রবিবার ২৯ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

জলাবদ্ধতার ভোগান্তি আর কতকাল?

মো. তোফাজ্জল বিন আমীন: মানুষের মুখ দেখে যেমন তার রাগ, ক্ষোভ, দুঃখ আনন্দ-বেদনা বোঝা যায় তেমনি একটি দেশের রাজধানীর চেহারা দেখেও দৃশ্যমান উন্নয়নের একটা ধারণা পাওয়া যায়। রাজধানী ঢাকার অলি গলিতে উন্নয়নের স্লোগানে মুখরিত ফেস্টুন ব্যানার প্রায়ই দেখা যায়। এসব ফেস্টুন ব্যানারের শব্দগুলো দেখলে মনে হবে সত্যিই আমরা উন্নয়নের মহাসড়কে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলছি। অথচ এখন উন্নয়নের ব্যানার কিংবা ফেস্টুনের নিচে কোথাও কোমর কোথাও হাঁটু পানি প্রবাহিত হচ্ছে। আমাদের প্রাণের এই শহর বায়ুদূষণের রেকর্ড ভাঙছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে রাজধানী ঢাকা বায়ুদূষণের দিক থেকে বিশ্বের মধ্যে দ্বিতীয়। বায়ুদূষণের সাথে পাল্লা দিয়ে জলাবদ্ধতা বাড়ছে। এখন আর পয়সা খরচ করে সমুদ্রের ঢেউ দেখার জন্য কক্সবাজার কিংবা টাঙ্গুয়ার হাওরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। মাত্র ৬৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হলেই রাজধানী ঢাকাতে সাগরের ঢেউ দেখা যায়। এবারই প্রথম জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে তা কিন্তু নয়! প্রতি বছরই বৃষ্টির মৌসুমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। শত শত কোটি টাকা ব্যয়ের পরও কেন রাজধানীর জলাবদ্ধতা দূর করা সম্ভব হচ্ছে না, তার সুস্পষ্ট ব্যাখা জাতির সামনে উন্মোচন করা প্রয়োজন। সামান্য বৃষ্টি হলেই অধিকাংশ রাস্তাসহ অলিগলি ডুবে একাকার হয়ে যাচ্ছে। এতে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে নগরবাসী।

এই সরকার তিন টাম ধরে ক্ষমতায়। অথচ তারা জলবদ্ধতা নিরসন করতে পারেনি। একটু বৃষ্টি হলেই নগরবাসীকে জলবদ্ধতার কবলে পড়তে হচ্ছে। তলিয়ে যাচ্ছে রাস্তা, মার্কেট, অলিগলি। রিকশা, সিএনজি, প্রাইভেটকার পুরো ডুবে যাওয়ার অবস্থা। যানবাহনের ইঞ্জিনে পানি ঢুকে আটকে গেলে মনে হয় সড়ক যেন নরকের চেয়েও খারাপ। এর মধ্যে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি তো আছেই। তাদের মুখে উন্নয়নের  স্লোগান যেভাবে মুখরিত হয় সেভাবে যদি জলবদ্ধতা নিরসনের জন্য উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতো তাহলে জলবদ্ধতার দুঃসহ যন্ত্রণা থেকে নগরবাসী রক্ষা পেত। এই সরকারের আমলে উন্নয়ন হয়নি এটা আমরা বলছি না। কিন্তু উন্নয়ন যা হয়েছে তার সিংহভাগ লুটপাট হয়েছে। ঢাকার দুই নগরপিতাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় উন্নয়ন কতটুকু হয়েছে! তারা নিশ্চয়ই নানারকম উদ্যোগের কথা বলবেন। কিন্তু নাগরিকদের যদি এই ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হয়, তারা এক বাক্যে বলবে জলবদ্ধতা আগে যেমন ছিল, এখনো তেমনই আছে। শুধু ব্যবধান এতটুকু হয়েছে অতীতে হাঁটু পানি জমতো আর এখন কোমর পানি জমে। 

ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ একটি শহর। প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৪৪ হাজারের বেশি লোকের বসবাস। ঢাকামুখী প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। পাল্লা দিয়ে নতুন নতুন বিল্ডিং তৈরি হচ্ছে। একটি রাজধানী শহরের যতটুকু ফাকা জায়গা থাকা প্রয়োজন তাও ঢাকার আছে বলে মনে হয় না। বি আইপির একটি গবেষণায় দেখা গেছে ১৯৯৯ সালে মূল ঢাকা শহরের মোট ভূমির প্রায় ১৪ শতাংশ জলাভূমি ছিল। ওই সময় কংক্রিটে আচ্ছাদিত এলাকা ছিল প্রায় ৬৫ শতাংশ। আর ২০১৯ সালে জলাভূমি কমে হয়েছে ৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ। আর কংক্রিট আচ্ছাদিত এলাকা বেড়ে হয়েছে ৮১ দশমিক ৮২ শতাংশ। বর্তমানে ঢাকার অন্যতম প্রধান সমস্যা হচ্ছে যানজট ও জলাবদ্ধতা। এ সমস্যা চট্রগ্রামে ও রয়েছে। চট্টগ্রামের জলবদ্ধতা তো বর্ষার মৌসুমে ভয়াবহ আকার ধারণ করে। সামান্য বৃষ্টি হলেই জলবদ্ধতার শিকার হন নগরবাসী। রাস্তাঘাট বৃষ্টির পানিতে যতটা না ডুবে তারচেয়ে অনেক বেশি উন্নয়নের খানাখন্দে জলবদ্ধতা আরো বিগড়ে যায়। দুই নগরপিতা হয়ত বলবেন ঢাকাকে বাসযোগ্য, গ্রিন ঢাকা, তিলোত্তমা করতে আরো সময় লাগবে। ধর্য্য ধরেন, হাতির ঝিল হয়েছে। সামনে আরো হবে। ভালো কথা। কিন্তু জলবদ্ধতার কি অবসান হবে?

জলবদ্ধতার অন্যতম কারণ হচ্ছে রাজধানীর খালগুলো ভরাট ও বেদখল হয়ে যাওয়া। ইতোমধ্যে আশপাশের নদীগুলোও ভরাট হয়ে গেছে। ওয়াসা ও সিটি করপোরেশনের যে ড্রেনগুলো আছে সেগুলোও সময়মত পরিষ্কার হয় না। ওয়াসা ও সিটি করপোরেশনের কাজে অনেক সময় সমন্বয় হয় না। একে অন্যের ঘাড়ে দায় চাপানোর একটা প্রবণতা দেখা যায়। ৫৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৮ সালে ঢাকা মহানগরীর ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও খাল উন্নয়ন প্রকল্প হলেও অগ্রগতি হতাশাজনক। এক সময় ঢাকা শহরে ৪৬টি ছোট-বড় খাল প্রবাহিত হতো যা এই শহরের জলবদ্ধতা নিরসনে সহায়ক ছিল। কিন্তু এখন ৪৬টির মধ্যে মাত্র ২৬টির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। এর বাইরেও আরো কিছু কারণ রয়েছে। যেমন অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খানাখন্দ, যত্রতত্র খোড়াখুড়ি ও ময়লার ভাগাড়। অন্যদিকে খোঁড়াখুঁড়ির কারণে ছোট-বড় গর্ত ভরে জলাবদ্ধতার পাশাপাশি অসহনীয় যানজট জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। ঢাকা শহরের এমন কোন সড়ক বা অলিগলি নেই,যেখানে উন্নয়নের নামে খোঁড়াখুঁড়ির কাজ চলছে না। সিটি কর্পোরেশন, মেট্রোরেল স্থাপনের কাজ, ওয়াসা, তিতাস, ডেসকোসহ বিভিন্ন সংস্থা প্রতিনিয়ত কোনো না কোনো সড়ক, অলিগলি ইচ্ছেমতো খুঁড়ছে। দেখা যায় যে এক সংস্থা একটি রাস্তা কেটে মাত্র মাটি ফেলেছে,পরদিন আরেক সংস্থা এসে আবার ওই রাস্তাই কাটছে। আবার এমনও দেখা যায় যে, একই রাস্তায় ওয়াসার পানি ও স্যুয়ারেজ লাইন, তিতাসের গ্যাসলাইন, পিডিসি ও বিটিসিএলের নতুন কেবল লাইন বসানো বা মেয়ামতের কর্মযজ্ঞের কারণে প্রায় বছরজুড়ে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে।  ২০১৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর একনেক ঢাকার জলবদ্ধতা দূর করার জন্যে ৫ হাজার ৫৩০ কোটি টাকার অনুমোদন দেয় তিনটি প্রকল্প বাস্তবায়নে। অথচ কাজের কাজ কিছুই দৃশ্যমান হয়নি। ঢাকা শহর বসবাসের অযোগ্য নগরীগুলোর মধ্যে একটি। কেন আমাদের এই প্রিয় নগরী বসবাসের অযোগ্য নগরীর তালিকায় চলে গেল? কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে দেখা যাবে, জলবদ্ধতার বিষয়টিও উঠে এসেছে। এটা আমাদের জন্য যেমন দুর্ভাগ্যের তেমনি রাষ্ট্রপরিচালনার নিয়োজিতদের জন্যও লজ্জার। ঢাকা শহরকে সিঙ্গাপুর কিংবা মালয়েশিয়া বানানোর দরকার নেই। দয়া করে রিকশা বাস, সিএনজিতে চড়তে দেন। নৌকায় যেন চড়তে না হয়। এমনটিই নগরবাসীর প্রত্যাশা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ