বুধবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

রিজার্ভের টাকা ব্যবহারের মানদণ্ড না মানলে অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়বে

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ঋণ নিতে হলে নিরাপত্তা সঞ্চিতির মানদণ্ড মেনে নিতে হবে। অন্যথায় দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকির কারণ হতে পারে। এ জন্য সতর্কতার সঙ্গে চাহিদা নির্ধারণ করে সিদ্ধান্ত নেয়ারও পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, মহামারীকালে এখন আমদানি ব্যয় কম মেটাতে হলেও কিছু দিন পর পরিস্থিতি বদলেও যেতে পারে সেটাও ভাবতে হবে। ৩৫/৩৬ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ কিন্তু খুব বেশি নয়। এখন আমদানি খাতে কম খরচ হচ্ছে ঠিক। কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আমদানি ব্যয় বাড়বে, তখন এই রিজার্ভ খুবই মূল্যবান হয়ে উঠবে। এ জন্য মহামারীকালে রিজার্ভ নয়, রাজস্ব আদায়ে গুরুত্ব দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। মোট কথা তহবিলের অর্থ ফেরত পাওয়াটা যে কোনোভাবেই হোক, নিশ্চিত করতে হবে।
গত সোমবার (৬ জুলাই) বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ঋণ নেয়া কিংবা এই অর্থ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যবহার করা যায় কিনা, সেটির পরীক্ষা-নিরীক্ষার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে তিনি এ নির্দেশনা দেন। এই অর্থ ব্যবহার করলে অর্থনৈতিক কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, সেটি বিশ্লেষণ করতে পারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বৈঠক শেষে এক ব্রিফিংয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান জানান, প্রধানমন্ত্রী একটি ঐতিহাসিক পরামর্শ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আমাদের রিজার্ভ ৩৬ বিলিয়ন ডলার। তাই বিদেশী ঋণ না নিয়ে এই টাকা ব্যবহার করা যায় কিনা। যেহেতু তিন মাসের আমদানি ব্যয় জমা থাকলেই সেটি স্বস্তিদায়ক, সেহেতু আমাদের যে অর্থ জমা আছে তা দিয়ে প্রায় এক বছরের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে টাকা ঋণ হিসেবে নিয়ে ব্যয় করা যায় কিনা, সেটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন রিজার্ভের অর্থ ব্যয় করলে অর্থনীতিতে কী ধরনের প্রভাব পড়বে এবং এ অর্থ ব্যয় করা যাবে কিনা, সে বিষয়ে গবেষণা করতে হবে। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অর্থ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো বিশ্লেষণ করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে যদি আনুষ্ঠানিকভাবে এ ধরনের প্রস্তাব কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আসে, তাহলে তখন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রিজার্ভ থেকে ঋণ নিয়ে কীভাবে উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় করা যায়, তার একটা সুন্দর পথ খুঁজে বের করার উদ্যোগ নেয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে প্রক্রিয়া খুঁজতে শুরু করেছে, কীভাবে রিজার্ভ থেকে ঋণ দেয়া যায়।
সূত্র জানায়, পদ্মা সেতুতে অর্থায়নের জন্য ২০১৫ সালে বাংলাদেশে সার্বভৌম সম্পদ তহবিল গঠনের সম্ভাব্যতা যাচাই, তহবিলের কার্যপদ্ধতি এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এর সর্বোত্তম ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার দিকগুলো পর্যালোচনার জন্য একটি কমিটি করা হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের তখনকার ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী নেতৃত্বাধীন ওই কমিটিতেও সদস্য ছিলেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান মনসুর। ওই সময়কার অর্থ সচিব ও বর্তমানে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরীও সদস্য ছিলেন কমিটিতে। সে সময় কিছু প্রক্রিয়া শুরু হলেও ২০১৬ সালের মার্চে হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ১০ কোটি ডলার চুরি হওয়ার পর সেই কার্যক্রমে ভাটা পড়ে।
বাংলাদেশে এ তহবিল গঠনের বিষয়ে কমিটি বলেছিল, মূলত খনিজ সম্পদ এবং উদ্বৃত্ত বাজেটসমৃদ্ধ দেশই এই সার্বভৌম সম্পদ তহবিল গঠন করে। কারণ তাদের উদ্বৃত্ত বাজেট হয়। বর্তমানে প্রায় ৪৬টি দেশে এ ধরনের তহবিল আছে। বাংলাদেশ খনিজ সম্পদ রফতানিকারক দেশ নয়। সাম্প্রতিক সময়ে রফতানি, প্রবাসীদের প্রেরিত আয়, বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং বৈদেশিক মুদ্রায় নিট ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। এ কারণে উদ্বৃত্ত রিজার্ভ সৃষ্টি হয়েছে এবং যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এ অবস্থা বিবেচনায় ছয় মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর পর রিজার্ভের বাকি অর্থ দিয়ে সরকার ‘সভরেন ওয়েলথ ফান্ড (এসডব্লিউএফ) বা সার্বভৌম সম্পদ তহবিল’ এসডব্লিউএফ গঠন করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সার্বভৌম সম্পদ তহবিল গঠন করে রিজার্ভ থেকে ঋণ দেয়া যেতে পারে। তবে রিজার্ভ খরচ এবং ঋণের প্রকল্প নির্বাচন দুই ক্ষেত্রেই সতর্ক থাকতে হবে। রফতানি, রেমিটেন্স, বিদেশি বিনিয়োগে কোনো দেশে যে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ তৈরি হয়, তাই রিজার্ভ, যে ভাণ্ডার থেকে আমদানি ব্যয় মেটানো হয়। আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ী, সাধারণত কোনো দেশের তিন মাসের বৈদেশিক মুদ্রার দায় মেটানোর মতো মজুদ থাকতে হয়। এর কম থাকলে ঝুঁকি হিসেবে গণ্য করা হয়।
এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘যেকোনো দেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতার নিরাপত্তা দেয়াল হলো বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ।  এখানে হাত দেয়ার আগে ভাবতে হবে, কত মাত্রার ঋণ নেবে, কিভাবে তা শোধ দেবে। 
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যে রিজার্ভ আছে, তা এক অর্থে অলসই পড়ে থাকছে।  এই অর্থ যদি সরকার ঋণ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, ক্ষতির কিছু নেই।  তবে, সুদের হার ও পরিশোধের মেয়াদ কী হবে, কোন প্রকল্পে ব্যবহার করা হবে, তা  আগে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে  দেখতে হবে।
এদিকে রিজার্ভ এখন বেশি থাকলেও তা খরচ করার ক্ষেত্রে যেমন সাবধানী হতে বলছেন গবেষকরা; তেমনি বলছেন, ঋণের জন্য প্রকল্প নির্বাচনের ক্ষেত্রে লাভালাভের দিকে দৃষ্টি রাখতে। ২০১৫ সালের কমিটি বলেছিল, কেবল সরকারের মেগা প্রকল্পে বা পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) প্রকল্প বাস্তবায়নে এ তহবিল থেকে অর্থায়ন করা যেতে পারে। তবে পিপিপি প্রকল্পের ভিজিএফ (ভায়াবিলিটি গ্যাপ ফাইন্যান্সিং) অর্থায়নে এ তহবিল ব্যবহার করা যাবে না। তহবিলের অর্থায়নে প্রকল্প নির্বাচনের ক্ষেত্রে অবশ্যই প্রকল্পের মেয়াদ যাতে দীর্ঘ হয় এবং পুরো সময়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে মুনাফা পাওয়া যায় তা নিশ্চিত করতে হবে। যতই উচ্চ সামাজিক সুবিধাসম্পন্ন প্রকল্প হোক না কেন, কোনোভাবেই সামাজিক অবকাঠামো খাতে এ তহবিলের অর্থ ব্যয় করা উচিত হবে না।
এ বিষয়ে সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, রিজার্ভের অর্থ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করতে হবে। কোনোভাবেই যাতে অপচয় না হয়, তা দেখেই প্রকল্প নির্বাচন করতে হবে। এজন্য এমন প্রকল্প নির্বাচন করতে হবে, যার সুশাসন সর্বোচ্চ মাত্রায় নিশ্চিত হবে, দীর্ঘমেয়াদি হবে এবং নিশ্চিতভাবেই মুনাফা আসবে। মোট কথা তহবিলের অর্থ ফেরত পাওয়াটা যে কোনোভাবেই হোক, নিশ্চিত করতে হবে।
ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান আহসান মনসুর জানান, মহামারীকালে এখন আমদানি ব্যয় কম মেটাতে হলেও কিছু দিন পর পরিস্থিতি বদলেও যেতে পারে সেটাও ভাবতে হবে। ৩৫/৩৬ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ কিন্তু খুব বেশি নয়। এখন আমদানি খাতে কম খরচ হচ্ছে ঠিক। কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আমদানি ব্যয় বাড়বে, তখন এই রিজার্ভ খুবই মূল্যবান হয়ে উঠবে। আহসান মনসুর সরকারকে রাজস্ব আয় বাড়াতে মনোযোগ দেয়ার পরামর্শ দেন।
তিনি বলেন, এই মহামারীকালে সরকারের রিজার্ভ দরকার নেই, দরকার রাজস্ব (টাকা)। রিজার্ভের অর্থ দিয়ে আমদানি বিল এবং উন্নয়ন প্রকল্পের বিদেশি পেমেন্ট যেটা, সেটা হয়তো পরিশোধ করা যাবে। কিন্তু অন্যান্য খরচের জন্য তো টাকা লাগবে। সরকারকে সেদিকেই বেশি মনোযোগী হতে হবে। রাজস্ব আদায় বাড়াতে জোর দিতে হবে।
এই অর্থনীতিবিদ বলেন, সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা নিলেই পারে। এছাড়া রিজার্ভ হলেও টাকায় কনভার্ট হবে। আবার টাকার প্রশ্ন উঠলে সরকার কী পরিমাণ ঋণ নিতে পারবে, কী পরিমাণ নিয়েছে, কত পাবে এই প্রশ্নগুলো জটিলতা তৈরি করবে। এর বাইরে রিজার্ভ থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার আইনগত দিকও দেখতে হবে। বিশ্বের কোনো সরকার এখনো এই পথে হাঁটেনি।  এর চেয়ে বরং টাকা ছাপানোর পথ ধরা যেতে পারে যা ডলারে রূপান্তরও করা যাবে।
উল্লেখ্য গত ২ জুলাই দেশের রিজার্ভ ইতিহাসে প্রথম ৩৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। তবে গত মঙ্গলবার এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) মে-জুন মাসের ৭২ কোটি ডলার আমদানি বিল পরিশোধের পর তা ৩৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ