বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

আলোকিত ব্যক্তিত্ব বদরে আলম

অধ্যাপক এ.বি.এম ফজলুল করীম : গত ২৬ জুলাই ২০২০ দিবাগত রাত সাড়ে বারটায় চলে গেলেন প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ সম্মানিত বদরে আলম। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তিনি আল্লাহ তায়ালার এবং রাসূল (সাঃ) এর আনুগত্যে বিশ্বাসী ছিলেন। বাংলাদেশে ইসলামী আন্দোলনের সূচনা লগ্ন থেকে জনাব বদরে আলম আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্ত থেকে অনেক গুরুত্ব পূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি কুরআন হাদীসের আলোকে একজন আলোকিত মানুষ হিসেবে নিজেকে তৈরি করার জন্য সারা জীবন চেষ্টা করেছেন। ইসলামী আচরণ, মেজাজ ও পরিবেশ ছিল তার নিকট অত্যন্ত পরিষ্কার ও স্বচ্ছ। ভদ্রতা ও বিনয়ে তাকে আলাদা করতো অন্যদের থেকে। বিভিন্ন মতের প্রতি তিনি ছিলেন শ্রদ্ধাশীল। তার ইন্তিকালে বাংলাদেশর মানুষ শোকাভীভূত। তাঁর মৃত্যুতে বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তি ব্যক্তিগতভাবে ও জাতীয় পত্রিকায় বিবৃতির মাধ্যমে শোক প্রকাশ করেছেন। ইন্তিকালের সময় তার বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর। তিনি অবিভক্ত ভারত বর্ষের কোলকাতায় ৫ই অক্টোবর ১৯৩২ সালে জন্ম গ্রহণ করেন। জনাব বদরে আলম কোলকাতায় শিশু বয়স থেকে ধীরে ধীরে বড় হতে থাকেন। তিনি কিশোর বয়স থেকে ভদ্র-নম্র এবং সুন্দর আচরণ করতে অভ্যস্ত হন। কোলকাতায় তিনি সফল ভাবে প্রাথমিক শিক্ষা ও মাধ্যমিক শিক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। পরবর্তীতে তার পরিবার কোলকাতা থেকে ঢাকার আজিমপুরে বসবাস শুরু করেন। তৎকালীন পুরাতন ঢাকার জগন্নাথ কলেজ থেকে মেধাবী ছাত্র জনাব বদরে আলম উচ্চ মাধ্যমিক অর্থ্যাৎ এই.এস.সি বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পাশ করেন। এর পর তিনি ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সফলতার সাথে বি.এজি পাস করেন। পরবর্তীতে তিনি আমেরিকার স্বনাম ধন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম. এজি পাস করেন। বগুড়া জেলার বিশিষ্ট ডাক্তার জনাব নাজির হোসেনের মেয়েকে ১৯৫৯ সালে জনাব বদরে আলম বিবাহ করে বিবাহিত জীবন শুরু করেন।
জনাব বদরে আলমের ৬ ছেলে ও ৩ মেয়ে। তাদের সকলকে তিনি ইসলামী মূল্যেবোধের আলোকে আলোকিত মানুষ হিসেবে তৈরি করার চেষ্টা করেন। তিনি চাকুরী জীবনেও কর্তব্য পরায়ন এবং আন্তরিক ভাবে তার দায়িত্ব পালন করে প্রশংসা অর্জন করেছিলেন। তার অফিসের সহকর্মীদের নিকট তিনি ছিলেন অনুকরণীয় একজন আদর্শিক  ব্যক্তিত্ব।
তিনি দীর্ঘ দিন যাবত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও বায়তুলমাল বিভাগের সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেছেন। দায়িত্ব পালনে তিনি ছিলেন সদা তৎপর। বায়তুলমাল বিভাগের প্রতিটি কাজ তিনি অত্যন্ত সুচারু ও নিয়ম মাফিক করতেন। তিনি ছিলেন ব্যবহারে একজন অমায়িক মানুষ। চলনে-বলনে, পোশাক-পরিচ্ছেদে তিনি ছিলেন খুবই পরিপাটি।
জনাব বদরে আলম সব সময় কথা বলতেন একদম স্পষ্ট ও শুদ্ধ ভাষায় যা ছিল তাঁর অন্যতম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। তিনি গণতন্ত্র, ন্যায় বিচার, সুশাসন এবং আদর্শিক মূল্যবোধের আলোকে দুর্নীতি মুক্ত একটি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন।
তিনি মনে করতেন ঃ-
“হৃদয় জয়কারী নৈতিক ও চারিত্রিকগুণ
    তরবারির চেয়ে ধারালো
এবং হীরা ও মনি মানিক্যের চেয়েও মূল্যবান”।
জনাব বদরে আলম বি.আই.আইয়ের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। তিনি বাংলাদেশ ইসলামিক ইনস্টিটিউটের জেনারেল সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেছেন দীর্ঘ দিন। পরবর্তীতে তিনি দীর্ঘ সময় কাল বি.আই.আইয়ের ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। আমি একজন সাধারণ মানুষ। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত এই মহান ব্যক্তির সাথে দীর্ঘ ১২ বছর বাংলাদেশ ইসলামিক ইনস্টিটিউট এর ম্যানেজিং কমিটি একজন সদস্য হিসেবে কাজ করার সৌভাগ্য অর্জন করেছি। তাঁকে আমি একজন অভিভাবক হিসেবে পেয়ে ছিলাম। তিনি একজন বিশিষ্ট লেখকও ছিলেন। তার বেশ কয়টি বই প্রকাশিত হয়েছে। যেমন :-
(১) চরিত্র ও মাধুর্য,
(২) হারানো মুক্তার হার।
আরো অনেক বই তাঁর প্রকাশিত হয়েছিল। জনাব বদরে আলমের রচিত বই পাঠক সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিল। সৃজনশীল লেখার জন্য তিনি দেশ ও বিদেশে সম্মানিত হয়েছেন। আমাকে যখন বাংলাদেশ ইসলামিক ইনস্টিটিউটের জেনারেল সেক্রেটারীর দায়িত্ব দেয়া হয়, তার অনেক পূর্ব থেকে তিনি আমাকে পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করাসহ বই লিখে প্রকাশ করার জন্য বারংবার উৎসাহ দিতেন। তা আজও আমি করতে পারিনি। বর্তমানে আর ঐ মহান ব্যক্তি আমাদের মাঝে নেই। আমরা আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করব “হে আল্লাহ আপনি মরহুম জনাব বদরে আলমকে জান্নাতবাসি করুন”।
তিনি তার সমগ্র জীবনব্যাপী হৃদয় জয়কারী নৈতিক ও চারিত্রিক গুণাবলীর মানুষ তৈরির কাজ করে গেছেন। তিনি মনে করতেন যারা নৈতিক চরিত্রের গুণাবলীর অধিকারী হয় তারা নিজেদের চার পাশের মানুষের হৃদয় ও পরিবেশকে জয় করতে পারে। আর কোন একটি দল যদি এ সব গুণে গুণান্বিত হয়, তাহলে দুনিয়ার কোন শক্তিই তাদেরকে পরাজিত করতে পারেনা।
তিনি সদা সত্য কথা বলতেন এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে কাজ করে গেছেন। সত্যের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে তিনি কখনো কার্পন্য করতেন না। আমি বহু বার তার প্রমাণ পেয়েছি বি.আই.আইয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভায় এবং তাঁর সাথে চলতে গিয়ে। আমরা জনাব বদরে আলমের জন্য আবারও প্রানভরে  দোয়া করছি, আল্লাহ তায়ালা যেন তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ