বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

নদনদীর পানি বিপদসীমার ওপরে বন্যার আরো বিস্তার ॥ দুর্গতরা চরম দুর্ভোগে

গতকাল নওগাঁর আত্রাই-বান্দাইখাড়া সড়কের জাতআমরুল নামক স্থানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হচ্ছে -সংগ্রাম

সংগ্রাম ডেস্ক : গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ, আত্রাই, মানিকগঞ্জ, লালমনিরহাটসহ বিভিন্ন জেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটেছে। নদনদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভাঙছে। নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ায় লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়ছে। দুর্গতদের দুর্ভোগ বাড়ছে। অবিলম্বে বিশুদ্ধ খাবার পানিসহ জরুরি ত্রাণ সাহায্য প্রয়োজন।

গাইবান্ধা থেকে জোবায়ের আলী : ভারি বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে গাইবান্ধায় যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘট, তিস্তা ও করতোয়াসহ সবকটি নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ফুলছড়ি পয়েন্টে বিপদসীমার ১১৮ সেন্টিমিটার ও ঘাঘট নদীর পানি গাইবান্ধা শহরের নতুন ব্রিজ পয়েন্টে বিপদসীমার ৯৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে গাইবান্ধা-সাঘাটা আঞ্চলিক সড়কের উল্যা ভরতখালী এলাকার বিভিন্ন স্থানে বাঁধের উপর দিয়ে পানি যাচ্ছে। এই সড়কের ১০টি পয়েন্ট ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। বালুর বস্তা দিয়ে বন্যার পানি ঠেকানোর চেষ্টা করছে স্থানীয়রা। হুমকিতে রয়েছে কয়েকটি স্লুইসগেট। যেকোনো সময় ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

জানা গেছে, ঘাঘট ও করতোয়ার পানি বৃদ্ধির ফলে গাইবান্ধা সদর উপজেলার কামারজানি ইউনিয়ন ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে সাঘাটা উপজেলার হলদিয়া ও জুমারবাড়ী ইউনিয়নের পালপাড়া, চিনিরপটল, চকপাড়া, পবনতাইড়, থৈকরপাড়া, বাঁশহাটা, মুন্সিরহাট, গোবিন্দি, নলছিয়াসহ ১৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদ ও যমুনা নদীর ডান তীরঘেঁষা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধটি চরম হুমকির মুখে পড়েছে।

সুন্দরগঞ্জ উপজেলার চণ্ডীপুর, কাপাসিয়া, তারাপুর, বেলকা, হরিপুর ও শ্রীপুর গ্রাম বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। এ উপজেলার ১৫টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। অস্বাভাবিকভাবে পানি বৃদ্ধির ফলে গত কয়েক বছরের মতো বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে যেকোনো সময় দেখা দিতে পারে ভয়াবহ বন্যা। তাই বন্যা আতঙ্কে রয়েছেন জেলার সাত উপজেলার কয়েক লাখ মানুষ।

ফুলছড়িতে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কায় চরাঞ্চলের এসব মানুষ শঙ্কিত হয়ে পড়ছেন। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও উঁচু স্থানে আশ্রয় গ্রহণ করা এসব মানুষের মাঝে বিশুদ্ধ পানি ও পয়োনিষ্কাশন সমস্যা দেখা দিয়েছে। এছাড়া পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। ফুলছড়ি উপজেলার গজারিয়া, খাটিয়ামারী ইউনিয়নের বেশিরভাগ এলাকা বন্যার পানিতে নিমজ্জিত। এ উপজেলার প্রায় ১৫টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। সাঘাটার হাটভরতখালী এলাকার কৃষক জাকির হোসেন জানান, ভরতখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গেটসংলগ্ন পশ্চিমে বস্তা দিয়ে পানি রক্ষার চেষ্টা করা হচ্ছে। এ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধটি হুমকির মুখে রয়েছে।

সাঘাটা উপজেলার ভরতখালি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শামছুল আজাদ শীতল জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ড সময়মতো কাজ না করার কারণে গাইবান্ধা-সাঘাটা আঞ্চলিক সড়কের ১০ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ হুমকিতে রয়েছে। ফুলছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু রায়হান দোলন বলেন, বন্যা কবলিতদের সহযোগিতা করার জন্য উপজেলা প্রশাসন সবসময় প্রস্তুত আছে। এছাড়া বিশুদ্ধ পানি ও পয়োনিষ্কাশন সমস্যার সমাধানের জন্য জরুরি ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। সাঘাটা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর জানান, বন্যা কবলিত মানুষদের তালিকা করে চাল বিতরণ করা হচ্ছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ রক্ষায় সার্বক্ষণিক খোঁজ খবর রাখা হচ্ছে। গাইবান্ধা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা একেএম ইদ্রিস আলী জানান, জেলার সদর, সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা ও ফুলছড়ি উপজেলার ২৬টি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলের ৬০টি গ্রামের এক লাখ ৪৬ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। এর মধ্যে এক লাখ ২২ হাজার ৩২০ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য এ পর্যন্ত ৩২০ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ১৫ লাখ টাকা, শিশুখাদ্য চার লাখ, গোখাদ্য দুই লাখ ও ১৮ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এগুলো বিতরণ করা হচ্ছে।তিনি আরও জানান, বর্তমান পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যা ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। পানি এভাবে বৃদ্ধি পেলে ঝুঁকিপূর্ণ অংশ ভেঙে বাঁধ ভাঙনের আশঙ্কা রয়েছে। বাঁধ রক্ষায় সব ধরনের ব্যবস্থা 

গ্রহণ করা হয়েছে। গাইবান্ধা জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে। জেলার সব নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে ব্রহ্মপুত্র নদ, তিস্তা, ঘাঘট ও করতোয়া নদী তীরবর্তী গাইবান্ধার ৪টি উপজেলার ২৬টি ইউনিয়নের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এসব ইউনিয়নের ১ লাখ ২২ হাজার ৩২০ জন মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। তারা ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছে।

এদিকে বৃহস্পতিবার সকাল ৬টায় ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ফুলছড়িঘাট পয়েন্টে বিপৎসীমার ১১৮ সেন্টিমিটার ও ঘাঘট নদের পানি জেলা শহরের নতুন ব্রিজ পয়েন্টে বিপদসীমার ৯৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। তবে করতোয়া নদীর পানি গোবিন্দগঞ্জের কাটাখালী পয়েন্টে বিপদসীমার ২৫ সেন্টিমিটার এবং তিস্তার পানি কাউনিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ৫০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোখলেছুর রহমান মুঠোফোনে বলেন, অবিরাম বর্ষণ ও উজানের ঢলে প্রতিটি নদ-নদীর পানিই বেড়েছে। যেভাবে পানি বাড়ছে, তাতে বড় বন্যা হতে পারে। বন্যাকবলিত এলাকাগুলোয় বিশুদ্ধ পানি, খাদ্য, শিশুখাদ্য, গো-খাদ্য, নারীদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যসামগ্রী ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার সংকট দেখা দিয়েছে। ঘরবাড়িতে বন্যার পানি ওঠায় পানিবন্দী পরিবারগুলো চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছে। দেখা দিয়েছে খাদ্য সংকটের। রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় যোগাযোগব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গাইবান্ধা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা এ কে এম ইদ্রিশ আলী বলেন, বন্যাকবলিত জেলার ৪ উপজেলার জন্য ৩২০ মেট্রিক টন চাল, ১৫ লাখ টাকা, ৪ লাখ টাকার শিশুখাদ্য, ২ লাখ টাকার গো-খাদ্য ও ৩ হাজার ৬০০ প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ করা হয়েছে। এগুলোর বিতরণ চলমান রয়েছে।

ঝুঁকিতে বাঁধ

গত বুধবার ভোরে ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের ভাষারপাড়া এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ চুঁইয়ে পানি অপর পাড়ে যাওয়ায় বাঁধে গর্তের সৃষ্টি হয়। এতে বাঁধের পশ্চিম পাশে বসবাসকারী ৩০টি গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তারা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য দিগি¦দিক ছোটাছুটি করতে থাকে। অনেককে শুকনো খাবার ক্রয় ও আসবাব রক্ষার প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি ক্রয়ে স্থানীয় দোকানগুলোতে ভিড় করতে দেখা যায়।খবর পেয়ে উপজেলা প্রশাসন, পাউবো, ফায়ার সার্ভিসের কর্মী ও স্থানীয় জনসাধারণ সম্মিলিতভাবে বাঁধ রক্ষার কাজে নেমে পড়েন। জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মতিনের উপস্থিতিতে দিনভর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাঁধটি তাৎক্ষণিক ভাঙন থেকে রক্ষা করা হয়। কিন্তু এখনো ঝুঁকিমুক্ত হয়নি। বৃহস্পতিবারও এই বাঁধটি মেরামতের কাজ চলছিল। এ ছাড়া গাইবান্ধা সদরের খোলাহাটি ইউনিয়নের কিশামত বালুয়া এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ চুঁইয়ে চুঁইয়ে পানি পড়ায় তা ভাঙনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। অপর দিকে ফুলছড়ির মাঝিপাড়া এলাকায় ও গাইবান্ধা সদরের তালতলার বিপরীতেও বাঁধ চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।গাইবান্ধা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান জানান, পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় বর্তমান পরিস্থিতি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। তিনি বলেন, পানি অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পেলে বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ অংশে ভাঙনের আশঙ্কা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় নদী তীরবর্তী সর্বসাধারণকে সতর্ক করতে জেলা প্রশাসনসহ সব সরকারি দপ্তরে জরুরি বার্তা পাঠানো হয়েছে। জরুরি বার্তায় পর্যাপ্ত শুকনা খাদ্য মজুত রাখা, বন্যায় আক্রান্ত লোকদের জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখা, বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসন কার্যক্রমের ব্যবস্থা গ্রহণ করা ও জরুরি ভিত্তিতে মাছ ধরে বিক্রি করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বার্তায় পাউবো বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ভেতরে যেসব স্থান বন্যামুক্ত রয়েছে সেসব স্থানের জনগণকে সতর্ক করে তাদের জানমালের আগাম নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করার বিষয়ে মাইকিং করা হয়েছে। সার্বিক বিষয়ে গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক আব্দুল মতিন বলেন, বন্যা কবলিত মানুষের জন্য সরকারি সহায়তা অব্যাহত আছে। এছাড়াও বাঁধ রক্ষায় জেলা প্রশাসন সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

সিরাজগঞ্জে যমুনার পানি বেড়ে ১১৯ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে পানিবন্দী পৌনে দুলাখ মানুষ

 আব্দুস ছামাদ খান, ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি : উজানের পানি বাড়তে থাকায় সিরাজগঞ্জের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। সিরাজগঞ্জে যমুনার পানি বেড়ে ১১৯ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

এতে প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। তলিয়ে যাচ্ছে রাস্তাঘাট, স্কুল, মসজিদ মাদরাসা। জেলার ৪৫ হাজার পরিবারের প্রায় পৌনে দুই লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।

জেলা পয়েন্টে আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৬টায় পানি বিপৎসীমার ৯০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। কাজিপুর উপজেলা পয়েন্টে বিপৎসীমার ১১৯ সেন্টিমিটার উপরে ছিল। যমুনার পানি বাড়ায় কাজিপুর, শাহজাদপুর ও চৌহালীতে ভাঙন বেড়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এ কে এম রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘গত ২৪ ঘণ্টায় সিরাজগঞ্জে যমুনার পানি ১৯ সেন্টিমিটার বেড়েছে। জেলা পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ৯০ সেন্টিমিটার এবং কাজিপুরে ১১৯ সেন্টিমিটার উপরে রয়েছে।’

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আব্দুর রহিম বলেন, ‘গত কয়েক দিনে জেলার ৪৫ হাজার পরিবারের প্রায় পৌনে দুই লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। বেশিরভাগ মানুষ নিজে উদ্যোগী হয়ে পাশের উঁচু স্থান ও বাঁধে আশ্রয় নিতে শুরু করেছে।’

জেলা প্রশাসক ড. ফারুক আহাম্মদ বলেন, ‘ত্রাণ দপ্তর থেকে ৪০০ টন চাল, দুই লাখ টাকার শিশু খাদ্য, দুই লাখ টাকার গোখাদ্য ও চার হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ পাওয়া গেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মধ্যে জেলার বন্যাদুর্গত এলাকার জন্য ১৪২ টন চাল এবং দুই লাখ ৫৪ হাজার করে টাকা দেওয়া হয়েছে। ১৭৯টি আশ্রয়কেন্দ্র ও ৩০টি মেডিকেল টিম প্রস্তুত রয়েছে। যেকোনো পরিস্থিতিতে দুর্গতদের আশ্রয়কেন্দ্রে আনতে নিজ নিজ উপজেলা কমিটিকে জরুরি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

আত্রাইয়ে তিন স্থানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত 

নাজমুল হক নাহিদ, আত্রাই (নওগাঁ) সংবাদদাতা : নওগাঁর আত্রাইয়ে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। তিন স্থানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। আত্রাই নদীর পানি কিছুটা কমলেও গতকাল বৃহস্পতিবার বিপদসীমার প্রায় ৬৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এদিকে বাঁধ ভেঙে যাবার ফলে আত্রাই-সিংড়া এবং আত্রাই-বান্দাইখাড়া সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে প্রায় ৩০ হাজার পরিবারের লক্ষাধিক মানুষ।

গত কয়েকদিন থেকে আত্রাই নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে উপজেলার ভরতেঁতুলিয়া ও মধুগুড়নই গ্রামে বেড়ি বাঁধ ভেঙে যায়। এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে উপজেলার আত্রাই- বান্দাইখাড়া পাকা সড়কের জাতআমরুল নামক স্থানে এবং আত্রাই- সিংড়া পাকা সড়কের বৈঠাখালী ও পাঁচুপুর নামক স্থানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে অসংখ্য গ্রাম বন্যা কবলিত হয়েছে। বাঁধ ভাঙার ফলে কালিকাপুর ইউনিয়নের গন্ডগোহালী, ধনেশ^র, বাজেধনেশ^র, গোয়ালবাড়িয়া, আহসানগঞ্জ ইউনিয়নের সিংসাড়া, দীঘা, দমদমা, ব্রজপুর, পাঁচুপুর ইউনিয়নের মধুগুড়নই, পাঁচুপুর, ব৭াকিওলমা, কাঁন্দওলমা, বিশা ইউনিয়নের বৈঠাখালী, পারমোহনঘোষ, বিশা, থলওলমাসহ অর্ধশতাধিক গ্রামের প্রায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। পানিবন্দী অনেকে পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে উঁচু বাঁধের উপর আশ্রয় নিয়েছে। উপজেলার জগদাস গ্রামের রহিমা খাতুন বলেন, আমাদের গ্রামসহ পাশ^বর্তী চকবিষ্টুপরের প্রায় অর্ধশত ঘরবাড়িতে পানি ডুকেছে। আমরা চরম আতঙ্কের মধ্যে রয়েছি। এখন পর্যন্ত সরকারী কোন ত্রাণ আমরা পাইনি। ত্রাণের জন্য উপজেলা প্রশাসনের পিআইওকে বলেছি। 

উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) নভেন্দু নারায়ন চৌধুরী বলেন, পানিবন্দী প্রায় ১ হাজার ৮০০ পরিবারের মাঝে ত্রাণ হিসেবে ১০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়েছে। গতকালও পানিবন্দী মানুষের মাঝে ত্রাণ হিসেবে শুকনো খাবার চিড়া, মুড়ি, গুড়, খাবার স্যালাইন বিতরণ করা হয়েছে। এদিকে আত্রাই-সিংড়া এবং আত্রাই-বান্দাইখাড়া সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ওই এলাকার লোকজন চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। বিশেষ করে এসব রুটে চলাচলকারী সিএনজি, অটোচার্জার ও রিক্সা ভ্যান চলকরা চরম বিপাকে পড়েছে। 

এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কে এম কাউছার হোসেন বলেন, গত কয়েক দিনের বৃষ্টির পানি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে উপজেলার কয়েক স্থানের বেড়ি বাঁধ ভেঙ্গে প্রায় ২ হাজার ৫৭ হেক্টর ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে কৃষক অনিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. সানাউল ইসলাম জানান, আত্রাই নদীর পানি বিপদসীমার প্রায় ৭৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। উপজেলা প্রশাষনের পক্ষ থেকে পানিবন্দী পরিবারের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে এবং এ কর্মসূচী অব্যাহত থাকবে। তিনি আরো বলেন যেসব স্থানের সড়কগুলো ঝুঁকিপূর্ণ তা রক্ষায়  জোর চেষ্টা চলছে।

মানিকগঞ্জে যমুনা ও পদ্মার পানি বৃদ্ধি নিম্নাঞ্চল প্লাবিত

মানিকগঞ্জ সংবাদদাতা : পদ্মা-যমুনায় পানি বাড়ায় মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলা চত্বরে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে এ ছাড়া জেলার সাত উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে প্রায় পাচশতাধিক পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।

 গতকাল বৃহস্প্রতিবার শিবালয়ের আরিচা পয়েন্টে যমুনা নদীর পানি ১২ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ৮৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।  

শিবালয় উপজেলার নির্বাহীর অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলার আরুয়া ইউনিয়নের তেঘরিয়া এলাকায় পদ্মা নদীর পানি বিপদসীমার ১০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নিম্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে।

হরিরামপুর উপজেলায় পদ্মা নদীতেও পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। শিবালয়ের পাটুরিয়া এলাকায় যমুনা নদীর সঙ্গে এই নদীর সংযোগ রয়েছে। এছাড়া, ধলেশ্বরী, কালীগঙ্গা, ইছামতিসহ জেলার অভ্যন্তরীণ সব নদীতেই পানি বাড়ছে।

দৌলতপুর উপজেলা যমুনায় পানি বাড়ার ফলে উপজেলার বাঁচামারা, বাঘুটিয়া, চরকাটারী ও জিয়নপুর ইউনিয়নের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। অনেক বসতভিটায় পানি ঢুকেছে।

হরিরামপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দেওয়ান সাইদুর রহমান বলেন, তার উপজেলার রামকৃষ্ণপুর, হারুকান্দি, লেছড়াগঞ্জ, আজিমনগর, ধূলসূড়া ও কাঞ্চনপুর ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এ ছাড়া কয়েকটি এলাকায় পানির স্রোতে কাঁচা রাস্তা ধসে গেছে।

 জেলা প্রশাসক এস এম ফেরদৌস বলেন, দৌলতপুর উপজেলায় দুইশ পরিবার পানিবন্দী অবস্থায় আছে এবং ৫০টি পরিবার সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছেন।

লালমনিরহাটে জমির ফসলের ক্ষতি

লালমনিরহাট সংবাদদাতা : সপ্তাহের ব্যবধানে দ্বিতীয় দফার বন্যায় লালমনিরহাটে ৩শত ৮৭হেক্টর জমির ফসল বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

গত বুধবার ১৫ জুলাই থেকে লালমনিরহাট জেলায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে বন্যায় লালমনিরহাট জেলার ৫টি লালমনিরহাট সদর, আদিতমারী, কালীগঞ্জ, হাতীবান্ধা, পাটগ্রাম উপজেলার ৩শত ৮৭হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শামীম আশরাফ জানান, লালমনিরহাট জেলায় ১শত ৯০হেক্টর আমন বীজতলা, রোপা আমন ১শত ৭১হেক্টর, আউশ ১৬হেক্টর ও সবজি ১০হেক্টর পানিতে তলিয়ে গেছে। রোপা আমন ও আউশ ধানের খুব বেশি ক্ষতি হবে না। তবে সবজির ক্ষতি বেশি হতে পারে। কৃষকরা জানান, দফায় দফায় বন্যায় চলতি মৌসুমের ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

মাদারগঞ্জে বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ ভেঙে নতুন করে ১০ গ্রাম প্লাবিত

জামালপুর সংবাদদাতা : জামালপুরের মাদারগঞ্জ-মাহমুদপুর বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধটি বুধবার লালডোবা এলাকায় বন্যার প্রবল স্রোতে পায় ৫০ মিটার ভেঙ্গে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। কড়ইচুড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক বাচ্চু জানান, বন্যা নিয়ন্ত্র বাঁধটি মুহূর্তের মধ্যে ভেঙ্গে আশপাশ এলাকার প্রায় ১০ টি গ্রাম নতুন করে প্লাবিত হয়ে পড়েছে। 

মাদারগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আমিনুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, বালিজুড়ি ইউনিয়নের যমুনা নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ঝুকিতে রয়েছে। যে কোন সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ