বুধবার ১২ আগস্ট ২০২০
Online Edition

শরীয়তপুর ও কুড়িগ্রামে ব্যাপক ভাঙ্গনে বহু ব্যবসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নদী গর্ভে বিলীন

শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জের উত্তর তারাবুনিয়া স্টেশন বাজারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছে ব্যবসায়ীরা

কে এম মকবুল হোসাইন, শরীয়তপুর থেকে : পদ্মার ভাঙ্গনে শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার উত্তর তারাবুনিয়া চেয়ারম্যান স্টেশন বাজারে সোমবার গভীর রাতে ৮টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এর ৭ দিন আগে ওই বাজারের আরো ৫টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পদ্মার ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে যায়। ভাঙ্গন আতঙ্কে মঙ্গলবার বাজার থেকে আরো ২০টি দোকানঘর অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে। বালু ভর্তি জিওব্যাগ ফেলে  ভাঙন রোধের চেস্টা চালিয়ে যাচ্ছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় সূত্র জানায়, উজান থেকে নেমে আসা ঢলে পদ্মার পানি বৃদ্ধি পেয়ে প্রবল স্রোতের সৃস্টি হয়েছে। এতে হঠাৎ করে দেখা দিয়েছে নদী ভাঙ্গন। আর এ ভাঙনে শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার উত্তর তারাবুনিয়া চেয়ারম্যান স্টেশন বাজারের দিদার সরকার, দেলু বেপারী, সুমন আসামী, রাজ্জাক মিজি, আঞ্জু সরকার জাহাঙ্গীর খার দোকানসহ সোমবার রাত দেড়টার দিকে ৮টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এ সব ব্যবসায়ীরা তাদের প্রতিষ্ঠানের কোন মালামাল রক্ষা করতে পারেনি। এর ১ সপ্তাহ আগে ওই বাজারের আরো ৫টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এ নিয়ে মোট ১৩টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নদী গর্ভে বিলীন হলো। ভাঙ্গন আতঙ্কে ইতোমধ্যে বাজারটির আরো ২০টি দোকানঘর অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্থ ব্যবসায়ী দিদার সরকার বলেন, গতকাল রাতে দোকান বন্ধ করে বাড়ি চলে যাই । সকালে বাজারে এসে দেখি আমার দোকানঘরসহ আরো ৭টি দোকান নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। আমার সবকিছু কেড়ে নিল পদ্মা। আমি এখন পরিবার পরিজন নিয়ে কি করে বাঁচবো। দোকানের আয় ছিল আমার সংসার চালানোর একমাত্র অবলম্বন।
শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম আহসান হাবিব বলেন,  গত কয়েকদিনে পদ্মার ভাঙনে তারাবুনিয়া স্টেশন বাজারের ১৩টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙন কবলিত ওই স্থানের ৩শ’ মিটার এলাকায় ৭৫ লাখ টাকা ব্যায়ে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙ্গন রোধের কাজ চলছে। ভাঙ্গন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডে একটি প্রকল্প জমা দেয়া হয়েছে।
মোস্তাফিজুর রহমান কুড়িগ্রাম থেকে : কুড়িগ্রামে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হলেও দুর্ভোগে রয়েছে বন্যাকবলিত এবং নদী ভাঙ্গনের শিকার পবিারগুলো। তবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার খবর পাওয়া গেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মৎস ও কৃষি খাতে।
জেলা প্রাথমিক ও উলিপুর উপজেলা শিক্ষা অফিসের তথ্যানুযায়ী জানা যায়, গত এক সপ্তাহের ব্যাবধানে নদী ভাঙনে বিলীন হয়েছে ৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে- উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নের নওদাপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, বজরা ইউনিয়নের চরবজরা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, থেতরাই উনিয়নের জুয়ান সতরা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ফলুয়ারচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এছাড়াও মারাত্বক হুমকির মূখে ব্রক্ষপুত্রের কিনারে দাঁড়িয়ে রয়েছে একই উপজেলার সাবের আলগা ইউনিয়নের সুখের বাতির চর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় দ্বিতল ভবনটি। যেটি ফ্লাড সেন্টার হিসেবেও ব্যবহুত হয়। তথ্যমতে ঐ বিদ্যালয়টিতে ঐ এলাকার দেড়’ শতাধিক কোমলমতি শিশু শিক্ষারত আছে। এছাড়া ১৫২টি বিদ্যালয়ের আংশিক ক্ষতি হয়েছে।
জেলা মৎস কর্মকর্তা জানান, জেলায় ১৩৭ হেক্টর আয়তনের ৮৫৪টি পুকুর বন্যায় পুরোপুরি নিমজ্জিত হয়েছে। ফলে ১৯০ টন মাছ ও ৩৮ লাখ ৫৪ হাজার টাকার পোনা ভেসে গেছে। প্রায় ২০ লাখ টাকার পুকুর পাড়ের ক্ষতি হয়েছে। সব মিলিয়ে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৩ কোটি টাকার। বন্যার ফলে জেলার নিবন্ধিত ১৮ হাজার মৎসজীবীর হ্যাচারি উৎপাদন ও বিপণন হুমকির মুখে পড়েছে। তিনি আরও জানান, জেলার ২২২টি বিলের মধ্যে ২০টি বিলে মাছ অবমুক্ত করা হয়েছে। তবে এ তথ্য যথাযথ নয় বলে মন্তব্য করেয়ছন জেলা মৎসচাষী সমিতির এক সদস্য।
কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন অফিস সুত্রে জানা যায়, বন্যার ফলে ৯ জন মারা গেছেন। এছাড়া পানিবাহীত রোগ দেখা দেয়ায় ৮৮ জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। জেলায় বন্যার পানিতে এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ৯ জন। এছাড়া ৮৮ জনের ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, ব্রহ্মপুত্রের পানিসহ কুড়িগ্রামের সকল নদ-নদীরর পানি বিপদসীমার নিচদিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে বেড়েছে নদী ভাঙ্গন।
উলিপুর উপজেলার সাহেবের আলগা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিদ্দিক মরাডল জানিয়েছেন, বন্যার পানি কমতে থাকলেও জনগণের কষ্ট কমেনি। বন্যা দুর্গতদের পর্যাপ্ত ত্রাণের প্রয়োজন।
জেলা প্রশাসক মো: রেজাউল করিম জানান, কুড়িগ্রামে বন্যাকবলিতদের জন্য সরকারী ও বেসরকারী ত্রাণ ততপরতা অব্যাহত রয়েছে।
গাইবান্ধায় বন্যার পরিস্থিতি অপরিবর্তিত
গাইবান্ধা সংবাদদাতা : ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘট নদীর পানি এখনও বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত হয়েছে। জেলার গাইবান্ধা সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার চরাঞ্চল ও নদী তীরবর্তী এলাকাগুলো ও চরাঞ্চলগুলোর মানুষ এখনও শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, জ্বালানি ও গো-খাদ্যের সংকটে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। বিশেষ করে বন্যায় কর্মহীন হওয়ার কারণে শ্রমজীবি মানুষগুলোর মধ্যে খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, গতকাল সোমবার ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপদসীমার ৩৫ সে.মি. এবং ঘাঘট নদীর পানি বিপদসীমার মাত্র ৩ সে.মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
জেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জেলার সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা, ফুলছড়ি ও সদর উপজেলার ২৬টি ইউনিয়ন বন্যা কবলিত হয়ে পড়ায় ১ লাখ ২২ হাজার ৩২০ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া বন্যায় প্রায় ২ হাজার হেক্টর জমি পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এতে চিনা বাদাম, আউশ ধান ও পাটের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ