সোমবার ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

বন্যার অবনতি ও বিস্তার অব্যাহত ॥ নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত

গাইবান্ধা: উজান থেকে নেমে আসা পানির ঢল এবং ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে গাইবান্ধায় ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘট ও তিস্তার পানি অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় সবগুলো নদীর পানি এখন বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে

সংগ্রাম ডেস্ক : বিভিন্ন স্থানে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি অব্যাহত রয়েছে। প্লাবিত হচ্ছে নতুন এলাকা। বানভাসি লাখ লাখ মানুষের দুর্ভোগের সীমা নেই। অনেকে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য উচু স্থানের উদ্দেশে ছুটছে। বিভিন্ন নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ভাঙছে নদীর কূল। বিলীন হচ্ছে ফসলী জমি ঘরবাড়ী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে দুর্গত লোকদের জন্য অবিলম্বে ত্রাণ সাহায্য প্রয়োজন।

কুড়িগ্রামে বন্যায় আড়াই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী ধরলার পানি বিপদসীমার ১০২ সেন্টিমিটার উপরে
মোস্তাফিজুর রহমান, কুড়িগ্রাম : অবিরাম বর্ষণ ও গজলডোবা ব্যারেজের সবকটি গেট খুলে দেয়ায়, ভারতীয় পানি হু-হু করে আসছে দেশের উত্তর সীমান্ত কুড়িগ্রামের উপরদিয়ে বয়ে যাওয়া সকল নদ-নদীর উপর। ফলে কুড়িগ্রামের সবকটি নদীর পানি ফুলে-ফেঁপে টইটুম্বুর হয়ে উঠেছে। এরইমধ্যে ধরলা নদীর পানি অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় হুহু করে বানের পানি ঢুকছে লোকালয়ে। ৯ উপজেলার ৫৬টি ইউনিয়নের প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন আড়াই লক্ষাধিক মানুষজন।
এদিকে ভারতের আসাম রাজ্যের ধুবরী জেলার মাইনকারচর এলাকার কালো নদীদিয়ে ঐ দেশের পাহাড়ী ঢল, কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার সীমান্তঘেঁষা ঝিনিজরাম নদীতে তীব্র গতিতে প্রবেশ করায় টইটুম্বুর হয়েছে ঐ এলাকা। এতে আতংকিত হয়ে পড়েছে নদী পাড়ের মানুষজন। তলিয়ে গেছে রৌমারী সদরের ঠনঠনিয়াপাড়া, চুলিয়ারচর, নওদাপাড়া, খাটিয়ামারী, ব্যাপারীপাড়া, রতনপুর, মোল্লারচর, যাদুরচর ইউনিয়নের চাক্তাবাড়ী, দিগলপাড়া, নতুনগ্রাম, ধনারচরসহ ঐ উপজেলার দাঁতভাঙ্গা ও শৌলমারী ইউনিয়নের আরো ৫০ গ্রামসহ প্রায় শতাধিক গ্রামের ৮’শতাধিক পরিবারের কয়েক হাজার মানুষ। এতে ঐ এলাকার রোপা আমন বীজতলাসহ অন্যান্য ফসলের প্রায় ৭’শ হেক্টর জমির ফসল পানির নীচে নিমজ্জিত হয়েছে।
ফুলবাড়ী উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের প্রায় ২হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়েপড়েছে। উলিপুর উপজেলার সাহেবের আলগা, বেগমগঞ্জ, বজরা, থেতরাই, হাতিয়া ও বড়াবুড়িসহ তবকপুর ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকায় নতুন করে পানি ঢুকে পড়েছে। প্রবল স্রোতের তোড়ে সেখানকার বেশকিছু ঘরবাড়ি ও গাছপালা বিধ্বস্ত  হয়েছে এবং সব ভেসে যাচ্ছে। নিম্নাঞ্চলসমূহের বাড়িঘর তলিয়ে গিয়ে ১ম দফা বন্যায় কিছুটা ক্ষতি হলেও এবার কোন কিছুই রক্ষা করতে পারছেন না এসব মানুষ। অপ্রতুল ত্রাণ সকলের ভাগ্যে জুটছে না বলে অভিযোগ বন্যার্তদের।
নিজেদের সহায় সম্বল বন্যার পানিতে ভেসে যাওয়ায় তারা এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছে। হাঁস, মুরগী, গরু ছাগলসহ গবাদি পশু ও ঘরের ধান চালসহ অনেক জিনিস বন্যার পানির তোড়ে ভেসে যাচ্ছে। কাঁচা সড়ক ছাড়াও সদর উপজেলার মধ্যকুমরপুর এলাকায় পাকা রাস্তায় পানি উঠেছে। ফলে এখানকার বাজারে আসা মানুষজনের কষ্ট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। চর থেকে নৌকা নিয়ে পাকা রাস্তার ওপর দিয়ে নৌকায় নিজেদের মালামাল নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে আসছে বানভাসীরা। এখনও অনেক এলাকায় বানভাসীদের ত্রাণ হাতে না পৌঁছায় বন্যার্তরা ক্ষোভ জানিয়েছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, কুড়িগ্রাম ধরলা সেতু পয়েন্টে ধরলা নদীর পানি বিপদসীমার ১০২ সেন্টিমিটার, তিস্তার কাউনিয়া পয়েন্টে ১৮ সেন্টিমিটার, ব্রক্ষপুত্রের নুনখাওয়া পয়েন্টে ৮৫ সেন্টিমিটার এবং চিলমারী পয়েন্টে বিপদসীমার ৯০ সেন্টিমিটার উপরদিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

বন্যা পরিস্থিতির অরো অবনতির আশংকা
ধরলা নদীর পানির প্রবল চাপে সোমবার সদর উপজেলার সারডোবে একটি বিকল্প বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে গত ২৪ ঘণ্টায় আরো প্রায় ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
সদর উপজেলার মধ্যকুমরপুর হয়ে ফুলবাড়ী উপজেলা শহর যাওয়ার পাকা রাস্তা এখন পানির নিচে। ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। হলোখানা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান উমর ফারুক জানান, ধরলা নদীর পানির প্রবল চাপে সদর উপজেলার সারডোবে একটি বিকল্প বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
সারডোব গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম জানান, সোমবার সকালে বাঁধটি ভেঙে পানি প্রবল বেগে ধেয়ে আসে। একে একে ৫টি বাড়ি বিধ্বস্ত হয় এবং অনেক মালামাল ভেসে যায়। তীব্র স্রোতের কারণে নৌকা নিয়ে সেখানে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। হলোখানা ইউপি সদস্য জানান, বাঁধটি ভাঙার ফলে হলোখানা, ভাঙামোড়, কাশিপুর, বড়ভিটা ও নেওয়াশি ইউনিয়নের ২৫টি গ্রাম একে একে প্লাবিত হচ্ছে।
সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. ময়নুল ইসলাম জানান, পানিবন্দী মানুষকে উদ্ধারের জন্য সেখানে দু’টি নৌকার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মো. রেজাউল করিম জানান, পানিবন্দী মানুষকে উদ্ধারে প্রয়োজনীয় নৌকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া জেলায় ৪৩৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তত রাখা হয়েছে। ৪০০ মে. টন চাল, ১১ লাখ টাকা ও ৩ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার উপজেলা পর্যায়ে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে জেলা থেকে উপজেলাগুলোতে প্রায় সাড়ে হাজার মেট্রিক টন চাল, ৪ লক্ষ টাকা, ২ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবারের প্যাকেট, শিশুদের খাদ্যের জন্য ২ লাখ টাকা ও গো-খাদ্যের জন্য ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও এখনো তা বিতরণ শুরু হয় নাই। এ দিকে প্রথম বন্যায়, বানভাসী মানুষজনের সঞ্চিত খাদ্য ও অর্থ শেষ হয়ে যাওয়ায় পরিবারগুলো পড়েছেন মারাত্মক বিপাকে।

গাইবান্ধায় পরিস্থিতির অবনতি
গাইবান্ধা সংবাদদাতা : উজান থেকে নেমে আসা পানির ঢল এবং ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে গাইবান্ধায় ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘট ও তিস্তার পানি অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় সবগুলো নদীর পানি এখন বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।গাইবান্ধার ফুলছড়ি ঘাট পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি গত ১২ ঘণ্টায় ১৮ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৮৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ঘাঘট নদীর পানি ১২ ঘণ্টায় ১১ সেন্টিমিটার বেড়ে গাইবান্ধা শহরের নতুন ব্রিজ পয়েন্টে বিপদসীমার ৫৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার ১৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
পানি বৃদ্ধির ফলে হুমকির মুখে পড়েছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ। পানির চাপে বাঁধ ভেঙে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় প্রবেশের আতঙ্কে রয়েছে জেলার কয়েক লাখ মানুষ। জেলার সদর, সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা ও ফুলছড়ি উপজেলার নিম্নাঞ্চলের ২৬টি ইউনিয়নের এক লাখ ৪৬ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। পানিবন্দী মানুষ উঁচু স্থানে মাচা করে বা বাঁধে আশ্রয় নিলেও দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে।
জানা গেছে, গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার দুই লক্ষাধিক মানুষ বন্যার অতঙ্কে রয়েছেন। সদর উপজেলার কামারজানি ইউনিয়ন ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে সাঘাটা উপজেলার হলদিয়া ও জুমারবাড়ী ইউনিয়নের পালপাড়া, চিনিরপটল, চকপাড়া, পবনতাইড়, থৈকরপাড়া, বাঁশহাটা, মুন্সিরহাট, গোবিন্দী, নলছিয়াসহ ১৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদ ও যমুনা নদীর ডান তীরঘেঁষা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধটি চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
ফুলছড়ি উপজেলার গজারিয়া, খাটিয়ামারী ইউনিয়নের বেশিরভাগ এলাকা বন্যার পানিতে নিমজ্জিত। এ উপজেলার প্রায় ১৫টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলার চণ্ডীপুর, কাপাসিয়া, তারাপুর, বেলকা, হরিপুর ও শ্রীপুর গ্রাম বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। এ উপজেলার ১৫টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। অস্বাভাবিকভাবে পানি বৃদ্ধির ফলে গত কয়েক বছরের মতো বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে যেকোনো সময় দেখা দিতে পারে ভয়াবহ বন্যা। তাই বন্যা আতঙ্কে জেলার সাত উপজেলার কয়েক লাখ মানুষ।
ভরতখালি গ্রামের আব্দুল কাদির জানান, আমরা রাত জেগে বাঁধ পাহারা দিচ্ছি। গতবছর পানির চাপে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এ বছর পানির চাপ অনেক বেশি। তাই বাঁধ নিয়েই আমাদের বেশি চিন্তা।
সাঘাটা উপজেলার ভরতখালি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শামছুল আজাদ শীতল জানান, গাইবান্ধা সদরের বাদিয়াখালি ব্রিজ থেকে সাঘাটার কচুয়াহাট পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ হুমকিতে রয়েছে। বাঁধ রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের সুদৃষ্টি কামনা করছি।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোখলেছুর রহমান বলেন, গত সপ্তাহে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপদসীমার ৮২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল। কয়েকদিনের ব্যবধানে সেই পানি প্রবাহ এখন বিপদসীমার ৮৯ সেন্টিমিটার উপরে। পানির চাপে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বিভিন্ন পয়েন্ট ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ার সম্ভাবনা আছে। তবে বাঁধ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
গাইবান্ধা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা একেএম ইদ্রিস আলী জানান, জেলার সদর, সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা ও ফুলছড়ি উপজেলার ২৬টি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলের এক লাখ ৪৬ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। এর মধ্যে এক লাখ ২২ হাজার ৩২০ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এসব মানুষের জন্য এ পর্যন্ত ৩২০ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ১৫ লাখ টাকা, শিশুখাদ্য চার লাখ, গোখাদ্য দুই লাখ ও ১৮ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। সার্বিক বিষয়ে গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক আব্দুল মতিন বলেন, জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভার মাধ্যমে বন্যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। বন্যার স্থায়িত্ব ও ভয়াবহতা উপলব্ধি করে জেলা প্রশাসন সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ব্রহ্মপুত্রের পানি গত ২৪ ঘন্টায় বিপদসীমার ৬১ সেঃ মিঃ, ঘাঘট নদীর পানি বিপদসীমার ৩৭ সেঃ মিঃ এবং তিস্তার পানি বিপদসীমার ১৩ সেঃ মিঃ উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এসব নদীর পানি নতুন করে আবার বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলার সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি, সাঘাটা ও গাইবান্ধা সদর উপজেলার নদী তীরবর্তী নিচু অঞ্চল এবং বিভিন্ন চর এলাকায় নতুন করে পানি উঠতে শুরু করেছে। ফলে ওইসব এলাকার মানুষ আবারও বন্যা আতংকে নানা উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে। এদিকে পানির চাপ বেড়ে যাওয়ায় ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ গাইবান্ধা শহর রক্ষা বাঁধের বিভিন্ন পয়েন্ট হুমকির মুখে পড়েছে। এব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ মোখলেছুর রহমান জানান, ভাঙনের হুমকির কারণে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের কয়েকটি পয়েন্টে জরুরি প্রতিরক্ষামূলক কাজ শুরু করা হয়েছে।

সিরাজগঞ্জে বাড়ছে যমুনার পানি
আব্দুস ছামাদ খান, ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি: উজানের পানি বাড়ায় সিরাজগঞ্জে যমুনার পানি বাড়তে শুরু করেছে। গত ২৪ ঘন্টায় সিরাজগঞ্জ জেলা পয়েন্টে পানি ৩২ সে.মি. বেড়েছে। এতে জেলায় পানি বিপদসীমার ৩৯ সে.মি. ওপরে এবং কাজিপুর উপজেলা পয়েন্টে বিপদসীমার ৬৯ সে.মি. ওপরে রয়েছে।
যমুনার পানি বাড়ায় নদীতীরবর্তী কাজিপুর উপজেলার ক্ষুদবান্ধি ও সিংগড়াবাড়ি এবং শাহজাদপুর উপজেলার কৈজুরীতে ব্যাপক ঘূর্ণাবত্যের কারণে থেমে থেমে ভাঙন বেড়েছে।
অন্যদিকে, সদর উপজেলার শিমলায় পাউবোর ক্ষতিগ্রস্ত ‘শিমলা স্পার’টির আরও প্রায় ৫০ মিটার পাকা কংক্রিট অংশ সোমবার নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। গত এক মাসের ব্যবধানে তিনবার ধস নামে ওই স্পারে। ৫০ মিটার মাটির ও আরও প্রায় ৫০ মিটার পাকা কংক্রিট অংশসহ ঘূর্ণাবত্যের কারণে ১শ’ মিটার নদীগর্ভে চলে যায়। পানির মধ্যে বাকী ৫০ মিটার অবকাঠামো অকার্যকর দাঁড়িয়ে আছে।
পাউবোর পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী একেএম রফিকুল ইসলাম জানান, জেলার প্রায় ৮০ কি.মি. নদী তীর রক্ষা বাঁধের ওপর ভাঙ্গনের ঝুঁকি ঠেকাতে ১৯৯৯-২০০০ অর্থ বছরে সদর, কাজিপুর ও এনায়েতপুরে ১১ টি স্পার ও গ্রয়েন নির্মাণ করা হয়। সময়মত রক্ষণাবেক্ষণ না করায় অধিকাংশই ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। ওইসব অবকাঠামোর মধ্যে শিমলা স্পারটির পাশে ব্যাপক ঘূর্ণাবত্যের কারণে সর্বশেষ এ দশা হয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে যমুনায় পানি বাড়ার হার অনেকটাই বেশি। পানি আরও বাড়ারও সম্ভবনা রয়েছে। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজিপুর, সদর ও শাহজাদপুরের কয়েক স্থানে ভাঙনও বেড়েছে। তবে, জেলার ৮০ কি.মি. নদী তীর রক্ষা বাঁধ এখনও সুরক্ষিত আছে।

শাহজাদপুরে নতুন নতুন অঞ্চল প্লাবিত
এম. এ. জাফর লিটন শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) থেকে : পাহাড়ী ঢল ও বর্ষণে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এতে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটছে। প্লাবিত হচ্ছে বন্যা কবলিত এলাকার নতুন নতুন অঞ্চল। গত ২৪ ঘন্টায় শাহজাদপুর যমুনা পয়েন্টে ২২ সে. মিটার বর্তমানে যমুনা নদীর পানি বিপদসীমার পয়েন্টে ১৩ সে. মিটার উপর দিয়ে দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় শাহজাদপুরের যমুনা তীরবর্তী এলাকায় ভয়াবহ ভাঙ্গনের আশংকা রয়েছে। ইতিমধ্যেই উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের শতাধিক গ্রাম এখন বন্যা কবলিত। এসব গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ এখন পানিবন্দী। বিশুদ্ধ পানি ও খাবার সংকট দেখা দিয়েছে। দুর্গত এলাকার মানুষগুলো এখনও পায়নি ত্রাণ সহায়াতা। নিম্নাঞ্চল সমূহের কাঁচা পাকা রাস্তাঘাট, ব্রিজ কালভার্ট, হাটÑবাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কবরস্থান, মসিজদ, মন্দির ডুবে গেছে।  সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী এ কে এম রফিকুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, উজানের ঢল ও টানা বর্ষণে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এতে শাহজাদপুরসহ সিরাজগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতি মারাত্নক আকার ধারণ করতে পারে। তবে বন্যাকবলিত এলাকার অনেক পরিবার ইতিমধ্যেই স্থানীয় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে বন্যাকবলিত এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হবে।

নীলফামারীতে তিস্তার পানি কমেছে
নীলফামারী সংবাদদাতা: গত দু’দিন তিস্তা নদীর পানি নীলফামারীর ডালিয়া তিস্তা ব্যারেজ পয়েন্টে বিপদসীমার ৫২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও মঙ্গলবার সকাল থেকে বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস সর্তকীকরণ কেন্দ্র  জানায়, সোমবার রাত থেকে তিস্তার পানি কমতে শুরু করে। যা মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে তিস্তার পানি ৫২ দশমিক ৪০ সেন্টিমিটার (বিপদসীমা ৫২ দশমিক ৬০) উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
এদিকে তিস্তার পানি কমলেও এখনও দুর্ভোগ কমেনি ডিমলা ও জলঢাকা উপজেলার কবলিত মানুষজনের।
ডিমলা উপজেলার টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ময়নুল হক জানান এবারের বন্যায় তার ইউনিয়নের এক হাজার ৭শত পরিবার পানি বন্দী হয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
পূর্ব ছাতনাই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল লতীফ জানান তিস্তার বন্যায় তার ইউনিয়নের  এক হাজার ৪০ টি পরিবার বন্যা কবলিত হয়ে পড়ে। বানের পানিতে রোপিত  আমনের চারা নষ্টসহ উঠতি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

দিনাজপুরের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত
দিনাজপুর অফিস : দিনাজপুরের প্রধান ৩টি নদীর মধ্যে ১টি নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে দেড় হাজারের বেশি মানুষ। পানিবন্দী এসব মানুষ উঁচু এলাকা ও বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে।
দিনাজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানাগেছে, দিনাজপুর জেলার প্রধান ৩টি নদীর মধ্যে ১টি নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গতকাল ১৪ জুলাই মঙ্গলবার সকাল ৯টায় দিনাজপুর শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত পুনর্ভবা নদীর পানি বর্তমানে ৩২ দশমিক ৭৮০ মিটারে প্রবাহিত হচ্ছে। পুনর্ভবা নদীর বিপদসীমা ৩৩ দশমিক ৫০০ মিটার। জেলার আত্রাণ নদীর ৩৯ দশমিক ৬৫০মিটার বিপদসীমার বিপরীতে বর্তমানে ৩৯ দশমিক ৯৮০ মিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়াও ছোট যমুনা নদীর ২৯ দশমিক ৯৫০ মিটার বিপদসীমার বিপরীতে বর্তমানে ২৮ দমশমিক ৯৮০ মিটারে প্রবাহিত হচ্ছে।
পুনর্ভবা নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে দিনাজপুর সদর উপজেলার বাঙ্গীবেচা ব্রিজ এলাকা, বালুয়াডাঙ্গা হঠাৎপাড়া, লালবাগ, রাজাপাড়ার ঘাট, নতুনপাড়া, বিরল মাঝাডাঙ্গা, মাটিয়ান, দুপ্তর, ফরক্কাবাদ ইউনিয়েনের কিছু অংশের দেড় হাজারের বেশি মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। ওই এলাকাগুলোতে দেখা দিয়েছে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাব। পানি উন্নয়ন বোর্ড আরো জানায়, সকালে জেলার আত্রাণ নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া অন্য ২টি নদী পুনর্ভবা ও ছোট যমুনা বিপদসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলের ফলে জেলার নদীগুলোর পানি বাড়ছে। দিনের মধ্যে যদি বৃষ্টিপাত বেশী হলে নদীগুলোর পানি আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর বৃষ্টি না হলে নদীগুলোর পানি কমতে শুরু করবে।

শেরপুরের ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ীতে ২০ গ্রাম প্লাবিত
শেরপুর সংবাদদাতা : গত চার দিনের প্রবল বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলে শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার চারটি ও নালিতাবাড়ী উপজেলার একটি ইউনিয়নের ২০টি গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে প্রায় দুই হাজার পাঁচশত পরিবার।  কাঁচা ঘর-বাড়ি, রাস্তাঘাট, রোপা আমন ধানের বীজতলা, সবজি, শতাধিক পুকুরের মাছ পানিতে ভেসে গেছে।
প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ী ঢলে মহারশী নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে ঝিনাইগাতী সদর, ধানশাইল, মালিঝিকান্দা ও হাতিবান্দা ইউনিয়নের ১২টি গ্রামের প্রায় দেড় হাজার ও নালিতাবাড়ীর ভোগাই নদীর বাঁধ ভেঙ্গে মরিচপুরান ইউনিয়নের ৮টি গ্রামের একহাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে পোল্ট্রি খামারি ও গৃহপালিত পশু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন পানিবন্দী খামারি মালিক এবং পরিবারগুলো। বাড়িতে পানি উঠায় চুলা জ¦ালাতে পারছেন না প্লাবিত এলাকার মানুষ। শুকনো খাবার খেয়েই দিন পার করছেন তারা। বৃষ্টিúাত না কমলে পানিবন্দী মানুষের দুর্ভোগ আরো চরমে পৌছবে।
ঝিনাইগাতী উপজেলার মালিঝিকান্দা ইউনিয়নের বানিয়াপাড়া গ্রামের পোল্ট্রি খামারী মো. মাসুদ মিয়া বলেন, আকস্মিক পাহাড়ী ঢলে সৃষ্ট বন্যায় তাঁর দুই একর পাঁচ শতাংশ জমিতে স্থাপিত মৎস্য খামারের সব মাছ ভেসে গেছে এবং তাঁর পোল্ট্রি ফার্মও হুমকির মুখে পড়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুবেল মাহমুদ বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি আরো অবনতি হতে পারে বলে আশংকা প্রকাশ করেছেন। তবে যেকোন পরিস্থিতি মোকাবেলার প্রস্তুতি তাঁদের রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ