রবিবার ০৯ আগস্ট ২০২০
Online Edition

বরকত-রুবেল ঘরে ঘরে

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী: আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদককে এখন বেশ স্মার্ট লাগে। নিজে ঘরে অন্তরীণ থেকে ভার্চুয়াল যোগাযোগের মাধ্যমে তিনি দৈনিক বিএনপিকে দায়দায়িত্বহীন বলে গাল দেন। বিএনপি জনগণের পাশে নাই। বিএনপি আইসোলেশনে ঢুকে গেছে। বিএনপি শুধু কথার তুবড়ি ছোটাচ্ছে। আর যা কিছু অপরাধ যা কিছু অন্যায়, যা কিছু ঘুষ-দুর্নীতি-ডাকাতি-দখল, সব কিছুর সঙ্গে এই ১২ বছর ক্ষমতায় থাকার পরও অবিরাম বিএনপিকে দায়ী করে যাচ্ছে। যে চোরই ধরা পড়ুক, তার ঐ এক কথা। এরা সব বিএনপির লোক ছিল। মানলাম, বিএনপি সব খারাপ লোকদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছিল। কিন্তু সেই সব লোককেই আপনারা কেন কোলে নিয়ে ১২ বছর ধরে লালন পালন করছেন? ওবায়দুল কাদের গং এ প্রশ্নের কোনোদিন জবাব দেননি। তিনি এ কথার মানুষ। একই কথা বলে যাচ্ছেন  বিএনপি দায়ী। এখন যে এসব বাজে কথা আর লোকে খায় না, সে কা-জ্ঞান আওয়ামী লীগারদের নেই। মানুষ হাসি ঠাট্টা করে। আবার হাসি ঠাট্টা করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট দিলে তাদের খপ করে ধরে ফেলে। হাসি ঠাট্টা যে শুধু সাধারণ মানুষই করছে তেমনটা নয়। হাসি ঠাট্টা করছে আওয়ামী লীগের লোকেরাও। এ রকম ঠাট্টা করতে গিয়ে সাবেক ছাত্রলীগ একজন নেতা বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে সাইবার নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এমন অভিযান অবিরাম চলছে। ঐ শিক্ষককে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে। পৃথিবীর যেসব দেশে সত্য বলা বিপজ্জনক বাংলাদেশ আছে একেবারে তার প্রথম দিকে। কালাকানুনের পর কালাকানুন হচ্ছে। একের পর এক যাকে খুশি তাকে ধরছে। আওয়ামী লীগারদের কোনো কুকীর্তিই প্রকাশ করা যাচ্ছে না। 

এর ফলে জেলায় জেলায়, থানায় থানায়, ইউনিয়নে ইউনিয়নে আওয়ামী ষণ্ডাদের রাজত্ব কায়েম হয়েছে। এ ষ-াদের কাছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও অসহায়। এরা কেউ মাটি ফুঁড়ে বের হয়নি। এদের গড ফাদার আছেন যারা নিজেদের প্রয়োজনে এসব ষণ্ডা বাহিনী গড়ে তুলেছে। তেমনি একদল ষণ্ডা বাহিনী গড়ে উঠেছে ফরিদপুরে। তারা কেউ হেলমেট বাহিনী বলে পরিচিত। কেউবা হাতুড়ি বাহিনী। হেলমেট বাহিনী এক-দেড় ডজন মোটর সাইকেল নিয়ে রাস্তায় বের হয়। প্রত্যেক বাইকে থাকে তিনজন করে ষণ্ডা। তাদের মাথায় থাকে হেলমেট। হাতে অস্ত্র। এরা যখন যেখানে খুশি হামলা চালায়। যা খুশি দখল করে। পেছনে আছে গড ফাদারের আশীর্বাদ। আমরা তো বার বার বলে আসছি, এই গড ফাদারদের ধরুন। কিন্তু ধারণা করি, গড ফাদারদের ধরতে গেলে আওয়ামী লীগের অস্তিত্বেই বিপন্ন হবে।

এই যেমন ধরা যাক, নরসিংন্দীর পাপিয়া কাণ্ড। পাপিয়াও নিজের অকাজ কুকাজ নির্বিঘেœ চালানোর জন্য গড়ে তুলেছিল মোটর সাইকেল বাহিনী। পাপিয়ার যে কোনো প্রয়োজনে তারা ছিল সদা হাজির। হেন কোনো অপকর্ম নেই যা পাপিয়া করেনি। সে ছিল নরসিংন্দী আওয়ামী লীগ নেত্রী। হতে চেয়েছিল এমপি। তার জন্য উর্ধ্বতন নেতা নেত্রীদের কোটি কোটি টাকা খাইয়েছে। সংবাদপত্রগুলো প্রায় পৌঁছে গিয়েছিল গড ফাদারদের কাছাকাছি। কাদের আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে পাপিয়া কোটি কোটি টাকা খরচ করে গুলশানের পাঁচ তারকা হোটেলের প্রেসিডেন্ট স্যুট বুক করে রাখতো? সেখানেই ছিল তার মধুকুঞ্জ। সে কুঞ্জে যারা ভ্রমর ছিলেন তাদের পর্যন্ত আর পৌঁছানো হলো না। প্রায় সকল সংবাদ মাধ্যম সরকারি লোকদের মালিকানাধীন। দুই একখানা যা আছে, তাও সেলফ সেন্সরড। কতটা লিখলে কোন কথাটি প্রকাশ করলে আইসিটি আইনে কোমরে দড়ি পড়বে না, সেটা ভেবে দেখতে হয়। শুধু আইসিটি আইন? দেশে আরও বহুবিধ কালাকানুন রয়েছে। সেসব খক্ষও প্রয়োগ করা হয় সংবাদ মাধ্যম বা ব্যক্তির উপর। ফলে চুপ করে থাকা ছাড়া আর কি পথ খোলা আছে?

গুলশানের পাঁচ তারকা হোটেলের মালিক নিজেও যে বসে পাপিয়া ও তার দেশী বিদেশী মোক্ষীদের সঙ্গে খোশ গল্পে মশগুল ছিলেন, সে ছবিও পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। ঐ হোটেল মালিক অনেক বড় দামী আওয়ামী লীগার। জানা যায়, আওয়ামী লীগের মাধ্যমেই ব্যবসা করে তিনি বিপুল বিত্তের মালিক হয়েছেন। আমরা প্রশ্ন করেছিলাম, পাপিয়ার রঙমহলে যাতায়াতকারী কারা ছিল? ধরুন তাদের। বের করে আনুন, তাদের অর্থের উৎস কী? না। সেদিকে অগ্রসর হয়নি সরকার। পাপিয়া-কাণ্ড ধামাচাপা পড়ে গেছে। 

তারপর এলো পাপুল কাণ্ড। লক্ষ্মীপুরের এমপি কাজী শহীদ ইসলাম পাপুল বড় ভাইয়ের হাত ধরে লেবার সুপারভাইজার হিসেবে গিয়েছিলেন কুয়েত। সেখানে গিয়ে ধীরে ধীরে তিনি মানবপাচারে জড়িয়ে পড়েন। তারপর বাংলাদেশ থেকে নানা কায়দায় নানা অবৈধ পথে কুয়েতে পাচার করেন হাজার হাজার শ্রমিক। আয় করেন শত শত কোটি টাকা। সে টাকার ভাগ দেন কুয়েতের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের। স্বামী স্ত্রী মিলে প্রায় শতকোটি টাকা বিনিয়োগ করে উভয়েই হয়েছেন ব্যাঙ্ক পরিচালক। কুয়েতের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ঘুষ দিয়ে তিনি এই মানবপাচারের ব্যবসা চালিয়ে যায়। শর্ত অনুযায়ী কাজ নেই। মাসের পর মাস বেতন নেই। প্রতিবাদ করলে করা হয়েছে শ্রমিকদের শারীরিক নির্যাতন। তাদের জিম্মি করে আরও টাকা আদায় করা হয়েছে বাংলাদেশে তাদের পরিবারের কাছে। 

পাপুল কোনো আওয়ামী লীগ টাওয়ামী লীগ ছিলেন না। কিন্তু বিত্ত যখন হয়েছে, সামাজিক মর্যাদাও তো তার দরকার। ফলে এমপি হতে চাইলেন শহীদ ইসলাম পাপুল। টাকায় কী না হয় বাংলাদেশে। পাপুল এলাকায় গিয়ে টাকা ছড়ালেন সে এলাকার জাতীয় পার্টির প্রার্থীকে ‘টাকা দিয়ে’ বসিয়ে দিলেন। আর আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটিকে দিয়ে লিখিয়ে নিলেন যে, তিনি লক্ষ্মীপুর ২ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী। অতএব সবাই যেন তাকেই ভোট দেয়। আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সাবেক আমলা, প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত ঘনিষ্টজন ও উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম। তাকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, পাপুলকে কীভাবে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি আওয়ামী লীগের প্রার্থী বলে ঘোষণা করলো। তিনি তাইরে নাইরে না বলে এড়িয়ে গেলেন। কিন্তু তার পদবী বা অবস্থানে কোনো পরিবর্তন হয়নি। তার যেমন বেণী তেমনি আছে চুল ভেজালেন না। মানব পাচারের দায়ে পাপুল এখন কুয়েতের কারাগারে বন্দী। সেখানকার সরকার তার প্রায় দেড়শ’ কোটি টাকা জব্দ করেছে। তার কুয়েতি সহযোগীদের গ্রেপ্তার করেছে। জানানো হয়েছে, তিনি বিদেশেও কুয়েত থেকে টাকা পাচার করেছেন।

পাপুলের টাকা এতটাই শক্তিশালী ছিল যে তিনি কুয়েতের বাংলাদেশ দূতাবাস প্রায় কিনেই ফেলেছিলেন। সেখানে তার ইচ্ছায়ই সবকিছু চলত। ফলে সেখানকার রাষ্ট্রদূতকেও সরকার মানে মানে সরিয়ে এনেছে।  বাংলাদেশের ইজ্জত ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। বিশ্বের কাছে বার্তা গেছে যে, কোন ধরনের লোক এখন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের সদস্য! এই পাপুলেরাই এখন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ। এরা দুর্নীতি ও অবৈধ টাকা দিয়ে জাতীয় সংসদের সদস্য হতে পারে। জনগণের ভোটের দরকার হয় না। আর পাপুল একাই শুধু এমপি হননি, ঐ একই টাকার জোরে ঘাটে ঘাটে কড়ি ঢেলে নিজের স্ত্রীকেও এমপি বানিয়েছেন। তার এমপি স্ত্রীকে ডেকেছিল আজব প্রতিষ্ঠান দুদক। সেখানে তিনি বলেছেন, সরকারের বদনাম করার জন্য এক শ্রেণীর লোক তার ও তার স্বামীর বিরুদ্ধে অপপ্রচার করে যাচ্ছে। 

ঘুষ-দুর্নীতি-ডাকাতি-দখলবাজি এখন আওয়ামী লীগের কল্যাণে ঘরে ঘরে বিস্তৃত হয়েছে। ছাত্রলীগ বা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, কৃষকলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ- এসব করলে সাত খুন মাফ। যার যা খুশি তাই করা যায়। শাস্তির কোনো বিধানে নেই। সমাজ চলছে এক গড্ডালিকা প্রবাহে। এই ধারা যে কত দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে সেটা অনুমান করা যায় আমতলির এক স্কুল ঘর নির্মাণ কেন্দ্র করে। ছাত্রলীগের জোর খাটিয়ে তিন বছর আগে রডের বদলে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে পিলার দিয়েছিল ছাত্রলীগের ঐ ঠিকাদার। কয়েকদিন আগে সেই পিলার ভেঙে পড়েছে। ভাগ্যিস, স্কুল বন্ধ ছিল। তা না হলে, অনেক শিশু শিক্ষার্থীর প্রাণ যেত। ঐ ‘ত্যাগী’ ছাত্রলীগ নেতার বিরুদ্ধে পিলার নির্মাণের সময় যেমন কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ভেঙে পড়ার পরও না। তাহলে যে ওবায়দুল কাদের এত বড় বড় আওয়াজ দিচ্ছেন? চক্ষু বন্ধ করে নয়, চোখ খোলা রেখে কথা বলুন। 

শুরু করেছিলাম, ফরিদপুরের ত্রাস বরকত-রুবেলকে নিয়ে। সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের হাত ধরে উত্থান ঘটেছিল দুইভাই বরকত আর রুবেলের। তারই প্রশ্রয়ে ঐ দুই ভাই চাঁদাবাজি জমি দখল ও সন্ত্রাসী কাজে করে কয়েক বছরের মধ্যেই ২ হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছে। ধারণা করা হয়, বিদেশে পাচার হয়ে গেছে সে টাকা। এক ভাই বরকত ফরিদপুর শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হয়েছে। একই আশীর্বাদে আর এক ভাই রুবেল পত্রিকা খুলে সম্পাদক হয়েছেন। শহরের এমন কোনো এলাকা নেই যেখানে তাদের জমি নেই। ঐ সাবেক মন্ত্রীর প্রশ্রয়ে তারা দুই জন দাপিয়ে বেরিয়েছেন গোটা শহর। বোবা হয়ে ছিল ফরিদপুরবাসী। এ পর্যন্ত পাওয়া তাদের সম্পদের মধ্যে রয়েছে জমির দলিল ১১৩টি। আবাদি ও বসতি জমি ৫৭৩ বিঘা। চরের জমি ৮০০ একর। পাথর ভাঙা কারখানা ১৫ একর। পেট্রোল পাম্প তিনটি। পরিবহন বাস ৩০টি। ব্যক্তিগত গাড়ি ৫টি। ট্রাক ও মিনি ট্রাক ১৪টি। রোলার ট্রাক্টর ৮টি। বাড়ি ও ভবন ৪টি। রেস্ট হাউজ ২টি। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ১২টি। ব্যাঙ্ক হিসাব ৪৪টি। টাকা লেনদেন তদন্তাধীন। তাদের বয়স তেমন কিছু না। ৪০ থেকে ৪৭-এর মধ্যে। কিন্তু দুর্নীতিকে কতটা বিস্তৃত হতে দিলে এই ফ্র্যাঙ্কেস্টাইনদের জন্ম হয়? 

ওবায়দুল কাদের আর ওবায়দুল কাদেরের আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেবার কি ক্ষমতা রাখে? কিন্তু এরা ধরা খেয়েছে আর এক আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে হামলা করতে গিয়ে। আওয়ামী লীগের প্রবীণ রাজনীতিবিদ আিইনজীবী সুবল সাহা সাবেক মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের বাসায় ইফতার পার্টিতে কেন যাননি, সে কারণে তার বাড়িতে দফায় দফায় হামলা করেছে বরকত-রুবেল। এভাবেই আসলে ঘরে ঘরে পাড়ায় মহল্লায় বরকত রুবেলে জন্ম দিয়েছে আওয়ামী লীগ। খুব যে মুখ বন্ধ করে আছেন! একটা কিছু কন কাদের, একটা কিছু কন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ