বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

বেসরকারি ব্যাংকের ওপর গ্রাহকদের আস্থা কমার আশঙ্কা

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : করোনা সংকটকালে ব্যাংকের খরচ কমানোর নামে বেশ কয়েকটি ব্যাংক তাদের কর্মীদের বেতন-ভাতা কমিয়েছে। কোনো কোনো ব্যাংক কর্মী ছাঁটাই শুরু করেছে। ব্যাংককে সারভাইভ করার জন্য কর্মী ছাঁটাই, বেতন কমানো সমাধান নয় বলে মত দিয়েছেন ব্যাংকাররা। তারা বলেছেন, এটার সমাধান হিসাবে সব ধরনের অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে আনতে হবে। গত কয়েক মাসে দেড় শতাধিক কর্মীকে ছাঁটাই করেছে বেসরকারি এবি ব্যাংক। ব্যয় কমানোর নামে এর আগে ওয়ান ব্যাংক, দ্য সিটি ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ও এবি ব্যাংক তাদের কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, ব্যাংকগুলো তার কর্মকর্তাদের বেতনেরই যদি সুরক্ষা দিতে না পারে, তাহলে গ্রাহকরা তাদের আমানতের সুরক্ষার ব্যাপারে নিশ্চিত হবে কিভাবে? এর ফলে বেসরকারি ব্যাংকের ওপর গ্রাহকদের আস্থা কমে যাবে।
জানা গেছে, করোনা সংকটের সময় ওয়ান ব্যাংকসহ মোট চারটি ব্যাংক তাদের কর্মকর্তাদের বেতন কমানোর ঘোষণা দিয়েছে। এর আগে এক্সিম ব্যাংক, সিটি ব্যাংক এবং এবি ব্যাংকও বেতন কমানোর ঘোষণা দেয়। ওয়ান ব্যাংকের কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে জানানো হয়, মূল বেতনের ৫ থেকে ১০ শতাংশ এবং মোট বেতনের ৫ থেকে ১০ শতাংশ কমানো হবে। তবে ৫০ হাজার টাকার নীচে কারো বেতন নামবে না। ১ জুলাই থেকেই এটা কার্যকর হবে। ব্যাংকের অ্যাসিটেন্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট থেকে ঊর্ধ্বতনদের মূল বেতন ১০ শতাংশ কমে যাবে। আর প্রিন্সিপাল অফিসার থেকে নীচের গ্রেডের অফিসারদের মূল বেতন ৫ শতাংশ কমবে। এর আগে গত জুনে সিটি ব্যাংকতাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ১৬ শতাংশ বেতন-ভাতা কমায়। ১ জুন থেকে তা কার্যকর হয়েছে। এক্সিম ব্যাংক বেতন কমিয়েছে ১৫ শতাংশ। কার্যকর হয়েছে ১ জুন থেকে। এই দুটি ব্যাংকে বেতন কমানোর সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
এবি ব্যাংক মে ও জুন মাসের বেতন ৫ শতাংশ কমিয়েছে। তারা একসঙ্গে সিদ্ধান্ত না দিয়ে মাস ধরে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। করোনাভাইরাসের এ দুর্যোগকালীন সময়ের মধ্যে কর্মী ছাঁটাই করেছে বেসরকারি এ ব্যাংকটি। ব্যাংকটি তাদের শতাধিক কর্মকর্তাকে ইতোমধ্যেই চাকরিচ্যুত করেছে। গত রোববার এটি কার্যকর করা হয়েছে। চাকরিচ্যুত কর্মকর্তাদের তালিকা করে এক অফিস নির্দেশনা জারি করে এবি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। চাকরিচ্যুত হওয়া কর্মীদের উদ্দেশে অফিস নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যাদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে, তাদের সব বকেয়া এবং পাওনা পরিশোধ করা হবে। এবি ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী তাদের তিন মাসের মূল বেতন প্রদান করা হবে। সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নিলে তার জন্য তিনি নিজেই দায়ী থাকবেন।
গত মাসে আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকে বেতন কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও পরে তা স্থগিত করা হয়।
বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) করোনা মহামারিতে গত জুন মাসে ব্যাংকারদের বেতন কমানোর পরামর্শ দেয়। তবে বেশ কিছু ব্যাংক বেতন না কমানোর ঘোষণা দিয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে ইউসিবি, এসবিএসি, প্রাইম ব্যাংক, ডাচ-বাংলা ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, এনসিসি ও মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক। কিন্তু বাকি বেসরকারি ব্যাংকগুলো কী করবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। বাংলাদেশে বেসরকারি ব্যাংক আছে ৬০টি।
যেসব ব্যাংকে বেতন কমানো হয়েছে, সেখানকার কর্মকর্তারা ক্ষুব্ধ। অন্য ব্যাংকগুলোতেও বেতন কমানোর আতঙ্ক রয়েছে। বেতন কমানো হয়েছে এমন একটি ব্যাংকের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেন, আমরা করোনার মধ্যে সেবা দিচ্ছি। আমাদের ব্যাংক খাতের ১০ ভাগ কর্মকর্তা কর্মচারী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। ৩৬ জন মারা গেছেন। তারপরও বেতন কমানোয় আমরা হতাশ হয়ে পড়ছি।
ব্যাংকারদের মতে, ব্যাংককে সারভাইভ করার জন্য কর্মী ছাঁটাই, বেতন কমানো সমাধান নয়। বরং সব ধরনের অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে আনতে হবে। বিশেষ করে পরিচালনা পর্ষদের অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানোর পাশাপাশি নতুন নিয়োগ, সকল প্রকার ঋরীবফ অংংবঃ কেনা, স্থানীয় ও বিদেশি প্রশিক্ষণ ও বিদেশ ট্যুর বন্ধ রাখা উচিত।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, করোনাকালে ব্যাংক কর্মীদের উৎসাহ দেয়ার জন্য ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে কোনো ব্যাংক কর্মীর বেতন কমানো, ইনক্রিমেন্ট বন্ধ রাখা কিংবা ছাঁটাই করা বাংলাদেশ ব্যাংক সমর্থন করে না। এটা নীতিগতভাবেও ঠিক না, অমানবিক কাজ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গর্ভনর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, করোনার সময়ে ব্যাংক কর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করায় তাদের প্রণোদনা দেয়া উচিত। কিন্তু তা না করে বেতন কমানো কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এর নেতিবাচক প্রভাব অন্যসব সেক্টরেও পড়বে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত এগুলোর বিষয়ে নজর দেয়া। খরচ কমানোর জন্য ব্যাংকের সাজসজ্জা কমিয়ে আনা, বছরে ৮/১০ কোটি টাকা দিয়ে বিল্ডিং ভাড়া নেয়া বন্ধ করা। ব্যাংকের হেড কোয়াটারের সাজসজ্জার নামে অর্থ অপচয় রোধ করতে হবে। কারণ ব্যাংকের কাজ হয় শাখা অফিসগুলোতে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত ব্যাংক থেকে পরিচালকরা কি কি সুবিধা পেতে পারেন, আর কি পারেন না তা নির্ধারণ করে দেওয়া। যে ব্যাংক কর্মীদের চালাতে পারবে না, তাদের অন্য ব্যাংকের সাথে একীভূত করে দেওয়া যেতে পারে। কারণ দেশে এতো ব্যাংকের দরকার নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গর্ভনর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, বেশির ভাগ ব্যাংকই বেতন কমানো, ইনক্রিমেন্ট বন্ধ রাখা কিংবা কর্মী ছাঁটাই করার মতো অনৈতিক কাজগুলো করছে না। ৬০টি ব্যাংকের মধ্যে ৫/৭টি দুর্বল ব্যাংক এই ধরনের কাজ করছে। এটা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ব্যাংকের বিজ্ঞাপন কমিয়ে এনে বিভিন্ন ভাতা বন্ধ করার পাশাপাশি পরিচালনা পর্ষদের বিভিন্ন খরচ কমিয়ে আনা গেলে কর্মী ছাঁটাই কিংবা বেতন কমানোর প্রয়োজন হবে না।
বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কর্মীদের সংগঠন ব্যাংকার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের (বিডব্লিউএবি) পক্ষ থেকে সংগঠনটির প্রেসিডেন্ট কাজী মো. শফিকুর রহমান এ বিষয়ে বিবৃতি দিয়েছেন। বিবৃতিতে বলা হয়, বিডব্লিউএবি মনে করে, ব্যাংক কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুতি বা বেতন-ভাতা কমানো কোভিড-১৯ বা অন্য সংকট মোকাবিলায় সমাধান হতে পারে না। বিডব্লিউএবি আশা করে, সকল বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক তাদের কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুতি বা বেতন-ভাতা কমানোর চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসবে এবং ব্যয় কমানো ও আয় বাড়ানোর অন্য বাস্তবভিত্তিক পন্থা অবলম্বন করবে।
বিডব্লিউএবি বলছে, যেসব ব্যাংকে চাকরিচ্যুত বা বেতন কমানো হয়েছে, সেখানকার কর্মকর্তারা ক্ষুব্ধ। অন্য ব্যাংকগুলোতেও চাকুরিচ্যুতি বা বেতন কমানোর আতঙ্ক রয়েছে। সাধারণ জনগণ মনে করে, ব্যাংকগুলো তার কর্মকর্তাদের বেতনেরই যদি সুরক্ষা দিতে না পারে, তাহলে গ্রাহকরা তাদের আমানতের সুরক্ষার ব্যাপারে নিশ্চিত হবে কীভাবে? এর ফলে বেসরকারি ব্যাংকের ওপর আস্থা কমে যাবে। ব্যাংক কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুতি বা বেতন-ভাতা কমানোর সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বিডব্লিউএবি বলছে, এ সিদ্ধান্ত ব্যাংক কর্মকর্তাদের হতাশাগ্রস্ত করবে। তারা কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন এবং ব্যাংকিং সেক্টরে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত না করা বা পদত্যাগে বাধ্য না করা এবং তাদের বেতন না কমানো। বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটিকালীন সময়ে ব্যাংক কর্মকর্তাদের অফিসে কাজ করার বিশেষ প্রণোদনা প্রদানের ব্যবস্থা করা। বিষয়গুলো প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনরের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে সংগঠনটি।
জানা যায়, ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা করোনায় সাধারণ ছুটির দুই মাস দায়িত্ব পালনের জন্য প্রণোদনা ভাতা পেয়েছেন। এখন আর সেটাও দেয়া হয় না। আর স্বাস্থ্য নিরাপত্তার উপকরণও দেয়া হয় নামে মাত্র। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুরক্ষা সামগ্রী নিজেদের কিনতে হচ্ছে। আরেকজন ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংকগুলো তার কর্মকর্তাদের বেতনেরই যদি সুরক্ষা দিতে না পারে, তাহলে গ্রাহকরা তাদের আমানতের সুরক্ষার ব্যাপারে নিশ্চিত হবে কিভাবে? এর ফলে বেসরকারি ব্যাংকের ওপর আস্থা কমে যাবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ