বৃহস্পতিবার ০২ ডিসেম্বর ২০২১
Online Edition

আ’লীগ নেতা এনু-রুপনের অর্থ পাচারের চার মামলায় চার্জশিট অভিযুক্ত ৫২

তোফাজ্জল হোসাইন কামাল : ক্যাসিনোকাণ্ড বিরোধী অভিযানের ১০ মাসের মাথায় এসে আলোচিত মামলাগুলোর মধ্যে অর্থপাচারের ৪টি মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) আদালতে জমা দিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি। এই মামলাগুলোয় ক্যাসিনো কারবারে বিপুল অর্থের মালিক বনে যাওয়া ‘ক্যাসিনো ব্রাদার্স’ নামে পরিচিত গেন্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা এনামুল হক এনু ও তার ভাই রুপন ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে বুধবার পৃথক ৪টি অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার তা গনমাধ্যমকে জানানো হয়। চারটি মামলায় ৫২ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

আদালত পুলিশের সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা এসআই সালোয়ার হোসেন জানান, আলোচিত এই দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে গেন্ডারিয়া, ওয়ারী ও সূত্রাপুর থানার অর্থপাচারের চার মামলায় বুধবার বিকেলে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে সিআইডি। তিনি বলেন, আগামী রোববার অভিযোগপত্রগুলো দেখে যাচাই-বাছাই করে সব তথ্য ঠিক থাকলে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম এএম জুলফিকার হায়াতের কাছ থেকে ঢাকার জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজের বিচারিক আদালতে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত হাকিম রোববার অভিযোগপত্রে ‘দেখিলাম’ বলে স্বাক্ষর করবেন।

ঢাকায় ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের মধ্যে গত বছর ২৪ সেপ্টেম্বর এনু-রুপনদের পুরান ঢাকার বানিয়ানগরের বাসায় এবং তাদের দুই কর্মচারীর বাসায় অভিযান চালায় র‌্যাব। সেখান থেকে কয়েকটি বড় বড় সিন্দুক ভর্তি পাঁচ কোটি টাকা এবং সাড়ে সাত কেজি সোনা উদ্ধার করা হয়। এরপর এনু-রুপনের বিরুদ্ধে অর্থপাচার আইনে পাঁচটি মামলা হয়। সেগুলোর মধ্যে চারটি মামলার তদন্ত শেষ করে চার্জশিট দাখিল করল সিআইডি। গেন্ডারিয়া থানার মামলায় ১৬ জন, সূত্রাপুরের দুটি মামলায় ১৫ ও ১০ জন করে এবং ওয়ারী থানার মামলায় ১১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। সবমিলে চার মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে ৫২ জনকে। মামলাগুলো হলো-ওয়ারী থানার মামলা নম্বর ৩৪, সূত্রাপুর থানার মামলা নম্বর ২৯, গেন্ডারিয়া থানার মামলা নম্বর ২৮ এবং সূত্রাপুর থানার মামলা নম্বর ২৭। এগুলোর বাইরে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আলাদা মামলা রয়েছে। ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের পরিচালক এনু ছিলেন গেন্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি। আর তার ভাই রুপন ছিলেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। গত বছর ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার কয়েকটি ক্লাবের সঙ্গে ওয়ান্ডারার্সে অভিযান চালিয়ে জুয়ার সরঞ্জাম, কয়েক লাখ টাকা ও মদ উদ্ধার করে র‌্যাব। এর সূত্র ধরেই এনু-রুপনদের ধরা হয়।

অভিযোগপত্রে নাম নেই ওয়ান্ডারার্স ক্লাব সভাপতি ও যুবলীগ নেতার

ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে ক্যাসিনো খেলে অবৈধ অর্থ উপার্জন করে তা পাচারের উদ্দেশ্যে গোপন রেখেছিল এনামুল হক এনু ও তার ভাই রুপন ভূঁইয়া। র‌্যাবের দেওয়া চার অর্থপাচার মামলায় এই অভিযোগের প্রমাণ পেয়ে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে সিআইডি। তদন্তে এনু ও রুপন ছাড়াও ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক জয় গোপাল সরকারের সম্পৃক্ততা পেয়েছে সিআইডি। তবে ক্লাবের সভাপতি ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট মোল্লা আবু কাওছারের কোনও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেছে সিআইডি। অথচ এই ক্লাবেই ক্যাসিনো খেলার ঘটনাস্থল দেখানো হয়েছে। এছাড়া এনু ও রুপনের চার মামলার অভিযোগপত্রে সংঘবদ্ধ অপরাধের কথা বলা হলেও আসামীর তালিকায় নাম আসেনি আরেক সাবেক যুবলীগ নেতা ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর এ কে এম মমিনুল হক ওরফে সাঈদের।

সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার মো. নাজিম উদ্দিন আল আজাদ বলেন, ‘র‌্যাবের দায়ের করা চারটি অর্থপাচার মামলার তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। চারটি মামলায় বেশিরভাগই কমন আসামী। চার মামলায় ৫২ আসামী হলেও তারা মানুষ ১৮ জন। এই ১৮ জনই চারটি মামলায় আসামী হয়েছেন।’ অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সংঘবদ্ধভাবে অপরাধীরা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অর্থ পাচারের উদ্দেশ্যে নিজেদের কাছে রেখেছিল। আসামীরা এই অর্থ উপার্জনের কোনও বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেনি।’ অভিযোগপত্রে ক্যাসিনোর মাধ্যমে সংঘবদ্ধভাবে এনু ও তার ভাই রুপনের অবৈধ অর্থ উপার্জনের কথা বলা হয়েছে। এজন্য তারা মতিঝিলের ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবসহ কয়েকটি ক্লাবে অবৈধ ক্যাসিনো খেলতো।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক মেহেদী বলেন, ‘আসামীরা সবাই সংঘবদ্ধ হয়ে অপরাধ সংঘটিত করেছে। তারা সংঘবদ্ধভাবে ক্যাসিনো খেলা পরিচালনা করে, উপার্জিত অর্থ পাচারের উদ্দেশ্যে গোপন করেছিল। তদন্তে এই অপরাধের প্রমাণ মিলছে। তাই তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।’ মামলায় এনু ও রুপনসহ তাদের ম্যানেজার, বন্ধু ও কর্মচারীদের আসামী করা হয়েছে। এছাড়া আসামী করা হয়েছে যেখানে ক্যাসিনোর আসর বসাতো এনু ও রুপন সেই ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক জয় গোপাল সরকারকে। তবে একই ক্লাবের তৎকালীন সভাপতি ও সাবেক স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট মোল্লা আবু কাওছারকে আসামী করা হয়নি। এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক মো. মেহেদী বলেন, ‘তার সম্পৃক্ততা আমরা তদন্তে পাইনি। তাই অভিযোগপত্রে তার নাম আসেনি।’ একই ক্লাবের সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে এনু রুপনের ক্যাসিনো কান্ডের সম্পৃক্ততা পেলেও সভাপতির সম্পৃক্ততা পায়নি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। যদিও ক্যাসিনোকান্ডের অভিযানের পর থেকে জনসম্মুখে দেখা যায়নি মোল্লা আবু কাওছারকে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি দেশের বাহিরে রয়েছেন। তাকে নিয়ে বিতর্ক শুরু হওয়ার পর স্বেচ্ছাসেবক লীগ থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক জয় গোপাল সরকারের সম্পৃক্তরা বিষয়ে সিআইডির কর্মকর্তারা জানান, তরুণ বয়সে গোপাল ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের হয়ে খেলেছেন। এরপর ক্লাবের ক্যাশিয়ার ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্য পদ পান। ২০১৪ সালে তিনি ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পর এনু ও রূপনের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে। এই সূত্র ধরে তিনি তাদের ক্লাবে ক্যাসিনো চালাতে সহযোগিতা করেন।

নাম আসেনি সাবেক যুবলীগ নেতার

এনু ও রুপনের চার মামলার অভিযোগপত্রে সংঘবদ্ধ অপরাধের কথা বলা হলেও আসামীর তালিকায় নাম আসেনি সাবেক যুবলীগ নেতা ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর এ কে এম মমিনুল হক ওরফে সাঈদের। সাঈদ যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণ কমিটির যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে তিনি পলাতক।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক মো. মেহেদী জানান, তদন্তে এ কে এম মমিনুল হক ওরফে সাঈদেরও কোনও সংশ্লিষ্টতা পাননি তারা।

তবে র‌্যাব অভিযানের সময় সাংবাদিকদের জানিয়েছিল, ফকিরাপুলে ইয়ংমেন্স ক্লাব, ওয়ান্ডারার্স ক্লাব, গুলিস্তানের মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্র ও বনানীর গোল্ডেন ঢাকা ক্লাবের মধ্যে ওয়ান্ডারার্স ক্লাবটির ক্যাসিনোর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন বিতর্কিত নেতা মমিনুল হক। এই ক্লাবে নিয়মিত ক্যাসিনো, জুয়া, মাদকের আসরের পেছনের কারিগর তিনিও।

চার মামলায় প্রায় পাঁচ কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত নগদ টাকার উল্লেখ করা হয়েছে, যে টাকা তারা পাচারের উদ্দেশ্যে গোপন করে রেখেছিল। এর মধ্যে গেন্ডারিয়া থানার ২৮ নম্বর মামলায় এক কোটি ৯৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা, সূত্রাপুর থানার ২৭ নম্বর মামলায় ১৭ লাখ ১৬ হাজার ৩শ’ টাকা। অপরদিকে, ওয়ারী ও গেন্ডারিয়া দুটি মামলায় ২ কোটি ও ৮৮ লাখ টাকা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অভিযোগের প্রমাণ মিলছে বলে জানান তদন্ত কর্মকর্তা। 

জানা গেছে, এনু-রুপনের নামে ব্যাংকে ১৯ কোটি টাকা এবং পুরান ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ১২৮টি ফ্ল্যাটের খোঁজ মিলেছে। ক্যাসিনো ব্যবসার মাধ্যমে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন এ দুই ভাই।

অন্যদিকে দুর্নীতি দমন কমিশনও এনু-রুপনের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে পৃথক দুটি মামলা করে। মামলায় এনুর বিরুদ্ধে ২১ কোটি ৮৯ লাখ ৪৩ হাজার টাকার আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের এবং রুপনের বিরুদ্ধে ১৪ কোটি ১২ লাখ ৯৫ হাজার ৮৮২ টাকার আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়। তবে দুদক এখনো এ বিষয়ে আদালতে কোনো প্রতিবেদন জমা দেয়নি। এনু-রুপনের আয়ের বড় উৎস ছিল মতিঝিলের ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে ক্যাসিনো ব্যবসা।

চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি কেরানীগঞ্জের একটি ভবন থেকে এক সহযোগীসহ গ্রেফতার হন এনু-রূপন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ