শনিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

কুরবানির চামড়ার দাম বিপর্যয়ে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন দ্বীনি প্রতিষ্ঠান

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান: চামড়ার দাম বিপর্যয়ে ভয়াবহভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছে গরিব-মিসকিন ও এতিমরা। সুবিধাবঞ্ছিত লাখ লাখ ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার খরচ চলে কুরবানির পশুর চামড়া বিক্রির অর্থ দিয়ে। এতিম খানা ও মাদরাসাগুলোর লিল্লাহ বোডিংয়ে থাকা শিক্ষার্থীর সকলেই গরিব ঘরের সন্তান এবং অনেকেরই বাবা-মা নেই। এই অসহায় এতিদের কেউ অন্যের সহায়তায়, কেউ লিল্লাহ বোর্ডিং-এ থেকে লেখাপড়া করেন। বোর্ডিংয়ের মাধ্যমে দরিদ্র অসহায়, এতিম শিক্ষার্থীরা লেখা-পড়ার খরচসহ বিনামূল্যে খাবার পেয়ে থাকেন। বিপুলসংখ্যক এই শিক্ষার্থীর লেখাপড়া থাকা-খাওয়া তথা ভরণপোষণের অর্থ মাদরাসা কর্তৃপক্ষ পেয়ে থাকেন অন্যের দান থেকে। বিশেষ করে ঈদুল ফিরতের সময় জাকাত এবং ঈদুল আজহার কুরবানির চামড়া মাদরাসায় দান করা টাকা থেকে বছরের অর্ধেক সময় এদের ভরণপোষণ হয়। কিন্তু এবার চামড়ার দাম বাজারে কৃত্রিম বিপর্যয় হওয়ায় সেটা সম্ভব হবে না। কুরবানির চামড়ার দাম বিপর্যয়ে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতিতে এ সব দ্বীনি প্রতিষ্ঠান। এ সব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতি বছরই ঈদুল আজহায় কুরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করেন এ সব দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। এই চামড়া বিক্রির টাকা এ সব প্রতিষ্ঠানে অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখে। এ টাকা গরিব ছাত্রদের পড়ালেখা, থাকা-খাওয়ার পেছনে খরচ করা হয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, কুরবানির চামড়া থেকে আসা টাকা দরিদ্র, অসহায়, এতিম শিক্ষার্থীদের থাকা-খাওয়া ও লেখাপড়ায় ব্যয় করা হতো। কিন্তু বিগত কয়েক বছর ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রস্তুতকৃত (ফিনিশড) চামড়ার দাম কমছে, এমন অজুহাতে গত কয়েক বছর ধরেই ব্যবসায়ীদের স্বার্থে কুরবানির পশুর কাঁচা চামড়ার দাম কমাচ্ছে সরকার। গত বছর কাঁচা চামড়ায় বিপর্যয়ের পর এবারও ব্যাপক হারে কমানো হলো দাম। আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কমিয়ে এবার ঢাকায় লবণযুক্ত চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৩৫ থেকে ৪০ টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। এর ফলে সাত বছরের ব্যবধানে লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম কমলো ৫৬ শতাংশ। ঘোষণা অনুযায়ী, আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে ঢাকায় লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৩৫ থেকে ৪০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ২৮-৩২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া সারা দেশে খাসির চামড়া ১৩-১৫ আর বকরির চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ থেকে ১২ টাকা।
চামড়ার বাজারে ধসের পেছনে সরকারের নজরদারির অভাবকে দায়ী করছেন অর্থনীতিবিদরা। সমাজের দরিদ্র অংশের পাশাপাশি কুরবানির চামড়া বিক্রির অর্থের অন্যতম বড় সুবিধাভোগী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও। বিশ্লেষকরা বলছেন, চামড়ার দামের এমন নিম্নমুখী প্রবণতায় চলতি বছর এইসব প্রতিষ্ঠানগুলোও ক্ষতির সম্মুখীন হবে।
ঢাকার একটি মাদরাসার শিক্ষক জানান, ২০১৮ সালে ঈদুল আজহায় তার মাদরাসার শিক্ষার্থীরা ঘুরে ঘুরে প্রায় দেড় হাজার গরুর চামড়া সংগ্রহ করেছিল। প্রত্যেকটি চামড়া ১ হাজার টাকা ধরে বিক্রি করা হয়। ৫ বছর আগে যদিও একটি চামড়া ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা দরে বিক্রি করা হতো। গত বছরের ঈদে এক হাজার ওপরে চামড়া সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু, চামড়া বিক্রির জন্য কোনও গ্রাহক না পেয়ে মাদরাসার খরচে গাড়ি ভাড়া করে একজন আড়তদারকে দেয়া হয়। বাজার দর অনুযায়ী টাকা দেয়া হবে এমন আশ্বাস দিয়েছিলেন মাত্র।
আরেকজন শিক্ষক বলেন, চামড়া বিক্রির টাকা দিয়ে মাদরাসার শিক্ষার্থীদের খরচের একটি অংশের ব্যয় নির্বাহ করা হয়। এটা হয়তো খুব বেশি বড় নয়। কিন্তু তারপরও চামড়া বিক্রির খাত থেকে এই টাকা আসতো। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। গতবারের ঈদে আমাদের শিক্ষার্থীরা ৪শ’ গরু চামড়া সংগ্রহ করে। একজন পরিচিত ব্যক্তির কাছে তা ৫শ’ টাকা দরে বিক্রি করেছি। অথচ তার আগের বছর ঈদুল আজহায় ২৮০টি গরুর চামড়া তুলে প্রতিটি ৯শ’ টাকা দরে বিক্রি করেছিলাম।
মাওলানা আব্দুল্লাহ বলেন, আগের বছরগুলোতে কুরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করে পাওয়া অর্থ দিয়ে লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের ৩-৪ মাসের ব্যয় নির্বাহ হতো। কিন্তু এবার এক মাসের খরচও উঠবে না।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, মূলত সরকার চামড়া মার্কেটটাকে কিছু লোকের হাতে তুলে দিয়েছে। সরকার কাঁচা চামড়া রফতানি করতে না দেয়ার ফলে একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রসেসিং এবং ট্যানারিতে পাঠানোটা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। তখন মনোপলি এক কন্ট্রোল ট্যানারি মালিকদের হাতে চলে যায়। এ সুযোগটাই ট্যানারি মালিকরা নিয়ে সহজেই সিন্ডিকেট করে পানির দরে চামড়া কেনার সুযোগ নিচ্ছে। সরকার কাঁচা চামড়া রফতানির সুযোগ দিলে ট্যানারি মালিকরা প্রতিযোগিতায় আসতে বাধ্য হবে। তখন কাঁচা চামড়ার ন্যায্য দাম পাওয়া যাবে।
এক মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল বলেন, মহান আল্লাহ মানুষের রিজিক দাতা। তিনি অবশ্যই মাদরাসা পড়ুয়া এতিম ছাত্রদের খাবারের যোগান দেবেন। সুবিধাবঞ্ছিত গরিব এবং এতিম ছাত্রদের জ্ঞানের আলো ছড়ানো সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। তারা কুরবানির চামড়া থেকে টাকা পেয়ে কিছু সুবিধা পেত। সেটা চক্রান্ত করে অন্যেরা খেয়ে ফেলছে। যারা সিন্ডিকেট করে পরিকল্পিতভাবে চামড়ার দামে বিপর্যয় ঘটিয়ে গরিব এতিমদের হক খাচ্ছে তারা চরম অন্যায় করেছে। তাদের চিহ্নিত করে শাস্তি দেয়া উচিত।
দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা বলেন, চামড়া শিল্পকে বাঁচাতে হলে সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে। কুরবানির চামড়া বিক্রির টাকার হক থেকে গরির এবং অসহায়দের বঞ্চিত করা সিন্ডিকেটকে ভেঙে দিতে হবে। কেননা, পশুর চামড়া বিক্রি করে এতিম, গরিব এবং অসহায়দের কাজেই লাগানো হয়। চামড়া শিল্পের ক্ষতি মানে তাদের ক্ষতি।
উদাহরণ দিয়ে এক জন শিক্ষক বলেন, জামেয়া মিল্লিয়া আরাবিয়া খাদেমুল ইসলাম মাদরাসা ও এতিমখানাটির অবস্থান খুলনা মহানগরীর পূর্ব বানিয়াখামার এলাকায়। এ মাদরাসার লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে চার শতাধিক ছাত্রের বাস। এদের থাকা-খাওয়ার ব্যয় নির্বাহ করে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ, যার একটি বড় অংশ আসে কুরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করে। কিন্তু গত বছর কাঁচা চামড়ার দাম এতটাই কম যে কাঙ্খিত অর্থ আয় তো তো দূরে থাক, চামড়া সংগ্রহ করতে গিয়ে যে ব্যয় হয়েছিল তাও উঠে আসেনি এতিমখানাটির। চলতি অর্থবছরে তহবিল সংকট দেখা দিয়েছে তাদের। সরকার যেহেতু গত বছরের তুলনায় চামড়ার দাম আরও কমিয়ে দিয়েছে তাই এবারও চামড়ার দাম বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন তারা।
শুধু খুলনা নয়, কুরবানির চামড়ার দাম বিপর্যয়ে দেশের সবখানেই দ্বীনি প্রতিষ্ঠানে তহবিল সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে উপজেলা সদর ও প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। চলতি বছর এসব মাদরাসার লিল্লাহ বোর্ডিং চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
সূত্র মতে, অন্যান্য বছর কুরবানির সময় যে চামড়া বিক্রি হতো হাজার টাকায়, গত বছর তা বিক্রি হয়েছে মাত্র ২৫ থেকে ১০০ টাকায়। এ কারণে কেউ বিপাকে পড়ে নামমাত্র মূল্যে চামড়া বিক্রি করেছিলেন। আবার অনেকেই চামড়া মাটিতে পুঁতে এবং নদীতে ফেলে দিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। ফলে গত বছর দ্বীনি প্রতিষ্ঠানগুলোতে চামড়া থেকে অর্থ উপার্জন তেমন হয়নি। উল্টো চামড়া সংগ্রহ করতে গিয়ে তহবিলের টাকা গচ্চা গেছে।
প্রসঙ্গত, চামড়া বিক্রির টাকা গরিব, এতিম ও দুস্থদের হক বলে মনে করা হয়। এ প্রসঙ্গে চুয়াডাঙ্গার মাওলানা মো: সাইদুল ইসলাম বলেন, চামড়া বিক্রির টাকা মূলত গরিব, এতিম ও দুস্থদের হক। কাজেই চামড়ার দাম কমে যাওয়া মানেই গরিব, এতিমদের অংশ কমে যাওয়া। তিনি বলেন, চার বছর আগে বড় একটি গরুর চামড়ার টাকা দিয়ে একজন এতিম ছয় মাস চলতে পারতো। কিন্তু বর্তমানে ওই ধরনের বড় গরুর চামড়ার টাকায় তার এক মাসও যাবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ