বুধবার ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

অর্থসংকটে মানুষের স্বাভাবিক জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : প্রতিনিয়ত মানুষের মনে করোনাভাইরাস আতঙ্ক তাড়া করছে। একেকটি দিন পার করার মানে হচ্ছে করোনামুক্ত চ্যালেঞ্জ। গোটা বিশ্বে শুধু আক্রান্ত আর মৃত্যুর হারই বাড়ছে না, মানুষের স্বাভাবিক জীবন-জীবিকা ব্যাপক হুমকির মুখে পড়েছে। স্থবির হয়ে পড়েছে বিশ্ববাজার। বাড়ছে অর্থসংকট। ইতোমধ্যেই ভাটা পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। এই মন্দা স্বাভাবিক হতে কত দিন লাগবে, তাও বলতে পারছেন না অর্থনীতিবিদেরা। দিন দিন দেশজুড়ে ক্ষুধার্ত ও কর্মহীন মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। বন্ধ হওয়ার উপক্রম বহু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। চাকরি হারাচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। করোনাভাইরাস মহামারির কারণে কর্মহীন মানুষ শহর ছেড়ে যেভাবে গ্রামে চলে যাচ্ছে তাতে নতুন সামাজিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে এমনটিই আশংকা বিশ্লেষকদের।
দীর্ঘদিন ধরে কর্মহীনতায় আর্থিক সংকটে রোজগারের আসায় ঢাকায় আসা লাখ লাখ মানুষ বাধ্য হয়ে ছাড়ছে স্বপ্নের শহর। করোনাভাইরাসের প্রভাবে দেশের গার্মেন্ট শিল্পে জড়িত পোশাক শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক, গৃহ শ্রমিক, বিভিন্ন হোটেলে রেস্টুরেন্টে থাকা মানুষগুলো চাকরি হারিয়েছে। করোনার কারণে সবকিছু বন্ধ থাকায় আয়-রোজগার নেই ভাসমান এসব মানুষের। শুধু নিম্নবিত্ত মানুষই নয়, মধ্যবিত্ত পরিবার, ব্যাচেলর, ছাত্র-শিক্ষক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এই সমস্যায় জর্জরিত। গত তিন মাস থেকে আয় বলতেই নেই এই মানুষগুলোর। তাই বিভিন্ন পেশায় জড়িত মানুষজন প্রতিদিনই ঢাকা ছেড়ে গ্রামে যাচ্ছেন।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অনেক বাড়িওয়ালার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে নিম্নবিত্ত অনেক পরিবারই বেশি সমস্যায় পড়ে ঢাকা ছাড়ছে। প্রায় শূন্য হাতে ফিরছেন তারা। তবে মহামারিতে কত মানুষ ঢাকা ছেড়েছে বা কত শ্রমিক বা কর্মী চাকরি হারিয়েছে, তা নিয়ে সরকারি বা বেসরকারি কোনো তথ্য এখনও মেলেনি।
গত ২০ জুন বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের এক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ ছুটির মধ্যে ৯৫ শতাংশ মানুষ উপার্জনের দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ৫১ শতাংশ গৃহে কোনো আয়ই হয়নি। এতে দেখা যায়, আয়হীন পরিবারের সংখ্যা গ্রামের চেয়ে শহরে বেশি। আর নারীর রোজগারে চলে, এমন পরিবারে আয় কমেছে বেশি। শহরে নারীদের কর্মসংস্থানের একটি বড় অংশ ছিল তৈরি পোশাক শিল্পে, সেখানেও চলছে দুরবস্থা। ব্র্যাকের জরিপের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ ছুটি শুরু হওয়ার আগে যেখানে খানাভিত্তিক গড় মাসিক আয় ছিল ২৪ হাজার ৫৬৫ টাকা, সেখানে মে মাসে আয় ৭৬ শতাংশ কমে ৭ হাজার ৯৬ টাকায় নেমে আসে। এক্ষেত্রে শহর এলাকায় আয় কমার হার ৭৯ শতাংশ পল্লী অঞ্চলের ৭৫ তুলনায় কিছুটা বেশি বলে জানানো হয়।
সম্প্রতি বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক ড. বিনায়ক সেন আরেক গবেষণায় দেখিয়েছেন, মহামারির কারণে এ পর্যন্ত ১ কোটি ৬৪ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে। এর মধ্যে শহরের শ্রমিকের আয় কমেছে ৮০ শতাংশ এবং গ্রামীণ শ্রমিকের আয় কমেছে ১০ শতাংশ। বিনায়ক সেন বলছেন, মহামারির আগে দেশে মোট বেকার ছিল ১৭ শতাংশ। এখন তা ১৩ শতাংশ বেড়ে ৩০ শতাংশে পৌঁছেছে। কর্মসংস্থানের জন্য যারা এক সময় রাজধানীতে এসেছিলেন, মহামারিতে এখন তাদের উল্টোযাত্রা দেখা দিলেও ফিরে তারা কী করবেন, সেটা একটা বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ দিকে এখন মনোযোগ দিতে হবে সরকারকে।
বিনায়ক সেন আশঙ্কা করছেন, চলতি বছরের শুরুতে দেশে সার্বিক দারিদ্র্যের হার ২০ দশমিক ৩ শতাংশ থাকলেও বছর শেষে তা ২৫ শতাংশ ছাড়াতে পারে। তিনি বলছেন, বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে যদি শ্রমিকের আয় ৫০ শতাংশ এবং শেষ প্রান্তিকে যদি ৫০ শতাংশ আয় উদ্ধার করা সম্ভব হয়, তাহলে দারিদ্র্যের হার ২৫ শতাংশের মধ্যে রাখা যাবে, নইলে আরও খারাপ পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে।
এদিকে মহামারি করোনায় প্রতিনিয়ত বাড়ছে বেকারত্বের হার। পৃথিবীতে সব দেশে একযোগে চলছে ছাঁটাই, বরখাস্ত, চাকরিচ্যুতি। করোনাভাইরাস শুধু জীবন ও স্বাস্থ্যেই প্রভাব ফেলছে না, এই ভাইরাস সংক্রমণের প্রভাব পড়েছে সব ধরনের অর্থনীতিতেও। যার ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য নিম্নমুখী হওয়াতে কর্মীরা চাকরি হারানোর আতঙ্কে ভুগছেন। এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে পাইলট থেকে শুরু করে নিম্নশ্রেণির পেশাজীবী মানুষকে।
মাত্র একজনের চাকরির অর্থ উপার্জন দিয়ে গোটা পরিবার চলেÍএমন পরিবারের সংখ্যা আমাদের সমাজে সবচেয়ে বেশি। সেই চাকরির কিছু হলে যে অন্য কিছুর হাল ধরবে, তারও কোনো পরিস্থিতি বর্তমানে নেই। করোনা সংকটের কারণে করোনা পরিস্থিতিতে সৃষ্ট চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হিমশিম খাচ্ছে সবাই। পরিবার চালাতে বিপাকে পড়ছেন মধ্যবিত্তরা।
দেশে চাকরি না পাওয়ায় বিদেশে এসে কাজ করা প্রবাসীরা আছেন সবচেয়ে বিপদে। ইতিমধ্যে কয়েক লাখ প্রবসী চাকরি হারিয়েছেন এই করোনার কারণে। তবে সুদিনে যাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্সে দেশের অর্থনৈতিক চাকা সচল ছিল, তাঁদের এই বিপদের সময় দেশ তাঁদের জন্য কী করতে পারে, সেটাই দেখার বিষয়। প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় অংশ শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল। চলতি বছর বাংলাদেশে এই রেমিট্যান্সের হার ২২ শতাংশ কমে যাবে বলে আশঙ্কা করছে বিশ্বব্যাংক।
করোনার ফলে ভোগ, সরকারি ব্যয়, আমদানি ও রপ্তানি সূচক দুর্বল থেকে দুর্বলতর হচ্ছে। আর করোনাভাইরাস বেসরকারি খাতনির্ভর অর্থনীতির কতটা ক্ষতি করেছে, তার প্রমাণ হচ্ছে বেসরকারি বিনিয়োগ এক অর্থবছরেই জিডিপির ২৪ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কমে ১২ দশমিক ৭ শতাংশ হয়ে গেছে। কৃষক তাঁর উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পেলে পরবর্তী মৌসুমে উৎপাদনে যেতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। বিভিন্ন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং সেবা খাতের কার্যক্রমও বন্ধ।
করোনা দুর্যোগে চাকরি হারিয়ে দিশেহারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রবাসীরা। আর তাই বাজেটে করোনায় কর্মহীন প্রবাসীদের জন্য বিশেষ বরাদ্দের দিকে তাকিয়ে ছিল বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কর্মহীন বাংলাদেশি প্রবাসীরা। কিন্তু এবারের বাজেটে কর্মহীন প্রবাসীদের দেশে পুনর্বাসন ও আত্মনির্ভরশীল করে তোলার কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা নেই এবারের বাজেটে।
সাউথ এশিয়ান ইকোনমিক মডেলিং- সানেম জানায়, শহর থেকে গ্রামে এক ধরনের উল্টো অভিবাসন বা রিভার্স মাইগ্রেশন হচ্ছে। যে নিম্নআয়ের পরিবারগুলো গ্রামে ফিরে যাচ্ছে, সেখানে গিয়ে তারা কোনো কাজ নাও পেতে পারে এবং এতে করে নতুন সামাজিক চ্যালেঞ্জও তৈরি হতে পারে। আবার সরকারি বিশাল আকারের প্রণোদনা প্যাকেজের ঋত বিতরণের গতি শ্লথ। ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতার জন্য প্রণোদনা বিতরণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে ঠিকমত লকডাউন বাস্তবায়ন না করায় মহামারি পরিস্থিতির ক্রমাবনতি ঘটছে। একইসঙ্গে পরীক্ষায় দুর্নীতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এ ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। আশঙ্কা করা হচ্ছে বর্তমানে যে রেমিট্যান্স আসছে সেটি প্রবাসী শ্রমিকদের শেষ সঞ্চয়। প্রবাসী শ্রমিকদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের দেশে ফেরত আসার আশঙ্কা আরও বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্য অনুযায়ী, করোনাভাইরাস কারণে আগামী তিন মাসের মধ্যে বিশ্বে সাড়ে ১৯ কোটি মানুষ তাঁদের পূর্ণকালীন চাকরি হারাতে যাচ্ছেন। যার মধ্যে সাড়ে ১২ কোটি মানুষ বসবাস করেন এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের হিসাবে, করোনার কারণে বাংলাদেশে চাকরি হারানোর তালিকায় যুক্ত হতে পারেন অন্তত দেড় কোটি মানুষ।
সানেমের গবেষণা পরিচালক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সায়েমা হক বিদিশা বলেন, বেকার হয়ে যেসব মানুষ গ্রামে চলে যাচ্ছে তাদের সন্তানদের পড়াশুনা বিঘ্নিত হতে পারে। অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়তে পারে। গ্রামীণ মজুরি কমে যেতে পারে। স্কুল থেকে ঝরে পড়ার হার বৃদ্ধি পেতে পারে, বাল্য বিবাহ বৃদ্ধি পেতে পারে, লিঙ্গ বৈষম্য আরো বেড়ে যেতে পারে। তিনি বলেন, মানবসম্পদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মোকাবেলায় গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণ ও গ্রামাঞ্চলে সুযোগ-সুবিধা বিস্তৃত করা দরকার। এটি কৃষি উদ্যোক্তাদের জন্য একটি ভালো সুযোগও হতে পার। তবে যেহেতু বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ কমে গেছে, গ্রামাঞ্চলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা বেশ কঠিন। এক্ষেত্রে আইসিটি ডিভিশন স্থানীয় সরকারের সাথে মিলে গ্রামাঞ্চলে তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির চেষ্টা করতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ