বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

নানা বলয়ে বিভক্ত পৃথিবী

বর্তমান সভ্যতায় পৃথিবীটা বিভিন্ন বলয়ে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। ন্যায়-অন্যায় কিংবা সত্য-মিথ্যার কারণে এই বিভক্তি ঘটেনি। বিভক্তি ঘটেছে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বার্থের কারণে, হীন স্বার্থের কারণে। স্বার্থের এই যুদ্ধে দমন-অবদমন, জুলুম-নির্যাতন হয়েছে। মারণাস্ত্রের ব্যবহার হয়েছে। ধ্বংস হয়েছে জনপদের পর জনপদ। লাগাতার বোমা বিস্ফোরণে পরিবেশ দূষিত হয়েছে। ভিন্নধর্ম ও ভিন্নমতের কারণে স্বদেশে নাগরিকদের থাকতে হচ্ছে বন্দীশিবিরে। সব মিলিয়ে মনুষ্যত্বের অবমাননা, সুন্দর পৃথিবীর অবমাননা অব্যাহত রয়েছে তথাকথিত আধুনিক এই সভ্যতায়। আর অবমাননার এসব কাজ করে যাচ্ছেন সভ্যতার শাসকরাই। কিন্তু এর বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো প্রতিবাদ হচ্ছে না। তবে মাঝে মাঝে কিছু প্রপাগাণ্ডা হয়। আমরা জানি যে, প্রপাগাণ্ডার  পেছনে থাকে বিশেষ কোনো মতলব। প্রায়ই  লক্ষ্য করা যায় বলয়ভিত্তিক মতলব। একটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সারা পৃথিবী এখন একসাথে কথা বলতে অক্ষম। নিজ বলয়ের অন্যায়ে চুপ থাকে, অন্য বলয়ের অন্যায়ে হয় সরব। এমন পঙ্গুত্ব নিয়ে বর্তমান সভ্যতায় শাসকরা পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করবে কেমন করে? পৃথিবীকে মানুষের বসবাসযোগ্য রাখবে কেমন করে?
বিষয়টি আবারও স্পষ্ট হলো প্রখ্যাত গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের একটি প্রতিবেদনে। আমরা জানি যে, গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে করোনার আক্রমণে নাস্তানাবুদ হয়েছে চীনের উহান প্রদেশের লোকজন। সে সময় তাদেরকে ফলের খোসা, প্লাস্টিকের বোতল, এমনকি অন্তর্বাস দিয়েও ফেসমাস্ক বানিয়ে পরতে দেখা গেছে। করোনা থেকে বাঁচতে সে সময় মাস্ক, গ্লাভস চেয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে হাত পাততে দেখা গেছে চীনকে। কিন্তু তার পরই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। মাস তিনেকের মধ্যেই নিজ দেশের চাহিদা মিটিয়ে মাস্ক রফতানি শুরু করে চীন। হঠাৎ মাস্ক উৎপাদনের এমন চিত্র দেখে সৃষ্টি হয় প্রশ্ন। সেই প্রশ্ন বা রহস্যের জাল উন্মোচনে এগিয়ে এসেছে দ্য গার্ডিয়ান। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, বন্দীশিবিরগুলোতে মাস্ক তৈরি করতে উইঘুর মুসলিমদের ওপর অত্যাচার চালানো হয়েছে। ক্রীতদাসদের মতো হুমকি দিয়ে তাদের মাস্ক বানাতে বাধ্য করেছে চীন। এজন্য তাদের কোনো পারিশ্রমিকও দেয়া হতো না। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, বন্দী উইঘুরদের দিয়ে জোর করে তৈরি করানো মাস্ক অস্ট্রেলিয়ায় রফতানি করেছে বেইজিং। চীনের হুবেই প্রদেশের পোশাক প্রস্তুতকারী সংস্থা ‘হুবেই হাইজিন প্রটেকটিভ কোম্পানি লি.’ অস্ট্রেলিয়ায় কয়েক লাখ মাস্ক রফতানি করেছে। অভিযোগ, সেই মাস্কগুলো জোর করে উইঘুর মুসলিমদের দিয়ে তৈরি করানো হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি নামের একটি সংস্থা সম্প্রতি বলেছে, চীনা কারখানাগুলোয় প্রায় ৮০ হাজার উইঘুর শ্রমিককে জোর করে কাজ করানো হচ্ছে। ২০১৭ থেকে ২০১৯ এর মধ্যে ওই শ্রমিকদের নিজের বাড়ি বা ডিটেনশন সেন্টার থেকে নিয়ে এসে চীনের সুদূর প্রান্তে ক্রীতদাসের মতো কাজে লাগানো হয়েছে। কেউ কাজ করতে রাজি না হলে চালানো হচ্ছে চরম নির্যাতন। এ খবর প্রকাশ্যে আসলে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয় অস্ট্রেলিয়ায়। প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনেকেই বলেছেন, চীন থেকে মাস্ক আমদানি করলে সেগুলো তৈরির স্বচ্ছতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। কোনো চীনা সংস্থার ওপর জোর করে মজদুরি করানোর অভিযোগ থাকলে সেখান থেকে যেন কোনো পণ্য কেনা না হয়। উল্লেখ্য যে, করোনা মহামারির কারণে অস্ট্রেলিয়ায় মাস্ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
আলোচ্য ঘটনায় চীনকে অমানবিক ও নিষ্ঠুর মনে হচ্ছে; কিন্তু ফিলিস্তিন, ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া, সিরিয়ায় কী হচ্ছে? সেখানে কি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য কিংবা রাশিয়া মানবিক আচরণ করছে? আসলে বর্তমান সভ্যতায় কোনো পরাশক্তির আমলনামাই ভালো নয়। ক্ষুদ্র স্বার্থে, হীণস্বার্থে ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে, মানুষ মারতে তারা মোটেই কুণ্ঠিত নন। ফলে শান্তি সফরের মেলোড্রামার মধ্যেই চলছে যুদ্ধ এবং নতুন নতুন মারণাস্ত্রের পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এসব নিয়ে প্রতিযোগিতা আছে, আছে কূটকৌশল পরাশক্তিদের মধ্যে। ফলে নানা প্রপাগাণ্ডা হয়, সৃষ্টি হয় উত্তেজনাও। যেমন এখন লক্ষ্য করা যাচ্ছে চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে।
বিশে^র দাম্ভিক ও শক্তিধর নেতারা করোনাকে পরাস্ত করতে সমর্থ না হলেও পরস্পরকে পরাস্ত করতে যেন উদগ্রীব। এমন দ্বন্দ্বে তাদের কত কৌশল, কত কূটনীতি! আসলেই কি তারা একে অপরকে পরাস্ত করতে পারবে? তাদের লক্ষ্য কি তাই? পর্যবেক্ষকদের অনেকে মনে করেন, শক্তিধর দেশগুলোর হাতে এখন যে ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র আছে তাতে কেউই নিরাপদ নয়। এক দেশকে ধ্বংস করে আরেক দেশ বেঁচে যাবে এমনটি ভাবা যায় না। ফলে পৃথিবীতে পরমাণু শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে বিরাজ করছে এক ধরনের ‘ভীতির ভারসাম্য।’ এখন সীমিত মাত্রার মারণাস্ত্রের ‘গিনিপিগ’ করা হচ্ছে পিছিয়ে পড়া দরিদ্র দেশগুলোকে। পরাশক্তিগুলো যেন মিলেমিশেই ওই কাজগুলো করে যাচ্ছে। তাহলে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এখন যে উত্তাপ ও উত্তেজনা তার ব্যাখ্যা কী? এটা কি শুধুই খেলা, নাকি বিপজ্জনক খেলা? কেউ কেউ তো বলছেন, এটা নির্বাচনে জেতার একটা কৌশলও হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে চীনা কনস্যুলেট বন্ধের পাল্টা পদক্ষেপ হিসাবে এবার সিচুয়ান প্রদেশের চেংদুতে মার্কিন কনস্যুলেট বন্ধের নির্দেশ দিলো চীন। যুক্তরাষ্ট্রকে ‘যোগ্য জবাব’ দিতেই তারা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে গত শুক্রবার এক বিবৃতিতে জানায় বেইজিং। আগের দিন বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রশাসন ভিসা জালিয়াতির অভিযোগ আনে চার চীনা নাগরিকের বিরুদ্ধে। তাদের দাবি, চীনা সেনাবাহিনীর সদস্য হওয়া সত্ত্বেও তারা তথ্য লুকিয়েছেন। তাদের মধ্যে তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এখন পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। দৃশ্যমান এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই স্নায়ুযুদ্ধকালের কথা স্মরণ করছেন। যুক্তরাষ্ট্র এখন বাণিজ্য সমস্যা, চীনের মানবাধিকার লংঘন ও দক্ষিণ চীন সাগরে বেইজিংয়ের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির কথা বলছে। আরো যুক্ত হয়েছে হংকংয়ে নতুন জাতীয় নিরাপত্তা আইন কার্যকর এবং করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে গাফলতির অভিযোগ। সম্প্রতি লন্ডন সফরে এসে চীনবিরোধী আন্তর্জাতিক জোট গড়ে তোলার কথা বললেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও। তিনি হিউস্টনে চীনের কনস্যুলেটকে গুপ্তচরবৃত্তি ও মেধাস্বত্ব চুরির কেন্দ্র হিসাবে উল্লেখ করেন। তবে চীন এমন অভিযোগকে ‘বিদ্বেষপরায়ণ অপবাদ’ হিসাবে অভিহিত করেছে। অনেকেই উত্তেজনাকর এমন পরিস্থিতির পরিণতি নিয়ে ভাবছেন। তবে চীন যুক্তরাষ্ট্রের পথ অনুসরণ করে, মার্কিনবিরোধী কোনো আন্তর্জাতিক জোট গঠনের কথা এখনো উচ্চারণ করেনি। বরং চীন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইছে। গত শুক্রবার এক বিবৃতিতে স্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে সম্পর্ক আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে ওয়াশিংটনের প্রতি আহ্বান জানায় চীন। চীনের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের গর্জনে তারা ততোটা চিন্তিত নয়। তাহলে কি বিশ্লেষকদের ধারণাই ঠিক? তাঁরা বলছেন, আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জিততে চীনের সঙ্গে বিরোধ রিপালিকানদের একটি কৌশল হতে পারে। যেমনটি লক্ষ্য করা গিয়েছিল ভারতের বিগত নির্বাচনে। মোদি সরকার তো তখন পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় মেতে উঠেছিল। আসলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করতে চাইলে অভিযোগের কোনো অভাব হয় না কখনো। তবে প্রশ্ন হলো,  ক্ষমতা কিংবা নির্বাচনে জেতাই কি এখন নেতাদের জন্য সবকিছু? 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ