিউজি এবং আইএসও এই দুইটা সনদ বাধ্যতামূলক। বিশেষ করে লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডাব্লিউজি) এবং সিইপিটি তৈরি কাজ শেষ না হওয়ায় এই দুটি সনদের জন্য আমরা আবেদনই করতে পারছি না।’

মিজানুর রহমান বলেন, ‘চলতি বছরের জুনের মধ্যে সিইপিটি নির্মাণের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা হয়নি, কবে হবে তা আমরা নিশ্চিত নয়। এই পর্যন্ত সরকার সিইপিটি নির্মাণ করতে ১৪ বার সময় নিয়েছে।’

সাভার চামড়া শিল্পনগরীর প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী জিতেন্দ্র নাথ পাল বলেন, ‘চলতি বছরের জুন মাসে সিইপিটির কাজ শতভাগ সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও গত করোনাভাইরাসের কারণে কাজটি সময়মতো করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে সিইপিটির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে এবং ডাম্পিং ইয়ার্ডের কাজও আগামী আগস্ট-সেপ্টেম্বরের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। এই দুটি কাজ হলো বিসিকের কাজ শেষ।’

তিনি বলেন, ‘চামড়া শিল্প নগরীর আন্তর্জাতিক মান অর্জন করতে হলে মোট ১৩৫৫ নম্বরের ৫৫ শতাংশ নম্বর পেতে হবে। এই ১৩৫৫ নম্বরের মধ্যে সিইপিটি ও ডাম্পিং ইয়ার্ড এই দুইটি কাজের জন্য ২০০ নম্বর অবশিষ্ট ১১৫৫ নম্বর ট্যানারি মালিককদের কারখানার পরিবেশসহ বিভিন্ন কাজের ওপর পাওয়া যাবে।’

তিনি বলেন, ‘সিইটিপি ফাংশন করছে না মূলত ট্যানারি মালিকদের কারনে, আমাদের সব যন্ত্রপাতি বসানো হয়েছে। কিন্তু ট্যানারি থেকে বর্জ্যগুলো দুইটা প্যানেলে ছাড়তে হবে। একটি প্যানেলে ক্রোমিয়াম রিকভারি ইউনিটে যাবে। সেখান থেকে একটি প্যানেল থেকে ক্রোমিয়াম বর্জ্য এবং অন্য প্যানেল থেকে ক্রোমিয়ামবিহীন বর্জ্য ছাড়া হবে। কিন্তু ট্যানারি মালিকরা ক্রোমিয়ামটা আলাদা না করে সবগুলো বর্জ্য একই প্যানেল থেকে ছাড়ছে। ক্রোমিয়াম আলাদা করতে না পারলে সিইটিপি কোনো কাজে আসবে না।’

উল্লেখ্য, ট্যানারির বর্জ্যে বুড়িগঙ্গা ও হাজারীবাগ দূষণ রোধে ১৯৮৬ সালে প্রথম ট্যানারি স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০০৩ সালে ট্যানারি স্থানান্তরের জন্য সাভারে চামড়া শিল্পনগরী প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এরপর ২০১৭ সালের এপ্রিলে হাজারীবাগের ট্যানারি শিল্প সাভারের হেমায়েতপুরের হরিণধরায় ধলেশ্বরী নদীর তীরে ২০০ একর জমিতে স্থানান্তরিত হয়। ইতোমধ্যে সেখানে ১৫৫টি ট্যানারির মধ্যে ১৩৩টি প্রতিষ্ঠান বিক্রয় ও ব্যবহারযোগ্য চামড়া উৎপাদন শুরু করেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ