সোমবার ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

রাজধানীতে ১০ অস্থায়ী পশুর হাটের ইজারা চূড়ান্ত

* শেষ পর্যন্ত হাটগুলো বসবে কিনা তা নিয়েও আছে দ্বিধাদ্বন্দ্ব
তোফাজ্জল হোসাইন কামাল : আর সপ্তাহ দুয়েক বাদেই ঈদুল আযহা। এই ঈদের অন্যতম অনুষঙ্গ কুরবানির পশু। এই পশু কেনার জন্য দরকার হাট। সে হাটের আয়োজন করে থাকে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন। কিন্তু এবার করোনাকালীন সময়ে কুরবানির পশুর হাট নিয়ে দফায় দফায় সিদ্বান্ত পাল্টে ফেলতে হচ্ছে আয়োজক দুই সংস্থাকেই। সর্বশেষ, ওই দুই সংস্থাই রাজধানীতে কুরবানির পশু বিক্রির জন্য ১০ টি অস্থায়ী হাটের ইজারা চুড়ান্ত করেছে। চাহিদার তুলনায় এই হাটের সংখ্যা কম হওয়ায় রাজধানীবাসীর মধ্যে শুরু হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
এদিকে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে রাজধানীতে এবার কোন অস্থায়ী পশুর হাট বসতে দেয়া হবে না বলে সিদ্বান্ত নেয়া হয়েছে। সেক্ষেত্রে অনলাইনে কুরবানির পশু কেনার জন্য নগরবাসীকে আহবান জানানো হয়েছে।
উপরোক্ত এই দুই সিদ্বান্তের কারনে শেষ পর্যন্ত রাজধানীতে কুরবানির পশুর অস্থায়ী হাট বসবে কিনা তা নিয়েও শুরু হয়েছে দ্বিধাদ্বন্ধ।
জানা গেছে, প্রতি বছরই কুরবানির পশুর হাট বসা নিয়ে ঈদের ১৫-১৬ দিন আগেই সব কিছু চূড়ান্ত হয়ে যায়। কিন্তু এ বছরের প্রেক্ষাপটটা ভিন্ন শুধু নয় অত্যন্ত স্পর্শকাতরও। করোনা ভাইরাসের কারণে অনলাইনে পশু কেনাকাটার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিলেও শেষ পর্যন্ত রাজধানীতে এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত হওয়া ১০টি অস্থায়ী পশুর হাটের  মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় পাঁচটি এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় বসবে বাকি পাঁচটি । এর বাইরে উত্তরে গাবতলী ও দক্ষিণে সারুলিয়ার স্থায়ী পশুর হাটেও চলবে কুরবানির পশুর বেচাকেনা।
দুই সিটির লক্ষ্য ছিল অবশ্য বেশি। করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ঝুঁকির মধ্যেও এ বছর রাজধানীতে স্থায়ী দুইটি হাটের বাইরে আরও ২৪টি অস্থায়ী কুরবানির পশুর হাট বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু ডিএনসিসির ১০টি ও ডিএসসিসির ১৪টি হাটের ইজারার জন্য দুই দফা দরপত্র আহ্বান করেও কাক্সিক্ষত দর পাওয়া যায়নি। ফলে সব হাট ইজারা দেওয়া সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত দুই সিটিই পাঁচটি করে হাটের ইজারা চূড়ান্ত করেছে। এর বাইরে খাস আদায়ের মাধ্যমে অন্য কোনো হাট ইজারা না দেওয়ারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুই সিটিই। আর দক্ষিণ সিটি ১৯ জুলাই পর্যন্ত হাট ইজারার সুযোগ উন্মুক্ত রাখলেও ওই সময়ে গিয়ে হাট ইজারা নেওয়ার মতো কাউকে পাওয়া যাবে না বলেও মনে করছে।
ডিএনসিসির চূড়ান্ত ৫ হাট
ডিএনসিসির ইজারা চূড়ান্ত হওয়া হাটগুলো হলো- কাওলা-শিয়ালডাঙ্গা সংলগ্ন খালি জায়গা, উত্তরা ১৭ নম্বর সেক্টরের বৃন্দাবন থেকে উত্তর দিকে বিজিএমইএ পর্যন্ত খালি জায়গা, সম্পূর্ণ নতুন হিসেবে ৪৩ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্বাচল ব্রিজসংলগ্ন মস্তুুল ডুমনি বাজারমুখী রাস্তার উভয়পাশের খালি জায়গা, ভাটারা সাঈদনগর ও আব্দুল্লাহপুর এলাকায় বেঁড়িবাধ সংলগ্ন  মৈয়নারটেক শহীদনগর এলাকা।
এর আগে, ১৮ জুন ডিএনসিসি এলাকায় ১০টি অস্থায়ী কুরবানির পশুর হাটের ইজারার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। যে পাঁচটি হাট ইজারা দেওয়া যায়নি, সেগুলো হলো- উত্তরা ১৫ নম্বর সেক্টরের ১ নম্বর ব্রিজের পশ্চিমের অংশ ও ২ নম্বর ব্রিজের পশ্চিমে গোলচত্বর পর্যন্ত সড়কের ফাঁকা জায়গা, ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের খেলার মাঠ, বাড্ডা ইস্টার্ন হাউজিং (আফতাব নগর) ব্লক-ই সেকশন ৩-এর খালি জায়গা, মোহাম্মদপুর বুদ্ধিজীবী সড়কসংলগ্ন (বছিলা) পুলিশ লাইন ও মিরপুর সেকশন ৬ ওয়ার্ড ৬ (ইস্টার্ন হাউজিং)।
করোনার ঝুঁকি এড়াতে ও কাঙ্ক্ষিত দর না পাওয়ায় উত্তরা ১৫ নম্বর সেক্টরের ১ নম্বর ব্রিজের পশ্চিমের অংশ এবং ২ নম্বর ব্রিজের পশ্চিমে গোলচত্বর পর্যন্ত সড়কের ফাঁকা জায়গা, ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের খেলার মাঠ ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে হাটগুলো বাতিল করে গত দুই জুন একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে ডিএনসিসি।
ডিএনসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. মোজ্জাম্মেল হক বলেন, আমরা আগেই তিনটি হাটের ইজারা সম্পন্ন করেছিলাম। করোনার ঝুঁকি বিবেচনায় আর কোনো হাট না বসানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তবে সোমবার জনস্বার্থে হাট বাড়ানোর বৈঠকে আরও দু’টি হাট (ভাটারা ও মৈয়নারটেক) ইজারার জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব হাটের জন্য কাঙ্ক্ষিত দর পাওয়া যায়নি। তবু জনস্বার্থে এসব এলাকায় হাট বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কারণ ভাটারা এলাকার আশপাশে আর কোনো হাট না থাকায় সে এলাকার বাসিন্দাদের পশু কিনতে উত্তরা যেতে হতো। তাই এ সিদ্ধান্ত।
ডিএসসিসির চূড়ান্ত ৫ হাট
ডিএসসিসির কমলাপুর লিটল ফ্রেন্ডস ক্লাব সংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গা, আফতাবনগর ব্লক-ই, এফ, জি-এর সেকশন ১ ও ২ নম্বর এলাকা, হাজারীবাগ লেদার টেকনোলজি কলেজ সংলগ্ন খালি জায়গা, উত্তর শাহজাহানপুর মৈত্রী সংঘের মাঠ সংলগ্ন খালি জায়গা এবং পোস্তগোলা শ্মশানঘাট সংলগ্ন খালি জায়গাসহ মোট পাঁচটি হাট ইজারার জন্য চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে সংস্থাটিতে তৃতীয় দফায় আহ্বান করা দরপত্র খোলা হবে ১৯ জুলাই। ওই দিন বাকি হাটগুলোতে কাঙ্ক্ষিত দর পেলে ইজারা দেওয়া হবে। আর না পাওয়া গেলে পাঁচটি হাটই চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে বলে জানা গেছে। তবে বাকি হাটগুলো ইজারা হওয়ার সম্ভাবনা কম বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ হাট প্রস্তুতের জন্য কমপক্ষে সময় লাগে ১৫ দিন। ১৯ জুলাই ইজারা নেওয়া হলে প্রস্তুতির জন্য ইজারাদারের হাতে সময় থাকবে মাত্র পাঁচ-ছয় দিন। এ অল্প সময়ে কেউ হাট ইজারা নিতে রাজি হবে বলে মনে করছে না ডিএসসিসির সম্পত্তি বিভাগ সংশ্লিষ্টরা।
গত ১৪ জুন ১৪টি অস্থায়ী হাট ইজারা দিতে দরপত্র আহ্বান করে ডিএসসিসি। হাটগুলো হলো উত্তর শাহজাহানপুর খিলগাঁও রেলগেট বাজারের মৈত্রী সংঘ মাঠ, হাজারীবাগের ইনস্টিটিউট অব লেদার টেকনোলজি মাঠসংলগ্ন উন্মুক্ত এলাকা, কামরাঙ্গীর চরের ইসলাম চেয়ারম্যানবাড়ির মোড় থেকে বুড়িগঙ্গার বাঁধ, পোস্তগোলা শ্মশানঘাট, শ্যামপুর বালুর মাঠ, মেরাদিয়া বাজার, আরমানিটোলা মাঠ, লিটল ফ্রেন্ডস ক্লাবসংলগ্ন গোপীবাগ বালুর মাঠ ও কমলাপুর স্টেডিয়ামসংলগ্ন বিশ্বরোড, দনিয়া কলেজ মাঠসংলগ্ন খালি জায়গা, ধূপখোলা মাঠ, সাদেক হোসেন খোকা মাঠের পাশে ধোলাইখাল ট্রাক টার্মিনাল, ডিএসসিসির আফতাবনগরের (ইস্টার্ন হাউজিং) ব্লক ই, এফ, জি ও এইচ এবং সেকশন-১ ও ২, আমুলিয়া মডেল টাউন এবং লালবাগের রহমতগঞ্জ খেলার মাঠ।
দরপত্র আহ্বানের প্রথম দফায় ২৮ জুন টেন্ডার খোলা হয়। তখন মাত্র তিনটি হাটের কাঙ্ক্ষিত দর পেয়ে ইজারা চূড়ান্ত করা হয়। বাকি হাটগুলো ইজারার জন্য ফের দরপত্র আহ্বান করা হয়। দরপত্র খোলা হয় ৮ জুলাই। এ দফায় হাট মূল্যায়ন কমিটি ফের কাঙ্ক্ষিত দর পেয়ে আরও দু’টি হাটসহ মোট পাঁচটি হাটের ইজারা চূড়ান্ত করে। বাকি হাটগুলো দর না পাওয়ায় ফের তৃতীয় দফায় দরপত্র আহ্বান করা হয়, যা আগামী ১৯ জুলাই খোলা হবে। ওই দিনই চূড়ান্ত হবে, ডিএসসিসিতে নতুন আর কোনো হাট বসবে কি না।
ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা রাসেল সাবরিন বলেন, আমাদের পাঁচটি হাটের ইজারা চূড়ান্ত করা হয়েছে। বাকি আর কোনো হাট চূড়ান্ত হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত ১৯ জুলাই তৃতীয় দফার দরপত্র খোলার পর জানানো হবে। তবে ওই দিন যদি নতুন কোনো হাটের জন্য কাঙ্ক্ষিত দর না পাওয়া যায়, তাহলে এখনকার পাঁচটি হাটই চূড়ান্ত থাকবে। নতুন কোনো হাট বসিয়ে ডিএসসিসি হাসিলও আদায় করবে না, হাটও বসাবে না।
এদিকে, চাহিদার তুলনায় হাটের সংখ্যা কম হওয়ায় নগরবাসীর মাঝে দেখা দিয়েছে মিশ্রপ্রতিক্রিয়া। কেউ কেউ বলছেন, হাটের সংখ্যা কম হওয়ায় হাটে ক্রেতা-বিক্রেতার চাপ থাকবে বেশি। বাড়তি ভিড়ের কারণে করোনার সংক্রমণের ঝুঁকিও বেড়ে যাবে এতে।
ডিএনসিসির ‘ডিজিটাল’ ব্যবস্থাপনা আর ডিএসসিসির পরামর্শ ‘বাসায় কুরবানি’
বিগত বছরগুলোতে কুরবানি পশুর বর্জ্য অপসারণ সুবিধায় কুরবানি দেওয়ার জন্য রাজধানী ঢাকায় নির্ধারিত স্থান চিহ্নিত করে দিতো ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। কিন্তু এবছর ঈদের ব্যবস্থাপনা নাগরিকদের ওপর ছেড়ে দিচ্ছে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। সংস্থাটি বলছে, করোনার কারণে মানুষকে রাস্তা বা বাসার বাইরে কুরবানি না দিতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। সে কারণে ঈদের দিন কুরবানির কোনও ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে না। আর উত্তর সিটি করপোরেশন কুরবানি ব্যবস্থাপনার ডিজিটাল উদ্যোগ নিয়েছে। সংস্থাটি অনলাইনে পশু কেনাকাটা থেকে শুরু করে মাংস বাসায় পৌঁছে দেওয়ারও উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করে নগরীর বিভিন্ন স্থানের নির্ধারিত এলাকায় পশু জবাই দেওয়ার স্থানও চিহ্নিত করে দেবে। দুই সিটির শীর্ষস্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, আমরা এবছর হাটের পাশাপাশি ডিজিটাল হাটের ব্যবস্থাও করেছি। মানুষ চাইলে অনলাইনের মাধ্যমে পশু কেনাকাটা করতে পারবে। এখান থেকে কিন্তু আমরা একটা টাকাও পাচ্ছি না। শুধু কেনাকাটা নয়, চাইলে পশু জবাই করেও আমরা বাসায় পৌঁছে দেবো। সেই ব্যবস্থাও করছি। এজন্য ফুডপান্ডা, সেবা ডটকম, এসএ পরিবহনসহ অন্যান্য কোম্পানির সঙ্গেও আমরা চুক্তি করতে যাচ্ছি। নাগরিকদের সুবিধার্থে এই উদ্যোগ নিয়েছি। তিনি  বলেন, আমরা ঢাকার বসিলা, বনানী ও উত্তরাসহ চারটি এলাকায় পশু জবাই দেবো। যেখান থেকে মাংস বাসাবাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হবে। যদি কেউ চান যে তার মাংসের এক তৃতীয়াংশ আমাদের মাধ্যমে গরিব মানুষের মাঝে বণ্টন করবেন, সে ব্যবস্থাও রাখবো। আর যত্রতত্র কুরবানি দিলে শহর নোংরা হয়। তাই অন্যান্য বছরের মতো যাতে যত্রতত্র কুরবানি না হয়, সেজন্য বিভিন্ন স্থানে প্যান্ডেলও করে দেবো। সেসব স্থানে স্বাস্থ্যবিধি যাতে পুরোপুরিভাবে পালন করা হয় সেটাও দেখভাল করা হবে। আমি মনে করি মানুষ আমাদের এই সেবা গ্রহণ করবে।
করোনাকালে কুরবানি ঈদের ব্যবস্থাপনা নাগরিকদের ওপর ছেড়ে দিচ্ছে ডিএসসিসি। সংস্থাটির মতে পশু জবাই দেওয়ার জন্য নির্ধারিত স্থান করে দিলেও কেউ সেখানে কুরবানি দেয় না। সংস্থার কাউন্সিলররাও এই উদ্যোগে আগ্রহী নন। সেকারণে এবছর তারা নির্ধারিত স্থান করতে আগ্রহী নয়।
জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ মো. এমদাদুল হক বলেন, আমরা এখনও এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনও সিদ্ধান্ত নেইনি। তবে গত বোর্ড সভায় আমাদের কাউন্সিলরদের অনেকেই বলেছেন, পশু জবাই দেওয়ার জন্য নির্ধারিত স্থান করে দিলে কেউ সেখানে যায় না। বিগত বছরগুলোতেও এমন চিত্র দেখা গেছে। এবছর যেহেতু প্রেক্ষাপট অনেকটা ভিন্ন, তাই তারা (কাউন্সিলররা) নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কুরবানির মতামত দিয়েছেন। মানুষ নিজেরাই সতর্কতার সঙ্গে নিজের নিজের আয়ত্তের মধ্যে কুরবানি দেবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ