বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

ভুয়া করোনা রিপোর্টে চার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার কথা স্বীকার সাহেদের

গতকাল বৃহস্পতিবার রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. সাহেদকে আদালতে হাজির করা হয় -সংগ্রাম

* ১০ দিনের রিমান্ডে সাহেদ ও মাসুদ

* আদালতে কাঁদলেন সাহেদ, বললেন আমি করোনার রোগী 

* অস্ত্র ও জাল টাকার আরও দুই মামলা 

নাছির উদ্দিন শোয়েব: নমুনা পরীক্ষা না করেই করোনার (কোভিড-১৯) ভুয়া রিপোর্ট দিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে দুই মাসে অন্তত চার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ। গোয়েন্দা পুলিশের কাছে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বিভিন্ন ধরনের প্রতারণার অভিযোগ স্বীকার করেছেন তিনি। এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার সাহেদ ও রিজেন্টের এমডি মাসুদ পারভেজকে ১০ দিন করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন আদালত। এসময় আদালতের কাঠগড়ায় সাহেদ কেঁদে ফেলেন। কেঁদে কেঁদে তিনি বললেন, বাবার মৃত্যুর কথা। বললেন, তিনি নিজেও একজন করোনা ভাইরাসের রোগী। এর আগে সকালে তাকে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়। অপরদিকে অস্ত্র ও জাল টাকা উদ্ধারের ঘটনায় আরও দু‘টি মামলা করা হয়েছে সাহেদের বিরুদ্ধে। 

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে ডিবি কার্যালয়ের গেটে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার আবদুল বাতেন জানান, সাহেদ অনেক কিছুই বলেছেন ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে। তবে এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। পালিয়ে থাকার ব্যাপারেও কথা বলেছেন। টাকা হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়েও কথা বলেছেন তিনি। অতিরিক্ত কমিশনার আবদুল বাতেন আরও বলেন, প্রতিদিনই নতুন নতুন মামলার তথ্য আসছে। অনেক মামলা। সব মামলার তথ্য বিশ্লেষণ করা এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা অনেক সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মাত্রই রিমান্ড মঞ্জুর হয়েছে। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে ধীরে ধীরে সব তথ্য বের হয়ে আসবে।

গোয়েন্দা পুলিশের এই কর্মকর্তা  জানান, র‌্যাবের অভিযানের আগে রিজেন্ট হাসপাতালের উত্তরা শাখা থেকে যন্ত্রপাতিসহ বেশকিছু সরঞ্জাম সরিয়ে ফেলা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন সাহেদ। ডিবির অভিযানে এসব যন্ত্রপাতি উদ্ধার করা হবে। ডিবি সূত্র জানিয়েছে, করোনাকালীন দুই মাসে অন্তত চার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন প্রতারক সাহেদ। হাসপাতাল ছাড়াও বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে বেশি দামে পণ্য এনে কম দামে বিক্রি করে টাকা পকেটে ভরেছেন। অথচ কারও টাকা তিনি পরিশোধ করেননি। তার বিরুদ্ধে আরও যেসব অভিযোগ এসেছে, সেগুলোও একে একে স্বীকার করছেন। রিমান্ডে সাহেদ ও মাসুদকে আলাদা আলাদা এবং মুখোমুখি করেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। যদি প্রয়োজন হয় তবে সাহেদকে নিয়ে অভিযান পরিচালনা করা হবে। সাহেদকে রিমান্ডে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলেও জানান তিনি। সাহেদের বিষয় কোনও ভুক্তোভোগী অভিযোগ করতে চাইলে তাদের অভিযোগ নেওয়া হবে বলে জানান বাতেন। 

সাহেদ ও মাসুদ ১০ দিনের রিমান্ডে: সাহেদ এবং প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসুদ পারভেজকে ১০ দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। আর সাহেদের প্রধান সহযোগী তরিকুল ইসলাম ওরফে তারেক শিবলীর দ্বিতীয় দফায় সাতদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল সকাল ১০টায় তাদের তিনজনকে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করা হয়। মহানগর হাকিম আদালতের কলাপসিবল গেইট বন্ধ রেখে কেবল দুই পক্ষের আইনজীবীদের ভেতরে প্রবেশ করার অনুমতি দেওয়া হয়। সাংবাদিকদের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। আসামিদের বিরুদ্ধে উত্তরা পশ্চিম থানায় দায়ের করা মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তিনজনের ১০ দিন করে রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক এস এম গাফফার আলম। অপরদিকে তাদের আইনজীবী নাজমুল হোসেন রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিনের আবেদন করেন। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে সাহেদ ও মাসুদের ১০ দিনের এবং তরিকুলের সাতদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন ঢাকা মহানগর হাকিম মো. জসিম। আদালত চত্বরে সাহেদের আইনজীবী নাজমুল বলেন, তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ ও জালিয়াতির কথা বলেছে। আমরা তার পক্ষে জামিন আবেদন করেছিলাম। আমরা আদালতকে বলেছি জামিন চাওয়ার অন্যতম কারণ সাহেদ অসুস্থ। পাশাপাশি তার বাবা মারা গেছেন বলে তিনি শোকাহত। তিনি বাংলাদেশের স্থায়ী নাগরিক, দেশ ছেড়ে কোথাও যাবেন না। তাই তাকে রিমান্ডে নেয়ার কোনো প্রয়োজন পড়ে না। তবে আদালত আমাদের আর্জি মঞ্জুর না করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। 

আদালতে কেঁদে যা বললেন সাহেদ: সাহেদ রিমান্ড শুনানিতে আদালতের কাছে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, পুলিশ ও র‌্যাব তার সঙ্গে ‘অন্যায়’ করেছে। আদালতে উপস্থিত রাষ্ট্রপক্ষের একজন আইনজীবী জানিয়েছেন, ‘কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আসামি সাহেদ একসময় কাঁদতে থাকেন। কাঁদতে কাঁদতে বলেন,  ‘আমি দেড় মাস ধরে করোনায় আক্রান্ত। আমার বাবা করোনায় মারা গেছেন। তিনি বলেন, আমরা তাকে বলি শান্ত হোন, আগেই এটা বোঝা উচিৎ ছিল আপনার।’ তার আগে রিমান্ড শুনানির সময় সাহেদ বিচারককে বলেন, তার রিজেন্ট হাসপাতালই প্রথম সরকারের আহ্বানে কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসায় এগিয়ে এসেছিল, যখন অন্য কোনো হাসপাতাল সাড়া দিচ্ছিল না। ‘হাসপাতাল থেকে করোনা আমাকে ও আমার পরিবারকে সংক্রমিত করে। আমি মার্চে প্রথম দিন যখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে যাই, তখন তারা আমাকে আমার হাসপাতালের লাইসেন্স নবায়ন করতে বলেন। তখন আমি বলি আমার লাইসেন্সের ঘাটতি আছে। তখন তারা বলে যে লাইসেন্স নবায়নের জন্য সোনালী ব্যাংকে টাকা জমা দেন। হাসপাতালের নিবন্ধনের মেয়াদ বাড়ানোর জন্য সোনালী ব্যাংকে আমরা টাকাও জমা দিয়েছি। আমি কোনো অপরাধ করিনি। অন্যায়ভাবে র‌্যাব ও পুলিশ আমার হাসপালের বিভিন্ন শাখা সিলগালা করে দিয়েছে।’

মানুষের জীবন-মৃত্যুর মূল্য নেই তার কাছে:  সাহেদ নিজেকে সুধী ও ক্লিন ইমেজের ব্যক্তি বলে দাবি করলেও প্রকৃতপক্ষে সে একজন ধুরন্ধর, অর্থলিপ্সু ও পাষণ্ড প্রকৃতির লোক। অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার প্রশ্নে তার কাছে মানুষের জীবন বা মৃত্যুর কোনও মূল্য নেই।’ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের পরিদর্শক এসএম গাফ্ফারুল আলম সাহেদের রিমান্ড আবেদনে এসব কথা উল্লেখ করেন। রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, ‘সাহেদ নিজেকে সুধী ও ক্লিন ইমেজের ব্যক্তি বলে দাবি করলেও প্রকৃতপক্ষে সে একজন ধুরন্ধর, অর্থ লিপ্সু ও পাষ- প্রকৃতির লোক। অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার প্রশ্নে তার কাছে মানুষের জীবন-মৃত্যুর কোনো মূল্যই নেই। সে তার সহযোগীদের সহায়তায় কোভিড-১৯ পরীক্ষার রিপোর্ট ও চিকিৎসা উভয় ক্ষেত্রে প্রতারণা করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। কোনো রোগী যদি প্রতারণার কথা বুঝতে পেরে, প্রতিবাদ করে তবে সে তাদের বিভিন্নভাবে হুমকি দিত। ফলশ্রুতিতে আর কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পেত না।’ প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত রোগীদের নমুনা পরীক্ষার ফর্মে বিনামূল্যে করার কথা উল্লেখ থাকলেও প্রতিটি রোগীর কাছ থেকে আদায় করত তিন হাজার ৫০০ থেকে চার হাজার টাকা। সেই হিসাবে ছয় হাজার রোগীর কাছ থেকে মোট দুই কোটি ১০ লাখ টাকা আদায় করে।

অস্ত্র ও জাল টাকার মামলা:  সাতক্ষীরার দেবহাটা থানায় সাহেদ ওরফে সাহেদ করিমের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা হয়েছে। বুধবার রাতে মামলাটি রেকর্ড করা হয় বলে জানিয়েছেন দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বিপ্লব কুমার সাহা। ওসি জানান, র‌্যাব-৬-এর সাতক্ষীরা কোম্পানির উপসহকারী পরিচালক মো. নজরুল ইসলাম এ মামলার বাদী হয়েছেন। মামলায় দুইজন আসামির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এরা হচ্ছেন সাহেদ ও বাচ্চু মাঝি। এ ছাড়া একজন অজ্ঞাতনামা আসামিও রয়েছে। রাজধানীর উত্তরায় সাহেদের গোপন কার্যালয় থেকে জাল টাকা উদ্ধারের ঘটনায় আরও একটি মামলা দায়ের করেছে র‌্যাব। র‌্যাব-১ কর্মকর্তা মজিবুর রহমান বাদী হয়ে বুধবার রাতে উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলাটি দায়ের করেন।

ব্যাংকের ঋণ নিয়ে ফেরত দেন না সাহেদ: সাহেদের আরও অনেক অপকর্মের খবর বেরিয়ে আসছে। প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে হাসপাতাল, গাড়ি ও ক্রেডিট কার্ডের বিপরীতে ঋণ নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। কিন্তু টাকা শোধ করার কোনো খবর নেই। ফলে একাধিক ব্যাংকে খেলাপির তালিকায় রয়েছে সাহেদ ও তার মালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। জানা গেছে, সাহেদ প্রথমে ব্যাংকে কিছু টাকা আমানত রাখতেন। কিছুদিন পরই ক্ষমতাসীনদের নাম ভাঙিয়ে ঋণ নিতেন। একবার ঋণ হাতে পেলে আর খবর থাকত না। খেলাপির টাকা চাইলে বিভিন্নভাবে চাপে ফেলতেন ব্যাংকারদের।

সাজা পরোয়ানা মাথায় ১০ বছর: সাহেদকে ১০ বছর আগে প্রতারণার একটি মামলায় ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত। কারাদণ্ডের পাশাপাশি ৫৩ লাখ টাকা জরিমানাও করা হয়। রায়ের পর আদালত থেকে সাহেদের বিরুদ্ধে তখনই সাজার পরোয়ানা জারি করা হয়। এই ১০ বছরে সাজা পরোয়ানা মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন সাহেদ। গ্রেফতারি পরোয়ানা জারিও থাকলেও তাকে গ্রেফতার করেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আদালত সূত্র জানায়, ২০০৮ সালে চেক জালিয়াতির অভিযোগে মজিবর রহমান নামের একজন ব্যবসায়ী সাহেদ করিমের বিরুদ্ধে ঢাকার মহানগর হাকিম আদালতে মামলাটি করেন। সেই মামলায় বিচার শেষে ২০১০ সালের ১৮ আগস্ট ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত সাহেদকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন। একই সঙ্গে, ৫৩ লাখ টাকা জরিমানা করেন আদালত। পরে সাজার পরোয়ানাও জারি করা হয়। 

নাম বদলের সনদ খতিয়ে দেখা হচ্ছে:  রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান স্কুল শেষ করেননি বলে সোশাল মিডিয়ায় আলোচনা থাকলেও জাতীয় পরিচয়পত্রে নিজের নাম সংশোধন করে ‘সাহেদ করিম’ থেকে ‘মোহাম্মদ সাহেদ’ হওয়ার সময় তিনি ‘ও’ লেভেলের সনদ দাখিল করেছিলেন নির্বাচন কমিশনের কাছে। জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম এখন বলছেন, সাহেদের ওই শিক্ষাগত সনদের সত্যতা তারা খতিয়ে দেখবেন। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ