বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম ও কেলেঙ্কারির দায় কার?

নাছির উদ্দিন শোয়েব : একের পর এক অনিয়ম ও কেলেঙ্কারি প্রকাশ হয়ে পড়ায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদফতর প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। সাইনবোর্ডসর্বস্ব হাসপাতাল এবং বিভিন্ন ভুয়া প্রতিষ্ঠানকে করোনা চিকিৎসা ও নমুনা পরীক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হলেও এখন এর দায় কেউ নিচ্ছে না। নিজেদের রক্ষায় একে অপরকে দায়ী করছে। অথচ এ অনিয়মের শিকার হয়ে ভুগছেন সাধারণ মানুষ। জেকেজির পর রিজেন্ট হাসপাতালের প্রতারণা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের অদক্ষতা এবং ব্যর্থতাকে স্পষ্ট করেছে। অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলায় ডুবে আছে দেশের স্বাস্থ্য খাত। লাইসেন্সবিহীন রিজেন্ট হাসপাতালের অপকর্ম প্রকাশ হওয়ার পর প্রশ্ন ওঠে, করোনা চিকিৎসার মতো স্পর্শকাতর দায়িত্ব ওই প্রতিষ্ঠানগুলোকে কীভাবে দেওয়া হলো। এর দায় কার?  বিষয়টি শুধু দেশেই নয়, বিশ্বেও বাংলাদেশের সুনাম নষ্ট করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা পরীক্ষার নামে ভুয়া রিপোর্ট দিয়ে রিজেন্ট হাসপাতাল ও জেকেজি গোটা বিশ্বে বাংলাদেশকে কলঙ্কিত করেছে। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে এমন ন্যক্কারজনক ও নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশ ইতিহাস তৈরি করেছে।
বিশিষ্ট সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক গণমাধ্যমকে বলেছেন, করোনা মহামারির মধ্যেও যখন এমন জালিয়াতি করে ভুয়া করোনা রিপোর্ট ও রোগীদের চিকিৎসায় দুর্নীতি হয়, তখন বুঝতে হবে বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে। আর সাহেদকাণ্ডই তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। তিনি বলেছেন, ‘সমাজের অধিকাংশ মানুষই অন্যায় সয়ে নিচ্ছেন এবং সিরিয়াস কোনো ঘটনাই মনে করছেন না। আর এ কারণেই সাহেদ করিমের মতো লোকেরা ভয়ঙ্কর জালিয়াতি করতে পারছেন।’ এ আইনজীবী বলেন, ‘সাহেদ করিম একাই জালিয়াতি করেছেন, বিষয়টি এমন নয়। অনেকেই করোনাকালে দুর্নীতি করেছেন, করছেন। মহামারির এমন দিনে যখন মানুষের জীবন নিয়ে ব্যবসা, জালিয়াতি হয়, তখন সমাজের সর্বোচ্চ অধঃপতন ঘটছে বলেই মনে করতে হয়।’
এদিকে, রিজেন্টের প্রতারণার মূল হোতা সাহেদ করিম এখনো ধরা ছোঁয়ার বাইরে। হাসপাতালে র‌্যাবের অভিযানের পর আট দিন হলেও তাকে গ্রেফতার করা যায়নি। আরেকটি প্রতারণা প্রতিষ্ঠান জেকেজির চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনাকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করছে পুলিশ। এরই মধ্যে  রোববার একদিনেই পাঁচ প্রতিষ্ঠানের করোনাভাইরাস পরীক্ষার অনুমোদন বাতিল করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। এছাড়া রাজধানীর ডেমরার সারুলিয়ায় এইচএসএস হেলথ কেয়ার হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভুয়া রিপোর্ট দেওয়ার অভিযোগে হাসপাতালের পরিচালককে দুই বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত।
গত ৬ জুলাই রিজেন্ট হাসপাতালে অভিযানের পর র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল সারওয়ার-বিন-কাশেম বলেছেন, করোনার নমুনা পরীক্ষা ও চিকিৎসার নামে প্রতারণা ছোট করে দেখার মতো ঘটনা নয়। করোনায় রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. সাহেদকে খুঁজছে র‌্যাব। অন্যান্য বাহিনীও সতর্ক থাকায় তিনি দেশ ছেড়ে পালাতে পারবেন না। শিগগিরই তাকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে। লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক বলেন, রিজেন্টের প্রতারণায় ১৭ জনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাত আরো ৯ জনকে আসামি করে নিয়মিত মামলা হয়েছে। অভিযানের পরই সাহেদ গা ঢাকা দিয়েছেন। অভিযানের বিষয়ে তিনি বলেন, করোনাকে ঘিরে আমরা নানা অপতৎপরতা দেখেছি। শুরু থেকেই ভুয়া হ্যান্ড স্যানিটাইজার, ব্যবহৃত গ্লাভস-মাস্ক বিক্রির বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছি। বিভিন্ন ভুক্তভোগীর মাধ্যমে জানতে পারি, কিছু হাসপাতাল করোনা টেস্টকে ঘিরে নৈরাজ্য শুরু করেছে। ব্যক্তি পর্যায় থেকেই অনুসন্ধানের কাজ শুরু করেছিলাম। রিজেন্ট হাসপাতাল হোম ডেলিভারির মতো বাসায় গিয়ে করোনার নমুনা সংগ্রহ করে দ্রুততার সঙ্গে রিপোর্ট সরবরাহ করছিল। প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে আমরা গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়েছি। এরপর কেঁচো খুঁড়তে সাপ নয়, এনাকোন্ডা বের করে আনতে সক্ষম হই।
নকল ডাক্তার-ভুয়া রিপোর্ট, হাসপাতাল সিলগালা: এদিকে রাজধানীর ডেমরার সারুলিয়ায় এইচএসএস  হেলথ কেয়ার হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভুয়া রিপোর্ট দেওয়ার অভিযোগে হাসপাতালের পরিচালককে দুই বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। একইসঙ্গে তাকে দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। ওই পরিচালক সওকত হোসাইন সুমন নিজেকে চিকিৎসক ও টকশো ব্যক্তিত্ব পরিচয় দিয়ে এলেও আদতে তিনি চিকিৎসকই নন। কেবল সাখাওয়াত সুমন নয়, বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে হাসপাতালের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত আরও কয়েকজনকে জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। একইসঙ্গে হাসপাতালটি সিলগালা করা হয়েছে। রোববার বিকেল থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ওই হাসপাতালে অভিযান চালায় র‌্যাব-৩-এর ভ্রাম্যমাণ আদালত। অভিযানে নেতৃত্ব দেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পলাশ কুমার বসু। অভিযান শেষে পলাশ কুমার বসু সারাবাংলাকে বলেন, রোগীর স্যাম্পল গ্রহণ করার পর তা ফেলে দিয়ে ভুয়া রিপোর্ট দেওয়ার অভিযোগে ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট ওয়াসিম মন্ডলকে এক লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ, ফিজিশিয়ান স্যাম্পল, নকল ওষুধ রাখার দায়ে ফার্মেসির ম্যানেজার কাকন মিয়াকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারটি সিলগালা করা হয়েছে।
পাঁচ প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন বাতিল: এক দিনে পাঁচ প্রতিষ্ঠানে করোনাভাইরাস পরীক্ষার অনুমোদন বাতিল করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। আলাদা পাঁচটি চিঠিতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনুমোদন বাতিলের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো কেয়ার মেডিকেল কলেজ হসপিটাল, সাহাবুদ্দীন মেডিকেল কলেজ হসপিটাল, স্টেমজ হেলথ কেয়ার, থাইরোকেয়ার ডায়াগনস্টিক এবং চট্টগ্রামের এপিক হেলথ কেয়ার। এর মধ্যে স্টেমজ হেলথ কেয়ারকে কাতারের ভিসা প্রত্যাশীদের জন্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল।
সাহেদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত দুদকের: রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক ও রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান পলাতক মো. সাহেদ ওরফে সাহেদ করিমের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল সোমবার দুদকের পরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রণব কুমার ভট্টাচার্য্য এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ