বৃহস্পতিবার ০২ ডিসেম্বর ২০২১
Online Edition

একের পর এক বেরিয়ে আসছে স্বাস্থ্য বিভাগের কুকীর্তি

স্টাফ রিপোর্টার : ফাঁস হয়ে যাচ্ছে স্বাস্থ্যবিভাগের নানা কুকীর্তি।  বেরিয়ে আসছে নানা অনিয়ম আর দুর্নীতির খবর। বিশেষ করে দেশে করোনা সংক্রমণের পর থেকে বেপরোয়া দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে আমলা থেকে শুরু করে নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের রুই-কাতলারাও।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন আলোচনা-সমালোচনার পর কিছু মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলেও বাইরে রয়ে যাচ্ছে প্রভাবশালী মহল। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি কোনোভাবেই কমবে না।

গত মার্চ মাসে বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকেই এই প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় স্বাস্থ্য বিভাগের নেয়া পদক্ষেপের কার্যকারিতা, কর্তৃপক্ষের নিজেদের মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ, তথ্য লুকানোর অভিযোগের মত নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা ছিল বাংলাদেশের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে।

মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ পদত্যাগ করার পর আবারো আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে সেই বিষয়গুলো।

মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ এমন একটা সময় পদত্যাগ করলেন যখন করোনাভাইরাস পরীক্ষার ফল নিয়ে জালিয়াতি করা রিজেন্ট হাসপাতাল কীভাবে করোনাভাইরাস পরীক্ষা ও চিকিৎসার অনুমোদন পেয়েছিল, তা নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মধ্যে বিতর্ক চলছে।

করোনাভাইরাস পরীক্ষায় জালিয়াতির অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় গত ৭ জুলাই ঢাকায় রিজেন্ট হাসপাতালে র‌্যাবের অভিযানের পর বন্ধ করে দেয়া হয় হাসপাতাল।

রিজেন্ট হাসপাতালের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

পরে অনিয়মের অভিযোগে রিজেন্ট হাসপাতাল বন্ধ করে দেয়া হলে মন্ত্রী জানান যে অধিদফতরের আমন্ত্রণেই তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। অন্যদিকে মহাপরিচালক দাবি করেছিলেন যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশেই তারা চুক্তিটি করেছিলেন।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সম্প্রতি এই বিষয়টি নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়ালে মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মধ্যে দ্বন্দ্বের বিষয়টি জনসমক্ষে আসে, যেটিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের পদত্যাগের একটি কারণ হিসেবে মনে করছেন অনেকে।

তবে সম্প্রতি স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের এই খবর প্রকাশিত হওয়ার আগেও বেশ কয়েকবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়হীনতা ও কার্যক্রম পরিচালনায় অস্বচ্ছতার বিষয়টি সামনে এসেছে।

দুর্নীতি বিরোধী বেসরকারি সংস্থা টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড: ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, লাইসেন্স ছাড়াই হাসপাতাল ক্লিনিক চালানোসহ স্বাস্থ্যখাতে কেনাকাটা এবং চিকিৎসায় অনিয়ম একটা প্রাতিষ্ঠানিক চেহারা পেয়েছে। এখন দৃশ্যমান কিছু ঘটনায় সরাসরি জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। কিন্তু পেছনের রুই-কাতলাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে দীর্ঘ মেয়াদে কোন ফল হবে না বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

বিশ্লেষকদের অনেকে বলেছেন, যেহেতু অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগের ক্ষেত্রে পেছনের শক্তিকে চিহ্নিত করার পদক্ষেপ এখনও দৃশ্যমান নয়। সেজন্য অনিয়মে সরাসরি জড়িত বা প্রকাশ্যে থাকা কিছু লোকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা যে নেয়া হচ্ছে, তা লোক দেখানো কিনা- এমন সন্দেহ থেকে যাচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক ড: শাহনাজ হুদা বলছেন, "যেটা বার বার বলা হচ্ছে যে মন্ত্রণালয়ের একটা সি-িকেট আছে। যেটা সবাই বলছে। অবশ্যই তাদের উচ্চপর্যায়ের অনেকের সাথে কানেকশন আছে। এবং এটা যদি আমরা না ধরতে পারি, তাহলে স্বাস্থ্যখাতের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরবে না।"

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি এবং সাবেক স্বাস্থ্য মন্ত্রী আ.ফ. ম. রুহুল হক বলেছেন, "মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এখন অনিয়ম দুর্নীতির পেছনের শক্তিকে চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। তা না হলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে মানুষের এমনিতেই অনাস্থা আছে, সেটা আরও বাড়বে।"

মার্চ মাসে বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর যথেষ্ট পরিমাণ পরীক্ষা না করা, তথ্য গোপন করা থেকে শুরু করে নানারকম অভিযোগ ওঠে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে।

তবে কর্তৃপক্ষের নিজেদের মধ্যে সমন্বয়হীনতার বিষয়টি প্রথমবার জনসমক্ষে প্রকাশিত হয় এপ্রিল মাসের শুরুর দিকে, যখন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক এক বৈঠকে বক্তব্য রাখার সময় আক্ষেপ করে বলেন যে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে তৈরি করা জাতীয় কমিটির তিনি প্রধান হলেও সেই কমিটির নেয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তিনি জানেন না।

এর পাশাপাশি মাস্ক নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের পরিচালককে বদলি, আইইডিসিআরের কাছ থেকে করোনাভাইরাস পরীক্ষার দায়িত্ব সরিয়ে নেয়ার মত ঘটনাগুলোও বেশ আলোচনার তৈরি করেছিল।

করোনাভাইরাস আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার পর হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা না পাওয়া, রোগী দেখার ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের অবহেলা, ভিআইপি'দের জন্য আলাদা হাসপাতাল এবং কিছু হাসপাতালের সরকারি নির্দেশনা না মানার অভিযোগ ওঠে স্বাস্থ্য বিভাগের বিরুদ্ধে।

এরকম প্রেক্ষাপটে জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে স্বাস্থ্য সচিব আসাদুল ইসলামকে বদলি করা হয়।

সচিবের বদলির সপ্তাহখানেকের মধ্যেই মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন অতিরিক্ত সচিব এবং উপসচিবকেও বদলি করা হয়।

এরই মধ্যে করোনাভাইরাস পরীক্ষা নিয়ে জেকেজি হেলথকেয়ারের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে এবং কীভাবে ঐ প্রতিষ্ঠান কোভিড পরীক্ষার অনুমোদন পেল, তা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

জেকেজি কেলেঙ্কারির ঘটনার কিছুদিন পরই রিজেন্ট হাসপাতালের জালিয়াতি আর কেলেঙ্কারির ঘটনা সামনে আসে।

রিজেন্ট হাসপাতাল এবং এর মালিক মো: সাহেদের বিরুদ্ধে প্রতারণার নানা অভিযোগ যখন ওঠে, তখন হাসপাতালটির লাইসেন্স না থাকার পরও এর সাথে সরকারের চুক্তি করার বিষয়টি আলোচনায় আসে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন বাংলাদেশে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বারবার দুর্নীতি, অনিয়ম, জালিয়াতির অভিযোগ ওঠায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওপর সরকারের উপর মহল থেকে ক্রমশ চাপ বাড়ছিল, যার ধারাবাহিকতায় মহাপরিচালকের এই সিদ্ধান্ত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ