বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠক সাবেক মন্ত্রী বিএনপি নেতা শাহজাহান সিরাজ আর নেই

স্টাফ রিপোর্টার: স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করা স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক চার বারের সাবেক সংসদ সদস্য, সাবেক বন ও পরিবেশমন্ত্রী এবং বিএনপির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শাহজাহান সিরাজ (৭৭) আর নেই। ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। গতকাল মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ৩টায় রাজধানীর এভার কেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। তার মৃত্যুতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও বিশিষ্টজনরা শোক জানিয়েছেন।
বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রেস উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবীর খান জানান, আজ বুধবার বনানী কবরস্থানে শাহজাহান সিরাজকে দাফন করা হবে।
জানা গেছে, গত সোমবার (১৩ জুলাই) তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। দীর্ঘদিন ক্যানসারে ভুগছিলেন মুক্তিযুদ্ধসহ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের নানা পর্বের সাক্ষী এই রাজনৈতিক নেতা। গত কয়েক বছর তিনি শারীরিক অসুস্থতার কারণে রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় ছিলেন। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে দীর্ঘদিন ডায়াবেটিস, কিডনি জটিলতা, উচ্চ রক্তচাপে ভুগছিলেন শাহজাহান সিরাজ। ২০১২ সালে তার ফুসফুসে ক্যানসার ধরা পড়ে। এর কয়েক বছর পর ক্যানসার ধরা পড়ে মস্তিষ্কেও।
মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী রাবেয়া সিরাজ, মেয়ে সারোয়াত সিরাজ ও ছেলে রাজীব সিরাজসহ অসংখ্য শুভাকাক্সক্ষী রেখে গেছেন। শাহজাহান সিরাজের স্ত্রী রাবেয়া খাতুনও বিএনপি রাজনীতিতে সম্পৃক্ত। তিনি সর্বশেষ বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ তাঁতী বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন।
১৯৪৩ সালের ১ মার্চ টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে জন্মগ্রহণ করেন শাহজাহান সিরাজ। ১৯৬২ সালে হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন বিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত হওয়ার মধ্যদিয়ে শাহজাহান সিরাজ ছাত্র-রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। সেই সময় তিনি টাঙ্গাইলের করটিয়া সা’দত কলেজের ছাত্র ছিলেন। এরপর তিনি ছাত্রলীগের মাধ্যমে ছাত্র-রাজনীতিতে উঠে আসেন। ১৯৬৪-৬৫ এবং ১৯৬৬-৬৭ দুই মেয়াদে তিনি দুইবার করটিয়া সা’দাত কলেজের ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। একজন সক্রিয় ছাত্রনেতা হিসেবে তিনি ১১ দফা আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করেন। এরপর তিনি ১৯৭০-৭২ মেয়াদে অবিভক্ত ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ছিলেন ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’ (যার অন্য নাম নিউক্লিয়াস) এর সক্রিয় কর্মী, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা।
মুক্তিযুদ্ধের পর সর্বদলীয় সমাজতান্ত্রিক সরকার গঠনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) গঠনে ভূমিকা পালন করেন, যা ছিলো স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বিরোধী দল। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের প্রতিষ্ঠাতা সহকারী সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন শাহজাহান সিরাজ। পরবর্তীতে জাসদে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। জাসদের মনোনয়নে ৩ বার তিনি জাতীয় সংসদের টাঙ্গাইল-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
শাহজাহান সিরাজ ১৯৯৫ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপিতে যোগ দেন। তিনি বিএনপির মনোনয়নেও একবার একই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বেগম খালেদা জিয়া সরকারের শেষ পর্যায়ের দিকে নৌপরিবহন মন্ত্রি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
শাহজাহান সিরাজ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। মুক্তিযুদ্ধের সময় যাদের ‘চার খলিফা’ বলা হতো শাহজাহান সিরাজ ছিলেন তাদেরই একজন। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ তিনি সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, আবদুল কুদ্দুস মাখন, নূরে আলম সিদ্দিকী, আ স ম আবদুর রব প্রভৃতি ছাত্রনেতাদের পাশাপাশি স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৯৭১ সালের ২রা মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন আ স ম আবদুর রব। সেখান থেকেই পরবর্তী দিনে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠের পরিকল্পনা করা হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৩ মার্চ ১৯৭১ পল্টন ময়দানে বিশাল এক ছাত্র জনসভায় বঙ্গবন্ধুর সামনে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করেছিলেন শাজাহান সিরাজ। এরপর যুদ্ধ শুরু হলে তিনি সশস্ত্র যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ‘বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স’ (বিএলএফ) বা মুজিব বাহিনীর কমান্ডার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
নামাযে জানাযার সিডিউল : আজ বুধবার সকাল ১১ টায় প্রথম জানাযা টাঙ্গাইল এলেঙ্গায় অনুষ্ঠিত হবে। দ্বিতীয় জানাযা বাদ জোহর কালী হাতী উপজেলায়। তৃতীয় জানাযা বাদ এশা গুলশান সোসাইটি মসজিদে নামাজ জানাযা শেষে দাফন করা হবে বনানী কবর স্থানে।
বিএনপির শোক: এক শোকবার্তায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাবেক মন্ত্রী, দেশের খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ ও দেশমাতৃকার কৃতি সন্তান শাহজাহান সিরাজ এর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দু:খ প্রকাশ করে বলেন, স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম কারিগর, স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠকারী দেশের বরেণ্য রাজনীতিবিদ শাহজাহান সিরাজের মৃত্যুতে আমি তার পরিবারের শোক ও বেদনার সাথে সম-অংশিদার। আমাদের জাতীয় সংগ্রামের একজন কীর্তিমান পুরুষ শাহজাহান সিরাজ, দেশের মুক্তি, গণতন্ত্র ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে এক সাহসী নেতার নাম শাহাজাহান সিরাজ। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন কেটেছে স্বৈরশাহীর জুলুম-নির্যাতনের কষাঘাতে। একদলীয় নাৎসী দু:শাসনের আগ্রাসী অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে তাকে বারবার কারা নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। অগণতান্ত্রীক কর্তৃত্ববাদী অন্ধ অসহিষ্ণু সরকার তাকে হয়রানী করেছে বারবার। তবুও শাহজাহান সিরাজ গণঅধিকার আদায়ে তার কর্তব্যকর্ম থেকে পিছপা হয়নি। তিনি ছিলেন ধৈর্যশীল কিন্তু অন্যায় অপকর্মের প্রতিবাদে তেজষ¦ী বাগ্মি। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে প্রত্যেকটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রামে তাঁর অংশগ্রহণ নি:সন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। তাঁর মতো একজন অনন্য স্বাধীনতা সংগ্রামী ও রাজনীতিবিদ এই মুহূর্তে পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ায় দেশ এক অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখিন হলো।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শোকবার্তায় মরহুম শাহজাহান সিরাজ এর রূহের মাগফিরাত কামনা করে শোকবিহব্বল পরিবারের সদস্যবর্গ, আত্মীয়স্বজন এবং শুভাকাঙ্খীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
বিভিন্ন সংগঠনের শোক: স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠক, স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা, শাহজাহান সিরাজের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম ও সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান বীর প্রতীক।
শাহজাহান সিরাজের স্মৃতিচারণ করে বঙ্গবীর বলেন, পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ১৯৭১ সালের ৩রা মার্চ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে শাজাহান সিরাজ স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করার মাধ্যমে যে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছিলেন তা এই দেশ, মানচিত্র আর পতাকা যতদিন থাকবে ততদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি মরহুমের রূহের শান্তি কামনা করে শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজনের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
শাহজাহান সিরাজের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করে বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশ ন্যাপ চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি ও মহাসচিব এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া বলেন, শাহজাহান সিরাজ ইতিহাসের কিংবদন্তী। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের এক জলন্ত অধ্যায়ের শেষ হলো। শোক বার্তায় নেতৃদ্বয় মরহুমের রূহের মাগফিরাত কামনা ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ