বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

দেউলিয়া হওয়ার পথে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা

* কর্মহীন হতে পারে এক কোটি শ্রমিক
মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : বিশ্ব মহামারি করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে চরম সংকটে পড়েছেন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা। যারা ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়েছেন তা আজ বন্ধ হওয়ার পথে। করোনা  মহামারীতে টানা ৬৬ দিন সাধারণ ছুটির সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ রাখা এবং ছুটি শেষে সীমিত আকারে খুললেও খুব একটা লাভ হয়নি। ক্রেতা নেই, তাই লেনদেনও কম। উপরন্তু কারখানা ভাড়া, কর্মচারির বেতন ও পারিবারিক খরচ মেটাতে জমানো অর্থ খরচ করে চলেছেন এতদিন। এখন অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে গ্রামে যাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ ঘুরে দাঁড়ানোর উপায় খুঁজছেন। এভাবে চলতে থাকলে প্রায় এক কোটি শ্রমিক কর্মহীন হতে পারে বলে ধারণা সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার। তারা বলছেন, সরকারের প্রণোদনার টাকাটা পেলেও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা দেউলিয়া হওয়ার হাত থেকে উদ্ধার পেতো।
করোনা ভাইরাসের প্রভাবে চরম বেকায়দায় পড়েছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। লম্বা সময় ধরে ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা থাকায় নিজের সঞ্চয় ও পুঁজি ভেঙে চলতে হচ্ছে। অনেক ব্যবসায়ী এখন দেউলিয়ার পথে। এছাড়া চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে এ সব প্রতিষ্ঠানের কর্মচারিরা। জানতে চাইলে কয়েকজন উদ্যোক্তারা বলেন, লোকসানে পড়েছি, আবার দাঁড়িয়েছি। কিন্তু এবার আর দাঁড়ানোর উপায় নেই। করোনা  আমার এবং ব্যবসার কোমড় ভেঙে দিয়েছে। যারা এতদিন কাজ দিতো সেসব অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান কয়েক লাখ পাওনা টাকা না দিয়েই বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে একদিকে জমছে ঋণের কিস্তির পাহাড়, অন্যদিকে চার মাসের বাড়িভাড়া বকেয়া। পাওনাদারের ভয়ে বাসায় থাকতেও ভয় করে।
তারা বলেন, বছরের সবচেয়ে বড় ইনকাম হয় রোজার ঈদে। রোজার এক মাস ঘুম থাকে না। মাঝরাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়। ঈদের সময়ে যে আয় হয় তা দিয়ে পরের তিন চার মাস কর্মচারিদের বেতন ও দোকান ভাড়া ভালোভাবে চলে যেতো। কিন্তু এবারের চিত্রটা একেবারেই ভিন্ন। এবার চার মাস ধরে ব্যবসা বন্ধ। এর মধ্যে রোজার ঈদও চলে গেছে। জমানো টাকা দিয়ে জন কর্মচারির বেতন পরিশোধ করেছি। আবার নিরুপায় হয়ে বেশকিছু কর্মচারির কাজ থেকে একেবারেই বাদ দিতে হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, দেশে ১৫ জনের কম কর্মচারি কাজ করেন এমন পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৫৪ লাখ। এসব প্রতিষ্ঠানে ৯৭ লাখ কর্মচারি কাজ করে। যদি এই এসব ছোট ছোট প্রতিষ্ঠান ব্যবসা গুটিয়ে নেয় তবে প্রায় এক কোটি শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়বে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দীন বলেন, দেশে ফুটপাথে ব্যবসা করে কিংবা অতিক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর সংখ্যা ৬০ লাখ। যাদের কোনো লাইসেন্স নেই, ব্যাংকে লেনদেন নাই। কম পুঁজি দিয়ে দিনে ইনকাম দিনে শেষ- এমন ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি বিপদে রয়েছেন। গত চার মাসে তাদের কেউই ব্যবসা করতে পারেনি। উল্টো পুঁজি ভেঙে খেতে হচ্ছে। তিনি বলেন, অনেকের তো গ্রামে যাওয়ারও উপায় নেই। আমরা সরকারের কাছে অনেকবার বলেছি, এদের একেকজনের পুঁজি ৫০ হাজার টাকার বেশি নয়। এই টাকাটা পেলে তারা দেউলিয়া হওয়ার হাত থেকে উদ্ধার পেত। ব্যবসায়ীরা কখনও দান চায় না। আমরা লোন চাই। সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা গেলে এদের ব্যবসা গুটাতে হতো না।
এদিকে ওয়ার্ল্ড এসএমই ফোরামের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে ৭০ লাখ ৮১ হাজার শিল্পের মধে ৬০ লাখ ৮০ হাজার কুটিরশিল্প, ১ লাখ ১০ হাজার ক্ষুদ্রশিল্প, ৮ লাখ ৫০ হাজার ছোট শিল্প, ৭১ হাজার মাঝারি শিল্প এবং বড় শিল্পের সংখ্যা ৫২ হাজার। দেশে এসএমই খাতে কর্মসংস্থান রয়েছে ৭৩ লাখ শ্রমিকের।
শিল্প সচিব আবদুল হালিম বলেন, বর্তমানে জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান ২৫ শতাংশ। ২০৪১ সালের মধ্যে তা ২৮ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। ওই সময় জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান হবে ৪০ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গর্বনর ড. ফরাস উদ্দীন বলেন, করোনা ভাইরাস পরবর্তী সময়ে অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আর এ খাতে নজর দিলে এই সংকট দ্রুতই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। তিনি বলেন, এখন যেহেতু মানুষ গ্রামমুখী হচ্ছে, তাই কৃষিখাতে বেশি জোর দিতে হবে। কারণ মানুষ পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে। তাদের সুযোগ দিতে হবে। না হলে দারিদ্রতা বাড়বে। তিনি আরও বলেন, যারা কৃষি কাজে যুক্ত হবেন তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। আর যারা আবারও ব্যবসা করতে চান কিন্তু পুঁজি নেই, তাদের জন্যও সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।
এদিকে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণও তারা পাননি। ব্যাংক লোন নেওয়ার পথও বন্ধ। কারণ ব্যাংক বিজনেস দেখে লোন দেয়। এখন সে পরিস্থিতি নেই।
এ প্রসঙ্গে সিপিডির গবেষক ও পরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতিকে টেনে তুলতে এসএমই‘র দিকে নজর দিতে হবে। লাখ লাখ মানুষ কাজ হারিয়েছে। ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছে। তাদের ভবিষ্যত কী? যাদের ন্যূনতম কাজের সুযোগ আছে তারা কাজ করবে। যাদের একেবারেই কোনো সুযোগ নেই, তাদের জন্য সুযোগ করে দিতে হবে। দারিদ্র নিরসনে সরকারকে বড় বড় ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি এই ছোট ব্যবসায়ীদের পাশেও দাঁড়াতে হবে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, করোনা  দেশের অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক সংকট তৈরি করেছে। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, সংকটও বাড়তে থাকবে। এই পরিস্থিতি মাথায় নিয়েই মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কৃষি ও এসএমই খাতে জোর দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তারা। তারা বলছেন, অনেক উদ্যোক্তা ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে কারিগর বা শ্রমিকদের বেতন কমবেশি দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু পুঁজিতে টান ধরলে সেটি কত দিন চালিয়ে যেতে পারবেন তা নিয়ে রয়েছে সংশয়। ফলে এ খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত ৭৩ লাখ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এখন প্রণোদনা প্যাজেকের টাকা দ্রুত পেলে হয়তো কোনোভাবে নিজেদের ব্যবসা চালিয়ে নিতে বা টিকে থাকতে পারবেন।
এ বিষয়ে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি  শেখ ফজলে ফাহিম বলেন, করোনা  পরিস্থিতির কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বিভিন্ন সেক্টরে থাকা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নতুন উদ্যোক্তারা। ব্যাংক মালিকদের সংগঠনের পক্ষ থেকে তাদের সহায়তা করা হবে বলে আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু এখনো আমরা দৃশ্যমান ফলপ্রসূ কোনো পদক্ষেপ লক্ষ করছি না। ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়গুলো এখনো কোনো হেল্প ডেস্ক চালু করেনি এবং শাখাগুলোকেও কোনো পরিষ্কার নির্দেশনা দেয়নি। এই অসহযোগিতার বিষয়টি অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ