বুধবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

সাহেদকে গ্রেফতারে ঢাকা ও মৌলভীবাজারে অভিযান

* সাহেদের নথি চেয়ে ৯ প্রতিষ্ঠানকে দুদকের চিঠি
স্টাফ রিপোর্টার: রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো: সাহেদ ওরফে সাহেদ করিমকে গ্রেফতার করতে রাজধানী ঢাকা ও মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জের সীমান্ত এলাকাসহ কয়েকটি স্থানে অভিযান চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এদিকে গতকাল মঙ্গলবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, তিনি স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালকের (ডিজি) অনুরোধে রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তির অনুষ্ঠানে ছিলেন। অন্যদিকে সাহেদ-সংশ্লিষ্ট নথি চেয়ে ৯ প্রতিষ্ঠানকে চিঠি পাঠিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। র‌্যাব জানিয়েছে, প্রতারণার জগতে সাহেদ একজন আইডল। সে প্রতারণাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যা সাধারণ মানুষের ভাবনার অতীত। রিজেন্ট কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে জাল সার্টিফিকেটও দিত সাহেদ। এছাড়া সাহেদের বিরুদ্ধে প্রতারণা, হয়রানি ও নিপীড়নের নানা অভিযোগ করছেন ভুক্তভোগীরা।
জানা গেছে, সাহেদ মৌলভীবাজারে অবস্থান করছে এমন তথ্যের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সোমবার রাতভর তৎপর ছিল জেলার সীমান্ত এলাকায়। সাহেদের ফোন ট্র্যাক করে তার খোঁজে জেলাজুড়ে তল্লাশি চালায় র‌্যাব ও পুলিশ। তবে এখনও সাহেদের কোনও খোঁজ মেলেনি। জেলার সব সীমান্তে চেকপোস্ট, রিসোর্ট, হোটেল-মোটেলে বিশেষ নজরদারি রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। গোয়েন্দাদের ধারণা, সাহেদ হয়তো মৌলভীবাজারের পাহাড়ী এলাকার হোটেল-রিসোর্টে অবস্থান করতে পারে। অথবা সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারে। গোয়েন্দাদের এমন আগাম খবরে ওই এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে বিশেষ নজরদারি ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। সোমবার বিকাল থেকে ভারতের ত্রিপুরাগামী মৌলভীবাজার-চাতলাপুর সড়কের শমশেরনগর চৌমুহনী চত্বর ও লাউয়াছড়া সড়কের ফুলবাড়ী এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে যানবাহনে তল্লাশি চালায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সীমান্ত চেকপোস্ট বসিয়ে বিশেষ নজরদারি ছিল এ বিষয়ে কমলগঞ্জ থানার একজন কর্মকর্তা জানান, মৌলভীবাজার জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের জানানো হয়েছে ঢাকার রিজেন্ট হাসপাতালের করোনা কেলেঙ্কারি ঘটনার পলাতক প্রধান আসামী সাহেদ এ পথে কুলাউড়া উপজেলার শরীফপুর সীমান্তপথে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কৈইলাশহরে যেতে পারে–এমন সংবাদ রয়েছে। তাই সতর্কতাস্বরূপ যানবাহনে তল্লাশি করতে হচ্ছে। এ খবর পেয়ে সোমবার বিকাল ৫টার দিকে কমলগঞ্জ থানার শমশেরনগর পুলিশ ফাঁড়ির উপ-পরিদর্শক আনজির হোসেনের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল শমশেরনগর চৌমুহনায় দাঁড়িয়ে যানবাহনগুলো তল্লাশি করে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী যা বললেন: স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালকের (ডিজি) অনুরোধে রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তির অনুষ্ঠানে ছিলেন বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তিনি বলেন, আমি ডিজি অফিসে একটি সভায় গিয়েছিলাম। সভা শেষে ডিজির অনুরোধে রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তির অনুষ্ঠানে ছিলাম। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে নিজ দফতরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের মধ্যে কোনো সমস্যা নেই। স্বাভাবিক একটা ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে, সেজন্য স্বাস্থ্যসেবায় কোনো সমস্যা হচ্ছে না।’ জেকেজি ও রিজেন্ট হাসপাতালের অনৈতিক কমর্কাণ্ডের প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দুটি সংস্থাকে কিছু কাজের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। একটা হলো জেকেজি। যদি অন্যায় কাজ করে থাকে তাহলে সেই প্রতিষ্ঠান ও তিনি (প্রতিষ্ঠান কতৃপক্ষ) দায়ী। আরেকটি হলো রিজেন্ট হাসপাতালে। সেই হাসপাতালকে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে কিছু প্রক্রিয়া আছে। সেই প্রক্রিয়াগুলো পালন করে অধিদফতর। সেই প্রক্রিয়া পালন করে তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, সই করেছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা ডিজি অফিসে একটি সভায় গিয়েছিলাম। আন্ত মন্ত্রণালয় সভা ছিল। সচিবেরা ছিলেন, অন্যান্য ব্যক্তিরাও ছিলেন। ডিজির অনুরোধে... আপনারাও একটু থাকেন, চুক্তি সাক্ষর হবে। কী সেই সাক্ষর হবে। রিজেন্টের সঙ্গে সাক্ষর হবে। দুপুরের খাবারের পর। তো আমরাও সেখানে ছিলাম। আমরা খুশি ছিলাম, যে একটা নতুন হাসপাতাল আসল করোনার চিকিৎসা দেবে। প্রাইভেট তো তখন করোনা চিকিৎসা দিতে দ্বিধা করছে। ওনারাও আসল। ওনারা এসে সই-সাক্ষর করল, আমরাও খুশি হলাম। বাস! আমরা ওখান থেকে সরে গেলাম। পরবর্তীকালে যে ঘটনাগুলো তা দুর্ভাগ্যজনক, ন্যাক্বারজনক। যে কাজ করেছে, অন্যায় কাজ করেছে। অন্যায় কাজ করলে আইন অনুযায়ী যে ব্যবস্থা আছে সেটা নেওয়া হয়েছে। সে অনুয়ায়ী শাস্তি হবে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ: পলাতক সাহেদের বিরুদ্ধে প্রতারণা, হয়রানি ও নিপীড়নের নানা অভিযোগ নিয়ে সামনে আসছেন ভুক্তভোগীরা। রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান সাহেদ তার প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হয়রানির পাশাপাশি তাদের উপর নিপীড়ন চালাতেন বলে তার সাবেক জনসংযোগ কর্মকর্তা (পিআরও) আরিফুর রহমান সোহাগ অভিযোগ করেছেন। চট্টগ্রামের হালিশহরের এই বাসিন্দা বলছেন, সাহেদের হয়রানি-নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে এক পর্যায়ে তিনি চাকরি ছাড়তে চাইলে সাহেদ প্রভাব খাটিয়ে তাকে থানায় নিয়ে আটকে রাখেন। পরে কৌশলে তিনি কর্মস্থল ছেড়ে দিলে তার পুরো পরিবারের বিরুদ্ধে চুরির মিথ্যা অভিযোগে মামলা করেন সাহেদ। আরিফুর রহমান সোহাগ ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালের অগাস্ট পর্যন্ত রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান সাহেদের পিআরওর দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বলেন, চাকরি ছাড়ায় তাকে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়েছে। তার বাবা-মা ও তিন বোনকেও আসামি করা হয়। তিনি বলেন, বাবা-মাকে অযথা মামলার আসামি করে হয়রানি, অকথ্য ভাষায় গালাগালি ও বিভিন্ন সময়ে সাহেদের হুমকির সেসব যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতা এখনও ভুলতে পারছেন না সোহাগ।
হালিশহর বি ব্লকের বাসিন্দা সোহাগ ২০১৪ সালে রিজেন্ট গ্রুপের পত্রিকা দৈনিক নতুন কাগজে রিপোর্টার হিসেবে যোগ দেন। পরে তাকে চেয়ারম্যানের অর্থাৎ সাহেদের পিআরও হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি বলেন, সাহেদ তার সব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে বাজে আচরণ করতেন; তাদের অবিশ্বাস করতেন সবসময়। কর্মচারীরা তার অত্যাচারে তটস্থ থাকতেন। পছন্দমতো কাজ না হলে উত্তরার অফিসে নিজ কক্ষে কর্মচারীদের ডেকে নিয়ে শারীরিকভাবে নির্যাতন করতেন।
জাল সার্টিফিকেটও দিত সাহেদ: সাহেদ গ্রেফতার করতে দেশের সব জায়গায় অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে র‌্যাব। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে র‌্যাব সদর দফরে ব্রিফিংয়ে এ কথা জানান র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যাম শাখার পরিচালক আশিক বিল্লাহ। এসময় তিনি জানান, সাহেদের মত প্রতারণায় অন্য যারা জড়িত তাদেরও আনা হবে আইনের আওতায়। তিনি আরো বলেন, ‘নতুন করে অনেক অভিযোগই আমাদের কাছে আসছে, সর্বশেষ আমাদের কাছে যে অভিযোগ এসেছে রিজেন্ট কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক জাল সার্টিফিকেট দিয়েছেন শাহেদ।
নথি চেয়ে ৯ প্রতিষ্ঠানকে দুদকের চিঠি: সাহেদের ‘অবৈধ’ সম্পদের অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র চেয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতর, বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবি আর, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনসহ নয়টি প্রতিষ্ঠানে চিঠি পাঠিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন- দুদক। গতকাল মঙ্গলবার অনুসন্ধান কর্মকর্তা দুদকের উপ-পরিচালক মো. আবু বকর সিদ্দিকের স্বাক্ষরে এসব চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে কমিশনের পরিচালক (জনসংযোগ) প্রনব কুমার ভট্টাচার্য্য  জানিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে মোহাম্মদ সাহেদ কোটি কোটি টাকার ‘অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন’ উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র চেয়ে যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদফতর, উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিএফআইইউ প্রধান, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের উত্তরা শাখার ব্যবস্থাপক, দি ঢাকা মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ ব্যাংকের বিমানবন্দর শাখা ব্যবস্থাপক, জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান এবং এনবি আরের কর অঞ্চল-৯ এর উপ-কর কমিশনারের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। রিজেন্ট হাসপাতালের স্বত্বাধিকারী ও রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ ওরফে সাহেদ করিমের বিরুদ্ধে মাইক্রোক্রেডিট ও এমএলএম ব্যবসার নামে জনসাধারণের সাথে প্রতারণা করে কোটি কোটি টাকা সংগ্রহ করে আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ