বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

রাজধানীসহ সারা দেশ লোডশেডিংয়ে নাকাল

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল: একদিকে তীব্র গরম। অন্যদিকে তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রাজধানীসহ সারাদেশে

দফায়-দফায় চলছে লোডশেডিং। পিক-অফপিক আওয়ার সমানতালে লোডশেডিংয়ে নাগরিক জীবন নাকাল। অথচ সরকার বলছে, তারা চাহিদার তুলনায় বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। এছাড়া দফায় দফায় লোডশেডিংয়ের ওপর ভূতুড়ে বিলের ‘ঘা’ যোগ হয়ে নাগরিক জীবনকে করে তুলেছে দুর্বিষহ। গ্রাহকরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎচালিত বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশই এখন বন্ধ।  এর ফলে বিদ্যুৎ ঘাটতি থাকার কথা নয়।  আর বিতরণ কোম্পানিগুলোর দাবি, বিদ্যুতের ঘাটতি নেই।  তাহলে লোডশেডিং কেন হচ্ছে?। 

বিদ্যুৎ বিভাগের দাবি দেশে বর্তমানে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ-উৎপাদনের পরিমাণ বেশি। উদাহরণ হিসেবে গেল সপ্তাহের চাহিদা ও উৎপাদন প্রসঙ্গে টেনে বিদ্যুৎ বিভাগ দাবি করে,  গত ১১ জুলাই দিনের বেলায় উৎপাদন ছিল ১৩ হাজার ২২২ মেগাওয়াট। সন্ধ্যায় সর্বোচ্চ ১৪ হাজার ৬৫৫ মেগাওয়াট।  আর চাহিদা ছিল দিনের বেলায় ১১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। সন্ধ্যায় চাহিদা কিছুটা কমে হয় ৯০০০ মেগাওয়াট। তবে, বিদ্যুৎ বিভাগ চাহিদার চেয়ে উৎপাদন বেশি দাবি করলেও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন রাজধানীবাসী। তারা বলছেন, গত কয়েকদিনে রাজধানীর বেশ কিছু এলাকায় দফায় দফায় লোডশেডিংয়ের ঘটনা ঘটছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কয়েক দফা লোডশেডিং হচ্ছে। রাজধানীতে এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে মান্ডা, হাজীপাড়া, রামপুরার কিছু এলাকা, উত্তরখান, মীরপুর, মোহাম্মদপুর, সেগুনবাগিচা, নাখালপাড়া প্রভৃতি।  ৩ থেকে ৪বার সকালে এবং সন্ধ্যার সময় লোডশেডিং হয় বলে এসব এলাকার বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন।

এসব অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী বিকাশ দেওয়ান বলেন, রাজধানীতে লোডশেডিং নেই বললেই চলে। তবে, ট্রান্সমিশনের কারণে সাময়িক সমস্যা হতে পারে।  এর  বাইরে অন্য কোনো সমস্যা আপাতত পাচ্ছি না।

বিদ্যুৎসচিব ড. সুলতান আহমেদ বলেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়ে আমাদের সবসময়ই নির্দেশনা রয়েছে। আগামীতে এ ধরনের সমস্যা আর হবে না বলেও তিনি আশা প্রকাশ  করেন।

  পিডিবির কয়েকজন কর্মকর্তা বলেছেন, সরকারের হাতে যথেষ্ট বিদ্যুৎ থাকার পরও প্রধানত দুটি কারণে গ্রাম ও জেলা শহরে বিদ্যুৎ চলে যায়। এক. গ্রামে যেভাবে বিদ্যুতের লাইন স্থাপন করা হয়েছে, তাতে এটি বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়নি। কারণ, গ্রামের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কম ও এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ির দূরত্ব অনেক বেশি। এতে লাইন স্থাপনে ব্যয় অনেক বেশি। এসব গ্রাহককে বিদ্যুৎ দেওয়া লাভজনক হয় না। সে কারণে ওই সব এলাকায় দিন-রাত মিলিয়ে বিভিন্ন সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ কম থাকে। এতে গ্রামের লোক বিদ্যুৎ পায় কম।

দুই. গ্রামে বিদ্যুতের লাইন গাছের ভেতর দিয়ে। যেকোনো সময় গাছের ডাল ভেঙে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এ ছাড়া চাহিদার চেয়ে ট্রান্সফরমার কম থাকায় বাড়তি লোড নিতে গিয়ে ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণ ঘটে। এসব কারণেও বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে।

দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) এলাকায় ২৭ হাজার কোটি টাকার ১২টি প্রকল্পের কাজ চলছে। ঢাকা দক্ষিণের বিতরণ সংস্থা ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি) সড়কের ওপর দিয়ে যাওয়া বিদ্যুতের লাইন মাটির নিচ দিয়ে নেওয়ার জন্য প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এসব প্রকল্পের কাজ শেষ হলে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন হবে বলে আশা করছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

বিদ্যুৎ উদ্বৃত্ত সত্ত্বেও লোডশেডিং কেন জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ সম্প্রতি গণমাধ্যমকে বলেন, ১১ বছর আগে আওয়ামী লীগ সরকার যখন ক্ষমতায় আসে, তখন মাত্র ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হতো। এখন উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২১ হাজার। সর্বোচ্চ প্রায় ১৩ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন হয়েছে। আগে দেশের ৪৬ শতাংশ মানুষ বিদ্যুতের আওতায় ছিল এখন প্রায় শতভাগ। মানুষ আগে বিদ্যুৎ পেতই না। কিন্তু গত কয়েক বছর মানুষ বিদ্যুতের উন্নত সেবা পাওয়ায় জীবন বদলে গেছে। সে কারণে এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলেই অনেকে মেনে নিতে পারেন না।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিতরণব্যবস্থার উন্নতির জন্য বেশ কিছু প্রকল্পের কাজ চলছে। এসব কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহে কিছু সমস্যা হয়। এ ছাড়া সারা দেশে বিতরণ লাইনগুলো মাটির ওপর দিয়ে নেওয়া। কিছু একটা হলেই সমস্যা সৃষ্টি হয়। দেশে বিদ্যুতের কোনো লোডশেডিং নেই। এটি টেকনিক্যাল সমস্যা। আগামী দুই বছরের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে।

সূত্র মতে, দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন ১৩৭টি। এর সঙ্গে ভারত থেকে আমদানি ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট যুক্ত করলে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা এখন ২০ হাজার ২৭৯ মেগাওয়াট। সরকারি-বেসরকারি ও ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুৎ এককভাবে কিনে থাকে সরকারি সংস্থা পিডিবি। এরপর পিডিবির কাছে থেকে এই বিদ্যুৎ পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) সঞ্চালনের মাধ্যমে সারা দেশের ছয়টি বিতরণ সংস্থাকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে থাকে। এই ছয়টি বিতরণ সংস্থা সারা দেশে বিদ্যুৎ বিতরণ করে। দেশের ইতিহাসে এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ উৎপাদন হয়েছে ২০১৯ সালের ২৯ মে ১২ হাজার ৮৯৩ মেগাওয়াট। বর্তমানে ৯ থেকে সাড়ে ৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। কিন্তু ১১ থেকে ১২ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস বসে আছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ ও পিডিবির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা  বলেছেন, যথেষ্ট বিদ্যুৎ থাকার পরও সারা দেশে বিশেষ করে আরইবির ৮০টি সমিতিতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ থাকে না। এর কারণ হিসেবে সঞ্চালন প্রতিষ্ঠান পিজিসিবিকে দায়ী করা হয়। বলা হয়, পিজিসিবির সক্ষমতা নেই। প্রতিষ্ঠানটি সারা দেশে বিদ্যুৎ সঞ্চালন করতে পারে না।

পিজিসিবির সক্ষমতা জানতে চাইলে সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম কিবরিয়া বলেন, আমাদের কাছে যত বিদ্যুৎ চাওয়া হয়, আমরা তা দিতে সক্ষম। যদি এ মুহূর্তে ১৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সঞ্চালনের চাহিদা পড়ে, পিজিসিবি এটি দিতে প্রস্তুত। আমরা আমাদের সিস্টেম আরও উন্নত করার চেষ্টা করছি। কিন্তু প্রচলিত বাস্তবতার মধ্যেও আমাদের এমন সংকট নেই, যার কারণে লোডশেডিং হবে।

এ বিষয়ে আরইবির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মইন উদ্দিন বলেন, আগে দিনে-রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকত না। এখন অল্প সময়ের জন্য গেলেই মানুষ তা মেনে নিতে পারে না। কারণ, অভ্যস্ততা। মানুষ বিদ্যুৎ ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এটিকে লোডশেডিং বলা যাবে না।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, সক্ষমতার অর্ধেক বিদ্যুৎও উৎপাদন করা হয় না। তাহলে কেন জনগণ লো ভোল্টেজের মানহীন বিদ্যুৎ নেবে, যা আবার দফায় দফায় চলে যাবে। এসব অসংগতি দূর করার জন্য বারবার বললেও বিতরণ সংস্থাগুলো বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার যেসব যুক্তি দেখায়, তা গ্রহণযোগ্য নয়। গ্রামের মানুষ শহরের মানুষের মতোই বিদ্যুতের বিল দেয়, তাদের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ