বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

বহুমুখী জটিলতায় স্বাস্থ্যখাত চরম ভোগান্তিতে জনগণ

* টেস্টের ফি নির্ধারণে করোনা বিস্তারের সঠিক চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না
* পরীক্ষার সংখ্যা কমলেও শনাক্তের হার বাড়ছে
* ৩০ শতাংশ টেস্টের ভুল রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে
* আন্তর্জাতিক বিশ্বে ইমেজ সংকটে বাংলাদেশ 
স্টাফ রিপোর্টার : করোনা পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য সেবা নিয়ে বহুমূখী জটিলতায় পড়েছে দেশের স্বাস্থ্য খাত। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে জনগণ। করোনা টেস্ট নিয়ে সরকারের ফি নির্ধারণ, হাসপাতালগুলোর স্বেচ্ছাচারিতা, ভুল চিকিৎসা এবং দুর্নীতি এক দু:সহ যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে স্বাস্থ্য সেবাপ্রার্থীরা। এছাড়া বাংলাদেশের করোনা পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়লেও পরীক্ষার সংখ্যা সেই অনুপাতে বাড়েনি। তাদের মতে দৈনিক কমপক্ষে ২০ হাজার পরীক্ষা করা উচিত। কিন্তু সমন্বয়হীনতা এবং তথ্য-উপাত্তের অভাবের ফলে তেমনটি হচ্ছে না। অন্যদিকে, ঠিকমত লকডাউন বাস্তবায়ন না করায় মহামারি পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে। সেইসঙ্গে রোগ পরীক্ষায় দুর্নীতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এ খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের স্বাস্থ্য খাতের এই ভয়াবহ দুরবস্থার দায় সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো এড়াতে পারে না।
এদিকে করোনার কারণে চরম বিপাকে পড়েছেন স্বাস্থ্যসেবা প্রত্যাশীরা। সেইসাথে কিছু অসাধু এবং কুচক্রী মহলের কারণে দেশে বিদেশে ইমেজ সংকটে পড়েছে বাংলাদেশের মানুষ।
পরিসংখ্যান বলছে, করোনার নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা কমলেও বাড়ছে শনাক্তের হার। সরকার করোনা শনাক্তে আরটি-পিসিআর পরীক্ষার ফি নির্ধারণের পর থেকে প্রতিদিন পরীক্ষার সংখ্যা কমছে। সর্বশেষ গত ২৪ ঘণ্টায় ১১ হাজার ৫৯টি নমুনা পরীক্ষা করে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত আরও দুই হাজার ৬৬৬ জন শনাক্ত হয়। পরীক্ষা বিবেচনায় শনাক্তের হার ২৪ দশমিক ১১ শতাংশ। এদিকে করোনায় টেষ্টের ফি নির্ধারণে ভাইরাসটির বিস্তারের সঠিক চিত্র পাওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন এখাতের বিশেষজ্ঞরা।
গত ৬ জুলাই থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত প্রতিদিনের শনাক্তের হার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ৬ জুলাই শনাক্তের হার ২২ দশমিক ৪৭ শতাংশ থাকলেও ৭ জুলাই তা বেড়ে ২২ দশমিক ৯৮ শতাংশে দাঁড়ায়। ৮ জুলাই শনাক্তের হার ছিল ২২ দশমিক ২৬ শতাংশ। ৯ জুলাই শনাক্তের হার ছিল ২১ দশমিক ৪৯ শতাংশ। ১০ জুলাই আবার বেড়ে ২১ দশমিক ৮৬ শতাংশে দাঁড়ায়। সর্বশেষ ১১ জুলাই শনাক্তের হার বেড়ে ২৪ দশমিক শূন্য শতাংশ এবং গতকাল সর্বোচ্চ ২৪ দশমিক ১১ শতাংশে দাঁড়াল।
ফি নির্ধারণের পর পরীক্ষার সংখ্যা কমলেও শনাক্তের হার বাড়ার বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা বলেন, ‘এখন আসলে যার দরকার, সেই পরীক্ষা করছেন। আগে হয়তো দরকার নেই এমন অনেকে পরীক্ষা করতেন। এখন সেটি হচ্ছে না। এ ছাড়া, আমরা তো কন্টাক্ট ট্রেসিং করে পরীক্ষা করছি। এর বাইরে আরও লোক পরীক্ষা করাতেন। তাই তখন শনাক্তের হারও কম ছিল। এখন যাদের পরীক্ষা করা দরকার, তারাই করছেন। তাই শনাক্তের হারও বাড়ছে।’
‘পরীক্ষার সংখ্যা কমার ক্ষেত্রে ফি একটা কারণ হতে পারে। কিন্তু, শতভাগ কারণ ফি নয়। আরেকটা বড় ব্যাপার হলো সুস্থ হওয়ার যে ক্রাইটেরিয়াটা আমরা করে দিয়েছি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মত অনুযায়ী, শেষ তিন দিন উপসর্গ না থাকলে, ওষুধ না খেলে তাকে সুস্থ বলা হবে। সেক্ষেত্রে দ্বিতীয়বার পরীক্ষার দরকার হচ্ছে না।
সম্প্রতি মহামারি করোনা টেস্টে ফি নির্ধারণ করে দেয় সরকার। সরকারী প্রজ্ঞাপনে বলা আছে, কোভিড-১৯ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য অপ্রয়োজনীয় টেস্ট পরিহার করার লক্ষ্যে অর্থ বিভাগের গত ১৫ জুনের এক স্মারকের সম্মতির পরিপ্রেক্ষিতে আরটি-পিসিআর পরীক্ষার জন্য ২০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত ফি নির্ধারণ করা হলো।
এর প্রতিক্রিয়ায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফি নির্ধারণ করায় করোনা বিস্তারের সঠিক চিত্র আর পাওয়া যাবে না। তারা বলছেন, যাদের ফি দেওয়ার ক্ষমতা আছে তারাই করোনা পরীক্ষা করবেন। যাদের সংসার চলছে না, ২০০ টাকা হলে ৫ কেজি চাল কিনতে পারেন- এমন কেউ আর পরীক্ষা করাতে যাবেন না।  ফলে সমাজে করোনা বিস্তৃতির সঠিক চিত্রটা আর পাওয়া যাবে না।  শুধুমাত্র পয়সাওয়ালাদের মধ্যে কী পরিমাণ বিস্তৃতি লাভ করেছে সেটাই জানা যাবে।  সারাদেশের প্রাপ্ত তথ্য নিয়ে কোনো ধরনের পরিকল্পনার সুযোগও আর থাকলো না।
তবে স্বাস্থ্য সচিব আবদুল মান্নান মনে করেন, ‘‘২০০ টাকা দেওয়ার সক্ষমতা সবারই আছে। একজন রিক্সাচালক ভাল টাকা আয় করেন। করোনার মধ্যেও কিন্তু রিক্সা চলছে।  সরকার মনে করছে, ন্যূনতম একটা ফি থাকলে যাদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জাতীয় টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘‘একটা টেস্টের পেছনে সরকারের ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা খরচ হয়।  সেখানে ২০০ টাকা নিয়ে কতটা এগুবে? বরং ফ্রি থাকলে ধনী-গরীব সবাই টেস্ট করাতে যেতেন।  এখন যার খাবারেরই সমস্যা তিনি কীভাবে টেস্ট করাতে যাবেন? সবাই টেস্ট করাতে না গেলে সমাজের আসল চিত্রটা জানা যাবে না।  আর টেস্ট করানোর দায়টা তো স্বাস্থ্য বিভাগের।  জনগণ বুথে এসে নমুনা দিয়ে সরকারকে সহযোগিতা করছে।  তাহলে যে আপনাকে সহযোগিতা করছে, তার কাছ থেকে উলটো পয়সা নেবেন? আর এই সিদ্ধান্তটা অসাংবিধানিকও। সংবিধানে সবার জন্য স্বাস্থ্য সেবার কথা বলা আছে।  এখন এই সেবাটা আর সবার থাকলো না। ’’
বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব এহতেশামুল হক চৌধুরী দুলালও মনে করছেন, ফি নির্ধারণ না করলেই ভালো হতো। তিনি বলেন, ‘‘বিনা কারণে অনেকেই টেস্ট করাচ্ছেন এটা যেমন সত্যি, তেমনি ২০০ টাকা দিয়ে টেস্ট করানোও অনেকের জন্য কঠিন।  এটাও মানতে হবে।  তারপরও আমি মনে করি, সরকার তো কতকিছুতেই ভরতুকি দিচ্ছে, তাহলে এই টেস্ট ফ্রি রাখলেই ভালো হতো। ’’
বেসরকারি হাসপাতালগুলো যে বেশি ফি নিচ্ছে, সেই ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘সাড়ে তিন হাজার টাকা ফি নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও চার থেকে ছয় হাজার টাকা করে নিচ্ছে বেসরকারি হাসপাতালগুলো। এক্ষেত্রে সরকারের কঠোর মনিটরিং দরকার। বেসরকারি হাসপাতাল নিয়ে তো অনেক অভিযোগই আসছে। সরকারের উচিত তদারকি কমটি করে এগুলো সব সঠিকভাবে মনিটরিং করা।’
অনিয়ম, দুর্নীতি এবং অযোগ্যতার কারণে করোনাভাইরাস সংকট প্রকট হচ্ছে বলে মনে করে ট্রান্সপ্যারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ টিআইবি। এক গবেষণা প্রতিবেদনে সংস্থাটি আরও বলেছে, পরিস্থিতির শুরু থেকে লকডাউন সহ সকল পদক্ষেপের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ মতামত উপেক্ষা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণে আমলা নির্ভরতার কারণে অব্যাস্থাপনা বেড়েই চলেছে।
তাতে দেখা যাচ্ছে, সংক্রমণ প্রতিরোধের ব্যবস্থাপনা, চিকিৎসা থেকে শুরু করে অসহায় বা দরিদ্র মানুষকে সহায়তা দেয়ার ক্ষেত্রে দুর্নীতির প্রভাব পড়ছে। এর এতটাই খারাপ প্রভাব তারা দেখতে পেয়েছে যে, নমুনার দূর্বলতা এবং অদক্ষতার কারণে ৩০ শতাংশ টেস্টের ভুল রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে।
করোনাভাইরাস পরীক্ষার রক্ত সংগ্রহের টিউব, সিরিঞ্জ থেকে শুরু করে পিসিআর মেশিন কেনাসহ বিভিন্ন চিকিৎসা সামগ্রীর ক্ষেত্রে নানা ধরণের দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়ার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে ভুল এবং ভূয়া রিপোর্ট  নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যাওয়ার পর ধরা পড়ে ফিরে আসা এবং জেলে যাওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে বাংলাদেশ। করোনার কারণে বিশ্বের কিছু দেশে বাংলাদেশিদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আসলে ভুয়া রিপোর্ট দেওয়ার বিষয়টি জানার কারণেই বাংলাদেশিদের ভিসা দেওয়া হচ্ছে না। মানে এখান থেকে পরীক্ষা করে করোনা নেই জেনে বিদেশে যাওয়ার পর পরীক্ষা করে দেখা গেছে আছে। এসব বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত হবে। এখন যদি সংক্রমণ কমানো যায়, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি করা যায়, তাহলে অবশ্যই আবার তারা ভিসা দেবে। তারা তো তাদের নিরাপত্তার জন্য এমন সিদ্ধান্ত নেবেই। কাজেই এখানে রোগনিয়ন্ত্রণ করতে হবে।’
‘এখন যদি আমরা বাইরের দেশগুলোতে আস্থা স্থাপন করতে না পারি, তাহলে আমাদের মানুষগুলো সেসব দেশগুলোতে যেতে পারবে না। শ্রমবাজারে এটার প্রভাব পড়বে। কারণ, হয়তো পণ্য আনা যাবে, কিন্তু, শ্রমিকরা তো বাইরে যেতে পারবে না। অন্যদিকে, আমাদের দেশের অনেক শিক্ষার্থীই বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। তারাও একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সারাবিশ্ব যখন করোনার মহামারীকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে সেখানে বাংলাদেশে গাফিলতি করা হচ্ছে। কেননা এদেশে করোনার সার্টিফিকেট জাল হয়েছে, টাকার বিনিময়ে বিক্রি হয়েছে। আবার করোনার টেস্ট না করে নেগেটিভ বা পজেটিভ রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে। কয়েকটি দেশে ভুয়া রিপোর্ট নিয়ে যাওয়ায় আটকও হয়েছে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি। শুধু তাই নয়, ৮ জুলাই ইতালির গণমাধ্যমে করোনার ভুয়া সার্টিফিকেট বিক্রির জন্য দেশটির গণমাধ্যমে এসেছে বাংলাদেশের নাম। এ সব কারণে বাংলাদেশের সুনাম  চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ