বুধবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

বেসরকারি বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে

এইচ এম আকতার: মহামারি করোনা ভাইরাসের প্রার্দুভাবের কারণে অচল হয়ে পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য। এতে করে সরকারের রাজস্ব আহরণ কমেছে। একদিকে বেড়েছে খরচ, অন্যদিকে কমেছে আয়ের পরিমাণ। সদ্য সমাপ্ত (২০১৯-২০) অর্থবছরে সরকার ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেয় ৭২ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা। আগের (২০১৮-১৯) অর্থবছরে সরকার ঋণ নিয়েছিল ২৬ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার প্রতিবছর বাজেট ব্যয় ব্যবস্থাপনার জন্য অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক খাত থেকে অর্থ ধারের লক্ষ্য ঠিক করে। কিন্তু চলমান করোনা সংকটে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ। লক্ষ্য অনুয়ায়ী রাজস্ব আদায় হয়নি। এ ছাড়া নানা শর্তের কারণে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ কমেছে। ফলে সরকার বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে অতিমাত্রায় ঋণ নিয়েছে।

সরকারের এভাবে ব্যাংক ঋণ নির্ভরতায় বেসরকারি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

বাজেট ঘাটতি মেটাতে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ব্যাংক থেকে সরকার ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার নিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তবে অর্থবছরের শুরু থেকে সরকারের ব্যাংক ঋণের চাহিদা বাড়তে থাকায় পরে এটি বাড়িয়ে ৮২ হাজার ৪২১ কোটি টাকার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের ৩০ জুন শেষে ব্যাংক থেকে সরকারের নেয়া ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৭২ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা। আর ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোসহ ঋণের এ পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৮ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক সরবরাহ করেছে ১০ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা। আর বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নিয়েছে ৬১ হাজার ৮০৫ কোটি টাকা। আলোচিত সময়ে ব্যাংক খাতে সরকারের পুঞ্জিভূত মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজার ৩৪২ কোটি টাকায়।

এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, মহামারির কারণে লক্ষ্য অনুযায়ী রাজস্ব পায়নি। নানা শর্তের কারণে সঞ্চয়পত্রের বিক্রিও কমেছে। ফলে বাজেটের ব্যয় ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখতে সরকার বাধ্য হয়ে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে। তবে যতদিন রাজস্ব আদায়ে গতি না আসবে অথবা বিদেশি ঋণ সহায়তা না বাড়বে, ততদিন ব্যাংক থেকে সরকারকে ঋণ নিতে হবে।

সরকারের ব্যাংক ঋণ নির্ভরতা ঠিক নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এভাবে ঋণ নেয়া অব্যাহত থাকলে বেসরকারি ঋণ বাধাগ্রস্ত হবে। এমনিতে বেসরকারি ঋণ অনেক কমে গেছে।

এভাবে চলতে থাকলে সামনে কঠিন সময় আসবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

এদিকে নতুন (২০২০-২১) অর্থবছরের বাজেটে ঘাটতি মেটাতে সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এক লাখ ৯ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা সংগ্রহ করবে বলে পরিকল্পনা করেছে। চলতি অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেয়ার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে ৮৪ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে ২০ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য ব্যাংকবহির্ভূত খাত থেকে ৫ হাজার কোটি টাকাসহ মোট ২৫ হাজার কোটি টাকা নিতে চায় সরকার।

নভেল করোনা ভাইরাসের এই সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবি আর) রাজস্ব আদায় তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। গত মে মাসে প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও এর বিপরীতে আদায় হয় মাত্র ১৩ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা।

এনবি আরের তথ্য বলছে, গেল (২০১৯-২০) অর্থবছরের ১১ মাসে (জুলাই-মে) ১ লাখ ৮৭ হাজার ২৫০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়। আর সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে এক মাসে ১ লাখ ১৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করতে হবে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য সরকার ৩ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। এরপর সেটি সংশোধন করে কমিয়ে ৩ লাখ ৫০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে গত এপ্রিল শেষে বেসরকারি খাতে এক বছর আগের চেয়ে ঋণ বেড়েছে মাত্র ৮ দশমিক ৮২ শতাংশ। এই ঋণ প্রবৃদ্ধি গত প্রায় ১০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। করোনা ভাইরাসের কারণে মে মাসেও অধিকাংশ ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় ঋণ প্রবৃদ্ধি আরও কমবে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে নানা শর্তের কারণে সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগও কমে গেছে। জাতীয় সঞ্চয়পত্র অধিদফতরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৯-২০ অর্থবছরে জুলাই-মার্চ সময়ে নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয় ১১ হাজার ৩০২ কোটি ৬৪ লাখ টাকা, যা আগের অর্থবছরের (২০১৮-১৯) একই সময়ে বিক্রির পরিমাণ ছিল ৩৯ হাজার ৭৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা। বছরের ব্যবধানে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি কমেছে ৭২ শতাংশ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ