বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

আজ গাজী সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজীর মৃত্যুবার্ষিকী

 

গাজী সৈয়দ মরহুম মওলানা আবু মোহাম্মদ সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজী ১৯ ও ২০ শতকে বাঙালি মুসলিম জাগরণের প্রবক্তাদের অন্যতম একজন। তিনি মুসলিমদের জন্য বিজ্ঞান সাধনা, মাতৃভাষা চর্চা, নারী শিক্ষা বিষয়ে লেখালেখি করেছেন। তাঁর ‘অনল প্রবাহ’ গ্রন্থটি ব্রিটিশ সরকার বাজেয়াপ্ত করে তাকে দুই বছর সশ্রম কারাদ- প্রদান করেন। গাজী শিরাজী একাধারে কবি, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, যোদ্ধা, ঔপন্যাসিক, সমাজ সংস্কারক, বিশিষ্ট রাজনৈতিক চিন্তাবিদ, শিক্ষাব্রতি, বাগ্মী, শ্রেষ্ঠ দানশীল, সমাজ হিতৈষী ও দেশপ্রেমিক ছিলেন।

গাজী শিরাজী ১৩ই জুলাই ১৯৮০ সালে সিরাজগঞ্জের বানীকুঞ্জ শিরাজী বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৩১ সালের ১৭ই জুলাই ইন্তেকাল করেন। শিরাজী পাঠশালা ফার্সিও বাড়িতে সাংস্কৃত ভাষা শিখেছিলেন। অধ্যায়ন করেছিলেন বেত, মনস্মৃতি, মহাভারত, উপনিষদ প্রভৃতিও। গাজী ইসমাইল হোসেন শিরাজী বক্তা হিসাবে খ্যাতিমান ছিলেন। তৎকালীন বাঙালি মুসলমানদের পুনর্জাগরণ ও রাজনৈতিক বিষয়ে তিনি বক্তৃতা করতেন। তিনি হিন্দু, মুসলিম, সাম্যে বিশ্বাসী ছিলেন। যেমন কংগ্রেস, পরবর্তীতে জমিয়ত উলামায়েহীন্দসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সমিতিতে সক্রিয় ছিলেন। ছাত্র অবস্থায় তিনি কবিতা লিখতে শুরু করেন। ধর্মীয় বক্তা মুন্সি মেহেরুল্লাহের এক জনসভায় অনল প্রবাহ কবিতাটি লিখে পাঠ করেন। তিনি কবিতা শুনে মুগ্ধ হন এবং নিজ অর্থ ব্যয়ে ১৯০০ সালে কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশ করেন। ১৯০৮ সালের শেষ দিকে বইটির বর্ধিত সংস্করণ প্রকাশিত হয়। যা তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার বাজেয়াপ্ত করে তার প্রতি গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি করেন। শিরাজী তখন ফরাসী অধিকৃত চন্দন নগরে গিয়ে তার মহাশিখা কাব্য লেখার জন্য ৮মাস আত্মগোপন করে থাকেন। পরে কাব্য গ্রন্থটি শেষ হলে আত্মসমর্পণ করলে ব্রিটিশ সরকার তাকে ২বৎসর কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন।

১৯১৯ সালে শিরাজী মাসিক নুর নামে একটি পত্রিকা বের করেন। তার নিজের কাব্যশিক্ষা মহাকাব্য এবং নজরুলের কয়েকটি গল্প এ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ১৯২৩ সালে শিরাজী ও মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর যুগ্ম সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক সুলতান। গাজী ইসমাইল হোসেন শিরাজী সেই বলিষ্ট রাজনীতিবিদ, ভারতের নেতাজী সুবাস চন্দ্র বসুর মতো নেতা শিল্পকাজে আমার পূর্বে রাস্তায় জুতা রেখে এসে তাকে শ্রদ্ধা প্রণাম জানাতেন। গাজী শিরাজী সেই কবি যিনি তৎকালীন ব্রিটিশ আসনে সমগ্র মুসলিম দেশের মধ্যে “অনল প্রবাহ’ কবিতা শিখে জেল খেটেছিলেন, ইসমাইল হোসেন শিরাজী সেই যোদ্ধা যিনি তুরস্কে যুদ্ধ করে তাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন। গাজী উপাধী নিয়ে রাজকীয় পোষাকে করে তাকে দেশে পাঠানো হয়েছিল। শিরাজী সেই ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ যার মৃত্যুতে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট শোক বার্তা পাঠিয়েছিলেন। শিরাজী সেই দেশ প্রেমিক যিনি মানুষের কল্যাণে ব্রিটিশ কর্তৃক ২৮ বার জেল জুলুম খেটেছিলেন। শিরাজী সেই সমাজসেবী যিনি সুদ প্রথা বাতিলের জন্য সর্বপ্রথম প্রতিবাদ করে কবিতা লিখেছিলেন। শিরাজী সেই চিন্তাবিদ যিনি তৎকালীন সময়ে মুসলমান নারীদের জাগিয়ে তুলতে ভূমিকা রেখেছিলেন। শিরাজী সেই আত্মবিশ্বাসী সম্পন ব্যক্তি ছিলেন যিনি মুসলমানদের হীন নিচ করে লেখা দুর্গেশ নন্দিনীর প্রতিবাদে রায় নন্দিনি লিখে দাঁত ভাঙ্গা জবাব দিয়েছিলেন।

স্বদেশ স্বজাতির প্রতি তার অনাবিল প্রেম যেমন  তাকে এদেশকে প্রাণভরে ভালভাসতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন তেমনি মুসলিম জনগনের প্রতি তার যেমন প্রেম ছিল তারপরেও তিনি যথা সর্বস্ব উৎসর্গ করতেও প্রস্তুত ছিলেন। তিনি ছিলেন সাম্প্রদায়িকতার উর্ধ্বে। হিন্দু-মুসলিম উভয় সমাজের মিলনের জন্য অত্যন্ত উদগ্রীব। শুধু কথায় নয় কাজেও তিনি তার নৈতিক আদর্শের প্রতি অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছেন। দেশ জাতির জন্য তিনি কি না করেছেন। জেল যুলুম খেটেছেন। অর্ধহারে অনাহারে জীবন কাটিয়েছেন। তবুও নত হননি।

যে বানীকুঞ্জ থেকে তিনি আলো ছড়াতেন সেই বানীকুঞ্জ আজ অন্ধকারে নিমজ্জিত। তার মৃত্যুবার্ষিকী নীরবে আসে আর নীরবেই চলে যায়। এই কি পাওনা ছিল তার দেশ ও জাতির কাছে? এই খ্যাতিমান মহাপুরুষের জন্ম মৃত্যুবার্ষিকী জাতীয়ভাবে পালন হয় না তার মৃত্যুতে জাতীয় পত্রিকাগুলোতে কোন বাণীও প্রকাশিত হয় না। টিভি চ্যানেলগুলে তে কত অখ্যাত মানুষকে বিখ্যাত করে তোলা হয় অর্থচ প্রকৃত গুণীদের কোন স্থান নেই। এ দুঃখ রাখার জায়গা কোথায়? শীতের দিনে যেমন শরীরকে উষ্ণ করে নিতে রোদ্রের তাপ গ্রহণ করতে হয় তেমনি জাতির দুর্দিনে এই সব খ্যাতিমান মানুষের আদর্শ জীবনে লালন পালন ধারণ না করলে জাতির উন্নতি সাধিত হয় না। এজন্যই বিদ্রোহ কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেন , সত্যকে স্বীকার না করলে মনুষ্যত্বের অপমান হয়। আর সুন্দরকে বরণ না করলে দুর্গতি ঘিরে আসে।

১৯৩১ সালের ১৭ই জুলাই মহীরুহু ব্যক্তি তার জন্ম কর্ম ও সমাধি ভূমির বাণীকুঞ্জে চিরনিদ্রায় ঘুমিয়ে আছে। যে শিরাজী এই বানীকুঞ্জ থেকে যে আলো ছড়িয়েছিলেন আজ সেই বানীকুঞ্জ অন্ধকারে নিমজ্জিত। প্রেসবিজ্ঞপ্তি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ