বুধবার ২০ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

করোনার পরীক্ষা বাড়ানোর দাবি

দেশে মার্চের প্রথম দিকে করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর থেকেই চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন মহল দ্রুত নমুনা পরীক্ষা বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে এসেছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এ সংক্রান্ত নির্দেশনার উল্লেখ করে তারা বলেছেন, নমুনা পরীক্ষা বাড়ানো হলে রোগী শনাক্ত করা এবং তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থাও দ্রুতই করা সম্ভব হবে। সম্প্রতি ঢাকা সফর করে যাওয়া চীনা বিশেষজ্ঞ দলের সদস্যরাও নমুনা পরীক্ষা বাড়ানোর ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। সতর্ক করতে গিয়ে চীনের বিশেষজ্ঞরা আরো বলেছেন, পরীক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ খুবই পিছিয়ে রয়েছে এবং এর ফলে বিনা চিকিৎসায় বহু মানুষের মৃত্যুসহ ভয়ংকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
আশা করা হয়েছিল, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনার পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের তাগিদ ও হুঁশিয়ারির পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের পক্ষ থেকে নমুনা পরীক্ষা বাড়ানো হবে, যাতে করোনা রোগীদের শনাক্ত করা এবং চিকিৎসা দেয়া সহজে সম্ভব হয়। অন্যদিকে সরকার এগিয়ে চলেছে সম্পূর্ণ উল্টো পথে। পরীক্ষা বাড়ানোর অনুক’ল কোনো পদক্ষেপ নেয়ার পরিবর্তে সরকার প্রথমে পরীক্ষার জন্য ফি বা অর্থ দেয়ার আদেশ জারি করেছে। এই আদেশে বলা হয়েছে, সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষার জন্য জনপ্রতি দুইশ’ টাকা হারে ফি দিতে হবে। আর নমুনা সংগ্রহের জন্য কারো বাসায় যেতে হলে ফি’র পরিমাণ বেড়ে হবে সাড়ে তিন হাজার টাকা। বেসরকারি হাসপাতালে পরীক্ষার ক্ষেত্রে যোগ হবে আরো পাঁচশ’ টাকা। অর্থাৎ মোট চার হাজার টাকা। ফি আরোপের পক্ষে যুক্তি দেখাতে গিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, কোনো ফি বা টাকা দিতে হয় না বলে বহু মানুষ নাকি প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও সরকারি হাসপাতালে গিয়ে ভিড় করে এবং তার ফলে একদিকে সরকারের ব্যয় বেড়ে যায় এবং অন্যদিকে প্রকৃত রোগী ও আক্রান্তরা নাকি পরীক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়!
ফি আরোপের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সারাদেশে প্রতিবাদ উঠলেও সরকার তার অবস্থান পরিবর্তন করেনি। অর্থাৎ জনগণকে করোনা পরীক্ষার জন্য দুইশ’ এবং সাড়ে তিন হাজার টাকা করে দিতে হচ্ছে। এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই পরীক্ষার জন্য আগত মানুষদের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। যেমন গতকাল গণমাধ্যমের রিপোর্টে জানানো হয়েছে, জুন মাসের শেষদিকে দৈনিক যেখানে ১৭ থেকে ১৮ হাজার পর্যন্ত পরীক্ষা হয়েছে সেখানে ৩ থেকে ৬ জুলাই পর্যন্ত পরীক্ষা হয়েছে ১৩ থেকে ১৪ হাজার পর্যন্ত। এই চারদিনে ১৪ হাজার ৮৯০টি পরীক্ষা কম হয়েছে।
সরকার গঠিত জাতীয় পরামর্শক কমিটির সদস্য এবং বিএসএমএমইউ-এর সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর নজরুল ইসলাম বলেছেন, দৈনিক অন্তত ২০ হাজারজনের পরীক্ষা হলেও সংক্রমণের ধরন সম্পর্কে অনুমান করা যেতো। এদিকে পরীক্ষার দিক থেকে বাংলাদেশ বেশি সংক্রমিত দেশগুলোর তালিকায় ১৪৬ নম্বরে এবং যেসব দেশে এক লাখের বেশি সংক্রমিত সেসব দেশের মধ্যে মেক্সিকোর পর দ্বিতীয় স্থানে নেমে এসেছে। সর্বশেষ এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, বাংলাদেশে ১৩ হাজার ১৭৩ জনের পরীক্ষা করা হয়েছে- যাদের মধ্যে পজিটিভ এসেছে তিন হাজার ২৭ জনের তথা ২২.০৮ শতাংশের।
বলার অপেক্ষা রাখে না, বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতি ঘটে চলেছে। সে কারণে দরকার যখন ছিল পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ানো সরকার তখন ফি আরোপ করাসহ বিভিন্ন পন্থায় উল্টো পরীক্ষা কমিয়ে দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য অন্য একটি তথ্য হলো, ঢাকার বাইরে ৪২ জেলায় এখনো টেস্টের কোনো ব্যবস্থাই নেই। দেশের মোট ৬৪ জেলার মধ্যে ৪২ জেলাতেই পরীক্ষাকেন্দ্র না থাকার তথ্যটি শুধু আশংকাজনক নয়, যে কোনো বিচারে ভীতিকরও। প্রকাশিত বিভিন্ন রিপোর্টে জানানো হয়েছে, ঢাকায় ৩২টি এবং ঢাকার বাইরে ৩০টি- মোট ৬২টি কেন্দ্রে পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও চাহিদার তুলনায় অনেক কম হওয়ায় প্রতিটি পরীক্ষা কেন্দ্রেই নমুনার স্তুপ জমছে। কোনো নমুনা পরীক্ষার ফলই যথা সময়ে দেয়া যাচ্ছে না। একজনের রিপোর্ট চলে যাচ্ছে অন্যজনের নামে। বহু রিপোর্ট পৌঁছাচ্ছে এমনকি রোগী মারা যাওয়ার পর! তাছাড়া কোনো কোনো কেন্দ্রে ও হাসপাতালে ভুয়া রিপোর্ট দিয়ে অবৈধভাবে ব্যবসাও করা হচ্ছে- যেমনটি করার কারণে রিজেন্ট হাসপাতালকে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন এবং আমরাও মনে করি, সব মিলিয়েই বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতি অত্যন্ত আশংকাজনক হয়ে উঠেছে। কারণ, পরীক্ষাই যেখানে হচ্ছে না বা হলেও অনেক কম করা হচ্ছে সেখানে সংক্রমণ বেড়ে যাবে স্বাভাবিকভাবেই। এজন্যই সরকারের উচিত, ফি বাতিল করাসহ সম্ভাব্য সকল পন্থায় পরীক্ষা ও শনাক্ত করার এবং দ্রুত চিকিৎসা দেয়ার পদক্ষেপ নেয়া। আমরা আশা করতে চাই, পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠার এবং নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার আগেই মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য সরকার তৎপর হয়ে উঠবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ