রবিবার ০৯ আগস্ট ২০২০
Online Edition

ঈদযাত্রায়ও সড়কপথে ঘরমুখী মানুষের দুর্ভোগ

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান: মহামারী করোনাভাইরাস ও দেশব্যাপী বন্যার কারণে এবার পবিত্র ঈদুল আজহাও অনেকটাই উৎসবের আমেজহীন। তবুও নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা। এই পরিস্থিতির মধ্যেও যারা পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে রাজধানী ছাড়ছেন তাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। গাবতলী, আব্দুল্লাহপুর ও আশুলিয়াসহ প্রতিটি পয়েন্ট দিয়ে একযোগে চাকরিজীবী ও সাধারণ মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়েছে। সড়কে পর্যাপ্ত গাড়ি না থাকায় অনেকেই ট্রাক, পিকআপ, লেগুনা ও মোটরসাইকেলে গন্তব্যে পৌঁছাতে চেষ্টা করছেন। এছাড়া যানজটের কারণে নির্ধারিত সময়ে কাঙ্খিত পরিবহন না আসায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা যাত্রীদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

ঈদ মানে টার্মিনালে ঘরমুখো মানুষের ঢল, ঠাসা মানুষে কাউন্টারগুলো থাকে ভরপুর, সড়কে থাকে যানজট। বৈশ্বিক মহামারি করোনার কারণে এবার ভিন্ন এক ঈদযাত্রা দেখছে যাত্রী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। অন্যান্যবারের মতো এ বছর উপচে পড়া ভিড় নেই ঈদযাত্রায়। যানবাহন চলাচলে বিধিনিষেধ তুলে দেওয়ার পর সড়ক পরিস্থিতি মোটামুটি স্বাভাবিক হলেও মানুষের বাড়ি ফেরার আগ্রহ খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। অনেকেই গত ঈদে বাড়িতে ছিলেন বলে এবার যাচ্ছেন না। তবে বাসে অর্ধেক যাত্রী তোলায় দেখা দিয়েছে টিকিট সংকট। বাস মালিকরা বলছেন, ২৯ এবং ৩০ জুলাইয়ের টিকিট আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে রাতের যাত্রার টিকিট নিতে চান অনেকেই। সেই টিকিটগুলো সবার আগে শেষ হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিভিন্ন টার্মিনাল ঘুরে ও সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। 

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, দূরপাল্লার বাস ছাড়াও লোকাল বাস, ট্রাক, মিনি ট্রাক, পিকআপ, লেগুনা ও মোটরসাইকেলে রাজধানী ঢাকা ছাড়ছে ঘরমুখো মানুষ। একযোগে সবাই বাড়ির দিকে রওনা দেয়ায় রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা বেড়েছে। এতে গাড়ির গতি কমে গেছে। বিভিন্ন স্থানে যাত্রী ওঠানামা করাসহ ক্রসিংগুলোতে ভিড় বাড়ায় দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অনেকটাই হিমশিম খেতে হচ্ছে সড়কে নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের। অন্যদিকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে ঘরমুখো যাত্রীদের সামাজিক দূরত্ব মানতে দেখা যায়নি। কিছু কিছু যাত্রী মাস্ক ব্যবহার করলেও অধিকাংশেরই মুখে মাস্ক ছিল না।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জানান, পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে আজ (বৃহস্পতিবার) একযোগে কর্মজীবী ও সাধারণ মানুষ রাজধানী ঢাকা ছাড়ছে। এতে সড়ক-মহাসড়কগুলোতে গাড়ির চাপ বেড়েছে। শিল্পাঞ্চলের সব কারখানা শুক্রবার থেকে ঈদের ছুটি ঘোষণা করে বৃহস্পতিবার শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ করেছে। ফলে দুপুরের পর থেকে শ্রমিকরা গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ায় গাড়ির কিছুটা সঙ্কটও তৈরি হয়েছে। সময় মতো গাড়ি না পাওয়ায় অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে রাস্তায় অপেক্ষা করছে।

সড়কে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক পুলিশের ইন্সপেক্টর মোশারফ হোসেন খান জানান, শিল্পাঞ্চলের সব কারখানা একযোগে ছুটি ঘোষণা করায় দুপুরের পর থেকেই গ্রামের বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশ্যে রাস্তায় বের হয়ে পড়েছে শ্রমিকরা। যে কারণে সড়কে গাড়ির চাপ বেড়েছে। আবার বিভিন্ন স্থানে গাড়ি পার্কিং করে যাত্রী ওঠানামা করায় এবং কাঙিক্ষত গাড়ি সময়মতো না পৌঁছানোয় অনেকেই সড়কে অবস্থান করছে। কেউ কেউ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গরুর ট্রাকসহ পণ্যবাহী গাড়িতে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। আমরা বিষয়গুলো নজরদারির পাশাপাশি সড়কে যানজট নিরসনে কাজ করে যাচ্ছি।

পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানান, অন্যান্য বার যাত্রাপথে দীর্ঘ যানজটের কারণে বাসের শিডিউল লন্ডভন্ড হয়ে যেত। কিন্তু এবার প্রত্যেক পরিবহনের শিডিউল বাস ছেড়ে যাচ্ছে নির্ধারিত সময়ে। কল্যাণপুর বাস টার্মিনালের আহাদ পরিবহনের সুপারভাইজার চাঁদ আলী বলেন, পরিবহন শ্রমিকদের হাসি-কান্না যাত্রীদের নিয়েই। যাত্রী বেশি তো শ্রমিকদের আয়-রোজগার বেশি। কিন্তু করোনায় বাসের যাত্রী অনেক কমে গেছে। ঈদ মানে পরিবহন শ্রমিকদের বাড়তি চাপ, বাড়তি আয়ও। কিন্তু এমন ঈদ কখনো দেখিনি আগে।

গাবতলী ঈগল পরিবহনের কাউন্টার স্টাফ আলী মোহাম্মদ বলেন, যাত্রী না থাকায় অধিকাংশ দূরপাল্লার পরিবহনের ট্রিপ কমে গেছে। যাত্রী হলেই যাচ্ছে বাস।

গাবতলী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালে সরেজমিনে দেখা যায়, রাস্তায় সারি সারি সাজানো দূরপাল্লার বাস। ব্যাগসহ যাত্রী আসতেই পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে শুরু হয় হাঁকডাক, প্রতিযোগিতা, টানাটানি। বরিশাল রুটের হানিফ পরিবহনের কাউন্টার স্টাফ আনোয়ার হোসেন বলেন, এবার কপালই খারাপ, একে তো করোনা আতঙ্ক, তার মধ্যে বর্ষার প্রকোপ, কোথাও বন্যা। যে কারণে যাত্রী কম এবার। এস আর পরিবহনের বগুড়ার যাত্রী সেলিম রেজা বলেন, ঈদুল ফিতরে তো যেতে পারিনি করোনার কারণে। কিন্তু ঈদুল আজহায় নাড়ির টানে যেতে হচ্ছে বাড়ি। শ্যামলী পরিবহনের যাত্রী মেরাজুল ইসলাম বলেন, বাড়ি যাচ্ছি এটা ভেবে যেমন ভালো লাগছে তেমনি করোনা নিয়ে শঙ্কাও জাগছে। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বাড়ি যাচ্ছি। পথেঘাটে করোনার ভয়ের সঙ্গে বাড়তি ভাড়াও গুনতে হচ্ছে। 

গ্রীনলাইন পরিবহন কর্তৃপক্ষ জানায়, তাদের টিকিট অনেকেই অনলাইনে কিনেছে এবার। দূরপাল্লার রুটে শীতাতপ বাস বহর তাদের। তাদের কাউন্টারে খুলনাগামী একজন যাত্রী জানান, ৩০ জুলাই রাতে যাত্রা করতে চান কিন্তু রাতের সব টিকিট আগেই বিক্রি হয়ে গেছে। এমন অবস্থায় কাউন্টার থেকে ফিরে যাচ্ছেন তিনি। শ্যামলী এনআর ট্রাভেলস-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর রাকেশ ঘোষ জানান, বাসে যাত্রী তুলতে হচ্ছে অর্ধেক। যে কারণে টিকিট কিন্তু এখন অর্ধেক বিক্রি করতে হয়। সেটা আগেভাগেই শেষ হয়েছে। ২৯ এবং ৩০ এই দুদিন এবার ঢাকা ছাড়বে সবচেয়ে বেশি মানুষ। তবে সেটা অন্যবারের সঙ্গে তুলনা করলে প্রায় অর্ধেক।

এদিকে ট্রেনেও একই অবস্থা। টিকিক অগ্রিম বিক্রি হয়েছে। প্রতিবারের মতো অতিরিক্ত কোচ ও ট্রেন যোগ হয়েনি ঈদযাত্রায়। ঈদের শতভাগ টিকিট অনলাইনে বিক্রির রেকর্ডে গড়েছে রেলওয়ে। এমনকি মিনিট পাঁচেকের মধ্যে শেষ হয়েছে পুরো ট্রেনের টিকিট। কমলাপুর রেলস্টেশন ম্যানেজার আমিনুল হক জানান, স্টেশনে ঈদের কোনো আমেজ নেই। মানুষ অনলাইনে নিজের মতো করে টিকিট কেটে নিয়েছেন। ট্রেনের ক্ষেত্রে অর্ধেক সিট বিক্রি করতে হয় বলে অনলাইনে সীমিত টিকিটে ব্যাপক চাপ দেখা গেছে। 

আগামী শনিবার কোরবানির ঈদ উদযাপিত হবে বাংলাদেশে। শুক্রবার থেকে শুরু হচ্ছে ঈদের ছুটি, এবার ঈদ ও সাপ্তাহিক ছুটি একাকার হয়ে গেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ