বুধবার ২৭ জানুয়ারি ২০২১
Online Edition

বন্যার চরম অবনতি॥ ভাসছে মানুষ বাড়ছে দুর্ভোগ

কুড়িগ্রামে বন্যা

গাইবান্ধা থেকে জোবায়ের আলী : ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘট নদীর পানি অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় গাইবান্ধা জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়েছে। জেলার সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি, সাঘাটা ও গাইবান্ধা সদর উপজেলার ২৬টি ইউনিয়ন পুনরায় বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে। ওইসব এলাকার ১ লাখ ২৫ হাজার মানুষ এখন পানিবন্দী। ইতোপূর্বে যেসব এলাকা থেকে পানি নেমে গিয়েছিল ওইসব এলাকা আবার নতুন করে বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে। ফলে ঘরবাড়িতে বন্যার পানি ওঠায় পানিবন্দী পরিবারগুলো চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছে। শুকনো খাবার ও জ্বালানির অভাবে খাদ্য সংকটে পড়েছে বন্যার্ত মানুষ। অনেকে ইতোমধ্যে বাড়িঘর ছেড়ে গরু-ছাগল নিয়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও উঁচু এলাকায় আশ্রয় নিতে শুরু করেছে। রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপদসীমার ৯৯ সে.মি. এবং ঘাঘট নদীর পানি বিপদসীমার ৭১ সে.মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, এজন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ এবারের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৪ উপজেলার বন্যার্তদের মধ্যে বিতরণের জন্য নতুন করে ১শ’ মে. টন চাল, ৪ লাখ টাকা, ১ হাজার ৮শ’ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং শিশু খাদ্যের জন্য ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। গাইবান্ধার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ মোখলেছুর রহমান জানান, বন্যার পানি আরো দুদিন বাড়বে। এতে ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপদসীমার ১১০ সে.মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধের বিভিন্ন পয়েন্টে জরুরী প্রতিরক্ষামূলক কাজ করা হচ্ছে। বাঁধের অবস্থা এখনও ভালো আছে।সাঘাটা উপজেলা ভাসছে বানের পানিতে। পানিবন্দী হয়ে অন্তত ৩০ হাজার মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছে। টানাবর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে প্রতিদিনই প্লাবিত হচ্ছে নতুন এলাকা, তলিয়ে যাচ্ছে ফসলের ক্ষেত। ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে গাইবান্ধায় ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, করতোয়াসহ সবক’টি নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যহত আছে। গত ২৪ ঘন্টায় ব্রহ্মপুত্রের পানি ৫২ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ১০৩ সেন্টিমিটার ও ঘাঘট নদীর পানি ৫২ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৭৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে উপজেলার অন্তত ১৫টি গ্রাম নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকার বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় খাদ্য, পানি ও জ্বালানি সঙ্কটে পড়েছে পানিবন্দী মানুষ। বানের পানিতে তলিয়ে গেছে উপজেলার বিভিন্ন চরাঞ্চল। এসব এলাকার মানুষজন প্রয়োজনীয় খাদ্য, টাকা, স্বর্ণালঙ্কার ও গবাদিপশু নিয়ে বিভিন্ন উঁচু স্থানে আশ্রয় নিলেও ডাকাত আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। উপজেলার বিভিন্ন চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
জেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে বন্যা কবলিত ৪টি উপজেলায় এখন পর্যন্ত ২ হাজার ২১ হেক্টর জমির পাট, আমন বীজতলা, আউশ ধান এবং বিভিন্ন শাকসবজির ক্ষেত তলিয়ে গেছে। ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে গাইবান্ধায় যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘট, তিস্তা ও করতোয়াসহ সবকটি নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। গাইবান্ধার ফুলছড়ি ঘাট পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি গত ২৪ ঘণ্টায় ২৩ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ১১৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ঘাঘট নদীর পানি ২৪ ঘণ্টায় ৩০ সেন্টিমিটার বেড়ে গাইবান্ধা শহরের নতুন ব্রিজ পয়েন্টে বিপদসীমার ৮৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে তিস্তা নদীর পানি কাউনিয়ার পয়েন্টে ২৪ ঘণ্টায় ৩৭ সেন্টিমিটার কমে বিপদসীমার ২৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে ফুলছড়ি ঘাট পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধির ফলে হুমকির মুখে পড়েছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ। স্থানীয়রা রাত জেগে বাঁধ পাহারা দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বালুভর্তি বস্তা ফেলছেন। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় নদী তীরবর্তী মানুষকে সতর্ক করতে জেলা প্রশাসনসহ সকল সরকারি দফতরে জরুরি বার্তা পাঠিয়েছে গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। জানা গেছে, ঘাঘট ও করতোয়ার পানি বৃদ্ধির ফলে গাইবান্ধা সদর উপজেলার কামারজানি ইউনিয়ন ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে সাঘাটা উপজেলার ১৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদ ও যমুনা নদীর ডান তীরঘেঁষা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধটি চরম হুমকির মুখে পড়েছে। সুন্দরগঞ্জ উপজেলার চণ্ডীপুর, কাপাসিয়া, তারাপুর, বেলকা, হরিপুর ও শ্রীপুর গ্রাম বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। এ উপজেলার ১৫টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। অস্বাভাবিকভাবে পানি বৃদ্ধির ফলে গত কয়েক বছরের মতো বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে যেকোনো সময় দেখা দিতে পারে ভয়াবহ বন্যা। তাই বন্যা আতঙ্কে রয়েছেন জেলার সাত উপজেলার কয়েক লাখ মানুষ। গাইবান্ধা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ফুলছড়ি উপজেলার কালিরবাজার সাব-জোনাল অফিসের জুনিয়ার ইঞ্জিনিয়ার তৌহিদুল ইসলাম জানান, দুর্ঘটনা রোধ করতে ফুলছড়ি উপজেলার কাতলামারী, গজারিয়া, রতনপুর, সিংড়িয়া, গুনভরি, মশামারী, উড়িয়া, কেতকিরহাট, ঘোলদহ, কঞ্চিপাড়াসহ বন্যা কবলিত বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং ও গ্রাহকদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে।
এদিকে বিদ্যুৎ সমিতির ফুলছড়ির বন্যা কবলিত এলাকায় দুর্ঘটনা এড়াতে জনসাধারণকে বিদ্যুতের খুটি স্পর্শ না করার জন্য মাইকিং ও লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে। গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, বুধবার দুপুর ১২টা ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপদসীমার ১১৫ মিটার এবং ঘাঘট নদীর পানি ৯২ সে.মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

কুড়িগ্রামে বন্যায় ভাসছে মানুষ
মোস্তাফিজুর রহমান, কুড়িগ্রাম থেকে : কুড়িগ্রামের সবকটি নদীর পানি ফুলে-ফেপে টইটুম্বুর হয়ে উঠেছে। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। এরমধ্যে ধরলা নদীর পানি অস্বাভাবিকহারে বৃদ্ধি পাওয়ায় কুড়িগ্রাম-ভুরুঙ্গামারী মহাসড়কের মধ্যকুমরপুর হতে পাটেশ্বরী, আরডিআরএস এবং লোকালয়গুলো পানিতে ভাসছে। জেলার ৯ উপজেলার ৬০টি ইউনিয়নের প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন তিন লক্ষাধিক মানুষজন।
এদিকে নিজেদের সহায় সম্বল বন্যার পানিতে ভেসে যাওয়ায় বানভাসিরা এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছে। হাঁস, মুরগী, গরু ছাগলসহ গবাদি পশু ও ঘরের ধান চালসহ অনেক জিনিস বন্যার পানির তোড়ে ভেসে যাচ্ছে। কাঁচা সড়ক ছাড়াও সদর উপজেলার মধ্যকুমরপুর এলাকায় পাকা রাস্তায় হাটু পানি উঠে গত ৩দিন ধরে অবস্থান করছে। ফলে এখানকার বাজারে আসা মানুষজনের কষ্ট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। চর থেকে নৌকা নিয়ে পাকা রাস্তার ওপর দিয়ে নৌকায় নিজেদের মালামাল নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে আসছে বানভাসীরা। এখনও অনেক এলাকায় বানভাসীদের ত্রাণ হাতে না পৌঁছায় বন্যার্তরা ক্ষোভ জানিয়েছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ড এর তথ্যমতে, কুড়িগ্রাম ধরলা সেতু পয়েন্টে ধরলা নদীর পানি বিপদসীমার ৯০ সেন্টিমিটার, তিস্তার কাউনিয়া পয়েন্টে ৬ সেন্টিমিটার, ব্রক্ষপুত্রের নুনখাওয়া পয়েন্টে ৭০ সেন্টিমিটার এবং চিলমারী পয়েন্টে বিপদসীমার ১০২ সে.মি মিটার উপরদিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
২য় দফা বন্যায় জেলার ৬০টি ইউনিয়নের ৪ শতাধিক গ্রামের প্রায় ৩ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে এখন চরম সংকটে রয়েছে। জেলা-উপজেলা শহরের সাথে চরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় চরম ভোগান্তিতে এসব মানুষ। বানভাসীদের খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার ও জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। উঁচু রাস্তা, বাঁধ, স্কুল ঘরে ও আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে হাজার হাজার মানুষ। তবে নৌকার অভাবে অনেকেই নিরাপদ স্থানে যেতে পারছে না।

বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে প্লাবিত নিম্নাঞ্চল
ভারীবর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে নদ-নদীর পানি অস্বাবাবিকভাকে বাড়তে শুরু করায় গত ২৪ ঘন্টায় জেলার বিভিন্ন এলাকার নিম্নাঞ্চল নতুন করে পস্নাবিত হয়েছে। বন্যা সতর্কীকরণ ও পূর্বাভাস কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, কুড়িগ্রাম,  নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, গাইবান্ধা, জামালপুর, নাটোর, সিলেট, সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার বন্যাপস্থিতির অবনতির শঙ্কা রয়েছে। গত ৭২ ঘণ্টায় ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিকিম, আসাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরা অঞ্চলে কোথাও কোথাও ভারীবর্ষণ হয়েছে।

জামালপুরে বন্যা পরিস্থিতি চরম অবনতি॥ ট্রন চলাচল বন্ধ
জুলফিকার আলম, জামালপুর : ঢলে জামালপুরে বন্যার পরিস্থিতি চরম অবনতি হয়েছে। বুধবার সকাল আটটা পর্যন্ত যমুনার বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ১২৫ সেন্টি মিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পউবো) জামালপুর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু সাঈদ এবং পানি মাপক গেজ পাঠক আব্দুল মান্নান। এদিকে দেওয়ানগঞ্জ বাজার রেলস্টেশনে বন্যার পানির কারণে ট্রেন চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছে রেল কর্তৃপক্ষ। তবে তিস্তা-ব্রক্ষ¥পুত্র এক্সপ্রেস ট্রেন দু’টি ইসলামপুর পর্যন্ত চলাচল অব্যাহত রাখা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জামালপুর রেল স্টেশনের মাস্টার আব্দুল বাতেন।
তারা জানান, ইসলামপুর পর্যন্ত ট্রেন আসবে এবং ইসলামপুর স্টেশন থেকেই ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করবে। এভাবে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে জামালপুর থেকেই ট্রেন ঢাকা ফেরত যাবে। অপরদিকে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার চিকাজানী ইউনিয়নের মণ্ডল বাজার অদূরে পাকা রাস্তাটি নদীতে বিলিন হচ্ছে।  জেলার ইসলামপুর,মাদারগঞ্জ, মেলান্দহ, সরিষাবাড়ী, বকশীগঞ্জ ও জামালপুর সদরসহ ৭টি উপজেলার ৬৮টি ইউনিয়নের মধ্যে প্রায় ৪০টি ইউনিয়নে বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে প্রায় ৫লাখ মানুষ পানি বন্দী হয়ে পড়েছে।
ইসলামপুর উপজেলার সাপধরী, রেলগাছা, চিনাডুলী, কুলকান্দি ইউনিয়নের যমুনার দ্বীপ চরের লোকজন নৌকার অভাবে তাদের ঘরের ধান চাল এমনকি গৃহপালিত পশু নিরাপদ স্থানে নিতে পারছে না বলে বেলগাছা ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক জানিয়েছেন। বন্যা কবলিত এলাকাগুলোর মধ্যে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা চুকাইবাড়ী, চিকাজনী, বাগহাদুরাবাদ, চর আমখাওয়া, দেওয়ানগঞ্জ সদর ইউনিয়ন ও দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভা। ইসলামপুর উপজেলার কুনকান্দি, বেলাগাছা, চিনাডুরী, সোয়ারপাড়া, ইসলামপুর সদর, পলবান্দা গোয়ারেলর চর, গাইবান্দা, চরগোয়ালীনী, চরপটিমারী ইউনিয়ন ও ইসলামপুর পৌরসভা। মেলান্দহ উপজেলার কুলিয়া ,দুরমুঠ, মাহমুদপুর, শ্যামপুর , নাংলা, আদ্রা, ফুলকোচা, ঝাউগড়া ও ঘোষেরপাড়া ইউনিয়ন। মাদারগঞ্জ উপজেলার গুনারীতলা, জোড়খালী  ইউনিয়ন। বকশীগঞ্জ উপজেলার সাধুরপাড়া, মেরুরচর, বগারচর, ইউনিয়ন।  সরিষাবাড়ী উপজেলার পিংনা, আওনা, পোগলদিঘা, সাতপোয়া ও কামরাবাদ ইউনিয়ন বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষসহ গৃহপালিত পশু গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি পানি বন্দী হয়ে পড়েছে। এসব এলাকায় বন্যা কবলিত মানুষগুলো উঁচু বাঁধে, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছে। বানভাসিদের শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির, গো খাদ্যের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। এদিকে চলতি বন্যায় জামালপুর জেলায় বন্যার পানিতে ডুবে এ পর্যন্ত ১২ জন মারা গেছে।

সিরাজগঞ্জে যমুনার পানি বিপদসীমার ৯৪ সেন্টিমিটার উপরে
আব্দুস ছামাদ খান, সিরাজগঞ্জ থেকে : সিরাজগঞ্জে যমুনার পানি বেড়েই চলেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সিরাজগঞ্জ শহর রক্ষা হার্ডপয়েন্ট এলাকায় জেলা পয়েন্টে পানি ৩৩ সেন্টিমিটার বেড়েছে। জেলা পয়েন্টে গতকাল বুধবার পানি বিপদসীমার ৬৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কাজীপুর উপজেলা পয়েন্টে বিপদসীমার ৯৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
এতে জেলার বন্যার অবনতি হয়েছে। পানি বাড়ার কারণে প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। তলিয়ে যাচ্ছে রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি। পানিবন্দী অনেক মানুষ বাঁধ ও উঁচু স্থানে ঝুপড়ি ঘর তুলে অবস্থান নিয়েছেন।
পানি বাড়ায় নদী-তীরবর্তী কাজীপুর উপজেলার ক্ষুদবান্ধি, সিংগড়াবাড়ি ও শাহজাদপুর উপজেলার কৈজুরীতে ব্যাপক ঘূর্ণাবর্তের সৃষ্টি হয়ে ভাঙন শুরু হয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছে বন্যাকবলিত জেলার কাজীপুর, বেলকুচি, সদর, শাহজাদপুর ও চৌহালী উপজেলার দেড় লাখ মানুষ।
এদিকে, সদর উপজেলার শিমলায় পাউবোর ক্ষতিগ্রস্ত ‘শিমলা স্পার’টির আরো ৫০ মিটার পাকা কংক্রিট অংশ  নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। প্রায় এক মাসের ব্যবধানে তিনবার ধসে পড়ল স্পারটি। ৫০ মিটার মাটির ও ৫০ মিটার পাকা কংক্রিট অংশসহ ঘূর্ণাবর্তের কারণে ১০০ মিটার নদীতে চলে যায়। পানির মধ্যে বাকি ৫০ মিটার অবকাঠামো দাঁড়িয়ে আছে।
পাউবোর পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ (পওর) বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এ কে এম রফিকুল ইসলাম জানান, জেলার প্রায় ৮০ কিলোমিটার নদীতীর রক্ষা বাঁধের ওপর ভাঙনের ঝুঁকি ঠেকাতে ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছরে সদর, কাজীপুর ও এনায়েতপুরে ১১টি স্পার ও গ্রোয়েন নির্মাণ করা হয়। সময়মতো রক্ষণাবেক্ষণ না করায় অধিকাংশই ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ে। ওই সব অবকাঠামোর মধ্যে শিমলা স্পারটির পাশে ব্যাপক ঘূর্ণাবর্তের কারণে এ দশা হয়েছে। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজীপুর, সদর ও শাহজাদপুরের কয়েকটি স্থানে ভাঙনও বেড়েছে।
বন্যায় জেলার পাঁচটি উপজেলার ৩৩টি ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্তের তালিকায় রয়েছে,  ২২০টি ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ ও এক হাজার ৬০টি ঘরবাড়ি আংশিক, তিন হাজার ৫৫০ হেক্টর ফসলি জমি, ৩০টি শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ ও পাঁচটি আংশিক, তিন কিলোমিটার রাস্তা ও বাঁধ সম্পূর্ণ এবং সাত কিলোমিটার আংশিক, তিনটি ব্রিজ ও কালভার্ট সম্পূর্ণ ও সাতটি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এ ছাড়া ৩৩টি ইউনিয়নের ২১৬টি গ্রামের প্রায় ৩৫ হাজার পরিবারের এক লাখ ৬০ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আবদুর রহিম এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, বন্যাকবলিত মানুষের মধ্যে ইতোমধ্যে ২৬৭ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ২৫৮ টন জিআর চাল, সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা, গো-খাদ্যের জন্য দুই লাখ ও শিশুখাদ্যের জন্য দুই লাখ টাকা এবং ৩০ হাজার শুকনো খাবার মজুদ রয়েছে।

সিলেটে নদ-নদীর পানি কমলেও কমছেনা দুর্ভোগ
সিলেট ব্যুরো : সিলেটের সবকটি নদ নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। তবে সুরমার কানাইঘাট পয়েন্ট এবং কুশিয়ারার আমলশীদ ও ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে এখনও বিপদসীমার ওপর দিয়েই পানি প্রবাহিত হচ্ছে। আর নদ-নদীর পানি ধীর গতিতে নামার কারণে তলিয়ে যাওয়া লোকালয় থেকেও পানি নামছে ধীরগতিতে। ফলে বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ কমছেনা।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)-এর কন্ট্রোল রুম সূত্র জানায়, গতকাল বুধবার দুপুর পর্যন্ত সুরমার কানাইঘাট পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ৬২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। একই সময়ে আমলশীদ পয়েন্টে কুশিয়ারার পানি ৩০ সেন্টিমিটার এবং ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে ৪৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া সুরমা-কুশিয়ারা-সারি ও লোভার বাকি সবকটি পয়েন্টে পানি বিপদসীমার বেশ কয়েক সেন্টিমিটার নিচ দিয়েই প্রবাহিত হচ্ছে। সকাল থেকে বৃষ্টিপাত না থাকায় উঁচু এলাকা থেকে বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে। তবে নিচু এলাকায় বন্যার পানি কিছুটা স্থিতিশীল রয়েছে। কিছু এলাকায় রাস্তা-ঘাট পানির নিচে থাকায় এখনও যান চলাচল স্বাভাবিক হয়নি।
পানিবন্দী জনসাধারণের মধ্যে বিশুদ্ধ পানির সঙ্কট রয়েছে। গো খাদ্য সংকটও দেখা দিয়েছে। এছাড়া শুকনো খাবার না থাকায় ত্রাণের অপেক্ষায় রয়েছেন দুর্গত এলাকার মানুষ। অবশ্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পানিবন্দী মানুষের মাঝে ত্রাণ সহায়তা বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। এ পর্যন্ত বন্যা কবলিত ৩৭ ইউনিয়ন ও এক পৌরসভায় ২২০ মেট্রিক টন চাল, নগদ ৫ লাখ টাকা ও সহস্রাধিক প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে নদী তীরের গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট, কোম্পানীগঞ্জ ও বিশ্বনাথ উপজেলার নিম্নাঞ্চলের ৩৭টি ইউনিয়ন বন্যা কবলিত হয়েছে।  নদীর পানি কমলেও ১৯-২০ জুলাই নাগাদ ভারী বর্ষণসহ আরেক দফা বন্যার আশঙ্কাও রয়েছে বলে পূর্ভাবাসে জানিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ।

সিংড়ায় তীব্র স্রোতে রাস্তা ভেঙে দুই ইউনিয়ন প্লাবিত
আবু জাফর সিদ্দিকী, সিংড়া : আত্রাই নদীর বন্যার পানির তীব্র স্রোতে নাটোরের সিংড়া উপজেলার শেরকোল ইউনিয়নের শাহবাজপুর-তাজপুর-তেমুখ নওগাঁ সড়কের তিনটি স্থানে ভেঙে হু হু করে পানি ঢুকছে শেরকোল ও তাজপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে।  তীব্র বেগে পানি প্রবেশ অব্যাহত রয়েছে এখনও। হুমকির মুখে রয়েছে কয়েকটি বাড়ি এবং নওগাঁ বাজার। 
গতকাল বুধবার ভোররাতে সড়কটির তিনটি পয়েন্ট পানির তোড়ে ভেঙ্গে যায়। বুধবার দুপুর পর্যন্ত নদীর পানি বিপদ সীমার ৪২ সে: মি: উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়কটি তুলনামূলক নিচু জায়গায় নির্মাণে তাদের আপত্তি থাকলেও কর্ণপাত করেনি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ। ফলে অতি সহজেই পানি প্রবেশ করছে। সকাল থেকে স্থানীয় সরকার বিভাগের কোন কার্যক্রম চোখে পড়েনি। 
নাটোর পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়,  বুধবার বেলা ২ টার রিডিং অনুযায়ী বিপদসীমার ৪২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে আত্রাই নদীর পানি প্রবাহিত হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, ৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে মাস দু'য়েক আগে শাহবাজপুর -তাজপুর-তেমুখ নওগাঁ আঞ্চলিক সড়কটির নির্মাণকাজ শেষ হয়। সড়কটির তিনটি অংশ ভেঙ্গে পানি প্রবেশ করায় অন্যান্য দূর্বল অংশগুলোও ভেঙ্গে যাবার আশংকা দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে শেরকোল ও তাজপুর ইউনিয়নের মধ্যে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
তাজপুর ইউপি চেয়ারম্যান মিনহাজ উদ্দিন ও শেরকোল ইউপি চেয়ারম্যান লুৎফুল হাবিব রুবেল ভাঙ্গন এলাকা পরিদর্শন করেছেন।
তাজপুর ইউপি চেয়ারম্যান মিনহাজ উদ্দিন জানান, গতকাল সকাল থেকে আমরা বালুর বস্তা দিয়ে রাস্তার বিভিন্ন অংশে বাঁধ দেই। তবে পর্যাপ্ত ছিলো না। যার কারণে গভীর রাতে পানির তোড়ে তিনটি স্থানে পাকা সড়ক ভেঙ্গে গেছে। মেরামত করার জন্য চেষ্টা চলছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) নাসরিন বানু জানান, ঘরবাড়ি রক্ষায় বাঁধ সংস্কারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

চলনবিলে পানি বৃদ্ধি জনজীবনে আতঙ্ক
তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা: চলনবিলের তাড়াশ, চাটমোহর ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর, সিংড়া, বড়াইগ্রাম, উল্লাপাড়া, আত্রাই এলাকা বন্যার পানি বৃদ্ধির খরব পাওয়া গেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় চলনবিলসহ পদ্মা, যমুনায় নদীতে ১৬ সেমি. নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কয়েকদিন আগে পদ্মা-যমুনাসহ বিভিন্ন নদীর পানি কমলেও উজানের ঢল ও টানাবর্ষণে নতুন করে পানি বাড়তে শুরু করেেছ পাবনার বিভিন্ন স্থানে। সেই সাথে দেখা দিয়েছে নদী ভাঙন। এতে আতঙ্কিত জীবনযাপন করছেন সাধারণ মানুষ। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল হামিদ বলনে, যমুনা নদীর নগরবাড়ীর মথুরা পয়েন্টে গত মঙ্গলবার পানি বিপদসীমার শূন্য দশমকি ১৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কিছু কিছু স্থানে নদীপাড়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙন প্রতিরোধে কাজ করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। জানা যায়, পাকশী হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে গতকাল বুধবার  সকালে পানি ১.৬৬ সেন্টিমিটার বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহতি হয়।
পদ্মা ও যমুনায় নতুন করে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নদীপাড়ের মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক দেখো দিয়েছে। জমি, ফসল হারিয়ে সর্বশান্ত হয়েছেন অনেকেই। নতুন করে পানি বৃিদ্ধর ফলে তাদের মধ্যে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। যমুনা নদীপাড় এলাকার বেশ কিছু বাড়িঘর, মসজিদ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে যে কোনো সময়ে এ সকল স্থাপনা নদীগর্ভে চলে যাবে বলে ধারণা করা হয়। সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার হামকুড়িয়া গ্রামে বন্যায় তলিয়ে গেছে। কিছু কিছু বাড়ির উঠানে পানি উঠে পড়েছে। ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়া লোকজন আশ্রয় খুঁজছে। যেভাবে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে দুই একদিনের মধ্যেই সব বাড়িতে পানি উঠে পড়বে। ইতোমধ্যে বোনা আউস আমনের ক্ষেত তলিয়ে গেছে। হামকুড়িয়া দাখিল মাদরাসায় পানি উঠে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত লোকজন এ পযন্ত সরকারি অথবা বেসরকারিভাবে কোন ত্রাণসামগ্রী পাননি। এ রিপোর্ট লেখা পযন্ত চলনবিলে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ