মঙ্গলবার ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

মজুদ পড়ে আছে ৩ হাজার কোটি টাকার কাঁচা চামড়া

স্টাফ রিপোর্টার : ২০১৭ সাল থেকে তিন বছর ধরে তিন হাজার কোটিরও বেশি টাকার চামড়া মজুত পড়ে আছে।  এছাড়া বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়া,  নীতি সহায়তার অভাবসহ বিভিন্ন কারণে ধারাবাহিকভাবে কমছে চামড়া  ও  চামড়াজাত পণ্য রফতানি আয়।
জানা গেছে, হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি কারখানা সাভারে স্থানান্তর, বৈশ্বিক চাহিদা হ্রাস এবং সর্বশেষ মহামারি করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) ধাক্কায় মজুত পড়ে আছে এসব কাঁচা চামড়া। এর মধ্যে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার রফতানিযোগ্য ফিনিশড লেদারও রয়েছে, যা করোনাভাইরাসের কারণে রফতানি করতে পারেনি ট্যানারিগুলো। এতে করে ক্রয়াদেশ বাতিল হচ্ছে। নতুন করেও আসছে না ক্রয়াদেশ। এমন সংকটে থাকা চামড়া শিল্পখাতের প্রতিষ্ঠানগুলো আসন্ন কোরবানির ঈদে পশুর কাঁচা চামড়া সংগ্রহ নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছে। এ সংকট থেকে উত্তরণে ঈদের আগে ব্যাংক ঋণের নিশ্চয়তাসহ প্রয়োজনীয় নীতিসহায়তা চান ব্যবসায়ীরা।
চামড়া শিল্পের বর্তমান অবস্থা ও আসন্ন ঈদে কোরবানির পশুর চামড়া কেনার প্রস্তুতির বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, এবার আমাদের প্রস্তুতি তেমন নেই। কারণ অর্থ সংকট। তাই এখন আমাদের প্রস্তুতি হবে ব্যাংকের ঋণের ওপর নির্ভর করে। ব্যাংকগুলো আমাদের যে পরিমাণ ঋণ দেবে সেই হিসেবেই আমরা প্রস্তুতি নেব।
এবার আমরা ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে তেমন সহযোগিতা পাব না। কারণ গত তিন বছর ধরে আমাদের রফতানি কমছে। মহামারির কারণে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে রফতানি একেবারেই বন্ধ। ফলে অর্থ সংকটে গত বছরের নেয়া ঋণ পরিশোধ করতে পারিনি। তাই ব্যাংকের শর্ত অনুযায়ী ঋণ পেতে আমাদের সমস্যা হবে, যদি ব্যাংকগুলো নমনীয় না হয়।
জানা গেছে, প্রতি বছর ঈদুল আজহার আগে ব্যাংকগুলো কাঁচা চামড়া কেনার জন্য ব্যবসায়ীদের ঋণ দেয়। নিয়ম অনুযায়ী যারা আগের বছরের ঋণ পুরোপুরি শোধ করেন শুধু তারাই এ ঋণ পান। ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্কের বিবেচনায়ও অনেক প্রতিষ্ঠান ঋণ দিয়ে থাকে।
এদিকে আসন্ন কোরবানির ঈদে চামড়া শিল্পের ব্যবসায়ী ও শিল্প প্রতিষ্ঠান যেন কাঁচা চামড়া ক্রয় করতে সক্ষম হয় সে লক্ষ্যে ব্যাংকগুলো অগ্রাধিকারভিত্তিতে ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা নেবে। ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক জামানত গ্রহণের বিষয়টি নমনীয়ভাবে দেখার জন্য সম্প্রতি নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ট্যানারি ব্যবসায়ী শাহীন আহমেদ বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সব কথা কি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো শোনে? যদি শুনতো তাহলে যারা খারাপ গ্রাহক, যারা ঋণ নিয়ে ফেরত দেবে না বোঝা যায়, তাদের হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ দিতো না। যারা প্রকৃত ব্যবসায়ী তাদের ঋণের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হতো না। আমরা সংশ্লিষ্ট সবাইকে জানিয়েছি। ব্যাংকগুলো সহযোগিতা না করলে এবার কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে।
গতবারের কেনা চামড়া এবার মজুত কেমন আছে জানতে চাইলে ট্যানারি মালিকদের সংগঠন বিটিএ’র সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, ২০১৭ সাল থেকে গত তিন বছর যাবত চামড়া মজুত পড়ে আছে। এর মধ্যে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার ওয়েট ব্লু চামড়া মজুত রয়েছে। এছাড়া রফতানিযোগ্য প্রায় ৭০০ কোটি টাকার ফিনিশড লেদার পড়ে রয়েছে। যেগুলো রফতানির অর্ডার ছিল কিন্তু করোনার কারণে শিপমেন্ট হয়নি। এগুলো ডিসেম্বরের অর্ডার ছিল, চীন-ইতালিসহ বিভিন্ন দেশের এই অর্ডার প্যাকেজিং অবস্থায় পড়ে আছে। এখন অনেকে অর্ডার ক্যানসেল (বাতিল) করছে। আগের অর্ডারগুলো শিপমেন্ট করতে পারলে আমরা নতুন করে আরও অর্ডার নিতে পারতাম।
বিশ্ব বাজারের পরিস্থিতিও ভালো নয় উল্লেখ করে বিটিএ সভাপতি বলেন, মানুষ তার জীবন-জীবিকার খরচ মিটিয়ে যখন বাড়তি টাকা থাকে তা দিয়ে বিলাসী পণ্য কেনে। এখন যে বৈশ্বিক অবস্থা, তাতে সবাই যে সংগ্রামে পড়েছে, তাতে বেচাকেনার খুব সম্ভাবনা দেখছি না। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সরকারের সহযোগিতা ছাড়া সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে সরকার যে বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সেখানে আমরা ঋণ পাচ্ছি না। আমরা চাই প্যাকেজের আওতায় আমাদের যেন ঋণ সুবিধা দেয়া হয়। তা না হলে টিকে থাকা কঠিন হবে।
ট্যানারি মালিকরা চলমান পরিস্থিতিতে চামড়ার দর নির্ধারণ না করার পক্ষে জানিয়ে শাহীন আহমেদ বলেন, যদি সরকার দর নির্ধারণ করে আমাদের সঙ্গে আলোচনা করেই করবে বলে আশা রাখি। আগামী ২৬ তারিখ সরকার বৈঠক ডেকেছে। আশা করছি আড়তদার, ট্যানারি ও ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্ট সবার মতামত নিয়ে এ দর নির্ধারণ করবে। তবে আমাদের ক্ষমতার বাইরে চলে গেলে আমরা সরকারের বেঁধে দেয়া দরে কাঁচা চামড়া কিনতে পারবো না। কারণ কেউ মহামারির এ সময়ে চামড়া কিনে লস করতে চাইবে না।
এদিকে ২০২১ সালের মধ্যে চামড়া খাত থেকে ৫০০ কোটি ডলার রফতানি আয়ের লক্ষ্য ধরে ২০১৭ সালে চামড়া শিল্পকে ‘প্রোডাক্ট অব দ্য ইয়ার’ ঘোষণা করেছিল সরকার।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি করে আয় হয়েছিল ১১৬ কোটি ৯ লাখ মার্কিন ডলার। পরের অর্থবছর (২০১৬-১৭) রফতানি আয় বেড়ে দাঁড়ায় ১২৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার, প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ২৯ শতাংশ। এর পরের বছর (২০১৭-১৮) এই খাত থেকে রফতানি আয় ১২ শতাংশ কমে যায়, আসে ১০৮ কোটি ৫৫ লাখ ডলার। এরপর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। আগের অর্থবছরের চেয়ে ৬ দশমিক ০৬ শতাংশ কমে রফতানি আয় দাঁড়ায় ১০১ কোটি ৯৮ লাখ ডলারে।
সদ্য সমাপ্ত ২০১৯-২০ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানিতে আয় হয়েছে ৭৯ কোটি ৭৬ লাখ ডলার, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৭ শতাংশ কম এবং আগের অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ২২ শতাংশ কম। গত অর্থবছর চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রফতানির লক্ষ্য ধরা হয়েছিল ১০৯ কোটি ৩০ লাখ ডলার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ