রবিবার ০৯ আগস্ট ২০২০
Online Edition

অমানবিক নিষ্ঠুরতা

সাহেদ-সাবরিনা-আরিফ এবং ছাত্রলীগের সদ্য সাবেক নেত্রী শারমিন জাহানের মতো অসংখ্য প্রতারক ও জালিয়াত চক্রের পাশাপাশি ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়েও করোনাক্রান্ত ও করোনায় মৃতদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ যথেষ্টই করা হচ্ছে। এ ধরনের ঘটনা সম্পর্কিত রিপোর্টও গণমাধ্যমে প্রায় নিয়মিতভাবেই প্রকাশিত ও প্রচারিত হচ্ছে। অমন এক আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা ঘটিয়েছে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতাল। প্রকাশিত খবরে জানানো হয়েছে, ধানমন্ডি এলাকার ওই হাসপাতালে ৯ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর করোনায় আক্রান্ত একজন রোগীর মৃত্যু হলে একদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তার স্বজনদের কাছ থেকে ছয় লক্ষাধিক টাকা বিল আদায় করেছে, অন্যদিকে লাশ ফেরৎ দিয়েছে সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায়। স্বজনদের আপত্তি ও অনুরোধ সত্ত্বেও লাশের শরীরে সাধারণ একটি কাপড় বা চাদর দিতেও সম্মত হয়নি কর্তৃপক্ষ। শুধু তা-ই নয়, লাশ দাফনের জন্য আগত স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল প্রতিনিধিরা কাপড় বা চাদরের মূল্য হিসেবে টাকা দিতে চাইলে অসম্মতি জানিয়ে কর্মকর্তারা বলেছেন, এটা নাকি ওই হাসপাতালের ‘সিস্টেমে’ নেই! ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আপত্তি উঠেছে একাধিক কারণে। অত্যধিক পরিমাণ অর্থের বিল এর প্রথম কারণ। পর্যালোচনায় দেখা গেছে এবং তথ্যাভিজ্ঞরাও জানিয়েছেন, ৯ দিনে কোনো চিকিৎসক রোগীর কাছে না গেলেও চিকিৎসকদের ভিজিটের নামে লাখের ওপরে টাকা আদায় করা হয়েছে। ওষুধের জন্যও বড় অংকের টাকা আদায় করেছে হাসপাতাল। অথচ রোগীর স্বজনরা জানিয়েছেন, প্রতিটি প্রয়োজনীয় দামী ওষুধই তারা বাইরের দোকান থেকে কিনে এনে দিয়েছেন। সে কারণে ওষুধের জন্য এত বেশি টাকা আদায় করার কোনো সুযোগ ছিল না। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সেটাই করেছে। অক্সিজেনের মূল্যও তারা অনেক বেশি আদায় করেছে। সঠিক পরিমাণ সম্পর্কে জানাতে না পারলেও স্বজনরা বলেছেন, ৯ দিনে রোগীকে সব মিলিয়ে যে পরিমাণ অক্সিজেন দেয়া হয়েছে তার তুলনায় অন্তত বিশগুণ বেশি অক্সিজেনের মূল্য আদায় করা হয়েছে। 

‘সার্ভিস চার্জের’ নামেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা আদায় করেছে। অথচ চরম বিপদের মুহূর্তেও রোগী ও তার স্বজনরা অনেক ডাকাডাকি করেও কোনো ডাক্তার বা নার্সকে পাননি। রোগীর বিছানার চাদরও একবারের বেশি পাল্টানো হয়নি। বড়কথা, লাশ যখন উলঙ্গ অবস্থায় ফেরৎ দেয়া হচ্ছিল স্বজনরা তখন ৯ দিনের ব্যবহৃত চাদরটি লাশের শরীরে বিছিয়ে দেয়ার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু কথিত ‘সিস্টেমের’ দোহাই দিয়ে সে চাদরটিও দেয়া হয়নি। এতটাই কঠিন ওই হাসপাতালের ‘সিস্টেম’! জিজ্ঞাসার জবাবে পরিচালক পর্যায়ের একজন ব্যক্তি এসব বিষয়ে না জানার ভান করেছেন। কিন্তু তিনিও লাশের জন্য একটি চাদর বা কাপড়ের ব্যবস্থা করেননি। ফলে হাসপাতাল থেকে উলঙ্গ লাশই ‘বুঝে’ নিতে হয়েছে স্বজনদের। এ ব্যাপারে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনটি অবশ্য মৃতের সম্মান রক্ষার পদক্ষেপ নিয়েছে। এর সদস্যরাই লাশের জন্য বাইরে থেকে কাপড়ের ব্যবস্থা করেছে।

বলার অপেক্ষা রাখে না, খবরে উল্লেখিত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একজন করোনা রোগীর এবং তার স্বজনদের সঙ্গে যে আচরণ করেছে তাকে শুধু অমানবিক বলা যথেষ্ট নয়। সকল বিচারে এই আচরণকে জঘন্য ও অমার্জনীয় নিষ্ঠুরতা ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। আমরা ক্ষুব্ধ এবং উদ্বিগ্ন এজন্য যে, রাজধানীর অন্য অনেক হাসপাতালেও অনেককেই কমবেশি একই ধরনের অমানবিক নিষ্ঠুরতার শিকার হতে হচ্ছে। যেমন ক’দিন আগে ধানমন্ডি ২নং রোডে অবস্থিত এক ‘নাম করা’ ও ‘জনপ্রিয়’ হাসপাতালে একজন রোগীর নামে প্রায় ছয় লাখ টাকার বিল করা এবং টাকা দেয়ার জন্য স্বজনদের ওপর চাপাচাপি করা হয়েছিল। স্বজনরা তখন ৯৯৯ নাম্বারে ফোন করে পুলিশ ডেকে এনেছিলেন। পুলিশকে দেখেই এক লাফে ছয় লাখ টাকা নেমে এসেছিল মাত্র ১৫ হাজারে! কথাটা এখানে উল্লেখিত রোগীর স্বজনদেরও জানানো হয়েছিল। কিন্তু তারা পুলিশ ডাকতে রাজি হননি। কারণ, ওই হাসপাতালের মালিক নাকি ক্ষমতাসীন দলের একজন এমপি এবং তার ‘হাত’ নাকি ‘অনেক লম্বা’! ফলে নালিশ বা অভিযোগ জানাতে গেলে নাকি হিতে বিপরীত হতে পারে!

আমরা মনে করি, বিশেষ কোনো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবস্থা নেয়ার পরিবর্তে সরকারের উচিত সামগ্রিকভাবে তৎপর হয়ে ওঠা, যাতে কোনো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই বিশেষ করে করোনা রোগী এবং রোগীদের স্বজনদের সঙ্গে এ ধরনের অমানবিক নিষ্ঠুরতা করার কথা চিন্তাও না করতে পারে। কোনো চিকিৎসা না দিয়েও খাতের পর খাত ধরে লাখ লাখ টাকার বিল আদায় করা, দিনের পর দিন বিছানায় ফেলে রেখে রোগীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া এবং সবশেষে লাশের জন্য একটি চাদর পর্যন্ত না দেয়ার মতো অমানবিক ঘটনা যাতে আর ঘটতে না পারে সে ব্যাপারে সরকারকে অবশ্যই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কোন হাসপাতাল মালিকের ‘হাত’ কত ‘লম্বা’Ñ জনগণ অবশ্যই সেটা জানতে চায় না। জনগণের পাশাপাশি আমরাও চাই, চলমান মহামারির সময় কোনো একজন রোগীকেও যাতে বিনা চিকিৎসায় মারা যেতে না হয়, যাতে কোনো রোগীর স্বজনদেরই অযথা লাখ লাখ টাকার বিল গুনতে না হয়। তথাকথিত ‘সিস্টেমের’ নামে কোনো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই যাতে উলঙ্গ অবস্থায় লাশ হস্তান্তর না করতে পারে সে ব্যবস্থাও সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ